একটি আত্মহত্যার ঘটনার পর প্রতিরোধকারীর দরকার পারিপার্শ্বিক সাহায্য

আত্মহত্যার মধ্য দিয়ে কারও প্রাণ চলে গেলে, তা একজন দ্বাররক্ষীর জীবনেও গভীর প্রভাব ফেলে; এমতাবস্থায় তিনি কীভাবে পাবেন চারপাশের সহায়তা

দ্বাররক্ষী বা প্রতিরোধকারীর মনে আত্মহত্যার ফলে যে কোনও মানুষের মৃত্যু ঘটলে তা গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করতে পারে। মৃত ব্যক্তি যদি ওই সহৃদয় লোকটির কাছের  মানুষ অর্থাৎ ঘনিষ্ঠ বন্ধু বা পরিবারের  সদস্য না-ও হয়, তবু তার জীবনে এহেন ঘটনা চিরকালীন দাগ রেখে যায়। বন্ধ দরজার দ্বারে দাঁড়ানো মানুষটি, যিনি আত্মহত্যার ঘটনায় কাউকে তাঁর জীবন থেকে হারিয়ে ফেলেছেন, সেই পরিস্থিতিতে ওই দ্বাররক্ষীর মানবীয় অনুভূতির সমগ্র ক্ষেত্রে ব্যাপক আলোড়ন দেখা যায়। যেমন—

  • এহেন খবর শুনে তিনি মনে-মনে অত্যন্ত ভারাক্রান্ত হয়ে পড়েন। একজন মানুষ যে আর পৃথিবীতে নেই, এই সত্যটা তিনি কিছুতেই মন থেকে মেনে নিতে পারেন না।
  • যিনি আত্মহত্যার মতো ঘটনা ঘটিয়েছেন, তার উপর একপ্রকার রাগ জন্মায়। মনে প্রশ্ন জাগে, কীভাবে একজন মানুষ এহেন ঘটনা ঘটাতে পারে? দ্বাররক্ষী হিসেবে এ-ও মনে হতে পারে যে, যখন কোনও ব্যক্তি আত্মহত্যার মতো সাংঘাতিক ঘটনা ঘটাতে উদ্যত হচ্ছিলেন, তখন তিনি তাকে এই কাজ  করতে বাধা দিতে পারতেন, বা তাড়াহুড়ো করে যাতে সে এরকম অবিবেচক সিদ্ধান্ত না নেয়, সেকথাও দ্বাররক্ষী তাকে বোঝাতে পারতেন।
  • দ্বাররক্ষী এটা ভেবেও লজ্জিত হন যে, আত্মহত্যার ঘটনা ঠেকাতে একজন মানুষকে তিনি তাঁর সাহায্যের হাতটুকু বাড়িয়ে দিতে সক্ষম হলেন না।
  • একজন মানুষের জীবন শেষ করে দেওয়ার প্রবণতা থেকে তাকে তিনি সরিয়ে আনতে পারলেন না?— মনে এহেন প্রশ্ন জাগে এবং তিনি অপরাধ বোধে ভুগতে শুরু করেন। কিন্তু ভাবার বিষয় এই যে, সত্যিই কি এমন ঘটনার পিছনে তাঁর কিছু করার বা বলার থাকতে পারে? অন্য কারও সঙ্গে  এই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে এবং যা ঘটে গেছে তার পিছনে থাকা সম্ভাব্য ভুলগুলি সম্বন্ধে কাটাছেঁড়াও চলতে পারে।
  • হতাশা— এই ঘটনার ক্ষেত্রে দ্বাররক্ষী হিসেবে কারও চেষ্টা বিফলে গেলে তাঁকে যে একরাশ হতাশা গ্রাস করবে, তা বলাই বাহুল্য।

একটি আত্মহত্যার ঘটনা সেই সব মানুষের জীবনেই গভীর প্রভাব বিস্তার করতে পারে, যাঁদের উপর একজন আত্মহত্যাকারীর দেখাশোনার ভার বা দায়িত্ব ছিল। এক্ষেত্রে একজন তিনি একজন সামান্য মানুষ হতে পারেন, যিনি হয়তো  আত্মহত্যাকারীর বন্ধু বা পরিবারের কাছের কেউ নন। তবুও এহেন ঘটনা তাঁকে ভীষণভাবে নাড়া দেয়।

