ইলেক্ট্রোকনভালসিভ থেরাপি বা ইসিটি কী?

মানসিক রোগের চিকিৎসায় ইলেক্ট্রোকনভালসিভ থেরাপি একটি নিরাপদ, সঠিক এবং ক্ষেত্রবিশেষে জীবনদায়ী চিকিৎসা পদ্ধতি।

ন্যাশনাল ইস্নটিটিউট অফ মেন্টাল হেলথ অ্যান্ড নিউরোসায়েন্সেসে (নিমহ্যান্স) কর্মরত মনোবিদ ডাঃ প্রীতি সিন্‌হার থেকে আমরা এই চিকিৎসা পদ্ধতি সম্পর্কে জানতে চেয়েছিলাম।

মানসিক রোগের চরম পর্যায়ে ইলেক্ট্রোকনভালসিভ থেরাপি বা ইসিটি একটি বহু ব্যবহৃত চিকিৎসা পদ্ধতি। চলতি কথায় আমরা একে “শক ট্রিটমেন্ট” বলে থাকি। কিন্তু ইসিটি ব্যাপারে অজ্ঞ্যানতার কারণে লোকের এই পদ্ধতি সম্বন্ধে অনেক ভুল ধারণা আছে। এবং এর সম্পর্কে যথেষ্ট তথ্য কোথাও উপলব্ধ না হবার কারণে সবাই সিনেমা, সিরিয়াল বা ইন্টারনেটে উপলব্ধ ভ্রান্ত ধারনার স্বীকার হন।

এই লেখাটিতে আমরা এইরকমই কিছু ভ্রান্ত ধারণা দূর করে সঠিক তথ্য দেবার চেষ্টা করব।

ইলেক্ট্রোকনভালসিভ থেরাপি কী?

৭৫ বছরেরও বেশী সময় ধরে ইসিটি মানসিক রোগের চিকিৎসার ক্ষেত্রে ব্যবহৃত একটি নিরাপদ, যথোপযুক্ত ও জীবনদায়ী চিকিৎসার পদ্ধতি। এই পদ্ধতি অনুসারে রোগীর মস্তিষ্কের কোষগুলিকে উজ্জীবিত করার জন্যে তাঁর কপালে খুব অল্প এবং নিয়ন্ত্রিত পরিমাণে বৈদ্যুতিক প্রবাহ দেওয়া হয়। এর ফলে কয়েক মুহুর্তের জন্যে শরীরে খিঁচ ধরতে পারে। সেই জন্যে এই সময়ে রোগীকে অ্যানেস্থেশিয়া দেওয়া হয় যাতে তিনি কোনও কিছুর টের না পান। পুরো প্রক্রিয়াটি কয়েক মিনিট চলে এবং ১৫-২০ মিনিটের মধ্যে তাঁর জ্ঞ্যান ফিরে আসে।

এটি কি আদৌ একটি জনপ্রিয় চিকিৎসার পদ্ধতি?

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে, বিলেতে, অস্ট্রেলিয়াতে এবং বিশ্বের বহু প্রান্তে এই পদ্ধতিতে চিকিৎসা করা হয়। 

পরিসংখ্যান অনুযায়ী প্রত্যেক বছর আমেরিকাতে ৩৫০০০, বেলজিয়ামে ৭০০০ এবং জার্মানিতে ১৫০০ রোগীর চিকিৎসা করা হয়।

ব্যাঙ্গালোরের নিমহ্যান্সে প্রায় ৬০০-৮০০ জন রোগী এই চিকিৎসার সুবিধা গ্রহণ করেন।

ইসিটির ফলে কী রোগীর লাভ হয়?

