আসক্তির প্রভাব

আসক্ত ব্যক্তি ব্যক্তিগত আর পেশাগত দায়িত্ব, পরিবার এবং বন্ধুদের এড়িয়ে যান। এই নেশার অভ্যেসের প্রভাব আস্তে আস্তে ওনার কাজ আর ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের ওপরেও পড়ে।
আসক্তির প্রভাব
 
আসক্তি শুধু আসক্ত ব্যক্তিকেই প্রভাবিত করে না, এর প্রভাব ব্যক্তির চারপাশে থাকা অন্য মানুষের ওপর ও পড়ে।
 
নেশার বস্তু আসলে রাসায়নিক দ্রব্য যা শরীরের কার্যক্ষমতাকে প্রভাবিত করে। আসক্ত ব্যক্তি শুধু সেই বস্তুর থেকে প্রাপ্য আরামের ওপর ফোকাস করেন। খুব সম্ভবত উনি হয়ত ব্যক্তিগত আর পেশাগত দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন, এবং পরিবারের লোকজন এবং বন্ধুদের সঙ্গ এড়িয়ে যান যাতে শুধু নেশার ওপর ফোকাস করতে পারেন। এই নেশার অভ্যেসের প্রভাব আস্তে আস্তে ওনার কাজ আর ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের ওপরেও পড়ে।
অন্যান্য সমস্যা যা দ্রব্যের অপব্যবহার আর নেশার জন্য হতে পারে –
  • সাইকোটিক বিকার, মানসিক আর আচরণগত সমস্যা হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়
  • সাধারণ শারীরিক সমস্যা – লিভার ড্যামেজ (মদের অপব্যবহারে), লাং ক্যানসার (তামাকের অপব্যবহার), স্নায়বিক তন্ত্রের সমস্যা (ড্রাগের অপব্যবহার)। যারা মদ আর তামাকের নিয়মিত সেবন করেন তাদের ক্যানসার আর অসংক্রামক রোগ হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়।
  • বিষক্রিয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায় যখন ব্যক্তি মদ আর তামাক দুটোতেই আসক্ত থাকেন।
  • নেশাগ্রস্ত অবস্থায় ঝুঁকিপূর্ণ ব্যবহারের সম্ভাবনা বেড়ে যায় – যেমন হিংস্র আচরণ, ঝুঁকিপূর্ণ ভাবে গাড়ি চালানো বা যৌন ব্যবহার, পারিবারিক হিংস্রতা, দুর্ঘটনা এবং আঘাত।
  • যৌন সম্পর্কে জড়িয়ে পরার সম্ভাবনা (বিশেষত তরুণীদের) আর যৌনবাহিত রোগ হওয়ার বাড়তি সম্ভাবনা।
  • সেপ্সিস, ইনফেকশন আর অন্যান্য সংক্রামক রোগ যেমন এইচআইভি/এইডস-এর সম্ভাবনা ইনজেকশনের মাধ্যমে নেওয়া ড্রাগসের ক্ষেত্রে। অনেকেই মনে করেন যে একই ছুঁচ দিয়ে বারবার ইনজেকশন নিলেও সংক্রমণের ভয় থাকে না কারন ছুঁচ অন্য কেউ ব্যবহার করছে না, কিন্তু এটা সত্যি না। একই ছুঁচকে স্টেরেলাইজ না করে (জীবাণুমুক্ত না করে) বারবার ব্যবহার করলে ইনফেকশন হতে পারে।
  • নেশার করার ঘোরের জন্য সামাজিক বিচ্ছিনতা বা বিচ্যুতি।
  • আইনি সমস্যা – বিচক্ষণ ক্ষমতা কমে যাওয়া আর ঝুঁকি নেওয়া যায়, বা নেশার পরের খোরাকের জন্য বেআইনি পথে যাওয়া।
মনে রাখবেন এই সমস্যাগুলো কোনও বিশেষ উদ্দীপক নেওয়া মাত্রই হতে পারে, সেই বস্তুর প্রতি ব্যক্তি আসক্ত না হয়ে থাকলেও।
আপনি কিভাবে বুঝবেন যে আপনার আশেপাশে কেউ কোনও নেশায় আসক্ত কি না?
 
