আমার সংস্থার কেন আত্মহত্যা প্রতিরোধ কর্মসূচীতে নিবেশ করা উচিৎ?

আত্মহত্যা প্রতিরোধে কার্যক্ষেত্রের ভুমিকার বিষয়ে এই প্রবন্ধটিতে শ্রীরঞ্জিতা জেউরকার জানার চেষ্টা করেছেন কিভাবে একটি সংস্থা আত্মহত্যা প্রতিরোধ এবং আত্মহত্যা-প্রবণ কর্মচারীদের সাহায্য করতে পারে।
আমার সংস্থার কেন আত্মহত্যা প্রতিরোধ কর্মসূচীতে নিবেশ করা উচিৎ?
 
সক্রিয় আত্মহত্যা প্রতিরোধ কর্মসূচির মাধ্যমে একটি সংস্থা কর্মীদের মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন নিতে পারে এবং কার্যক্ষমতা বাড়িয়ে তুলতে পারে
 
আমাদের দৈনন্দিন জীবনে যে পরিমাণে চাপ বেড়ে চলেছে তাতে কার্যক্ষেত্র আত্মহত্যা প্রতিরোধের জন্য একটি বিশেষ স্থান হয়ে দাঁড়িয়েছে। আত্মহত্যা প্রতিরোধে কার্যক্ষেত্রের ভুমিকার বিষয়ে ৪-টি প্রবন্ধের ধারাবাহিকে এই প্রবন্ধটি প্রথম, এবং এতে শ্রীরঞ্জিতা জেউরকার জানার চেষ্টা করেছেন কিভাবে একটি সংস্থা আত্মহত্যা প্রতিরোধ করতে পারে আর আত্মহত্যা করার মতো প্রবণতা রয়েছে এমন কর্মচারীদের সাহায্য করতে পারে।
যখন আমরা শুনি যে কেউ আত্মহত্যা করেছে, আমরা ধরে নিই যে নিশ্চয়ই তার কারন এর মধ্যে কোনও একটাই – ব্যর্থ সম্পর্ক, আর্থিক সমস্যা, বা কর্মক্ষেত্রে পদন্নোতি না হওয়া। কিন্তু সত্যটা ভিন্ন। আত্মহত্যা একটি জটিল প্রক্রিয়া যার অনেকগুলো কারন থাকে। একজন ব্যক্তি যখন অনেকগুলো কারনে নিজেকে অবরুদ্ধ মনে করতে শুরু করে – যেমন কাজের চাপ, চাকরির বিষয়ে অসন্তোষ, সম্পর্কে বা পারিবারিক সমস্যা, নিজের ইমেজ নিয়ে সমস্যা, আর্থিক সঙ্কট, উদ্বেগ, অবসাদ, বা অন্য মানসিক রোগ। এই সব বিবিধ কারনের সমবেত চাপের জন্য ব্যক্তি আত্মহত্যা করার কথা চিন্তা করতে পারেন।
 
আত্মহত্যা সাধারণত গোপন সমস্যা হয়েই থেকে যায়, কারন কর্মচারীরা এই বিষয়ে কথা বলতে চায় না। এমন অনেক ভয় থাকে যা মানুষকে সাহায্য চাইতে দেয় না। “যদি আমার বস জানতে পারে?”, “আমার কি এর জন্য প্রমোশন আর বোনাস আটকে যেতে পারে?”, “এই বিষয়ে জানতে পারলে আমার সংস্থার মালিক আর সহকর্মীরা আমার সাথে কি ধরনের ব্যবহার করবে?”, “আমার কি চাকরি চলে যাবে?”
 
কর্মক্ষেত্রে আত্মহত্যা প্রতিরোধ
আত্মহত্যা প্রতিরোধ কেন আপনার কর্মচারী সহযোগিতা কর্মসূচির অংশ হওয়া উচিৎ
আপনি আপনার সহকর্মীর জীবন বাঁচাতে পারেন
কর্মচারীর আত্মহত্যার মুখোমুখি
 
এইসব ভয়ের কারনে একজন কর্মচারী আত্মহত্যার বিষয়ে নিজের ভাবনাচিন্তা গোপন করে রাখতে পারে। সাহায্যের ধরনের বিষয়ে ধারণা না থাকার কারনে ব্যক্তির বিশ্বাস কমে যায়, এবং সাহায্য চাইবার জন্য এগিয়ে না আসতে পারে। অনেক সংস্থায় কর্মচারী যারা মানসিক রোগে আক্রান্ত তাদের ছুটিতে চলে যেতে বলা হয় (কখনো কখনো বিনা বেতনে) এবং এমন হাসপাতালে পাঠানো হয় যেখানে হয়ত তারা উপযুক্ত সহযোগিতা পেতে পারেন, বা নাও পেতে পারেন।
 
কিন্তু আমাদের সংস্থায় তো কোনও সমস্যা নেই!
 