ডিপ্রেশন বা স্কিৎজোফ্রেনিয়ার মত রোগের চিকিৎসার সময় মনোবিদরা ইসিটি কে একটি বিকল্প হিসেবে দেখেন। কিন্তু তার আগে চিকিৎসকেরা রোগী এবং তাঁর পরিবারের মতামত, প্রক্রিয়াটির নিরাপত্তা, এবং রোগীর মানসিক পরিস্থিতির মত বহু দিক বিচার করেন। সাধারণত ইসিটি নিম্নলিখিত পরিস্থিতিতে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়ঃ

  • যখন রোগীর মানসিক ভারসাম্য স্থিতিশীল নয় এবং তিনি আত্মহননের পথ বেছে নেবার কথা ভাবছেন।
  • যখন রোগী মানসিক বিপর্যয়ের কারণে খাদ্যগ্রহণ বন্ধ করে দেন।
  • রোগী মানসিক অসুস্থতার জন্যে ক্রমশ একটি জড় পদার্থে পরিণত (ক্যাটাটোনিয়া) হচ্ছেন।
  • যখন রোগী উত্তেজনার বশে নিজের বা অন্যের বিপদের ডেকে আনতে পারেন।
  • যখন ওষুধে কোনও কাজ দেয় না বা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার দরুণ তা নিতে বারণ করা হয়।

ইসিটির আগে কি রোগী এবং তাঁর পরিবারের অনুমতি নেওয়া হয়?

ইসিটির সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে মনোবিদ রোগী এবং তাঁর পরিবারকে এই প্রক্রিয়াটির সুবিধা ও অসুবিধা এবং অন্যান্য বিকল্প চিকিৎসা পদ্ধতি সম্বন্ধে বোঝান। তাঁরা লিখিত অনুমতি দিলে পরেই চিকিৎসা শুরু করা হয়। ক্ষেত্রবিশেষে রোগী অনুমতি দেবার অবস্থায় না থাকলে, তাঁর পরিবারের মতামত নেওয়া হয়। কিন্তু তাঁরা না চাইলে অন্যান্য পদ্ধতিতে চিকিৎসা শুরু হয়। আগে অনুমতি দিয়ে থাকলেও পরে মত বদল করাও সম্ভব।

ইসিটির অনুমতি না দিলে?

ইসিটির অনুমতি না পেলে মনোবিদরা চিকিৎসার বিকল্প পথ বেছে নেন। সেইক্ষেত্রে ওষুধের মাত্রা বাড়ানো হয়। কিন্তু সেইক্ষেত্রে রোগীকে দীর্ঘ সময়ের জন্যে হাসপাতালে কাটাতে হতে পারে।
 

ইসিটি কি শিশু ও বৃদ্ধদের জন্যেও নিরাপদ?

পর্যাপ্ত সাবধানতা অবলম্বন করলে পরে বয়স্ক কোনও ব্যাক্তিকে ইসিটি সম্পুর্ন নিরাপদে দেওয়া সম্ভব। কার্যত অধিকাংশ দেশেই বৃদ্ধ রোগীরা ইসিটির মাধ্যমে চিকিৎসা করান। কিন্তু শিশুদের ক্ষেত্রে ইসিটির কথা সবার শেষে ভাবা হয়। ব্যাঙ্গালোরের নিমহ্যান্সে একশোরও বেশী শিশু কোনও গুরুতর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ছাড়াই ইসিটির মাধ্যমে চিকিৎসা করিয়েছেন।

ইসিটি কি হাইপারটেনশন বা হৃদরোগীদের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা যেতে পারে?

এইরকম ক্ষেত্রে চিকিৎসক ইসিটির সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে বিভিন্ন বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেন এবং রোগীর শারীরিক পরিস্থিতি খুঁটিয়ে বিচার করেন। স্নায়ুরোগ, হৃদরোগ এবং শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত বহু রোগীই ইসিটির মাধ্যমে কোনও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ছাড়াই চিকিৎসা করিয়েছেন।

গর্ভবস্থায় বা সদ্য সন্তানের জন্ম দেবার পরেও কি কোনও মহিলা ইসিটি নিতে পারেন?

পর্যাপ্ত সাবধানতা অবলম্বন করলে পরে গর্ভবস্থায় বা সদ্য সন্তানের জন্ম দেবার পরেও একজন মহিলাকে ইসিটি সম্পুর্ন নিরাপদে দেওয়া সম্ভব। যেহেতু এই অবস্থায় একজন মহিলাকে অনেক ওষুধ দেওয়া যায় না তাই ইসিটিকেই সবচেয়ে নিরাপদ বলে ধরা হয়।

ইসিটি কি একবার দেওয়া হলে বারংবার দেওয়ার প্রয়োজন হয়?

