আমার পরে কে?

খেয়াল রাখবেন, আপনি চলে যাওয়ার পরেও যেন অন্য কেউ আপনার প্রিয়জনের যত্ন নেন।

যে সব অভিভাবকদের সন্তানরা মানসিক অসুস্থতার শিকার হয়, তাঁরা প্রবল সমস্যার সম্মুখীন হন। এর সঙ্গে বয়স্ক মা-বাবাদের মনের মধ্যে হয়তো একটা প্রশ্ন চলতেই থাকে – আমি চলে গেলে কি হবে? সন্তানদের সঙ্গে জীবনের বেশিরভাগ সময় কাটানোর পরে, তাঁরা ভাবতে থাকেন যে তাঁরা মারা গেলে তাঁদের সন্তানদের কি হবে? তাঁরা চান যে তাঁদের সন্তানের কেউ যত্ন নিক, ভালবাসুক এবং তারা যেন সুখে থাকতে পারে। তাঁদের কিছু সাধারণ চাহিদা যেমন খাদ্য, আশ্রয়, জামাকাপড়, চিকিৎসা, ওষুধপত্র এবং একজন মনোবিদের কাছে নিয়মিত নিয়ে যাওয়া যেন পূর্ণ হয়।

এর জন্য আগে থেকেই অর্থনৈতিক পরিকল্পনা করে রাখা জরুরি এবং প্রয়োজন কোনও একজন কে ঠিক করে রাখা, যাতে সে প্রিয়জনের যত্ন নিতে পারেন। দু’টি উপায় আছে, যার মধ্যে দিয়ে আপনি আপনার সন্তানের জন্যও আপনার মৃত্যুর পরে যথেষ্ট অর্থ রেখে যেতে পারেন:  

  • তার নামে একটি উইল তৈরি করে রাখুন।
  • একটি ট্রাস্ট তৈরি করে রাখুন, যার উত্তরাধিকারী হবে আপনার সন্তান, যাতে সে আপনার মৃত্যুর পরেও সেখান থেকে সাহায্য পেতে পারে।

উইল বানানো

কে উইল বানাতে পারে?

যে কোনও প্রাপ্তবয়স্ক (১৮ বছর) মানুষই উইল তৈরি করতে পারে। মানসিক রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি যদি তিনি একটু হলেও সুস্থ হন, তাহলে তিনিও উইল বানাতে পারেন (এর জন্য মনোবিদের ছাড়পত্রের প্রয়োজন হবে)। একটি যৌথ পরিবার অথবা স্বামী স্ত্রী দুজনে মিলেও উইল বানাতে পারেন।

উইল কি ভাবে বানাতে হয়?

উইল তৈরি করার কোনও আলাদা রকম নিয়মাবলী নেই। এটি একটি সাদা কাগজেও করা যেতে পারে, যদি সেই মুহূর্তে সেখানে দুজন ব্যক্তি সাক্ষী হিসাবে এবং সেই উইলের অধিকর্তা থাকেন। সেই সাক্ষীরা যেন সেই উইলের অংশীদার না হয়। প্রয়োজন হলে উকিলের সাহায্য অবশ্যই নিন।

উইল নথিভুক্ত করা

সবসময় যে উইল নথিভুক্ত করতে হবে, তার কোনও মানে নেই, তবে নথিভুক্ত করা থাকলে আদালতে তা বেশি গুরুত্ব পাবে। নথিভুক্ত করতে হলে বেশি পয়সা খরচও করতে হয় না। আপনাকে একজন রেজিস্ট্রার বা ডেপুটি-রেজিস্ট্রারের কাছে যেতে হবে। নথিভুক্ত হয়ে গেলে আপনি উইলটি পড়ার আগে পর্যন্ত তাঁদের কাছেই রাখতে পারেন।

অভিভাবক, অছি  এবং অ্যাডমিনিস্ট্রেটর

উইলের অছি হচ্ছেন সেই ব্যক্তি যিনি উইলের নিয়মকানুনগুলি পড়ে শোনাবেন উইলটি লেখা হয়ে যাওয়ার পর।

অভিভাবক হলেন সেই ব্যক্তি যিনি সম্পত্তির দেখাশুনা করেন। যদি উইলের উত্তরাধিকারি মানসিক অসুস্থতায় ভোগেন এবং উইলের অধিকর্তা যদি মনে করেন যে সেই ব্যক্তি সম্পত্তির দেখাশুনা ভাল করে করতে পারবেন না, তাহলে তিনি একজন অভিভাবককে নিযুক্ত করতে পারেন। তিনি কোনও একজন আত্মীয় বা বন্ধু হতে পারেন বা এনজিও হতে পারেন, যিনি সম্পত্তির যত্ন রাখবেন।

যদি কোন অভিভাবক না পাওয়া যায়, তাহলে আদালতে যাওয়া যেতে পারে। আদালত থেকেই অভিভাবকের ব্যাবস্থা করা হবে।

কি করে নিশ্চিন্ত হবেন, যে উইল ঠিক মতো ব্যবহৃত হচ্ছে?

উইল ঠিক মতো ব্যবহৃত হচ্ছে কিনা, সেটি দেখার দায়িত্ব একজন নির্ধারকের। যদি তিনি নিজেও তা করতে না পারেন, তাহলে একজন অভিভাবকই দেখবেন, আর তাও না হলে এমন একজন যিনি আদালতে এই উইলের ব্যাপারে জানাতে পারবেন। যদি আদালত মনে করে যে নির্ধারক নিজের কাজ ঠিক করে করতে পারছেন না, তাহলে একজন অ্যাডমিনিস্ট্রেটর কে ডাকা হবে এই কাজগুলি করার জন্য।

একজন ব্যক্তি যদি মানসিক ভাবে অসুস্থ হন, তাহলে তিনি কি উইলের অংশীদার হবেন?

