আত্মহত্যার প্রতিবেদনের ক্ষেত্রে সংবাদমাধ্যমের পরামর্শ

১. মৃত্যু প্রসঙ্গে কোনও উত্তেজনাকর তথ্য প্রকাশ না করা— আত্মহত্যার ঘটনা এমনভাবে বলতে বা লিখতে হবে যাতে তার মধ্যে দিয়ে কোনও উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি না হয়। খবরের শিরোনামে মৃত্যুর কারণ পরোক্ষভাবে উল্লেখ করার প্রয়োজন নেই। আত্মহত্যার ঘটনার কোনও ছবি ব্যবহার করা উচিত নয়। যদি একান্ত ছবি দিতেই হয় তাহলে আত্মহত্যাকারীর পুরনো ছবি ব্যবহার করা যেতে পারে। শোকগ্রস্তদের সম্বন্ধে গোপনীয়তা রক্ষা করা জরুরি।

২. কোনও একটি কারণকে আত্মহত্যার জন্য দায়ী করে দেখানো ঠিক নয়—আত্মহত্যা একটি জটিল ঘটনা এবং সাধারণত এর সঙ্গে অনেক কারণ যুক্ত থাকে। নির্দিষ্ট প্রমাণ না মেলা পর্যন্ত আত্মহত্যার পিছনে থাকা কোনও কারণকেই কম গুরুত্ব দেওয়া উচিত নয়। সম্পূর্ণ তদন্তের পরই আত্মহত্যার মূল কারণটি চিহ্নিত করা যাবে— যে কোনও আত্মহত্যার ঘটনা এইভাবেই মিডিয়ার মাধ্যমে প্রচার করা যুক্তিযুক্ত। এবং জনগণকে এটাও জানানো দরকার যে, আত্মহত্যা একপ্রকার জটিল এবং নানা কারণের দ্বারা সংঘটিত একটি ঘটনা। আত্মহত্যার ঘটনা বলতে গিয়ে সম্পর্কের টানাপোড়েন, অর্থনৈতিক সংকট বা ব্যর্থতার প্রসঙ্গ টেনে আনার প্রয়োজন নেই।

৩. আত্মহত্যার ঘটনা কোনও খবরের কাগজের প্রথম পাতা বা অপরাধমূলক খবরের সঙ্গে প্রকাশ করা সঠিক নয়— খবরের কাগজের প্রথম পাতায় আত্মহত্যার মতো উত্তেজনাকর ঘটনা প্রকাশ করা বাঞ্ছনীয় নয়। আর অপরাধের খবরের সঙ্গে আত্মহত্যার ঘটনা লিখলে আত্মহত্যার বিষয়টিকে ভুলভাবে চিহ্নিত করা হবে। এই  ধরনের খবর অন্যান্য মৃত্যুর খবর বা শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদনের পাতায় লেখা যায়। খবরের শিরোনামে আত্মহত্যাজনিত মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে কোনও তথ্য দেওয়া ঠিক নয়।

৪. আত্মহত্যাজনিত কোনও তথ্যের বিবরণ জনসমক্ষে না আনা— আত্মহত্যা সম্পর্কিত কোনও নোট, আত্মহত্যার পদ্ধতি এবং প্রস্তুতির বিষয়, আত্মহত্যার সময়কার পরিস্থিতি বা যেখানে আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে তার সম্বন্ধে কোনও খবর বাইরে প্রকাশ করা অনুচিত। ঘটনার পূর্ণ বিবরণ প্রকাশ করলে সমাজে এইরকম আরও ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা সৃষ্টি হতে পারে।