এটি একটি সম্পুর্ন অবাস্তব ধারণা। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ইসিটি একবার দেওয়া হয়ে গেলে ওষুধপত্রের সাহায্যে রোগীর উপসর্গ নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়। এমনকি উপসর্গ আবার দেখা দিলেও পারতপক্ষে ইসিটির কথা ভাবা হয় না। খুব বিরল কিছু ক্ষেত্রে দেখা যায় যে রোগী ইসিটি ছাড়া অন্য কোনও চিকিৎসায় সাড়া দিচ্ছেন না।  

ইসিটির পরে কি রোগ সম্পুর্ণ সেরে যায়? ইসিটি চলাকালীন বা তার পরেও কি ওষুধ খাবার দরকার পড়ে?

ইসিটির প্রভাব চিরস্থায়ী না। ফলে রোগীর উন্নতির জন্যে ওষুধ খাওয়া চালিয়ে যেতে হয়। খুব বিরল কিছু ক্ষেত্রে ওষুধে যথেষ্ট কাজ না দেবার ফলে মাসে এক থেকে দুইবার ইসিটি দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।

ইসিটি নিতে বলা হলে রোগীর কি করা উচিৎ?

সবার আগে চিকিৎসককে রোগীর পুরনো চিকিৎসার ইতিহাস এবং বর্তমান শারীরিক পরিস্থিতির কথা জানাতে হবে। বিশেষত হৃদপিণ্ড, ফুসফুস, হাড় এবং রক্তচাপের সমস্যা কথা তাঁকে খুলে বলা খুবই জরুরি। অ্যানেস্থেশিয়ার সাহায্যে পুর্বে কোনও চিকিৎসা করিয়ে থাকলে বা নড়বড়ে দাঁতের কথাও জানানো উচিৎ। বর্তমানে রোগী কি কি ওষুধ খাচ্ছেন তাও জানিয়ে রাখা প্রয়োজন। রোগীর শারীরিক পরিস্থিতি খুঁটিয়ে দেখাতে সংশ্লিষ্ট মনোবিদ ইসিজি, ব্রেন স্ক্যান এবং কিছু রক্ত পরীক্ষাও করাতে পারেন।

ইসিটির আগে কি প্রস্তুতি নেওয়া উচিৎ?

ইসিটির অন্তত পক্ষে ৬ ঘন্টা আগে থেকে কিছু খাওয়া বা পান করা উচিৎ নয়। মাথায় যাতে কোনও তেল না থাকে তাই ভাল করে শ্যাম্পু করে নেওয়া উচিৎ এবং ঢিলেঢালা পোশাক পড়া উচিৎ। গয়নাগাঁটি, কন্ট্যাক্ট লেন্স, নকল দাঁত বা কানে শোনার যন্ত্র খুলে রাখা উচিৎ। ইসিটি করতে ধোঁকার আগে মলমূত্রাদি ত্যাগ সেরে ফেলা উচিৎ। ইসিটির আগে ও পরে ওষুধপত্র কি খাওয়া উচিৎ তা আপনার চিকিৎসক আপনাকে জানিয়ে দেবেন।

ইসিটি চলাকালীন ঠিক কি হয়?

সংশ্লিষ্ট মনোবিদ, নার্স এবং অ্যানেস্থেশিয়ার বিশেষজ্ঞের একটি অভিজ্ঞ দল ইসিটির সময় উপস্থিত থাকেন। এরপর রোগিকে ঘুমের ওষুধ দেওয়া হয় এবং অক্সিজেন মাস্ক পরিয়ে দেওয়া হয়। রোগী ঘুমিয়ে পড়লে পরে তাঁর মাংশপেশী শিথিল করার একটি ওষুধ দেওয়া হয়।  এরপর ২-৪ সেকেন্ডের জন্যে তাঁর কপালের কাছে সামান্য বিদ্যুতের শক দেওয়া হয়। এর ফলে ২০ সেকেন্ড থেকে ১ মিনিট মত রোগী কাঁপতে থাকেন। এই সময় উপস্থিত চিকিৎসকেরা রোগীকে সবরকম সাহায্য করেন। পুরো প্রক্রিয়াটি ঘুমের মধ্যে হওয়ার দরুন রোগী কোনও রকম কষ্ট বা যন্ত্রণা টের পান না।

ইসিটির পর কিরকম যত্ন নেওয়া উচিৎ?

