সমবেদনা, প্রিয়জনের সাথে যোগাযোগের চাবিকাঠি

তাঁদের অসুস্থতার অভিজ্ঞতাকে বুঝতে পারলেই আপনি তাঁদের বেশী ভালো দেখাশোনা করতে পারবেন।

আপনি যদি কোন মানসিক রোগে আক্রান্ত কারুর পরিচর্যার দায়িত্বে থাকেন, সেক্ষেত্রে আপনার জীবন অনেক ভাবে প্রভাবিত হবে। প্রথমদিকে, আপনাকে হয়তো রোগ-নির্ণয়ের সঙ্গে বোঝাপড়া করতে হবে এবং আপনার প্রিয়জনের পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে হবে এবং খুবই সমবেদনার সাথে আপনার ভালবাসার মানুষের যত্ন করতে হবে। যেহেতু তিনি হঠাৎই আপনার ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল হয়ে পড়বেন, আপনাকে হয়তোবা সব দায়িত্ব বা কর্তব্যগুলোকে আবার ঠিকমতো সাজিয়ে নিয়ে প্রয়োজনুসারে তাদের প্রাধান্য দিতে হবে। ক্রমশই, আপনি মুখোমুখি হবেন রোজকার জীবনের অসুবিধাগুলোর সাথে - কারণ, পরিবারের একজন অসুস্থ হওয়ায় আপনাকে বাড়ির কাজও করতে হবে, হয়তোবা অসুস্থ ব্যক্তিকে (কিছু কিছু ক্ষেত্রে) সারাদিন ধরে দেখাশোনা করতে হবে এবং তাঁদের স্বাস্থ্যেরও খেয়াল রাখতে হবে। জীবনযাত্রার এই পরিবর্তন ও আপনার প্রিয়জনের স্বাস্থ্যের কারণে আপনাকে হয়ত অর্থনৈতিক বিষয়টা অন্যভাবে পরিকল্পনা করতে হবে। সব মিলিয়ে একজনের অসুস্থতার প্রভাব গোটা পরিবারের ওপরেই পড়ে।

অবস্থার সাথে মানিয়ে নেওয়া

একজন মানসিক রোগীর যিনি পরিচর্যা করেন তাঁর পক্ষে এটা মেনে নেওয়া কঠিন যে যিনি আগে কর্মক্ষম ছিলেন, বাড়ির কাজ, পড়াশোনা ও কর্মক্ষেত্রের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করতেন, তিনি এখন আর সেই সব কাজ ঠিকমতো পালন করতে পারছেন না। সেই কর্মক্ষম মানুষটাই নিজের রোজকার কাজ, যেমন খাওয়া-দাওয়া, চান করা, ঘুমানো বা নিজের স্বাস্থ্যের সঠিক যত্ন রাখা, কিছুই করতে পারছেন না বা এই সব কাজগুলো উপেক্ষা করছেন। একজন মানুষ যিনি একসময় ঘরের সব কাজ ঠিকমতো সামলাতে পারতেন অথবা পরিবারের একজন রোজগেরে সদস্য ছিলেন, মানসিক অসুস্থতা-হেতু সেই সব কাজ এখন আর করতে পারছেন না। তাঁর ক্ষেত্রে ঘন ঘন মনের ভাবের পরিবর্তন ঘটছে; হয়তোবা আবেগতাড়িত হয়ে অস্বাভাবিক ব্যবহার প্রকাশ পাচ্ছে।

পরিচর্যাকারীর পক্ষে অবস্থাতা আরও জটিল হয়ে যায় যখন অসুস্থ মানুষের অভাব টা সে আর্থিক বা বাস্তবিক (উদাহরণ স্বরূপঃ যখন কেউ তাঁর ঘরের রোজকার কাজ করতে অক্ষম হন) যাই হোক না কেন, খুব বেশী মাত্রাতে অনুভূত হয়। সেই মানুষটি হয়তোবা সামাজিক দায়িত্ব থেকে নিজেকে সরিয়ে নেন – পাঁচজনের সাথে মেলামেশা থেকে বিরত থাকেন বা অস্বাভাবিক ব্যবহার (নিজের সাথে কথা বলা বা অন্যের কথায় সাড়া না দেওয়া বা শুধু একভাবে তাকিয়ে থাকা) করেন যা সমাজে অচল।

না বলা কথা ঠিকমত বোঝা

একজন পরিচর্যাকারীর পক্ষে এটা খুবই অস্বস্তিকর যখন তিনি তাঁর ভালবাসার মানুষকে বার বার রেগে যেতে, মুখ ভার করে থাকতে বা অসন্তোষ প্রকাশ করতে দেখেন। বিশেষজ্ঞরা বলেন, ভালবাসার মানুষকে উত্তর দেওয়ার আগে এক মুহুর্ত চিন্তা করা উচিতঃ মানুষটি কেন এই রকম ব্যবহার করছেন? তিনি ঠিক কি বোঝাতে চাইছেন?