অধিকাংশ মানুষই যখন কোনও আত্মহত্যার ঘটনার কথা শোনেন, তখন সেই ঘটনার জন্য যে কোনও কারণকেই তারা দায়ি করার চেষ্টা করেন। আমরা খুব সহজেই একটি স্থির সিদ্ধান্তে উপনীত হই যে, একটা নির্দিষ্ট কারণই একজন ব্যক্তিকে আত্মহত্যার দিকে ঠেলে দিয়েছে।

কিন্তু দ্বাররক্ষী হিসেবে একজনের মনে রাখা জরুরি যে, কোনও একটি বিষয় বা কারণকে আলাদাভাবে আত্মহত্যা ঘটানোর জন্য দায়ি করা সঠিক চিন্তা নয়। এই বিষয়টির কোনও সহজ সমাধান নেই বা এই ব্যাপারে দ্রুত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো
ঠিক নয়। আত্মহত্যা করার পিছনে সাধারণত বহুবিধ জটিল কারণ থাকে। এগুলির মধ্যে কোনও একটিকে নির্দিষ্ট করে তাকেই আত্মহত্যার জন্য যথাযথ কারণ হিসেবে বিচার করা যুক্তিযুক্ত নয়।

এক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল, এই ধরনের ঘটনায় একজন দ্বাররক্ষী কখনোই পুরোপুরি দায়ি হতে পারেন না। দ্বাররক্ষীর প্রধান কাজ হল, যে লোকটা আত্মহত্যা করার কথা চিন্তা করছে, তাকে সেই ভাবনা ত্যাগ করার ক্ষেত্রে সাহায্য করা এবং মানসিক স্বাস্থ্যের বিকাশে তাকে সঠিক দিশা দেওয়া। আত্মহত্যাকারীকে রোখার জন্য তাকে একথা বোঝানো একজন দ্বাররক্ষীর দায়িত্ব নয় যে, ওই ব্যক্তি জীবনের সব প্রতিবন্ধকতাকে জয় করতে সক্ষম। প্রকৃতপক্ষে একজন দ্বাররক্ষী আত্মহত্যায় ইচ্ছুক ব্যক্তি এবং মানসিক স্বাস্থ্য-বিষয়ক বিশেষজ্ঞের মধ্যে যোগসূত্র রচনার দায়িত্ব পালন করতে সমর্থ। আর এই বিশেষজ্ঞ ওই ব্যক্তির মানসিক স্থিতি ফিরিয়ে আনতে সচেষ্ট হবেন।

দ্বাররক্ষী হিসেবে আসলে কাদের চিহ্নিত করা হয়?

দ্বাররক্ষীরা হচ্ছেন সেই সব ব্যক্তি, যাঁরা বিশ্বাস করেন যে আত্মহত্যা প্রতিরোধযোগ্য একটি ঘটনা। উপযুক্ত সময় এবং সদিচ্ছার মাধ্যমে আত্মহত্যার পিছনে থাকা কারণগুলিকেও বোঝা সম্ভবপর হয় বলে তাঁরা মনে করেন। শিক্ষক, অভিভাবক, তত্ত্বাবধায়ক ব্যক্তি, অফিসের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ, সহকর্মী অথবা কমিউনিটির প্রধান দ্বাররক্ষীর ভূমিকা পালন করতে সক্ষম। দ্বাররক্ষী হিসেবে নিয়োজিত ব্যক্তির আত্মহত্যার ঘটনা ঠেকানোর জন্য এবং আত্মহত্যাকারীকে মানসিক ভাবে সাহায্য করার জন্য উপযুক্ত প্রশিক্ষণ থাকা দরকার। এবং আত্মহত্যার মতো ঘৃণ্য বিষয়ের মধ্যে যে বিপদের বীজ লুকিয়ে রয়েছে, সে সম্বন্ধে কমিউনিটির মানসিক স্বাস্থ্য সংক্রান্ত পরিষেবাকে সহযোগিতা করাও একজন দ্বাররক্ষীর অন্যতম কর্তব্য।

পরিবারের সদস্য বা বন্ধু, যাদের কাছের কেউ আত্মহত্যার মতো ঘটনা ঘটিয়েছেন, তাঁরা একজন দ্বাররক্ষী হিসেবে কীভাবে এহেন পরিস্থিতির মোকাবিলা করবেন—