সাধারণ কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই রোগীর জ্ঞ্যান ফিরে আসে। এরপর চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী রোগীর খাবার এবং ওষুধ খাওয়া উচিৎ। ইসিটির পরে বেশ কয়েক ঘণ্টা রোগীর কোনও গাড়ি চালানো উচিৎ নয়। পুরো চিকিৎসা শেষ না হওয়া অবধি সইসাবুদের মত গুরুত্বপুর্ন কাজ করা উচিৎ নয়। এছাড়া রোগী বলতে গেলে সম্পুর্ন স্বাভাবিক জীবন কাটাতে পারেন।

ইসিটি কতবার দিতে হয়?

সপ্তাহে ২-৩ বার হিসেবে মোট ৬-১২ টা সেশন দেওয়া যেতে পারে। পুরোটাই নির্ভর করছে রোগী চিকিৎসায় কতটা সাড়া দেবেন তাঁর ওপর।

ইসিটি কোথায় দেওয়া যায়?

ইসিটি চলাকালীন রোগীর শারীরিক পরিস্থিতি বিচার করার জন্য একটি বিশেষ ঘর থাকে।

ইসিটির সুফল কতদিনে পাওয়া যায়?

২-৪ টে সেশন করালেই অধিকাংশ লোক সুফল পান। যদিও কোনও কোনও ক্ষেত্রে ইসিটির কোর্স শেষ না হওয়া অবধি কোনও বিশেষ উন্নতি নাও দেখা যেতে পারে। খুব বিরল কিছু ক্ষেত্রে ইসিটি করিয়েও কোনও সুফল পাওয়া যায়নি।  

ইসিটি কীভাবে কাজ করে?

ইসিটির দরুন মস্তিষ্কে বিভিন্ন রাসায়নিক পরিবর্তনের ফলে আমাদের স্নায়ুকোষ গুলি সক্রিয় হয়ে ওঠে বলে মনে করা হয়। দেখা গেছে যে ইসিটির পরে আমাদের নিউরোট্রান্সমিটারে পরিবর্তন হয়। যদিও ইসিটির সঠিক কার্য্যপদ্ধতি আমাদের আজও অজানা এবং এই নিয়ে প্রতিনিয়ত গবেষণা চলছে।

ইসিটি কি নিরাপদ? এর কি কি পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হতে পারে? ইসিটির ফলে কি বিস্মৃতি দেখা দিতে পারে?

সতর্কতা অবলম্বন করলে পরে ইসিটি সত্যিই নিরাপদ। ইসিটির ফলে খুব ক্ষণস্থায়ী পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দেয় যেমন, মাথায় বা গায়ে যন্ত্রণা, ইসিটির ঠিক আগের বা পরের কথা ভুলে যাওয়া। সাধারণ বুদ্ধি বা পুরনো স্মৃতিতে এর কোনও প্রভাব পড়ে না। পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ব্যাক্তিবিশেষে আলাদা আলাদা হতে পারে। আধুনিক চিকিৎসার সাহায্যে হৃদপিণ্ড, স্নায়ুতন্র, দাঁত বা হাড় জড়িত কোন সমস্যা হয় না বললেই চলে।

পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কমানোর কোনও উপায়?

পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কমানোর উদ্দেশ্যে বর্তমানে ইসিটির প্রক্রিয়াকে আরও সহজ ও নিখুঁত করে তোলা হয়েছে। কিন্তু সেটা নির্ভর করছে রোগীর শারীরিক পরিস্থিতি, তাঁর সেরে ওঠার সময়, বয়স এবং পুর্ববর্তী ইসিটির অভিজ্ঞতার ওপর।

 


আরও পড়ুন