বিশেষজ্ঞদের কথায় রোগীর না-পাওয়া চাহিদার কারণে যে ব্যবহারিক প্রকাশ ঘটে তা সামলানোটাই সব থেকে শক্ত। যদি পরিচর্যাকারী সেই প্রয়োজনটা বুঝতে পারেন তাহলেই তাঁরা প্রিয়জনের সাথে যুগ্মভাবে সমস্যার সমাধান করতে পারবেন।

উদাহরণ হিসাবে বলা যায় যে, একজন মানুষ যিনি খুব রাগ করছেন কারণ তিনি খুব ক্ষুধার্ত ও সেই জন্য কষ্ট পাচ্ছেন অথচ নিজের কষ্ট কারোকে বোঝাতে পারছেন না।

এখানে কিছু সাধারণ ঘটনার কথা বলা হয়েছে যা একজন মানুষের না-পাওয়ার চাহিদা থেকে যে নৈরাশ্য দেখা যায় তার দিকেই ইঙ্গিত দেয় আর এই ধরণের ব্যবহার মানসিকভাবে অসুস্থ মানুষের মধ্যে দেখা যায়।

  • মানসিক অসুস্থতা বা ওষুধের জন্য কিছু ধরণের অস্বাভাবিক ব্যবহার লক্ষ্য করা যায় যা সাধারণভাবে অপ্রত্যাশিত বা অসংগত।
  • পরিচর্যাকারীর প্রত্যাশা তা সে প্রকাশ পাক বা না পাক; অন্যান্য স্বাভাবিক মানুষের সাথে বা বাচ্চাদের সাথে তুলনা (যেমনঃ “আপনি বাচ্চাদের মত ব্যবহার করছেন”, অথবা “ওঁকে দেখুন, উনি তো এরকম ব্যবহার করছেন না”); যিনি দেখাশোনা করেন তিনি আশা করতেই পারেন যে অসুস্থ ব্যক্তি আর পাঁচজন মানসিক দিক দিয়ে সুস্থ মানুষের মত সব কাজ করবেন। কিন্তু এতে অসুস্থ মানুষটি হতাশ হয়ে পড়েন ও নিজেকে অপ্রয়োজনীয় মনে করতে থাকেন।
  • অতরিক্ত দেখাশোনাঃ অনেক পরিচর্যাকারী প্রয়োজনের থেকে বেশী যত্ন নেওয়ার চেষ্টা করেন ও অসুস্থ মানুষটিকে তাঁর নিজের রোজকার কাজ, সংসারের কাজ এবং অন্যান্য কাজ থেকে দূরে সরিয়ে রাখেন।
  • স্টিম্যুলেশনের কম বা বেশী প্রয়োগঃ এর মধ্যে এটাও থাকতে পারে যে রোগী কারোর সাথে যোগাযোগ রাখতে চান না।

প্রতিকূল পরিস্থিতি সামলানো   

মানসিক অসুস্থতা হল আর পাঁচটা সাধারণ রোগের মত এবং এর চিকিৎসাও সম্ভব। এটা মাথায় রাখতে হবে যে ঐ ব্যক্তির ব্যবহারে অস্বাভাবিকতা দেখা যায় মানসিক অসুস্থতার কারণে। এটা ঐ ব্যক্তির দুর্বলতা বা ইচ্ছাকৃত ব্যবহার নয় যা আপনার পক্ষে মানিয়ে নিতে অসুবিধা হয়। একই সঙ্গে এটাও ঠিক নয় যে তিনি মানসিক অসুস্থতার বশীভূত হয়ে যা যা করেছেন তা সব সময় মেনে নেওয়া। সেই মানুষটা আর পাঁচজন মানুষের মত ও আশপাশের সাধারণ মানুষের মতই তাঁদের আনন্দ, নৈরাশ্য, রাগ, দুশ্চিন্তা সবই প্রকাশ করেন –ব্যবহারের এই বহিঃপ্রকাশ অসুস্থতা বা রোগের লক্ষণ হবে তা জরুরী নয়।

