সাক্ষাৎকারঃ যোগচর্চা এবং মানসিক স্বাস্থ্য

মানসিক অব্যবস্থা বা অস্বাভাবিকতার চিকিৎসায় মেডিকেশন এবং সাইকোথেরাপির সঙ্গে যুক্ত হতে পারে যোগচর্চা।

বিগত দশকগুলিতে বৈজ্ঞানিক গবেষণার মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হয়েছে যে, যোগচর্চা বিভিন্ন ধরনের মানসিক রোগের চিকিৎসায় খুবই ফলপ্রসু একটি মাধ্যম। এই বিষয়টি নিয়ে হোয়াইট সোয়ান ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে প্যাট্রিসিয়া প্রিতাম কথা বলেছিলেন নিমহানস-এর মনোরোগ বিভাগের অধ্যাপক ডা. শিবরাম বারামবাল্লির সঙ্গে। সেই সাক্ষাৎকারের সংক্ষিপ্ত রূপ তুলে ধরা হল।


যোগ কীভাবে মানসিক রোগের চিকিৎসায় ফলদায়ক ভূমিকা নিতে পারে?

বেশ কয়েক বছর ধরে এই ক্ষেত্রটি নিয়ে আমরা কাজ করেছি। কিছু গুরুত্বপূর্ণ মানসিক অসুস্থতার ক্ষেত্রে যোগ শুধু যে উপকারী তাই নয়, প্রায় ওষুধের মতোই কাজ করে। আবার কিছু ক্ষেত্রে যোগ-ই হচ্ছে একমাত্র ওষুধ। অনেক সময়েই দেখা গিয়েছে যে, কিছু রোগী মেডিকেশন পদ্ধতি গ্রহণ করতে অস্বীকার করেন। তখন আমাদের বিকল্প ব্যবস্থা খুঁজতে হয়। সেই সব ক্ষেত্রে যোগের সফলতা চোখে পড়ার মতো। চিকিৎসার মাধ্যম হিসেবে তখন যোগই একমাত্র পদ্ধতি হয়ে ওঠে। তবে এই ধরনের চিকিৎসাপ্রাপ্ত রোগীর সংখ্যা খুবই কম। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মানসিক রোগের স্থায়ী চিকিৎসা, যেমন মেডিকেশন, সাইকোথেরাপির সঙ্গে অতিরিক্ত পদ্ধতি হিসেবে যোগার সাহায্য নেওয়া হয়।

যোগাভ্যাস কয়েকটি মানসিক সমস্যা যেমন অবসাদ, স্কিৎজোফ্রেনিয়া, মানসিক উদ্বিগ্নতা বা এটেন্সান ডেফিসিট হাইপারএক্টিভিটি ডিস্‌অর্ডার (এ ডি এইচ ডি)-তে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়।


এমন কোনও বৈজ্ঞানিক রিপোর্ট বা তথ্য রয়েছে কি যা মানসিক রোগের চিকিৎসায় যোগের ভূমিকাকে আরও বেশি পরিমাণে জোরালো করতে সাহায্য করবে?

বেশ কিছু লেখালেখি বিশেষ করে বহু-বিশ্লেষণধর্মী পর্যালোচনা রয়েছে যেগুলি থেকে বিষয়টি সম্পর্কে একটি ধারণা জন্মায় মাত্র। কারণ এইসব ক্ষেত্রে সংখ্যাতত্ত্বের আধিক্য বেশি। কিন্তু লেখাগুলি অবশ্যই অর্থবহ। এই বিষয়ে যেহেতু অনেকের গবেষণা একত্রিত করে তথ্য সংগ্রহ করা হয়, সেহেতু একজনের গবেষণা থেকে এই সব ক্ষেত্রে কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সহজ নয়। কারণ যে কোনও একটা গবেষণা থেকে প্রাপ্ত তথ্য মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য নাও হতে পারে। তবে বিগত দশ বছরে ভারত এবং ভারতের বাইরে থেকে এমন কিছু প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে, যার সাহায্যে মানসিক রোগের চিকিৎসা পদ্ধতিতে অন্যান্য মাধ্যমের সঙ্গে যোগাভ্যাস যে সহযোগীর ভূমিকা নিতে পারে, তা বোঝা গিয়েছে। এই ক্ষেত্রে নিমহানস-এর তত্ত্বাবধানেই অধিকাংশ গবেষণার কাজ সম্ভব হয়েছে এবং ২৫টিরও বেশি গবেষণাপত্র জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পত্রিকায় আমরা প্রকাশ করেছি। এগুলির অধিকাংশই ইন্টারনেটে দেখা যাবে। এই ক্ষেত্রে ইন্ডিয়ান জার্নাল অফ সাইকিয়াট্রি: জুলাই-সেপ্টেম্বর ২০১৩, সংস্করণটির উল্লেখ করা যেতে পারে, যেখানে যোগচর্চা বিভিন্ন মানসিক রোগের চিকিৎসায় একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।


ভারতই যোগ সাধনার উৎসস্থল তাহলে কেন এতদিন ধরে যোগচর্চাকে চিকিৎসা পদ্ধতির অঙ্গ হিসেবে বিবেচনা করা হল না?

