পরিচর্যার সূত্র

হিতাকাঙ্ক্ষীদের উদ্দেশে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ

মাঝে মাঝে এমন অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতি সামনে আসে যেখানে কোনও ব্যক্তিকে তাঁর প্রিয়জনের শুভাকাঙ্ক্ষী হিসেবে একটা বড় ভূমিকা পালন করতে হয়। এমন হতেই পারে এই ভূমিকা পালন করার জন্য সেই ব্যক্তি কোনও ভাবেই প্রস্তুত ছিলেন না। মানসিক স্বাস্থ্য-সংক্রান্ত সমস্যায় আক্রান্ত কোনও মানুষের জীবনে হিতাকাঙ্ক্ষী হতে গেলে সেই ব্যক্তিকে শারীরিক এবং মানসিক দিক দিয়ে খুবই শক্তিশালী হওয়া প্রয়োজন। এই ক্ষেত্রে কারও সমস্যা যদি গুরুতর হয় তাহলে শুভাকাঙ্ক্ষীকে সর্বশক্তি দিয়ে তার পাশে থাকতে হবে। এমনকী কারও প্রতি যত্ন নিতে গিয়ে কেউ যদি তাঁর কাজে পুরোপুরি মগ্নও হয়ে যায়, তখনও মাঝে মধ্যে মনে হতে পারে কাজে ফাঁক থেকে যাচ্ছে। এই বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা কিছু পরামর্শ দিয়েছেন-

নিজের কাজের সীমা জানা জরুরি

প্রত্যেকেরই শারীরিক এবং মানসিক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এর সম্পর্কে যথাযথ জ্ঞান থাকা জরুরি। নিজের সীমার বাইরে গিয়ে এমন কাজ করা উচিত নয় যা ভাল করার থেকে খারাপ করে বসবে। হিতাকাঙ্ক্ষী হিসাবে একজনের উচিত তাঁর সীমাবদ্ধতাগুলিকে স্বীকার করা এবং সেই মোতাবেক কাজ করা।

কাজ উপভোগ করা প্রয়োজন

কথাটি বলা যত সহজ, করা ততটা নয়। বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষজ্ঞদের মতে, কাউকে দেখভাল করতে গেলে নিজেকে মানসিক ভাবে চাপমুক্ত রাখতে হবে। আর এটি তখনই সম্ভব, যখন কাজটিকে কেউ উপভোগ করবেন। এই কাজে অনেক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। বছরের পর বছর এক কাজ করার মধ্যে থেকে আনন্দ খুঁজে নেওয়া মোটেই সহজ নয়। এহেন কাজের মধ্য থেকে আনন্দ খুঁজে নেওয়াটাই আসল চ্যালেঞ্জ। এর অনেক উপায় রয়েছে। একঘেয়ে কাজকে নতুন উপায়ে করা এবং অবসরে নিজের মতো কিছু করার চেষ্টা একঘেয়েমি থেকে মুক্তি দিতে পারে।

ওয়াকিবহাল থাকতে হবে

কাজের প্রতি ওয়াকিবহাল হলে আত্মবিশ্বাস বাড়ে এবং এর ফলে শুভাকাঙ্ক্ষী তাঁর চ্যালেঞ্জগুলির মোকাবিলা করতে সক্ষম হয়। প্রিয়জনের প্রতি যথাযথ যত্ন নেওয়ার জন্য তার স্বাস্থ্য সম্পর্কে ওয়াকিবহাল হওয়া একজন হিতাকাঙ্ক্ষীর পক্ষে অত্যন্ত জরুরি। বিশেষজ্ঞদের মতে, একজন শুভাকাঙ্ক্ষীর নিজের কর্তব্য এবং দৈনন্দিন কাজের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করে চলা দরকার। সুযোগ করে নিয়ে নিজেকে উত্তরোত্তর দক্ষ করে তোলার শিক্ষাও গ্রহণ করতে হবে। নিজেকে আধুনিক জ্ঞান এবং তথ্যে এগিয়ে নিয়ে চলুন। নিজের ইচ্ছাশক্তিকে জাগিয়ে তুলুন।

