আত্মহত্যা সবার চিন্তার কারন

পরিবার, বন্ধু এবং সমাজের হস্তক্ষেপে বাঁচানো যায় একটি জীবন
ডা. জি গুরুরাজ

ইদানীং জনস্বাস্থ্যের সমস্যায় আত্মহত্যার ঘটনা ক্রমশই বেড়ে চলেছে এবং এর ফলে ভারতে রোগী মারা যাওয়া, হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ও আর্থ-সামাজিক ক্ষতিও ভয়ংকর আকার ধারণ করেছে। দেশের প্রায় প্রতিটি অংশেই আত্মহত্যা, আত্মহত্যার চেষ্টা এবং আত্মহত্যার কল্পনা প্রায়শই দেখা যাচ্ছে।

গবেষণায় দেখা গিয়েছে, আত্মহত্যা করে যাঁরা মারা গিয়েছেন, তাঁদের মধ্যে কম করে ১০ থেকে ১৫ জন বেশ কয়েকবার আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন এবং ১০০ জন বহুবার আত্মহত্যার কথা চিন্তা করেছেন। এই ধরনের চিন্তা বা কল্পনাগুলিকে সমাজের একটা বড় অংশের মানুষ যথাযথ গুরুত্ব দেন না বলেই সমস্যার সমাধান অধরা থেকে যায়। আত্মহত্যার চেষ্টা বা আত্মহত্যা রোখার ক্ষেত্রে এখনও সুরক্ষার ব্যবস্থা চোখে পড়ে না। আত্মহত্যা প্রতিরোধের জন্য শুধু চিকিৎসাবিদ্যা বা সরকারের উপর দায় চাপিয়েই রেহাই পাওয়া যাবে না, বরং এক্ষেত্রে সমাজের দায়িত্বও কিছু কম নয়। আর এই দায়িত্ব পালন করা তখনই সম্ভব, যখন আমাদের চারপাশে থাকা এমন মানুষ, যিনি আত্মহত্যার চিন্তা করছেন, তাঁকে চিহ্নিত করে সেই কুচিন্তার প্রভাব থেকে বের করে আনার উপায় আমরা রপ্ত করতে পারব।

কী উপায়ে আত্মহত্যার মতো ঘটনা ঠেকানো যায়, যা জনস্বাস্থ্যের প্রশ্নে খুবই গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হয়ে উঠেছে, সে সম্পর্কে একটি ধারণা গড়ে তুলতে সাহায্য করবে এই পর্বটি।

এই আলোচনায় যাওয়ার আগে, সমস্যাটি সমাজে ঠিক কতখানি গভীরে প্রবেশ করেছে, তা বোঝা প্রয়োজন। ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস বুরো, ভারত সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩ সালে আত্মহত্যায় প্রাণ হারিয়েছেন ১, ৩৪, ৭৯৯ জন। ১৯৮০ সালে ভারতে যেখানে প্রায় ৪০,০০০ আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছিল, ২০১৩ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১,৩৫,০০০। আত্মহত্যার ক্ষেত্রে জাতীয় হার বছর পিছু প্রতি ১ লক্ষ মানুষের মধ্যে ১১ জন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের করা সমীক্ষা থেকে জানা গিয়েছে যে, ঠিকঠাক লিপিবদ্ধ না হওয়ার কারণে আত্মহত্যার সঠিক হিসেব অবহেলিত রয়ে গিয়েছে।

আত্মহত্যার বিষয়টিকে এখনও মেডিকো-লিগাল সমস্যা বলে ধরা হয়। কারণ পুলিশি ঝামেলা, আইনি সমস্যা এবং সমাজে কলঙ্কিত হওয়ার ভয়ে অধিকাংশ আত্মহত্যার ঘটনাই চেপে যাওয়া হয়।

