বর্ণনাঃ সাহায্য চাইবার আগের মুহূর্ত অবধি সব আশা হারিয়ে ফেলেছিলাম

ডিপ্রেশনে হওয়া মেজাজ বিকৃতির চিকিৎসা আর নিয়ন্ত্রণ সম্ভব।

আহমেদাবাদের গুনি, উচ্চাকাঙ্ক্ষী, বুদ্ধিমতী মেয়ে ক্রুতি মেহতার বয়েস ১৮ বছর। স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে ও বেঙ্গালুরুতে পাড়ি দিয়েছিল, স্নাতকোত্তর পর্যায়ে সাইকোলজি আর সাহিত্য নিয়ে পড়াশুনা করার জন্য। ক্রুতির বাবার সাথে বিবাহ বিচ্ছেদের পর থেকে মা-ই ওর একমাত্র অভিভাবক আর জীবনে প্রথমবার মায়ের থেকে এত দূরে একা বসবাস করছিলো ক্রুতি।

ছোটবেলা থেকেই ক্রুতি নিজের বাবা-মায়ের বৈবাহিক মতভেদের সাক্ষী। “আমার বাবাকে আমি ঘৃণা করি। একজন বাবার দায়িত্ব নিজের সন্তানকে ভালবাসা, তাঁকে সুরক্ষিত রাখা। কিন্তু আমার বাবা একজন নিষ্ঠুর আর উদাসীন পুরুষ যার সাথে আমি আর কোনোদিন দেখা করতে চাইনা’’। বাবার ব্যাপারে কথা বলতে ক্রুতির গলায় তিক্ততা আর অভিমানের সুর স্পষ্ট ধরা পড়ে।

নিজের ছোট জীবনে ক্রুতি অনেক পারিবারিক বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়েছিল, কিন্তু বেঙ্গালুরুতে নতুন জীবন শুরু করা নিয়ে সে খুব উৎসাহিত ছিল। ও জানালো, “প্রথমদিকে মনে হয়েছিল আমি সব ফিরে পেয়েছি। এমন একটা জায়গায় এসেছি যেখানে মনের আনন্দে থাকতে পারব। কলেজের প্রথম সপ্তাহেই অনেক নতুন বন্ধু হয়ে গিয়েছিল আমার। কিন্তু এই সুখ বেশিদিন টিকলো না’’। হোস্টেলের একই ঘরে থাকা অন্যান্য মেয়েরা আর নতুন বন্ধুরা ওকে সব সময় বাইরে বিনোদন অনুষ্ঠানে সঙ্গে নিয়ে যাওয়ার জন্য পীড়াপীড়ি করতে লাগল। অথচ ক্রুতি নিজের চেহারা নিয়ে নিরাপত্তা-হীনতায় ভোগার দরুন ওদের সাথে যেতে চাইত না। ওর মায়ের কথা অনুযায়ী, ক্রুতির গড়ন ছোটবেলার থেকেই একটু ভারীর দিকে ছিল কিন্তু কলেজে ভর্তি হওয়ার আগে অবধি ও এই বিষয়ে কখনই উদ্বিগ্ন ছিল না। ক্রুতির রুমমেট অণু জানালো, “আগের তুলনায় ও বেশি বেশি খেতে আরম্ভ করল। মিষ্টি খাওয়াও বেড়ে গেল। কলেজে যেতে চাইত না, বরং দুপুর অবধি টানা ঘুমিয়ে থাকত।’’

ক্রুতি স্বীকার করে যে এর আগে নিজের বাড়তি ওজনের থেকে বেশি জটিল সমস্যার মোকাবিলা ওকে করতে হয়েছিল কিন্তু এইসময়ে ও নিজের চেহারা বাদে অন্য কোন কথা ভাবতে পারছিল না। “আমার চেহারা আর বাড়তি ওজনের ভাবনা আমাকে আবিষ্ট করে রেখেছিল। এর আগে অবধি আমার বন্ধুদের সাথে বাইরে ঘুরতে যেতে খুব ভালো লাগত, অথচ আমি বাইরে যাওয়া, ঘোরাফেরা করা সব বন্ধ করে দিয়েছিলাম যেহেতু আমার মনের মধ্যে একটা দৃঢ় ধারনা ঘর বেঁধেছিল যে আমাকে কুৎসিত দেখতে আর ছেলেরা আমার দিকে তাকাবে না বা আমার প্রতি আকর্ষিত হবে না। আমার মনে হতে শুরু করেছিল যে আমি ভালবাসার যোগ্য নই আর কেউ আমাকে ভালবাসবে না। নিজেকে কাজকর্ম বা সম্পর্কের অযোগ্য মনে হতে লাগল। কোন কিছুতেই আনন্দ হতো না। ক্রমশ তলিয়ে যাওয়ার একটা অনুভূতি আমাকে গ্রাস করছিলো। এই মনোভাব থেকে কোনভাবেই নিজেকে বার করে আনতে পারছিলাম না। যেন দুর্বিপাকের গর্তের মধ্যে পড়ে রোয়ে ছিলাম। সাইকোলজি পড়ার উৎসাহ হারিয়ে ফেলেছিলাম, ভালো ক্যারিয়ার গড়ার স্বপ্নটা দূরে সরে যাচ্ছিল। মনোযোগের অভাবে সেমেস্তার পরীক্ষায় খুব খারাপ ফল করি।’’