শারীরিক লক্ষণ
লাল চোখ
ঘুমের ছন্দে বিভ্রাট
হঠাৎ ওজন বেড়ে বা কমে যাওয়া
শরীর থেকে মদ বা ড্রাগসের গন্ধ পাওয়া
কাঁপুনি
সহযোজন ক্ষমতার অভাব, নড়বড়ে হাঁটাচলা
আঘাতের মাত্রা বেড়ে যাওয়া
আচরণগত ইঙ্গিত
কাজের প্রতি উৎসাহ কমে যাওয়া
স্কুলে, ঘরে বা অফিসে দায়িত্ব এড়িয়ে চলা
আর্থিক সমস্যায় পড়া
মারপিটে জড়িয়ে পড়া
সন্দেহজনক ব্যবহার করা। কোথায় যাচ্ছে জানাতে না চাওয়া, কার সাথে সময় কাটাচ্ছে জানাতে না চাওয়া, বা (আঘাতের ক্ষেত্রে) কিভাবে আঘাত পেয়েছে জানাতে না চাওয়া
নিজের ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে গোপনীয়তা দাবি করা। ঘরের দরজা বন্ধ করে রাখতে চাওয়া বা ঘরে কি করছে না বলতে চাওয়া; বন্ধুদের আর পরিবারের সাথে মেলামেশা এড়িয়ে যাওয়া
সামাজিক অনুষ্ঠান এড়িয়ে চলা
মনস্তাত্ত্বিক লক্ষণ
ব্যক্তিত্বের পরিবর্তন – খিটখিটে ভাব, চিন্তিত, অস্থিরতা
হঠাৎ করে মেজাজ পালটে যাওয়া
উদ্বেগ
বিভ্রম
উদ্যগের অভাব
স্মৃতিভ্রম, বিশেষত সেই সময়কালের যখন উদ্দীপক সেবন করেছিল
 