বেশীরভাগ সংস্থা আত্মহত্যা প্রতিরোধের জন্য আলাদা করে কোনও সংগঠিত ব্যবস্থা নিয়ে চান না, কারন তাদের ধারণা যে এটা তো মাত্র একটি বিক্ষিপ্ত ঘটনা।
 
অনেক ধরনের ভুল ধারণা থাকে – “মাত্র একজন ব্যক্তি আত্মহত্যা করেছে,” বা “সে নিশ্চয়ই কাজের চাপে আত্মহত্যা করেনি,” বা “আমি জানি আমার কর্মচারীরা এটা সামলাতে পারবে।”
 
কেবল একটিমাত্র আত্মহত্যার ঘটনা যখন ঘটে যায়, তখন শুধু যিনি আত্মহত্যা করলেন তার ক্ষতি হয়না। এই ঘটনার দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব অন্য কর্মচারী এবং সংস্থার ওপর পরতে পারে। সহকর্মী এবং অন্য কর্মচারীদের মনে হতে পারে যে কাজের চাপের জন্য উনি আত্মহত্যা করেছেন, এবং ধরে নিতে পারেন যে ভবিষ্যতে এমন ঘটনা তাদের সাথেও ঘটতে পারে। এই ফলে কতৃপক্ষের প্রতি তাদের মনে অবিশ্বাস জন্মাতে পারে।
 
আত্মহত্যার একটি ঘটনা সাধারণত হিমশৈলের চূড়া মাত্রএমন অনেক কর্মচারী থাকতে পারে যারা হয়ত কাজের চাপে বা অন্য কারনে আত্মহত্যার কথা চিন্তা করছেন। এই দুর্বল মানসিক পরিস্থিতিতে থাকা কর্মচারীদের মনে হতে পারে যে আত্মহত্যা নিজেদের সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়ার সব থেকে সহজ উপায়।
কর্মচারীদের মনে সংস্থার প্রতি নেতিবাচক ধারণা জন্মাতে পারে এবং তারা চাকরি ছেড়ে দিতে পারেন। এর ফলে লোকবলের অভাব ঘটতে পারে, এবং উৎপাদন, আয় এবং ব্যবসায়ে সুনাম কমে যেতে পারে।
হিমশৈলের চূড়া
একটি পরিবেশে যতগুলো আত্মহত্যা ঘটেছে – যদি সেটা বহু বছরে একটি ঘটনাও হয় – হিমশৈলের চূড়ার মতো, যার শুধু জলের উপরের ভাগটা দেখা যায়। বিশেষজ্ঞরা বর্ণালীর উপমা ব্যবহার করেন আত্মহত্যা কিভাবে ঘটে তা বোঝানোর জন্য। নিমহ্যান্সের মহামারী বিভাগের প্রোফেসর আর প্রধান, ডঃ গুরুরাজ গোপালকৃষ্ণা জানালেন, “আত্মহত্যা সবসময় একটি স্পেকট্রাম (বর্ণালী), আর আমরা যা দেখি, আত্মহত্যা বা তার চেষ্টা, সেটা হল তার পরিণতি। প্রত্যেক একজন ব্যক্তি যিনি আত্মহত্যা করেছেন, তার আড়ালে আরও এমন ১০ থেকে ২০ জন ব্যক্তি থাকেন যারা আত্মহত্যা করার চেষ্টা করেছেন, কয়েকশো জন আত্মহত্যার কথা ভাবছেন, এবং আরও অনেকের সম্ভাব্য ঝুঁকি রয়েছে।”
 
একজন কর্মচারীর সবে পদন্নোতি হয়েছে, অথচ তিনি ওই কাজের জন্য প্রশিক্ষিত নয়, এবং উচিৎ ফল দিতে পারেছেন না। তিনি সাংঘাতিক মানসিক চাপ অনুভব করেছেন, মদ আর সিগারেট খেয়ে স্বস্তি পেতে চাইছেন, আর নিজের বেশীরভাগ টাকা মদ আর সিগারেটের পেছনে ব্যয় করেছেন। এতে তার জুয়া খেলার অভ্যেস হয়ে গিয়েছে – এবং উনি ধারদেনার চোরাবালিতে তলিয়ে যাচ্ছেন। নিজের পরিবারের দেখাশুনা করতে পারছেন না। পরিবার অসুখী হয়ে পড়েছে; বউয়ের সাথে নিয়মিত ঝগড়া হচ্ছেউনি একা হয়ে পড়েছেন, আরও বেশী মদ খেতে শুরু করেছেন আর অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন। সব কাজে উৎসাহ হারিয়ে ফেলেছেন এবং ভাবতে শুরু যে এইভাবে বেঁচে থাকার কি মানে। এই ভাবনা ওনার মনে বারবার আসতে শুরু করে আর ক্রমশ গভীর হয়ে ওঠে। এই ভাবনার পর্যায়ে পৌঁছে উনি আত্মহত্যা করার কথা শুধু চিন্তা করেন না, বরং আত্মহত্যা করার পরিকল্পনা করতে শুরু করেন।
(এই কাল্পনিক বিবরণ বাস্তবিক পরিস্থিতি বোঝানোর জন্য বর্ণনা করা হয়েছে।)
 
