অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডার

অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডার (এএসডি) বলতে কী বোঝায়?

অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডার (এএসডি) বা অটিজম হল মানুষের বিকাশগত সমস্যার একটি সমবেত রূপ। স্নায়ুতন্ত্রের ত্রুটির কারণে এই সমস্যার জন্ম হয় এবং এর ফলে মানুষ সামাজিক, যোগাযোগগত ও আচরণগত প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হয়।

এএসডি বিকাশগত সমস্যার বহুল প্রচলিত রূপগুলির মধ্যে তৃতীয়। এই সমস্যায় সাধারণত সামাজিক আদান-প্রদান ও যোগাযোগের ক্ষেত্রে বাধার সৃষ্টি হয় এবং বারবার একইরকম আচরণ করতে দেখা যায় বা আগ্রহ অথবা ইচ্ছাপ্রকাশের ক্ষেত্রে  অনেক বিধিনিষেধ থাকে। এই সমস্যায় আক্রান্ত বাচ্চাদের অনুভূতি বা বোধ খুবই দুর্বল হয়। কিছু ক্ষেত্রে তারা অধিক সংবেদনশীল বা কোনও কোনও বিষয়ে তাদের অনুভূতি একেবারে নেই বললেই চলে (যেমন- জোরে শব্দ, নির্দিষ্ট ধরনের কাপড় প্রভৃতি)। 

অটিজম স্পেকট্রামের অধীনে বিভিন্ন সমস্যাগুলো কী কী?

অটিজম সমস্যার অন্তর্গত বিভিন্ন অব্যবস্থাগুলো হল-

অটিস্টিক ডিসঅর্ডার- যখন একটা বাচ্চা ছেলে বা মেয়ের মধ্যে এএসডি-র সব লক্ষ্মণ দেখা যায়।

অ্যাস্পারগারস্‌ সিনড্রোম- এক্ষেত্রে অটিজমের একটি উচ্চক্ষমতাপূর্ণ ধরন। সামাজিক বা অনুভূতিগত ত্রুটি ও নির্দিষ্ট কোনও বিষয়ের প্রতি বদ্ধমূল ধারণা গড়ে ওঠে। এক্ষেত্রে ভাষাগত বা বুদ্ধিগত বিকাশের দুর্বলতা চোখে পড়ে না। এ বিষয়ে বিশদে ব্যাখ্যার জন্য পড়ুন -

পারভাসিভ ডেভেলপমেন্টাল ডিসঅর্ডার- নট আদারওয়াইজ স্পেসিফায়েড (পিডিডি এনওএস)- পিডিডি এক বিশেষরকমের অটিজম সমস্যা। যখন শিশুদের ক্ষেত্রে এই সমস্যা ধরা পড়ে তখন অটিজমের কয়েকটি লক্ষণ প্রকাশ পেলেও সব লক্ষণগুলো কিন্তু অটিজমের মতো হয় না। যেমন- যদি বাচ্চার কথা বলতে দেরি হয় এবং কোনও একটা আচরণ বারবার করতে থাকে- তখন তার ক্ষেত্রে পিডিডি (এনওএস) সমস্যা নির্ধারণ করা হয়।

রেট সিনড্রোম- এটা খুবই বিরল এবং গুরুতর সমস্যা, যার সঙ্গে যুক্ত থাকে ক্রোমজোম এক্স-এর ত্রুটি। এই সমস্যা বেশিরভাগ মেয়েদের ক্ষেত্রেই দেখা যায়। রেট সিনড্রোমের ক্ষেত্রে বিকাশের পর্যায় স্বাভাবিক হলেও কিছু দক্ষতার বিকাশ আস্তে আস্তে কমে যায়। যেমন- প্রায়শই যোগাযোগগত এবং হাতের চলাচলের দক্ষতা হারিয়ে যায়।

চাইল্ডহুড ডিসইন্টিগ্রেটিভ ডিসঅর্ডার- এটা অত্যন্ত বিরল সমস্যা, যেখানে প্রাথমিকভাবে সব ক্ষেত্রেই বিকাশ স্বাভাবিক থাকলেও স্পেকট্রামের অন্যান্য সমস্যার থেকে দক্ষতার সমস্যা অনেক দেরিতে ঘটা শুরু হয়। এক্ষেত্রে শিশুদের বিকাশজনিত দক্ষতা (ভাষা, সামাজিক, আচরণ এবং চলাচল) কমে যায়।

উপরে আলোচিত সব সমস্যাগুলিই আলাদা করে চিহ্নিত করা গেলেও, এখন এই সমস্ত সমস্যাকেই একত্রে অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডার হিসেবে বিবেচনা
করা হয়।

 

এএসডি-র লক্ষণগুলো কী কী?

