থামুন! আত্মহত্যা শেষ কথা নয়

অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতি এবং তা কাটিয়ে ওঠার সমস্যাগুলি নিয়ে আলোচনা করেছেন বিশেষজ্ঞরা
ডা. ভি সেনথিল কুমার রেড্ডি

''ঝড় থামার জন্য অপেক্ষা নয়, বাদলের মধ্যেই শিখতে হবে নাচ''-- ভিভিয়ান গ্রিন

আত্মহত্যা ঠেকানোর জন্য একজনকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে হবে এবং এই সংক্রান্ত ঘটনাগুলি নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করার শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে। আত্মহত্যার ঘটনা খুবই নিন্দনীয় হিসেবে বিবেচিত হয় এবং এই ঘটনার জন্য দুর্ভোগের শিকারও হতে হয়, যা পরিস্থিতিকে অসহনীয় করে তোলে। এহেন অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়ানোর জন্য সক্রিয় উদ্যোগ একান্ত জরুরি।

২৬ বছরের তথ্য-প্রযুক্তির কর্মী মনোজ কাজে দক্ষতার জন্য তাঁর সহকর্মী এবং কর্মকর্তাদের কাছ থেকে যথেষ্ট প্রশংসা পেয়েছিলেন। কিন্তু সহসাই মনোজ উপলব্ধি করলেন যে, কাজ করতে গিয়ে তাঁর অসুবিধা হচ্ছে, অধিকাংশ সময়ে ক্লান্তিবোধ করছেন, কাজে একাগ্রতা কমে যাচ্ছে এবং ঠিক মতো ঘুম হচ্ছে না। তাঁর বাবা প্রায়ই অতিরিক্ত মদ্যপান করে এসে মাকে মারধর করত। বাবার মদ খাওয়া, মায়ের স্বাস্থ্য এবং পরিবারের অর্থনৈতিক সমস্যা নিয়ে মনোজ ক্রমশই চিন্তান্বিত হয়ে পড়তে শুরু করেছিলেন। এই সব ঘটনার ফলে নিজেকে শেষ করে দেওয়ার ভাবনাচিন্তা শুরু করেন।

ইতিপূর্বে কলেজে পড়ার সময় সেকেন্ড সেমিস্টারের পরীক্ষায় ফেল করার পরও তাঁর মাথায় আত্মহত্যার চিন্তা এসেছিল। তখন মনোজ তাঁর বন্ধু রবিকে এই ভাবনার কথা বলেন এবং মনে একপ্রকার স্বস্তি অনুভব করেন। সেই সময়ে মনোজ কলেজের ক্রিকেট টিমের সদস্য ছিলেন ও আসন্ন টুর্নামেন্টের জন্য অনুশীলনে মনোনিবেশ করেছিলেন। এইভাবে রবির সঙ্গে কথা বলে এবং ক্রিকেট নিয়ে ব্যস্ত হয়ে যাওয়ার ফলে তাঁর মাথা থেকে আত্মহত্যার চিন্তা ক্রমশ কমে যেতে শুরু করে। খেলায় তাঁর দল জেতে এবং মনোজ আবার পড়াশোনা করে পরীক্ষায় পাশ করেন। তখনকার মতো আত্মহত্যার চিন্তা তাঁর মন থেকে একেবারে মুছে যায়।

দ্বিতীয়বার যখন মনোজের মাথায় আবার আত্মঘাতী হওয়ার ভাবনা জেগে ওঠে, তখন কলেজের কথা তাঁর মনে পড়ে যায় এবং আত্মহত্যার হাত থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য সেই একই উপায় অবলম্বন করতে সচেষ্ট হন। তখন নিয়মিত রবিকে ফোন করে যথাযথ কাজ শুরু করে দেন মনোজ। এইভাবে মনোজের মধ্যে যে মানসিক বিপর্যয় এবং আত্মহত্যার চিন্তা এসেছিল, তা অনেকাংশে দূর হতে থাকে। কাজের ক্ষেত্রেও মনোজ উন্নতি করতে থাকেন। যদিও পরিবার সংক্রান্ত সমস্যা নিয়ে তিনি তখনও দুশ্চিন্তাগ্রস্ত ছিলেন। আত্মহত্যার চিন্তা কমতে থাকায় মনোজ ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় মন দেন এবং রবি ও কর্মজগতের অন্যান্যদের কাছ থেকে প্রভূত সাহায্য পান।

প্রতি তিনজনের মধ্যে থেকে একজনের মাথায় জীবনের কোনও না কোনও সময়ে আত্মহত্যার চিন্তা আসতে পারে। এমন অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেওয়া বা অন্যের সঙ্গে বিনিময় করা অনেক সময়েই কঠিন হয়ে পড়ে। প্রিয়জন বা কাছের মানুষ যাতে আত্মহত্যার কথা শুনে কষ্ট না পান, সেই জন্য অনেকেই এহেন চিন্তার বিষয়ে অন্যকে বলতে পারেন না। যাঁরা এমন চিন্তাভাবনার কথা অন্যকে জানাতে পারেন, তাঁরা উদার এবং বিবেচনাপ্রসূত কথাবার্তাই আশা করেন। আত্মঘাতী হওয়ার চিন্তা অন্যের কাছে বললে আত্মহত্যার মতো ঘটনা থেকে নিজেকে বাঁচানো যায়।