নেশা ছেড়ে দেওয়ার চেষ্টা করার কারনে হওয়া লক্ষণ
উইথড্রয়াল সিম্পটমস বা নেশা ছেড়ে দেওয়ার চেষ্টা করার কারনে হওয়া লক্ষণ হল শারীরিক আর আচরণগত পরিবর্তন যা ঘটে যখন ব্যক্তি এমন জিনিষের সেবন বন্ধ করে দেয় যার প্রতি আসক্তি রয়েছে। দুই ধরনের লক্ষণ হতে পারে – শারীরিক লক্ষণ আর আচরণগত লক্ষণ। সাধারণ শারীরিক লক্ষণ হল কাঁপুনি, ঘাম হওয়া, হৃদপিণ্ডের গতির পরিবর্তন, হজমের সমস্যা আর মৃগী রোগের মতো খিঁচুনি (গুরুতর ক্ষেত্রে)। আচরণগত লক্ষণগুলি হল উদ্বেগ, মনোযোগ না করতে পারা, সামাজিক পরিস্থিতির থেকে নিজেকে সরিয়ে নেওয়া, খিটখিটে হয়ে যাওয়া আর অস্থিরতা। আসক্তির চিকিৎসা সাধারণত ওষুধের মাধ্যমে করা হয় যা দিয়ে রোগী এই নেশার ছাড়ার ফলে হওয়া লক্ষণগুলোকে সামলাতে পারেন। যদি আপনি কোনও আসক্তি থেকে মুক্ত হতে চাইছেন বা নেশা ছাড়ার ফলে হওয়া লক্ষণগুলো সামলাতে পারছেন না, তাহলে কোনও ডাক্তার বা কাউন্সেলারের সাথে যোগাযোগ করুন।
আসক্ত ব্যক্তির সব থেকে বড় ভয় হল যে উনি হয়ত এই লক্ষণগুলো সামলাতে পারবেন না এবং পরের বারের খোরাক যোগাড় করতে না পারা তাদের জন্য সব থেকে বড় আতঙ্কের কারন। এর কারন হল যে আসক্তি তাদের প্রেরণার উৎসকে পালটে দিয়ে গুরুত্বের প্রাথমিক স্থান দখল করে নিয়েছে, খাবার, পানীয় এবং ঘুমের থেকেও বেশী জরুরী হয়ে উঠেছে। এর ফলে নেশা না করে থাকতে পারার কথা ব্যক্তি ভাবতেও পারেন না, যদিও মনে মনে হয়ত উনি এই আসক্তির হাত থেকে মুক্তি পেতে চাইছেন। ওরা জানেন যে নেশা করে ওদের শারীরিক এবং মানসিক ক্ষতি হচ্ছে, কিন্তু তবুও বন্ধ করতে পারছেন না। নেশা না করে থাকার কথা তারা চিন্তাই করতে পারেন না। সব সময় নেশা করার তীব্র আকাঙ্ক্ষার সাথে লড়াই করা, নেশা ছেড়ে দিলে উইথড্রয়াল সিম্পটমস, আর নেশা করার তাগিদ, এইসব ভয়গুলো ওদের সবসময় তাড়া করে বেড়ায়। এর কারনেই নেশা করা ছেড়ে দেওয়ার পরিকল্পনা সব সময় পিছিয়ে যায়, আর নিজেদের ওরা কথা দেয় যে কাল থেকে আর নেশা করবে না।
আসক্তি নির্ধারণ করার পদ্ধতি
অনেকগুলো প্রশ্নসূচি রয়েছে যার মাধ্যমে একজন ব্যক্তি জানতে পারেন যে তিনি কোনও উদ্দীপকের প্রতি আসক্ত কি না।
  • দি কেজ কোশ্চেনেয়ার, মদ্যপান সংক্রান্ত সমস্যার জন্য একটি স্ক্রিনিং টেস্ট (এর পরিবর্তিত সংস্করণ নিকোটিনের ওপর নির্ভরশীলতা মাপার জন্য ব্যবহার করা যেতে পারে)
  • দি ড্রাগ এবিউস স্ক্রিনিং টেস্ট (ডাস্ট)
  • দি ফেগারস্ট্রম টেস্ট ফর নিকোটিন ডিপেন্ডেন্স
  • দি ৪সি (4Cs) এসেস্মেন্ট, ডিএসএম-আইভির নির্দেশতালিকার ভিত্তিতে
এর মধ্যে কিছু পরীক্ষা নিজে-নিজে করা যেতে পারে, অন্যগুলি সাইকিয়াট্রিস্ট বা মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত পেশাদারী ব্যক্তির পরামর্শ দ্বারা করা সম্ভব। আপনি যদি নিজেই এই পরীক্ষাগুলো করে মনে করেন যে আপনার কোনও দ্রব্যের প্রতি আসক্তি রয়েছে, তাহলে মনে রাখবেন যে আসক্তি নির্ধারণ প্রথম পদক্ষেপ। সম্পূর্ণ চিকিৎসার জন্য কোনও সাইকিয়াট্রিস্ট বা নেশা নির্মূল কেন্দ্রের সাথে যোগাযোগ করুন।
বেশীরভাগ ক্ষেত্রে কোনও বন্ধু বা পরিবারের সদস্য চিণ্হিত করতে সক্ষম যে তাদের প্রিয়জনের আসক্তি সংক্রান্ত সমস্যা রয়েছে কি না, এবং চিকিৎসা করানোর জন্য তাদের উৎসাহিত করতে পারেন। যদি আপনি নিজের প্রিয়জনের জন্য সাহায্যের খোঁজ করছেন, তাহলে আপনি কোনও সাইকিয়াট্রিস্ট বা কাউন্সেলারের সাথে যোগাযোগ করতে পারেন পরিস্থিতির মূল্যায়নের জন্য, এবং বিশেষজ্ঞ নির্বাচন করার জন্য। বিশেষজ্ঞ তখন রোগী এবং তার আত্মীয়-পরিজনের সাক্ষাৎকার নিয়ে সমস্যার গভীরতা যাচাই করবেন এবং চিকিৎসার ধরণ নির্ধারণ করবেন।

আরও পড়ুন