আত্মহত্যাকারীর ঘনিষ্ঠ মানুষ এই ঘটনার ফলে একেবারে বিহ্বল হয়ে পড়েন। কেউ কেউ আবার দুর্ঘটনার পরে মানসিক অবসাদ বা পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার (পিটিএসডি)-এ আক্রান্ত হন। এক্ষেত্রে যদি কেউ দিশাহারা বোধ করেন বা নিজের অনুভূতিকে  নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখতে না পারেন, তাহলে তাঁর উচিত একজন মানসিক স্বাস্থ্যের  বিশেষজ্ঞের সঙ্গে যোগাযোগ করা। একটি প্রশ্ন খুব স্বাভাবিক ভাবেই মনে আসে যে, তাঁর কোনও কাজ বা কথা কাছের মানুষকে আত্মহত্যার পথে ঠেলে দিল কিনা বা  এই ঘটনা প্রতিরোধ করার ক্ষেত্রে তাঁর কিছু করণীয় ছিল কিনা। আত্মহত্যার সঠিক  কারণ সম্বন্ধে এহেন ব্যক্তিরা সম্পূর্ণ অন্ধকারে থাকতে পারেন। এইভাবে কোনও একটি কারণকে নির্দিষ্ট করে অন্যান্য মানুষের মতো তিনিও আত্মহত্যাকে একটা ঘৃণ্য ঘটনা বলে সমালোচনা শুরু করতেই পারেন। সেই সঙ্গে নিজেদের মনে বিভিন্ন প্রশ্ন জাগার এক প্রক্রিয়া চলে এবং এইভাবে আত্মোপলব্ধির জন্ম হয়। চিন্তা এবং অনুভূতির নির্দিষ্টতা, বোধগম্যতা, গ্রহণযোগ্যতা ও প্রকাশ ক্ষমতা আত্মহত্যার মতো ঘটনাকে মোকাবিলা বা সামাল দিতে সাহায্য করে। মানসিক স্বাস্থ্যের বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য হল, যখন তাঁরা আত্মহত্যার মাধ্যমে কোনও রোগীকে হারিয়ে ফেলে, তখন তাঁরা অন্যান্য বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে এই বিষয়টি নিয়ে আলাপ-আলোচনা শুরু করে আর বলাই বাহুল্য যে, যাঁদের সঙ্গে আলোচনা করা হয় তাঁরাও আত্মহত্যার ঘটনা প্রতিরোধ করতে সমাজে সাহায্যকারী মানুষ হিসেবই পরিচিত। এই ধরনের আলাপ-আলোচনার মধ্য দিয়ে সমাজে আত্মহত্যার সামগ্রিক ক্ষেত্রটি সম্পর্কে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে পারস্পরিক মত বিনিময় সম্ভব হয়, যা পরবর্তীকালে এহেন দুর্ঘটনার প্রতিকারে সহায়তা করে। একজন অভিজ্ঞ মনোবিদ দ্বাররক্ষী হিসেবে  কর্মরত ব্যক্তিদের সর্তকতার জন্য বলেছেন যে, তাঁরা যেন এহেন ঘটনায় নিজেদের দায়ি ও বিচ্ছিন্ন করে না দেখে। বরং এই ঘটনা থেকে যেন তাঁরা নতুন কিছু শেখার অভিজ্ঞতা লাভ করতে পারেন। আত্মহত্যার ঘটনা ঠেকানোর সফলতা বা ব্যর্থতা— দুটোকেই সমানভাবে গ্রহণ করে তা সমাজে আরও পাঁচজনের সচেতনতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে প্রচার করা খুবই কার্যকরী একটি বিষয়। এর মাধ্যমে এরকম ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত ঝুঁকির যথাযথ মূল্যায়ণ করা সহজ হয় এবং বিশেষজ্ঞদের কাছে তা দৃষ্টান্ত স্থাপন করে। এইভাবে আত্মহত্যার ঘটনায় ভেঙে পড়া একজন মানুষ নিজেকে পরিস্থিতির শিকার না করে, সেখান থেকে মুক্তির উপায় খুঁজতে সচেষ্ট হতে পারে।