অনুভূতির যথাযথ প্রকাশ রোগীর সুস্থ হয়ার ক্ষেত্রে একটা বড় ভূমিকা নেয়। এই সব অসুস্থ ব্যক্তিরা কিন্তু না-সূচক অনুভূতি সহজেই বুঝতে পারেন আর এটা তাঁদের ভালো থাকার রাস্তাতে বাধার কাজ করে। তাঁদের প্রতি না-বাচক বা সমালোচনা সূচক মন্তব্য না করাই ভালো। পরিবর্তে তাঁদের সাথে স্নেহ, ভালবাসা ও উৎসাহের সাথে কথা বলা উচিত। কখনো কখনো এইসব মানুষরা পরিচর্যাকারীর কথা মত চলতে গিয়ে অসুবিধাতে পরেন। প্রায়ই দেখা যায়, দেখাশোনা করতে গিয়ে নিজের ভালবাসার মানুষকে এত বেশী আগলে রাখা হয় যে তাঁকে বিছানা থেকে উঠতে দেওয়া হয় না, এমনকি আগ্রহ দেখানো সত্ত্বেও বাড়ির কাজে সাহায্য করতেও দেওয়া হয় না। মানসিক রোগীর পুনর্বাসন শারীরিক অসুস্থদের থেকে অনেকটাই আলাদা। কিছু ধরণের অস্বাভাবিকতার ক্ষেত্রে চিকিৎসা চলাকালীনও রোগী এতটাই কর্মক্ষম থাকেন যে তিনি নিজের কাজের জায়গাতেও সমভাবে সক্রিয় থাকেন; এমনকি ঘরের কাজে হাতও লাগাতে পারেন। কেবলমাত্র নির্দিষ্ট কিছু কাজ করার সময়েই তাঁর সাহায্যের দরকার হয়। যদি আপনি নিশ্চিত না হন যে আপনার ভালবাসার মানুষ ঠিক কোন কোন কাজ করতে পারবেন তাহলে চিকিৎসাধীন সাইকিয়াট্রিস্ট বা কাউন্সেলর এর সাথে আলোচনা করুন।

যখন দেখতে পান আপনার ভালবাসার জন খুবই হতাস, তখন তাঁর অনুভূতিকে বোঝার চেষ্টা করতে হবে। চারপাশের সুস্থ-স্বাভাবিক লোকদের সাথে যেমন ব্যবহার করেন, সেই একই ভাবে অসুস্থ মানুষদের সাথেও ব্যবহার করুন। তাঁদের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনুন – মানসিক রোগী হলেও তাঁদেরও অনুভূতি আছে। তাঁরা খুবই আবেগপ্রবণ ও চান যে কেউ তাঁদের কথা মন দিয়ে শুনুক। আপনি তাঁরা কেমন আছেন, ঠিক কি করতে চান তা জানার চেষ্টা করুন। তাঁদেরকে ঘরোয়া কাজে ও পরিবারের আলোচনাতে যোগদান করতে দিন – এতে তাঁরা নিজেদেরকে পরিবারের একজন, একটা অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ বলে মনে করবেন।

এ বি সি পদ্ধতি

বিশেষজ্ঞরা বলেন যে, মানসিক অসুস্থ ব্যক্তির ব্যবহারের এ বি সি ফরম্যাটে মাপলে তা পরিচর্যাকারীর কাছে একটা গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক হয়ে উঠতে পারে। এ বি সি অর্থাৎ -

আন্টিসিডেণ্টঃ আগে ঠিক কি ঘটেছে যার জন্য আপনার ভালবাসার মানুষ ঐ ধরণের ব্যবহার করেন?

বিহেভিয়ারঃ কি ধরণের ব্যবহার দেখা গিয়েছিলো (রাগ বা হতাশা ইত্যাদি)? এটা কতক্ষণ ধরে চলেছিল?

কন্সিকয়েন্সঃ ফলাফলটা কি ঘটেছিল? কিভাবে পরিচর্যাকারী বা পরিবারের লোকজন এই ব্যবহারে সাড়া দিয়েছিলেন?

আপনি এটা লক্ষ্য করে কোন নির্দিষ্ট ব্যবহার বার বার ঘটলে তা কিভাবে অতিক্রম করা যায় তার সংকেতও পেতে পারেন - একজন ব্যক্তি যিনি রেগে গেলে হয়ত ঘুঁষি পাকান, গলার আওয়াজ চড়িয়ে দেন বা অসহিষ্ণু হয়ে পরেন। এই ইঙ্গিতগুলো এক একজন মানুষের ক্ষেত্রে এক এক রকম হয় এবং এটা চিহ্নিত করতে পারলে আবার যখন এই রকম ঘটনা ঘটবে তা সামলাতে সাহায্য করবে।

এই সব তথ্য সাইকিয়াট্রিস্ট বা কাউন্সেলর কে দেখানো উচিত যাতে তিনি বুঝতে পারেন আশেপাশের কি কি পরিবর্তনের ফলে মানসিক অসুস্থ রোগীর ব্যবহারে কি কি পরিবর্তন ঘটছে। যিনি দেখাশোনা করছেন তিনি প্রয়োজনে বার বার ঘটা এই সব অবস্থাতে ঠিক কি করা উচিত সে বিষয়ে প্রফেশনলের পরামর্শ নিতে পারেন।


আরও পড়ুন