৫. আত্মহত্যার কোনও ছবি চিহ্ন হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না— প্রতিবাদ বা অসম্মতিসূচক কোনও অনুভূতি প্রকাশ করলে চলবে না। কারণ এর প্রভাব যে ব্যক্তি আত্মহত্যা করেছে তার চারপাশে থাকা বৃহত্তর মানুষের উপর পড়তে বাধ্য। তাই প্রায়শই এমন ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা থেকে যাবে। সমাজের উপর এই ধরনের সমস্যার কুপ্রভাবকে কখনোই অস্বীকার করা যায় না। যে ব্যক্তি আত্মহত্যা করেছে তার প্রতি সমবেদনা এবং শোক প্রকাশ করা এক্ষেত্রে বাঞ্ছনীয়। কীভাবে তার মৃত্যু ঘটেছে তা নিয়ে অতিরিক্ত আলাপ-আলোচনা করা কাম্য নয়।

৬. সংবেদনশীলতার প্রয়োজন— সমাজের বিখ্যাত ব্যক্তিরা যখন আত্মহত্যার মতো ঘটনা ঘটান, তখন তা খবর হিসেবে প্রচার করার সময়ে সহানুভূতি এবং  সংবেদনশীলতার দরকার হয়। বিখ্যাত ব্যক্তিরা যখন এহেন ঘটনা ঘটান তখন তার  প্রভাব সেই ব্যক্তির ভক্ত বা গুণমুগ্ধ আরও পাঁচজন মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। তাই তাদের ক্ষেত্রেও আত্মহত্যা করার ঝুঁকি দেখা যায়। তারা ভাবে যে একজন ব্যক্তি যে জীবনে অনেক ক্ষেত্রেই সফল, সে যদি আত্মহত্যা করতে পারে তাহলে অন্যদের সামনেও আত্মহত্যার পথ খোলা রয়েছে। তাই এহেন ব্যক্তির মৃত্যুর খবর দেওয়ার সময়ে অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত তথ্য জানানো এবং সেই মৃত্যুকে আত্মহত্যার সম্ভাবনা বলে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে।

৭. আত্মহত্যার বিষয়ে মানুষকে শিক্ষিত করে তোলার জন্য সুযোগের সদ্ব্যবহার করা— হেল্পলাইনের মাধ্যমে আত্মহত্যাকারী ব্যক্তির পরিবার-পরিজনদের সামনে এহেন ঘটনার বিরুদ্ধে সচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন। আত্মহত্যার মতো ঘটনা ঘটার পরে এমন মানুষজনের খবর পরিবেশন করা যুক্তিযুক্ত যারা ইতিমধ্যেই এহেন ঘটনা ঘটাতে উদ্যত হয়েছিল, কিন্তু কীভাবে তারা যথাযথ সাহায্যের মাধ্যমে আত্মহত্যার প্রবণতা কাটিয়ে উঠতে পেরেছে, সে কথা জনসমক্ষে প্রচার করা মিডিয়ার দায়িত্ব। এক্ষেত্রে আত্মহত্যার পিছনে থাকা সতর্কতামূলক বিষয়ের তথ্য জানাতে হবে এবং সেগুলি কীভাবে মানুষকে সহায়তা করবে, তা-ও স্পষ্টভাবে বলা জরুরি।

৮. আত্মহত্যার জন্য মনের সন্দেহ দূর করা— আত্মহত্যার ঘটনা ঘটতে পারে বলে যদি মনে সন্দেহ জাগে, তাহলে তা দূর করার জন্য মানসিক স্বাস্থ্যের বিশেষজ্ঞের সঙ্গে অবিলম্বে যোগাযোগ করা প্রয়োজন।

সূত্রঃ

১. খবরের কাগজে প্রকাশিত কিছু আত্মহত্যার প্রতিবেদন

গাইডলাইনস্‌-- http://www.nimhans.ac.in/nimhans-centre-well-being/research

২. আত্মহত্যার প্রতিরোধ বিষয়ে সংবাদমাধ্যমের বিশেষজ্ঞদের লেখাঃ

http://www.who.int/mental_health/prevention/suicide/resource_media.pdf

  


আরও পড়ুন