মানুষের বর্ণময় জীবনের একটা দিক হল আত্মহত্যার চেষ্টা। ভারত এবং ভারতের বাইরে হওয়া গবেষণার মধ্য দিয়ে জানা গিয়েছে, প্রতি বছর যে আত্মহত্যার ঘটনা ঘটছে, তার মধ্যে কম করে ১০ থেকে ১৫ জন আত্মহত্যার চেষ্টা করেছে উপযুক্ত স্বাস্থ্য সুরক্ষার ব্যবস্থা না থাকার জন্য। প্রতি বছর ভারতে প্রায় ১,৫০০,০০০-২,০০০,০০০ আত্মহত্যার চেষ্টা সংঘটিত হয়ে থাকে। এই বিরাট সংখ্যক মানুষ, যাদের মধ্যে আত্মঘাতী হওয়ার চেষ্টা বা প্রবণতা দেখা যায়, তাদের পিছনে সাধারণত সমাজের একটি বড় অংশের মানুষের সহায়তা থাকে না। যে কারণে সমস্যার মোকাবিলার জন্য যথাযথ ব্যবস্থাও গ্রহণ করা যায় না। মোদ্দা কথা হল, কেন একজন আত্মহত্যা করে বা তার চেষ্টা করে জটিলতা বাড়ায়? আনুষ্ঠানিক ভাবে প্রকাশিত রিপোর্ট থেকে জানা যায়, শতকরা ১৫.৬ ভাগ আত্মহত্যার ক্ষেত্রে সঠিক কারণ চিহ্নিত করা যায় না। সাধারণ ভাবে আবছা একটা ধারণার বশবর্তী হয়ে কতগুলি কারণ, যেমন পারিবারিক সমস্যা, অসুস্থতা, অর্থনৈতিক সমস্যা, পণ-সংক্রান্ত ঝামেলার ফলে অধিকাংশ আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে থাকে বলে মনে করা হয়।

মদ্যাসক্তি, গার্হস্থ হিংসা, গুরুত্বপূর্ণ কিছু সমস্যা এবং মানসিক স্বাস্থ্যজনিত হতাশা যে কোনও আত্মহত্যার পিছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে। জীবনের কঠিন সময়ে পরিবার, বন্ধু এবং সমাজের কাছ থেকে সহায়তা না পাওয়াটাও একটা বড় কারণ। আত্মহত্যা-সংক্রান্ত বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের গবেষণা থেকে এটুকু বলা যায়, এর পিছনে কাজ করে সমাজ, সংস্কার, অর্থনীতি এবং স্বাস্থ্যজনিত সমস্যা মিশ্রিত এক জটিলতা। এটি কোনও ব্যক্তি, পরিবার বা সমাজকে সামগ্রিক ভাবে প্রভাবিত করে। এই জটিল পরিস্থিতির ফলে একজন ব্যক্তির মধ্যে অসহায়তা, হতাশা এবং সে কোনও কাজের নয়- এমন একটি মনোভাবের জন্ম হয়, যা তাকে শেষ পর্যন্ত আত্মহত্যার পথে চালিত করে।

আত্মহত্যার পিছনে বহুবিধ কারণ-সম্পর্কিত বিতর্কের অবকাশ থাকলেও, এ কথা পরিষ্কার যে, আত্মহত্যার ঘটনা অনুমানযোগ্য এবং অবশ্যই তা ঠেকানো যায়।

আত্মহত্যার ঘটনা কমানোর ক্ষেত্রে কিছু সামাজিক হস্তক্ষেপের ভূমিকা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। আত্মঘাতী হওয়া থেকে একজনকে বিরত করার প্রশ্নে ওষুধ, সময়োচিত চিকিৎসা যেমন ফলপ্রসু, তেমনই চিকিৎসকের কাছে ঠিক সময়ে যাওয়া এবং আত্মহত্যা প্রতিরোধে মেনে চলা কয়েকটি সহায়তা সূত্রও এই ক্ষেত্রে খুবই প্রয়োজনীয় বিষয় বলে মনে করা হয়। আত্মহত্যার চেষ্টার লক্ষণগুলি একেবারে প্রাথমিক পর্বে ধরা পড়লে তা জন-সচেতনতার জন্য শিক্ষাক্ষেত্রে, কর্মজগতে এবং সমাজ বা গোষ্ঠীর মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব। এতে কলঙ্কজনক সমস্যা ও অন্যান্য সমস্যার সমাধান সহজতর হবে।

নিঃসন্দেহে সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা এই বিষয়ে খুবই উপযোগী। কারণ কীভাবে একজন ব্যক্তি তার মানসিক অবসাদকে কাটিয়ে কঠিন পরিস্থিতির মোকাবিলা করবে, তা সংবাদমাধ্যমের সাহায্যে প্রচারিত হলে অবশ্যই সুফল পাওয়া যাবে। আত্মহত্যা রোধে ইতিবাচক উপাদান বা নীতিগুলির মিশ্রণ এবং এই ক্ষেত্রে জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ আত্মহত্যার প্রবণতা কমিয়ে জীবনের কঠিন পরিস্থিতিগুলিকে নিয়ন্ত্রণ করতে সহায়ক হবে।

ডা. জি গুরুরাজ অধ্যাপক এবং বিভাগীয় প্রধান এপিডেমিওলজি, নিমহ্যান্স।


আরও পড়ুন