হ্যাঁ, মানসিক রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি উইলের সম্পত্তির অংশীদার হতে পারেন। কিন্তু যদি উইলের অধিকর্তা মনে করেন যে সেই ব্যক্তি এই দায়িত্ব নিতে পারবেন না, তাহলে তিনি একজন অভিভাবক নিযুক্ত করতে পারেন তাঁকে সাহায্য করার জন্য।

আমি যদি উইল না বানাই, তাহলে কি আমার সম্পত্তি আমার অন্য কোনও মানসিক রোগে আক্রান্ত আত্মীয়র কাছে চলে যাবে?  

 উইল না থাকলে এইগুলি হতে পারে: 

  • আপনার স্ত্রী বেঁচে থাকলে, সম্পত্তি তাঁর অধীনে যাবে
  • আপনার স্ত্রী বেঁচে না থাকলে, তা আপনার সন্তানের কাছে যাবে
  • আপনার কোনও সন্তানও যদি না থাকে, তাহলে সম্পত্তি যাবে আপনার মায়ের কাছে
  • যদি এই কজন (১ম শ্রেণীর) কেউই না থাকেন তাহলে আপনার সম্পত্তি যাবে আপনার ভাই বা বোনের কাছে (২ম শ্রেণী )।

যদি ১ম বা ২ম শ্রেণীর কেউ মানসিক রোগে আক্রান্ত হন, তাহলেও সম্পত্তির ভাগাভাগি একই নিয়ম অনুযায়ী হবে। যদি আপনি কোন ব্যক্তির যত্নের দায়িত্ব নিয়ে থাকেন এবং তাঁর নামেই উইলের সম্পত্তি রেখে যেতে চান, তাহলে উকিলের পরামর্শ নিয়ে উইল তৈরি করতে হবে।

ট্রাস্ট তৈরি করা

ট্রাস্ট কি?

একটি ট্রাস্ট হল একটি সম্পর্ক যার অধীনে একজন মালিকের সম্পত্তি অন্য একটি অংশীদারের হাতে যায়, যে অংশীদার আবার সেই সম্পত্তি দিয়ে অন্য একজনের সাহায্য করেন।

উদাহরন: সৌরভের পুত্র গৌরব মানসিক রোগে আক্রান্ত। সৌরভ চান যে তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর ছেলে আরামে জীবন কাটাক, তাই তিনি একটি ট্রাস্ট তৈরি করেন; ধরে নিন ‘ক’। এর জন্যও সৌরভকে তাঁর সম্পত্তি ‘ক’ কে দিতে হবে। ‘ক’ সৌরভের সম্পত্তির দেখাশুনা করবে যার সুবিধা ভোগ করবে গৌরব। অবশ্যই তা সৌরভের মতানুসারে হতে হবে, যা তিনি আগেই ঠিক করে যাবেন।

ট্রাস্ট তৈরি করতে গেলে কি কি লাগবে?

প্রত্যেক ট্রাস্টেরই একজন করে অধিকর্তার প্রয়োজন, কমপক্ষে দুজন ট্রাস্টির প্রয়োজন, ট্রাস্টের কার্য প্রয়োজন, একটি বেনেফিসিয়ারির প্রয়োজন, আর প্রয়োজন ট্রাস্টের সম্পত্তির। একজন অধিকর্তাই ট্রাস্ট তৈরি করেন, সে তাঁর সম্পত্তি ট্রাস্টে দান করে, সেটির কার্যটিও ঠিক করে দেন। ট্রাস্টিরা দেখেন সেই ট্রাস্টের সম্পত্তি ঠিক ভাবে, ঠিক জায়গায় বিনিয়োগ হচ্ছে কিনা। ট্রাস্ট বানাতে গেলে কোনও নির্ধারিত নুন্যতম সম্পত্তির প্রয়োজন হয় না। ট্রাস্টির সংখ্যাও নির্ধারিত করা থাকে না। তবে ব্যক্তিগত ট্রাস্ট হলে, বেশি ট্রাস্টি নিযুক্ত না করাই ভাল।

ট্রাস্টের কার্য কি?

এটি ট্রাস্টের কার্যকারিতাগুলি দেখে:

  • এটি ট্রাস্টের কারণগুলি তালিকাবদ্ধ করে
  • বেনেফিসিয়ারি বা উত্তরাধিকারী কে সেটি দেখে
  • ট্রাস্টিদের সমস্ত খবর রাখে – তাঁদের অ্যাপয়েন্টমেন্ট, তাঁদের সময়, নতুন ট্রাস্টি কি ভাবে নিজুক্ত করা হবে, ইত্যাদি
  • এটি ঠিক করে দেয়, কি ভাবে কখন ট্রাস্টের অংশ ব্যাবহার করা হবে

কি ভাবে আমি নিশ্চিত হব যে ট্রাস্টের লোকজন সম্পত্তি নিয়ে কোন ভুল কাজ করছেন কিনা?

যেহেতু অনেক ট্রাস্টি একসাথে কাজ করেন, তাই ভুল কাজ হওয়ার  সম্ভাবনা কম। যদিও বা ট্রাস্টিদের মধ্যে কোনও ঝামেলা হলে যে কেউ পুলিশ, আয়কর বিভাগ বা আদালতে জানাতে পারেন। ট্রাস্ট তৈরি করার আগে উকিলের পরামর্শ নিন। তাঁরাই আপনাকে বলে দেবেন কি করতে হবে। 


আরও পড়ুন