যখন কেউ একা বা কর্মহীন অবস্থায় থাকেন, তখন তাঁর মনে আত্মহত্যার ভাবনা ঘুরে-ফিরে আসে এবং চেপে বসে। এই ক্ষেত্রে পরিবারের সদস্য বা বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানো বা নিজেকে কাজে ব্যস্ত রাখলে আত্মহত্যার চিন্তা এবং আত্মঘাতী হওয়ার প্রবণতা থেকে মুক্ত থাকা যায়। এই সময় একজন নিজের খুশি মতো কাজ করতে পারেন বা নতুন কোনও হবি খুঁজে নিতে পারেন। কথায় রয়েছে যে, কাজের মধ্যেই মুক্তির আনন্দ এবং কাজই মানুষকে আত্মহত্যার মতো ঘটনা থেকে বাঁচাতে পারে।

আত্মহত্যার চেষ্টা কমানোর জন্য একজনকে অত্যন্ত সচেতন ভাবে সক্রিয় উদ্যোগ নিতে হবে এবং আগে হওয়া আত্মহত্যার চিন্তা থেকে কীভাবে সে নিজেকে রক্ষা করেছিল, সেই পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে। এই ক্ষেত্রে মনোজের উদাহরণ, যিনি তাঁর জীবনের অতীত অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে পরবর্তী সময়ের সমস্যাকে অতিক্রম করতে সক্ষম হয়েছিলেন, তা মনে রাখতে হবে। অতীতের ইতিবাচক অভিজ্ঞতা মনোজের আত্মবিশ্বাস বাড়াতে সহায়ক হয়েছিল।

দিনের মধ্যে একটি নির্দিষ্ট সময় আত্মহত্যার চিন্তা যদি মনে আসে তাহলে তা মাঝে-মধ্যেই আবার ঘুরে-ফিরে আসতে পারে এবং এই অবস্থা কিছুদিন অন্তর ঘটতে পারে। নিরাপদ পরিকল্পনা এই পরিস্থিতির হাত থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য খুবই সাহায্য করে। ধাপে ধাপে প্রয়োজন মতো ব্যবস্থা নিলে সুফল পাওয়া যায়। সেগুলি হল--

  • জীবনে বেঁচে থাকার কারণ, যেমন- জীবনের আশা, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, কাছের মানুষের জন্য অনুভূতি, অতীতের ইতিবাচক অভিজ্ঞতাগুলি লিখে ফেলা।
  • নিজেকে নির্দিষ্ট কাজের মধ্যে এমনভাবে ব্যস্ত রাখা, যাতে আত্মহত্যার চিন্তা মাথায় না আসতে পারে।
  • নিজের বিশ্বস্ত মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন এবং নিয়মিত তাঁদের সঙ্গে কথা বলা।
  • আত্মহত্যা রোখার জন্য চালু হেল্পলাইন এবং কাউন্সেলরের যোগাযোগ নম্বর সঙ্গে রাখা।
  • নিজের পরিকল্পনার কথা কাছের কাউকে জানিয়ে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করা। যে কোনও সময় এবং যে কোনও জায়গায় পরিকল্পনার সদ্ব্যবহার করা যেতে পারে।
  • ব্যক্তির আত্মহত্যাজনিত ঘটনার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা রয়েছে, তিনি সব সময় অন্যকে এই যন্ত্রণার হাত থেকে বাঁচাতে চান। আত্ম-সহায়তার মাধ্যমে আত্মহত্যা প্রতিরোধ করা যায় এবং মানসিক বিপর্যয়ও রোখা যায়। এই সব পদ্ধতি ব্যবহারের পরও যদি মনে হয় সমস্যা মিটছে না তা হলে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ একান্ত জরুরি। এই ক্ষেত্রে স্থানীয় সাধারণ চিকিৎসকেরও সাহায্য নেওয়া যেতে পারে।

 

.ভি সেনথিল কুমার রেড্ডি নিমহ্যান্স-এর মনোরোগ সংক্রান্ত বিভাগের সহকারী অধ্যাপক

তথ্যের জন্য যোগাযোগ করতে হবে নিমহ্যান্স সেন্টার ফর ওয়েল বিইং (এন সি ডব্লিউ বি) যোগাযোগের নম্বর- ৯১৯৪৮০৮২৯৬৭০/ (০৮০) ২৬৬৮৫৯৪, সকাল ৯টা থেকে বিকেল -৩০

          


আরও পড়ুন