সামান্য আলাপে একটি জীবন বাঁচানো যেতে পারে

আত্মহত্যাপ্রবণ একজন ¬ব্যক্তির কথা শোনা এবং তাঁর সঙ্গে কথা বলাটা আপাতদৃষ্টিতে কঠিন মনে হতে পারে; কিন্তু চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের মতে সেই সামান্য আলাপ, একটি জীবন বাঁচাতে পারে।
ডাঃ পূর্নিমা ভোলা

অনেক দিন বাদে আপনার পাড়ার এক মহিলার সঙ্গে দেখা; এবং যথারীতি আপনি তাঁর সঙ্গে ছেলে-মেয়ে কেমন আছে বা আজকাল রাস্তাঘাটে গাড়িঘোড়া বেড়ে গিয়েছে ইত্যাদি বিষয় নিয়ে গল্প শুরু করে দিলেন। কিন্তু হঠাৎ, একটু ইতস্তত করার পর, সেই মহিলা আপনাকে জানালেন, এই জীবন নিয়ে তিনি অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছেন। এই অবস্থায় আপনার কী বলা উচিত? আপনার পক্ষে কী সেই মহিলাকে সাহায্য করা আদৌ সম্ভব?

­­একটু সময় নিয়ে তাঁর কথা শোনা, মানসিক ভাবে তাঁর পাশ দাঁড়িয়ে এই ভরসা জোগানো যে, সব সময় অন্তত আপনি তাঁর পাশে আছেন – এইরকম পরিস্থিতিতে এইটুকু তো আপনি করতেই পারেন, তাই না? কোনও ব্যক্তির কথাবার্তার মধ্যে আত্মহত্যার সামান্য আভাস পেলে বুঝতে হবে ‘তাঁর সাহায্যের অত্যন্ত প্রয়োজন’। অনেকেই মনে করেন, এই অবস্থায় ব্যপারটা নিয়ে বেশি খোঁচাখুঁচি না করাই ভাল, কারণ তাহলে ওই ব্যক্তি হয়তো ব্যাপারটা নিয়ে আরও ভাববেন এবং ভুল কোনও পদক্ষেপ নিয়ে বসবেন। কিন্তু বাস্তবিক এইরকম পরিস্থিতিতে সেই ব্যাপারে খোলাখুলি কথা বলাতে পারলেই সবচেয়ে ভাল। প্রথমেই তাঁকে বুঝতে দিন যে, আপনি তাঁকে নিয়ে উদ্বিগ্ন। তারপর শান্ত হয়ে সমবেদনা আর স্বীকৃতি সহকারে তাঁর কথা শুনুন। এতে সেই মহিলার মনে আপনার প্রতি একটা বিশ্বাস জন্মাতে পারে, তিনি যে আর একলা নন এটা উপলব্ধি করতে পারেন। আপনি বলতে পারেন, "আমি হয়তো আপনার অবস্থাটি সম্পূর্ন উপলব্ধি করতে পারব না, কিন্তু এইটুকু জানবেন আমি আপনার পাশে আছি।” অথবা আপনি জিজ্ঞেস করতে পারেন যে, “আপনি কবে থেকে এইরকম ভাবতে শুরু করলেন বলুন তো? কিছু হয়েছে নাকি?”

অনেক সময় এইরকম একজন ব্যক্তিকে বোঝাতে গিয়ে আমরা অকারণ জ্ঞান, তুলনা এবং সমালোচনা করে ফেলি যেমন, “আপনার জীবনে কীসের অভাব বলুন”, বা “আপনি কি একবারও আপনার পরিবারের কী হবে ভেবে দেখেছেন”, বা “মানুষ এর চেয়েও কত কঠিন পরিস্থিতিতে লড়াই করে বেঁচে আছেন” বা “আপনি খুব স্বার্থপর ও দুর্বল”। এতে হিতে বিপরীত হয়। একবারও কি আপনি নিজেকে তাঁর যায়গায় বসিয়ে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সমস্যাকে বোঝার চেষ্টা করেছেন? নিজস্ব জ্ঞান দূরে সরিয়ে রেখে এইরকম পরিস্থিতিতে ধৈর্য ধরে আমরা শুধু তার সমস্যাটা বোঝার এবং পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করি।

মনোবল ভাঙা

এরপর আপনি কী করবেন? আপনার প্রতিবেশী হয়ত বলতে পারেন যে, উনি বহুদিন ধরেই বিভিন্ন উপায় নিজের জীবন শেষ করে দেবার কথা ভেবেছেন। একই সঙ্গে উনি আপনাকে বোঝানোর চেষ্টা করতে পারেন যে, এই ব্যাপার নিয়ে চিন্তা করার কোনও দরকার নেই, এবং কথাগুলো যেন শুধু তাঁর আর আপনার মধ্যেই থাকে। এই অবস্থায় আপনি তাঁর কাছে কোনও প্রতিজ্ঞা করে বসবেন না বা তাঁর মানসিকতা পরিবর্তনের বাড়াবাড়ি চেষ্টা করবেন না। বরং অত্যন্ত তৎপরতার সঙ্গে আপনার দ্বারা যতদূর সম্ভব সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিন। যদি তাঁর কাছে নিজেকে শেষ করার যথেষ্ট ধারণা থাকে, তবে তাঁকে একলা ছাড়া মোটেই নিরাপদ হবে না। আপনি তাঁদের পরিবারের লোকজনের কাছে নিজের উদ্বেগ প্রকাশ করতে পারেন, এবং তাদের বিভিন্ন হেল্পলাইন নম্বরে সহায়তার জন্যে বা একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলতে পারেন। উনি রাজি না হলেও আপনি কিন্তু হাল ছাড়বেন না। আত্মহত্যা সম্পর্কে দেশে ও বিদেশে বিভিন্ন গবেষণায় ব্যক্তির সঙ্গে সমব্যথী বার্তালাপের প্র্য়োজনীয়তা প্রমাণিত হয়েছে। এবং শুধুমাত্র সামান্য সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিলেই দেশে আত্মহত্যার হার কমানো সম্ভব। ‘লাইফলাইন’ নামে একটি অস্ট্রেলীয় সংস্থা এই ব্যাপারে প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকে। স্কুল-কলেজ-অফিসেও শিক্ষক বা সহকর্মীদের জরুরি পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখে এই ধরনের প্রশিক্ষণ দিয়ে রাখা উচিত।

আপনি হয়ত সবাইকে সাহায্য করতে পারবেন না, কিন্তু অন্তত একজন লোকের পাশেও যদি দাঁড়াতে পারেন, তবে একটি প্রাণ বাঁচতে পারে।

ডাঃ পূর্নিমা ভোলা নিমহ্যানসের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি ডিপার্টমেন্টের একজন সহকারী অধ্যাপিকা।


আরও পড়ুন