ক্রুতি আরও জানায় যে বিনা কারণে ঘন-ঘন ওর মন খারাপ হতো আর ও কেঁদে ফেলত। ওর মনে হতো যে ও মানসিক ভাবে দুর্বল আর পুরো পরিস্থিতি ওর নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছে। ক্রুতির মা জানান, “ক্রুতি আমাকে একদিন অন্তর ফোন করত। ওর গলা সব সময় বিষণ্ণ আর ক্লান্ত শোনাত। আমার মনে আছে কিভাবে ও হঠাৎ কাঁদতে আরম্ভ করত আর বলত যে ওর সবসময় মাথায় আর কোমরে খুব যন্ত্রণা করে।”

ক্রুতি যখন অণুকে এই কথা জানায় যে ও নিজের জীবনের প্রতি অবসন্ন হয়ে পড়েছে আর এই ‘মৃত, শূন্য আর একঘেয়ে জীবনে’ ও আর বেঁচে থাকার কোন কারণ খুঁজে পাচ্ছে না, তখন সমস্যার গভীরতা অনুমান করে অণু ক্রুতির মা কে ক্রুতির মানসিক অবস্থার কথা খুলে বলে।

ক্রুতি জানায়, “আমার মা আমাকে রোগ নির্ণায়ক মনোবিজ্ঞানী (ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট)-র কাছে নিয়ে যান আর তখন ধরা পড়ে যে আমি রোগ পর্যায়ে অবসাদ বা ক্লিনিক্যাল ডিপ্রেশনে ভুগছি”। ওই মনোবিজ্ঞানী ক্রুতিকে বোঝান যে ডিপ্রেশন একধরনের মানসিক ব্যাধি যা সচরাচর অনেক মানসিক রোগীর মধ্যেই দেখা যায়। এটা কোন ধরনের দুর্বলতার লক্ষণ না।

ডিপ্রেশন বা অবসাদ এক ধরনের মনোবিকার যা চিকিৎসার সাহায্যে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। লঘুতর ডিপ্রেশনে সাইকোথেরাপি চিকিৎসা পদ্ধতিদ্বারা নিরাময় সম্ভব কিন্তু গুরুতর সমস্যার ক্ষেত্রে রোগীর মধ্যে যখন অনিদ্রা, খেতে না চাওয়া, অত্যন্ত নেতিবাচক বা আত্মহননের মতো চিন্তাভাবনার উপসর্গ দেখা দেয়, তখন ওষুধ খাওয়া এবং সাইকোথেরাপি, দুটোরই প্রয়োজন হয়।

ডিপ্রেশনের সাধারণ উপসর্গ হল সব সময় মন খারাপ লাগা বা উদাসীন থাকা, বিনোদনকারী কাজের প্রতি অনীহা, নিজেকে অযোগ্য বা অপরাধী মনে করা, ঘন ঘন কান্নাকাটি করা, অনিদ্রা বা সারাক্ষণ ঝিমুনি-ভাব, অনিয়ন্ত্রিত খাওয়াদাওয়া, খিদে না পাওয়া, আত্মহননের চিন্তাভাবনা। যদি এইধরনের অপ্রতিরোধ্য বিষণ্ণ মনো দশা আপনার পারিবারিক বা কর্মক্ষেত্রে সমস্যা সৃষ্টি করতে আরম্ভ করে, দেরি না করে মনোবিদের পরামর্শ নিন।

প্রবল মানসিক দৃঢ়তা থাকা সত্যেও অবসাদ যে কোন মানুষের হতে পারে। সমস্যার কথা অকপটে স্বীকার করে নিবারণের চেষ্টা করাটা অনেক বেশি সাহসিকতার পরিচয়। আপনার যদি মনে হয় আপনি কোন ধরনের মানসিক সমস্যায় ভুগছেন, নিজের ঘনিষ্ঠ বন্ধু বা আত্মীয়র সাথে সমস্যাটি নিয়ে আলোচনা করুন আর মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সাথে যোগাযোগ করুন।

মনোবিদদের সহায়তায় বিভিন্ন রোগীর অভিজ্ঞতা অনুযায়ী এই কাল্পনিক বর্ণনাটি বাস্তব পরিস্থিতি বোঝানোর জন্যে তৈরি করা হয়েছেএটি কোনও ব্যক্তি বিশেষের অভিজ্ঞতা নয়।

 

 

 


আরও পড়ুন