আত্মহত্যার ঘটনা প্রতিরোধে কোনও প্রতিষ্ঠান এবং কমিউনিটি বা গোষ্ঠীর ভূমিকা—

  • আত্মহত্যা ঠেকাতে একজন দ্বাররক্ষী সমাজ-বিছিন্নভাবে কাজ করতে পারে না। এক্ষেত্রে একটি প্রতিষ্ঠান বা কমিউনিটির দায়িত্ব হল গেটকিপার বা মানসিক স্বাস্থ্যের বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা এবং এই  বিষয়ে তাঁদের অভিজ্ঞতাকে পাথেয় করে এহেন সমস্যার মোকাবিলা করা।
  • দুর্ঘটনার পর কার্যকরী ভূমিকা নেওয়ার ক্ষেত্রেও এদের এগিয়ে আসা জরুরি। এর মাধ্যমে আত্মহত্যার ফলে যারা তাদের কাছের মানুষকে হারিয়েছে, তাদের পাশে দাঁড়ানো এবং হতাশা দূর করা সম্ভব হয়।
  • প্রশিক্ষিত পেশাদারদের সাহায্যে গেটকিপারদের মানসিক ভাবে চাঙ্গা করার ব্যবস্থা নেওয়াও এহেন প্রতিষ্ঠান বা কমিউনিটির অন্যতম দায়িত্ব। এই ঘটনা ঘটার পরে আবার যাতে দ্বাররক্ষীরা নিজেদের কাজে মনোনিবেশ করতে সক্ষম হয়, সেদিকে খেয়াল রাখাও তাদের ক্ষেত্রে জরুরি।

আত্মহত্যা প্রতিরোধকারী হিসেবে একজনের করণীয় বিষয়গুলি হল—

  • যদি একজন প্রতিরোধকারীর পক্ষে আত্মহত্যা প্রতিহত করার শক্তি না থাকে, তাহলে বন্ধু-বান্ধবের সাহায্য নেওয়া বাঞ্ছনীয়। যারা নিজেরা এহেন ঘটনা রুখতে ব্যর্থ হবেন, তাদের উচিত সুইসাইড হেল্পলাইনের সহায়তা গ্রহন করা। এরকম হেল্পলাইনের সাহায্য নিয়ে অনেক মানুষই উপকৃত হয়েছেন।
  • এই ধরনের দুর্ঘটনা একজন প্রতিরোধকারীর আত্মবিশ্বাস এবং কাজকর্মের উপর গভীরভাবে নেতিবাচক প্রভাব বিস্তার করতে পারে। এর থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য নিজের জন্য কিছু সময় ব্যয় করা জরুরি। অন্য কারও সহায়তাও এই সময় প্রয়োজন।
  • নিজের সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে সচেতন হওয়া দরকার। আত্মহত্যা ঠেকাতে একজনের পক্ষে যতটা করা সম্ভব ততটাই সে করবে। কিন্তু সর্বশক্তি প্রয়োগ করে সব সময়ে এই ধরনের ঘটনা নিয়ন্ত্রণ করা একজনের পক্ষে সম্ভবপর না-ও হতে পারে। এক্ষেত্রে আইনের সাহায্য এবং বিশেষজ্ঞের পরামর্শ গ্রহণ প্রতিরোধকারীকে সঠিক দিশা দেখাতে সমর্থ হবে।
  • সাহায্যকারী শক্তিগুলির সঙ্গে একজন প্রতিরোধকারীর যোগাযোগ বাড়ানো দরকার। এক্ষেত্রে স্থানীয় ডাক্তার, মনোবিদ বা মনোরোগ বিশারদের সঙ্গে সুসম্পর্ক স্থাপন অতি অবশ্যই প্রয়োজন।
  • নিজেকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনার জন্য একজন প্রতিরোধকারীকে নিজের পছন্দের কাজ বেশি করে করতে হবে। নানা কাজে নিজেকে ব্যস্ত রাখা প্রয়োজন। নিজের স্বাস্থ্যকে ভালো রাখার জন্য উপযুক্ত বিশ্রাম এবং পুষ্টিকর
    খাওয়াদাওয়া জরুরি।

একটি কথা মনে রাখা অবশ্যই প্রয়োজন যে, আত্মহত্যা প্রতিরোধের কাজ যখন কেউ দায়িত্ব সহকারে পালন করতে চলেছেন, তখন সেই কাজে সফল হওয়ার জন্য তাঁর সদিচ্ছা এবং আন্তরিকতা থাকা একান্ত কাম্য। নিজের কাজের প্রকৃত চরিত্র সম্পর্কে বোঝার জন্য পর্যাপ্ত সময় ব্যয় করা জরুরি। মাঝে-মাঝে বিশ্রাম নেওয়াও বাঞ্ছনীয়। লক্ষ্যে স্থির থেকে নিজের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে হবে। সমাজে আত্মহত্যা প্রতিরোধকারীর অবদান যে অত্যন্ত মূল্যবান এবং গুরুত্বপূর্ণ সেকথা কখনোই ভুলে গেলে চলবে না।  


আরও পড়ুন