আত্মহত্যা সামাজিক, সাংস্কৃতিক, জৈবিক, কর্ম-সম্বন্ধি আর ব্যবস্থাপনা-সম্বন্ধি কারনে ঘটিত হয়। এই প্রত্যেক কারন একে অপরকে প্রভাবিত করে এবং এদের যৌগিক ফল প্রকাশ পায়। এই কারণগুলি সময়ের সাথে সাথে বাড়তে পারে এবং মানসিক যন্ত্রণার কারন হতে পারে, যার হাত থেকে নিস্তার পাওয়ার জন্য ব্যক্তি আত্মহত্যার পথ বেছে নেওয়ার কথা ভাবেন।
 
আত্মহত্যা প্রতিরোধ কর্মসূচী কেন জরুরী?
 
মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক এবং আত্মহত্যা প্রতিরোধক কর্মসূচি নিচে লেখা কারণগুলির জন্য জরুরিঃ
  • এতে কর্মচারীদের স্বাস্থ্য উন্নত হয় এবং তারা ভালো থাকে
  • মানসিক রোগ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে এমন ব্যক্তিদের চিণ্হিত করা যায় (এবং তাদের যথাযত সাহায্য করা যায়)
  • সংকটপূর্ণ পরিস্থিতিতে রয়েছেন এমন ব্যক্তিদের চিণ্হিত করা যায় (যারা হয়ত আত্মহত্যা করার চেষ্টা করেছেন, বা এই বিষয়ে ভাবছেন), তাদের সময়মত সাহায্য করা যায়, আর পরবর্তী পরিষেবা প্রদান করা যায়।
  • মানসিক রোগ বা আত্মহত্যার কথা ভাবছেন এমন ব্যক্তিদের জীবনের গুনমান বৃদ্ধি করা যায়, এবং আবার ভালো ভাবে কাজ করার জন্য সাহায্য করা যায়।
সংস্থার কর্ণধারদের দৃষ্টি দিয়ে বিচার করলে, সক্রিয় আত্মহত্যা প্রতিরোধ কর্মসূচী নিশ্চিত করে যে কর্মীরা যেন মানসিক ভাবে সুস্থ থাকে। যদি কোনও কর্মী আত্মহত্যা করার কথা ভেবে থাকেন, তাহলে তাকে সাহায্য করা যেতে পারে, যাতে তিনি সঠিক ভাবে কাজ করতে পারেন এবং তার কার্যক্ষমতা উন্নত হয়। এমন একটি কর্মসূচি প্রসারিত করলে কর্মীদের মনে হবে যে তাদের যত্ন নেওয়া হচ্ছে, এবং এতে তাদের স্বস্তিবোধ বৃদ্ধি পাবে। সামগ্রিকভাবে, সংস্থাটির লাভ হবে যখন তাতে মানসিক ভাবে সুস্থ এবং উৎপাদনশীল কর্মীবৃন্দ কাজ করবে।
 
কর্মচারীদের জন্য, মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক এবং আত্মহত্যা প্রতিরোধক কর্মসূচি তাদের আশ্বস্ত করে যে সংস্থা তাদের স্বাস্থ্য আর কল্যাণের বিষয়ে উৎসাহিত; এবং এতে তাদের কতৃপক্ষের প্রতি আস্থা বাড়ে। কর্মচারী এই সুযোগের ফলে নিজেদের সমস্যাপূর্ণ পরিস্থিতির বিষয়ে নির্দিষ্ট বিশেষজ্ঞ দলের সাথে আলোচনা করতে পারে – তারা নিজেদের জন্য সাহায্য চাইতে পারে, বা সহকর্মী বা পরিবারের হয়ে সাহায্য চাইতে পারে। এই মুক্তপথ হল আত্মহত্যা প্রতিরোধের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভাগ। একজন ব্যক্তি যদি সরাসরি সাহায্য চাইতে পারে, এবং পেশাদারদের সহযোগিতার মাধ্যমে নিজের সমস্যার সাথে মোকাবিলা করতে পারে তাহলে আত্মহত্যার পরিকল্পনার পর্যায় থেকে সে বেরিয়ে আসতে পারে।
আত্মহত্যা প্রতিরোধ কর্মসূচি দীর্ঘমেয়াদী যত্ন আর সহযোগিতার প্রতীক, এবং এর ফলে কর্মচারীরা সংস্থার উন্নতির জন্য সর্বোচ্চ অবদান করতে সক্ষম হয়।
 
