বর্ননাঃ আমরা একটি স্বাভাবিক পরিবার যেখানে একজন সদস্যের একটু বেশী ভালোবাসা প্রয়োজন

আপনার পরিবারে যদি কোনও স্কিৎজোফ্রেনিয়া রোগী থাকেন তবে তাঁর যত্ন নেওয়া সম্ভব।

আমার মেয়ের যখন ২০ বছর বয়স তখন আমাদের জীবন বদলে যায়। ছোটবেলায় তাঁর মধ্যে কোনও অস্বাভাবিকতা ছিল না। সে পড়াশুনায় ভাল ছিল। উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার পর সে একটি ভাল কলেজে বিজ্ঞান শাখায় ভর্তি হয়।

এরপরেই সব গোলমাল হয়ে গেল। সে কলেজ থেকে ফিরে সোজা নিজের ঘরে ঢুকে দরজা আটকে দিত, আর রাতে খাবার সময় আসত। আমরা ভাবতাম ও পড়ছে। কিন্তু একদিন ঘরে ঢুকে দেখলাম সব লণ্ডভণ্ড। আলমারি থেকে সমস্ত জামা কাপড় বের করে মেঝেয় ছড়িয়ে রেখেছে। আমি জিজ্ঞেস করলে আমায় প্রথম বার ও নিজের ভয়ের কথা বলল। ও নিশ্চিত ছিল যে ওঁর ঘরে একটি সরকারি সংস্থা গোপন চিপ লুকিয়ে রেখেছে এবং ওঁর প্রতিটি চালচলনের ওপর নজর রাখছে। ওই চিপটা খুঁজে বের করে ও ধ্বংস করতে চাইছিল।

আমি খুব ভয় পেয়ে গেলাম এবং ওকে বকলাম। আস্তে আস্তে ও নিজেকে আরও আলাদা করে নিল, এবং দেখতাম ও একা একা বিড়বিড় করছে। এরপর ও কলেজে যাওয়াও ছেড়ে দিল। ওর বাবাও ওকে বোঝানোর চেষ্টা করেছিল। লাভ হয়নি।

এরপর যেদিন স্নান খাওয়া বাদ দিয়ে পর পর দুই রাত জেগে আমার মেয়ে ওই গুপ্ত চিপটা খোঁজার চেষ্টা করল, আমরা ওকে ডাক্তার দেখাতে বাধ্য হলাম। কিন্তু যখন জানতে পারলাম ও স্কিৎজোফ্রেনিয়ার শিকার, তখন খুবই ভেঙ্গে পড়লাম।

বাড়ি ফিরে আমি আর আমার স্বামী এই রোগ নিয়ে পড়াশুনো করলাম। কিন্তু বিশেষ লাভ হল না। আমার মেয়ে এরপর একমাস হাসপাতালে কাটাল। ফিরে আসার পর সে  সবসময় মনমরা হয়ে থাকলেও আগের চেয়ে অনেকটা ভাল ছিল। তাঁকে ওষুধ খাওয়ার কথা মনে করিয়ে দিতে হত। সে আর আগের মতন বাইরে যেত না। সোফায় বসেই বেশীরভাগ সময়টা টিভি দেখে কাটাত। আগামী তিন বছর অবধি আমার মেয়েকে মাঝে মধ্যেই হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়েছে, বিশেষত যখন ও ওষুধ খেতো না। এই করতে করতে ১০ বছর কেটে গেছে। আমাদের মনোরোগ সম্পর্কে ধারনাও বদলেছে। আমরা বুঝেছি যে অন্যান্য অসুখের মত এটাও একটা অসুখ যা নিয়ে তাঁকে গোটা জীবন কাটাতে হবে। আমরা মেনে নিয়েছি যে ওর পক্ষে আর লেখাপড়া করা সম্ভব না। (চিকিৎসার পরে ও আর কলেজের চাপ নিতে পারেনি)। [অধিকাংশ ক্ষেত্রেই স্কিৎজোফ্রেনিয়া রোগীরা পড়াশুনা ছেড়ে দিতে বাধ্য হন।]

আমার স্বামীর এরপরে ডিপ্রেশন ধরা পড়ে এবং উনি এখনও নিয়মিত ওষুধ খান। আমরা জানি, কিছু ক্ষেত্রে মানসিক রোগের সাথে পুরোপুরি লড়ে ওঠা যায় না।

আমার বাড়ির কাছেই একটি মানসিক রোগের হাসপাতালে আমি স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে যোগদান করে, অনেক কিছু শিখতে পেরেছি। অন্যান্য হতভাগ্য বাবা-মায়ের পাশে দাঁড়িয়েছি। তাঁদের সাথে এক হয়ে একটি সংগঠনও খুলেছি। এর ফলে সবারই লাভ হয়েছে।

আমার মেয়ে আমার বাড়ির কাছেই একটি ছোট্ট দোকানে কাজ করে, এবং মাস গেলে সামান্য মাইনে পায়। সে যেমন ভাল দিন কাটায় তেমনি বাজে দিনও কাটায়। কিন্তু আমরা শিখেছি যে কখন তাঁর সাথে কথা বলতে হবে আর কখন একলা ছাড়তে হবে।

আমি কৃতজ্ঞ যে এইরকম ওষুধ বাজারে উপলব্ধ যা তাঁকে স্বাভাবিক ভাবে চলতে সাহায্য করে। আমি ভাবতেই পারিনা যে সেই সমস্ত ওষুধ না থাকলে কি হত। আজ বহু বছর হল ওকে হাসপাতালে নিয়ে যাবার কোনও দরকার হয়নি।

আমরা একসাথে হাঁটতে বেরোই, তাঁকে সময়মত ব্যায়াম করতে উৎসাহ দেই। কখনও ও নিজে ভাই বোনদের সাথে বাজার করতে বা সিনেমা দেখতে যায়। আমদের সঙ্গে আর পাঁচটা স্বাভাবিক পরিবারের কোনও ফারাক নেই। শুধু আমাদের মধ্যে একজন আছে, যার অন্যদের চেয়ে একটু বেশী স্নেহ ও যত্নের প্রয়োজন।

নিমহ্যান্সের স্পেশাল গ্রেড সাইকায়াট্রিস্ট ডাঃ সাবিনা রাও এর কাছে রেকর্ড করা এক বাস্তব অভিজ্ঞতা। 


আরও পড়ুন