এটা সত্যিই খুব অবাক করার মতো বিষয় এবং বহু জায়গা থেকেই এই প্রশ্নটা উঠেছে। এই ক্ষেত্রে দুই ধরনের সমস্যা দেখা যায়। প্রথমত, যোগচর্চাকে এখনও স্কুলের পাঠ্যক্রমের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখা হয়। যোগাভ্যাসকে থেরাপি হিসেবে ব্যবহার করা হয় না। সুস্থ জীবনযাপনের অঙ্গ হিসেবে যোগাভ্যাসকে প্রয়োজনীয় উপাদান হিসেবে মনে করা হলেও রোগের চিকিৎসার মাধ্যম হিসেবে তাকে এখনও গণ্য করা হয় না। থেরাপি হিসেবে যোগচর্চার ধারণাটি খুবই সম্প্রতি গড়ে উঠেছে। শেষ দুই-তিন দশক ধরে এটিকে নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছ।

অন্য দিকে, যোগকে থেরাপির মর্যাদা না দেওয়ার পিছনে আরও একটি সমস্যা রয়েছে। কারণ অধিকাংশ পত্রিকাতেই যোগকে রান্ডামাইজড কন্ট্রোল ট্রায়াল হিসেবে বর্ণনা করা হয়, যেটা মেডিকেশনের জন্য উপযুক্ত। এই ট্রায়ালে একজনকে যে ওষুধ দেওয়া হয়, তা অন্যজনের ক্ষেত্রেও যে সমান ভাবে প্রযোজ্য হবে সে কথা জোর দিয়ে বলা যায় না।

যোগচর্চার ক্ষেত্রে একটি অদ্ভুত সমস্যা হল, যে ব্যক্তি যোগাভ্যাস করছেন তিনি অনেক সময়েই যোগচর্চার বিষয়টি সম্পর্কে অন্ধকারে থাকেন। কিন্তু মেডিকেশনের ক্ষেত্রে এমনটা দেখা যায় না। এই সমস্যাটি এতটাই ভয়াবহ যে, যার কারণে যোগচর্চাকে ফলপ্রসু থেরাপি হিসেবে ব্যবহার করার বাধাটা এখনও কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি। আমার মনে হয় এই কারণের জন্যই যোগসাধনাকে চিকিৎসার অন্যতম পদ্ধতি হিসেবে গ্রহণ করা হচ্ছে না।


অবসাদ, মানসিক উদ্বিগ্নতা বা ওসিডি- মতো মানসিক রোগগুলির একেবারে প্রাথমিক পর্যায় যদি যোগচর্চার সাহায্য নেওয়া যায় তাহলে কি উপকার পাওয়া যাবে?

আমি আগেই বলেছি যে, যোগ একটি চিকিৎসা পদ্ধতি যা মূলত প্রাথমিক প্রমাণগুলির উপরেই নির্ভরশীল। যোগচর্চার ব্যবহার আগে হোক বা পরেই হোক, প্রথমে আমাদের নির্দিষ্ট মনোরোগের উৎসটি খুঁজে দেখা দরকার। যে কোনও ধরনের মনোরোগের চিকিৎসা যদি একেবারে প্রাথমিক পর্বে শুরু করা যায় তাহলে সেই অসুখের ধরন নির্ধারণ করা সহজ হয় এবং সুফলও পাওয়া যায়। এখন যোগার ক্ষেত্রে তত্ত্বগত ভাবে বলা যেতে পারে যে, অসুখের সূচনাপর্বে এই পদ্ধতি ব্যবহার করলে অবশ্যই ভাল ফল মিলবে। যোগচর্চার বিষয়টি এখনও সেভাবে প্রমাণিত সত্য হিসেবে বিবেচ্য না হলেও, যুক্তির খাতিরে যোগসাধনার উপর গুরুত্ব আরোপ করাই যায়। তবে রোগ সারাতে যোগ কীভাবে কাজ করে, তার উত্তর খুঁজতে বৈজ্ঞানিকরা এখনও চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। এটা এখনও বিশ্বাস করা হয় যে মানুষের মস্তিষ্কের মেরামতির কাজটা খুবই দক্ষতার সঙ্গে করা উচিত। সেই ক্ষেত্রে যোগচর্চা তখনই কার্যকরী হয়ে উঠবে, যখন একে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার করা হবে।


আরও পড়ুন