সংক্ষেপে বললে, কার্যকারী মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক এবং আত্মহত্যা প্রতিরোধক কর্মসূচি কতৃপক্ষ এবং কর্মচারী দুজনের জন্যই সমান ভাবে উপকারী।
 
প্রতিরোধক কর্মসূচী গড়ে তোলা
 
“যখন আমরা আত্মহত্যার শুধু একটি ঘটনার কথা বলি, তখন আমরা পুরো সমস্যাটাকে দেখি না। এমন যেকোনো ঘটনাকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করতে হবে। কিছু সংস্থা একজন কর্মী আত্মহত্যা করলে ক্ষতি নিয়ন্ত্রিত করার চেষ্টা করে প্রতিক্রিয়াশীল ভাবে কাজ করে। আদর্শমতে, সংস্থার সক্রিয় ভূমিকা নেওয়া উচিৎ যাতে কোনও সঙ্কট যেন নিরাশার পর্যায় অবধি না পৌঁছায়,” বললেন ডঃ গুরুরাজ গোপালকৃষ্ণা।
 
কর্মীদের মধ্যে আত্মহত্যা প্রতিরোধ করার জন্য একটি সংস্থা দুটো পথ অনুসরণ করতে পারে –
  • সার্বিক মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক কর্মসূচির মাধ্যমে যা সাধারণ মানসিক সমস্যা যেমন অবসাদ, উদ্বেগ আর নেশার বিষয়ে আলোচনা করে।
  • আত্মহত্যা প্রতিরোধ কর্মসূচি প্রকল্প যা মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক প্রকল্পের থেকে স্বাধীন বা তার অন্তর্গত হতে পারে।
এটাকে স্বীকৃতি দেওয়া দরকার যে আত্মহত্যা প্রতিরোধ আর মানসিক সুস্থতা বৃহতর কর্মচারী কল্যাণ প্রকল্পের অংশ। একই সাথে এটাও মেনে নেওয়া খুবই জরুরী যে আত্মহত্যা একটি সমস্যা, এবং এর সংস্থার ওপর প্রভাব বিশ্লেষণ করে এর সাথে মোকাবিলা করার জন্য একটি সুগঠিত পরিকল্পনা তৈরি করা দরকার।
যেকোনো আত্মহত্যা প্রতিরোধ পরিকল্পনার জন্য প্রয়োজন এটা সুনিশ্চিত করা যে সংস্থার প্রত্যেক কর্মচারী যেন প্রয়োজন মতো সেই সেবাগুলো পান এবং যারা সাহায্য নিতে চাইছেন কতৃপক্ষের সহযোগিতা তাদের জন্য উপস্থিত রয়েছে। সমস্যাগুলোর সংবেদনশীলতা এবং জটিলতার দরুন, প্রকল্পটিকে ভেবেচিন্তে এবং গুছিয়ে তৈরি করতে হবে। কতৃপক্ষ এবং কর্মচারী, উভয়পক্ষকে একে অপরের প্রয়োজন বুঝতে হবে এবং দরকার মতো সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতে হবে।


 

নিমহ্যান্সের এপিডিমিওলজি বিভাগের প্রধান ডঃ গুরুরাজ গোপালকৃষ্ণা; সাইকিয়াট্রি বিভাগের প্রোফেসর ডঃ প্রভা চন্দ্রা; ক্লিনিক্যাল সাইকোলোজি বিভাগের এডিশনাল প্রোফেসার ডঃ সীমা মেহেরোত্রা; ক্লিনিক্যাল সাইকোলোজি বিভাগের এসোসিয়েট প্রোফেসার

ডঃ পূর্ণিমা ভোলা; এবং সাইকিয়াট্রি বিভাগের এসোসিয়েট প্রোফেসার ডঃ সেন্থিল কুমার রেড্ডির দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে হোয়াইট সোয়ান ফাউন্ডেশন এই ধারাবাহিক প্রতিবেদন সংযোজন করেছে


আরও পড়ুন