সাহায্যের জন্য হাত বাড়িয়ে দিন

অনেক সময় শুভাকাঙ্ক্ষীরা মনে করেন সবটাই তাঁদের দায়িত্ব এবং এই ক্ষেত্রে অন্য কারও ভূমিকা নেই। আসলে মানসিক স্বাস্থ্যের সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের যাঁরা দেখভাল করেন, তাঁরা যেন সমাজের বাইরের কেউ এবং যুদ্ধক্ষেত্রে তাঁরা সম্পূর্ণ একা, তাঁদের উপর কাজ চাপিয়ে দেওয়া যায়-- এমন একটি ধারণা প্রচলিত রয়েছে। যদিও অপ্রত্যাশিত সাহায্য অনেক সময়ই শুভাকাঙ্ক্ষীদের অবাক করে তোলে। তবে এই ধরনের সহায়তা তখনই পাওয়া যায়, যখন একজন সাহায্যের জন্য নিজে থেকে উদ্যোগী হয়ে ওঠেন।

প্রচেষ্টা ভাগ করে নেওয়া প্রয়োজন

পরিচর্যাকে বিভিন্ন দিক দিয়ে দেখা হয়। পরিচর্যার বিষয়টি অনেক উপাদানের উপর নির্ভরশীল। যদি আশা করা হয় একজন ব্যক্তি যিনি অন্য কারও যত্ন নেওয়ার জন্য নিয়োজিত, তিনি অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে সব দিকে সমানভাবে নজর দেবেন, তাহলে তেমন আশা করা কখনোই উচিত নয়। এই ক্ষেত্রে রোগীর পরিবার এবং বন্ধুদের সঙ্গে এই দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়ার চেষ্টা করতে হবে। প্রাথমিকভাবে পরিচর্যাকারী, যাঁর উপর কাজের প্রভাব সব থেকে বেশি পড়ছে, তাঁর মানসিক চাপ কমানোর জন্য দায়িত্ব ভাগ করা নেওয়া অবশ্যই জরুরি। এই পদক্ষেপের ফলে মানসিক স্বাস্থ্যের সমস্যায় জর্জরিত ব্যক্তিও সুফল ভোগ করবেন। এই পদ্ধতি গ্রহণ করলে রোগী এবং তার পরিচর্যাকারী বুঝতে পারবে যে, আশপাশের সবাই তাদের সঙ্গেই রয়েছে।

নিজের যত্ন নিন

যাঁরা রোগীর সেবা করেন, তাঁরা শারীরিক এবং মানসিক ভাবে খুবই চাপে থাকেন। পরিচর্যাকারীরা তাঁদের জীবনের চাওয়া-পাওয়াগুলির সঙ্গে এক ধরনের সমঝোতা করেন, নিঃস্বার্থ ভাবে আমাদের প্রিয়জনের প্রতি যত্নশীল হন। এই ক্ষেত্রে সমাজের ভূমিকা যদি তাঁদের প্রতি সদর্থক না হয়, তাহলে বিষয়টি মোটেই সুখকর হবে না। অন্যের যত্ন নিতে গিয়ে অনেক সময়েই পরিচর্যাকারীরা নিজের স্বাস্থ্যের প্রতি যত্ন নেন না। সেই ক্ষেত্রে তাঁদের মাঝে মাঝে চেক-আপ করানো খুবই প্রয়োজন। কারণ একজন সুস্থ-সবল পরিচর্যাকারীই রোগীকে উন্নতমানের পরিষেবা দান করতে পারেন।

অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেওয়া জরুরি

একজন পরিচর্যাকারীর নিজস্ব মতামত, অভিজ্ঞতা, নানা মজার ঘটনা থাকে। সেগুলি অন্যের সঙ্গে ভাগ করে নিলে ভাল। চিন্তাভাবনার আদান-প্রদানের মধ্য দিয়ে মানসিক চাপ কমানো সম্ভব। এই পদ্ধতি অনেকটা থেরাপির মতো। এর ফলে একদিকে মানুষ চেনার ক্ষমতা বাড়ে আবার অন্যদিকে শুভাকাঙ্ক্ষী ব্যক্তির মানসিক বোঝাও হালকা হয়। অন্যের সঙ্গে যোগাযোগের মধ্য দিয়ে অনেক ভাল সুযোগের ক্ষেত্রও গড়ে উঠতে পারে। যাঁর সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপিত হচ্ছে তিনি হিতাকাঙ্ক্ষী ব্যক্তির বন্ধু হয়ে উঠতে পারেন। এইভাবে অভিজ্ঞতা ভাগ করার মধ্য দিয়ে মানসিক ভাবে একে অপরের কাছাকাছি পৌঁছে যাওয়া সহজ হবে।

 


আরও পড়ুন