যে কোনও বাচ্চাই যখন অটিজমের সমস্যায় আক্রান্ত হয় তখন তাদের মূলত তিনটি ক্ষেত্রে দুর্বলতা দেখা দিতে পারে-

  • সামাজিক আদান-প্রদানের দুর্বলতা (সম্পর্ক গড়ার ক্ষেত্রে সমস্যা প্রভৃতি)
  • সামাজিক যোগাযোগ স্থাপনের সমস্যা (মৌখিক এবং অঙ্গ-সঞ্চালনগত যোগাযোগ, যেমন- হাঁটাচলা, আকার-ইঙ্গিত প্রভৃতি)
  • সামাজিক কল্পনাগত সমস্যা (চিন্তার নমনীয়তার অভাব, সংগঠিত হওয়ার দুর্বলতা ইত্যাদি)

এছাড়া যান্ত্রিক দক্ষতাগত বিকাশের সমস্যা এবং কতগুলি অস্বাভাবিক আচরণ বারবার করার প্রবণতা, যেমন- হাত ঝাপটানো, সামনে-পিছনে বা এপাশে-ওপাশে শরীর দোলানো প্রভৃতি)।

শিশুরা এএসডি-র ধারক বা বাহক কিনা তা কীভাবে পরীক্ষা করা হয়?

শিশুদের মধ্যে বিকাশ দেরি করে হওয়ার লক্ষণগুলোর উপস্থিতি রয়েছে কিনা তা দেখার জন্য পরীক্ষা-নিরীক্ষাই একমাত্র উপায়। একজন পেশাদার এম-চ্যাট-আর/এফ-এর মতো পরীক্ষার সাহায্যে শিশুদের মধ্যে এএসডি-র ঝুঁকি রয়েছে কিনা তা বুঝতে পারেন। পরীক্ষার পরে সাধারণত সমস্যার মূল্যায়ন ও তা খতিয়ে দেখার পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয়। যত তাড়াতাড়ি এই পদ্ধতির মাধ্যমে সঠিক সমস্যাকে চিহ্নিত করা যাবে, তত তাড়াতাড়ি যথাযথ চিকিৎসার ব্যবস্থা করে বাচ্চাদের অটিজমের মতো দীর্ঘমেয়াদি সমস্যার প্রকোপ কমানো সম্ভব হবে।

এক্ষেত্রে আপনি নিজেও বয়স আনুপাতিক তালিকা (সৌজন্য: Com DEALL) নামক এক আত্ম-পরীক্ষার সাহায্যে আপনার বাচ্চার অটিজমের সমস্যা রয়েছে কিনা সে বিষয়ে নিশ্চিত হতে পারেন। সেক্ষেত্রে যদি দেখেন যে বয়স অনুপাতে বাচ্চার বিকাশের হার ঠিকঠাক হচ্ছে না তাহলে একজন শিশু চিকিৎসক বা শিশু মনোরোগ বিশেষজ্ঞ অথবা ক্লিনিকাল সাইকোলজিস্টের সঙ্গে আলোচনা করতে পারেন। তবে মনে রাখতে হবে যে, এই তালিকার সাহায্যে আত্ম-পরীক্ষা কখনোই একজন পেশাদারের তত্ত্বাবধানে রোগ নির্ধারণের বিকল্প হিসেবে বিবেচিত হতে পারে না।

কীভাবে এএসডি চিহ্নিত করা হয়?

এএসডি চিহ্নিত করার জন্য কোনও একটি নির্দিষ্ট চিকিৎসা সম্বন্ধনীয় বা জেনেটিক পরীক্ষা নেই। যদিও পেশাদাররা নিজেদের বিচারবুদ্ধি বা ধারণার প্রয়োগ ঘটিয়ে বিভিন্ন রোগ নির্ধারণকারী পরীক্ষা, যেমন- অটিজম ডায়াগনস্টিক অবজারভেশন সিডিউল (এডিওএস) বা অটিজম ডায়াগনস্টিক ইন্টারভিউ- রিভাইসড্‌ (এডিআই-আর) ব্যবহার করে অটিজমের সমস্যা নির্ধারণ করতে পারেন। বাচ্চাদের বিভিন্ন দক্ষতাজনিত বিকাশের হারের উপর নির্ভর করে (যেমন- যোগাযোগগত, সামাজিক,যান্ত্রিক এবং কগনিটিভ) অটিজমের সমস্যা নির্ধারণ করা হয়ে থাকে।

কিছু ক্ষেত্রে বাচ্চাদের মধ্যে অটিজমের লক্ষণ আগেভাগেই প্রকাশ পায়। আবার কয়েকটি ক্ষেত্রে দুই থেকে আড়াই বছর বয়সি বাচ্চার মধ্যে আপাত স্বাভাবিক বিকাশ হলেও পরে এএসডি-র লক্ষণ প্রকাশ পায় এবং নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে বাচ্চারা দক্ষতা অর্জনের ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। একে 'অটিস্টিক রিগ্রেশন' হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

অনেক এএসডি আক্রান্ত বাচ্চার মধ্যে অন্যান্য শারীরিক বা মনোরোগের সমস্যা দেখা যায়। যেমন- অটিজমের সঙ্গে এডিএইচডি, মানসিক উদ্বেগ, অবসাদ, অনুভূতিগত সংবেদনশীলতা, বৌদ্ধিক অক্ষমতা (আইডি), টওরেট সিনড্রোম এবং অন্যান্য রোগ নির্ধারণের সাহায্যে আরও বিভিন্ন সমস্যা দেখা যায়।  

এএসডি আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে কী কী অনন্য বৈশিষ্ট্য দেখা যায়?

অটিজমের সমস্যায় আক্রান্ত বাচ্চারা পারিপার্শ্বিক জগতের সঙ্গে নিজেদের খাপ খাওয়াতে এবং আদান-প্রদান করতে পারে না। যদিও তাদের মধ্যে এমন কিছু অনন্য গুণ থাকে যার সাহায্যে তারা ভবিষ্যৎ জীবনে এগিয়ে যায়। কিছু ক্ষেত্রে অটিজম আক্রান্ত শিশুরা গড়পরতা বা তার বেশি পরিমাণ দক্ষতাবিশিষ্ট হয়-

  • কয়েকটি বিশেষ ক্ষেত্রে বিশেষ জ্ঞানের অধিকারী
  • খুব সতেজ স্মৃতিশক্তি
  • খুব পদ্ধতি মেনে চলে এবং গোছানো
  • বিমূর্ত বিষয় বোঝার ক্ষমতা
  • যুক্তিবাদি হয়ে সমস্যার সমাধান

এএসডি-র কারণ কী?

বিশেষজ্ঞরা অটিজম সমস্যার সঠিক কারণ জানার জন্য প্রতিনিয়ত সন্ধান করছেন। কিন্তু গবেষণা করে এখনও পর্যন্ত যা জানা গিয়েছে তা হল অটিজমের পিছনে থাকে জেনেটিক, বায়োলজিকাল এবং পরিবেশগত উপাদানের সংম্রিশণ।

এএসডি সমস্যার প্রতিকারের রাস্তা কী?

অটিজম স্পেকট্রামের সমস্যা প্রায় সারা জীবন ধরেই চলতে থাকে এবং একেবারে সেরেও যায় না। কিন্তু সঠিক থেরাপি বা চিকিৎসার সাহায্যে শিশুরা প্রয়োজনীয় দক্ষতাগুলো অর্জন করার চেষ্টা করতে পারে এবং এর মধ্য দিয়ে তাদের জীবনযাত্রার মানেরও উন্নতি ঘটা সম্ভব। একটা বাচ্চার যখন ১২-১৮ মাস বয়স তখন যদি অটিজমের সমস্যা ধরা পড়ে তাহলে তৎক্ষণাৎ চিকিৎসা শুরু করলে তার ফল ভালো হতেই পারে।

এই সমস্যার সবচাইতে কার্যকরী প্রতিকার করার জন্য চাই একপ্রকার মিশ্র, সংগঠিত চিকিৎসা পদ্ধতি। এর সঙ্গে একজন বিশেষজ্ঞের সাহায্য দরকার, যিনি বাচ্চার যোগাযোগগত, সামাজিক এবং আচরণগত ত্রুটিগুলির সমাধান করার চেষ্টা করতে পারেন। এএসডি-র ক্ষেত্রে উন্নত চিকিৎসা হওয়া উচিত সংগঠিত, সুসংহত এবং লাগাতার।

আচরণগত প্রক্রিয়া বা বিহেভায়রল অ্যাপ্রোচ

অ্যাপ্লায়েড বিহেভিয়র অ্যানালিসিস (এবিএ)- এই পদ্ধতি অটিজম আক্রান্ত বাচ্চাদের আচরণগত সমস্যা সমাধানের জন্য ব্যবহৃত হয়। এই প্রক্রিয়ায় তিনটি ধাপে আচরণের সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করা হয়- নির্দেশ, আচরণ ও ফলাফল। এই পদ্ধতির সাহায্যে বাচ্চাদের মধ্যে যথাযথ আচরণ এবং দক্ষতা শেখানোর প্রচেষ্টা চালানো হয়। আর সেই সঙ্গে বাচ্চাদের সমস্যা সমাধানের হার মাপা হয় ও তা নির্দিষ্ট অভিমুখে রয়েছে কিনা, তাও বিচার করা হয়। এই প্রক্রিয়ায় ব্যবহৃত কৌশলগুলো হল-

  • ডিসক্রিট ট্রায়াল ট্রেনিং (ডিটিটি) : এই পদ্ধতির সাহায্যে শিশুদের প্রাথমিক জটিলতা দূর করার চেষ্টা হয়। সঠিক আচরণ এবং উত্তর পাওয়ার জন্য ইতিবাচক প্রয়োগ ও আনুষঙ্গিক নানা ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এর সাহায্যে বাচ্চাদের মধ্যে কাঙ্ক্ষিত আচরণ বা দক্ষতা, যতক্ষণ না তারা তা শিখতে পারছে, সেটা শেখানোর প্রচেষ্টা করা হয়।
  • আর্লি ইনটেনসিভ বিহেভায়রল ইন্টারভেনশন (ইআইবিআই)- এই ধরনের এবিএ-র লক্ষ্য থাকে অটিস্টিক বাচ্চাদের বিশেষ ধরনের আচরণগত সমস্যার সমাধান করা। সাধারণত পাঁচ বছরের নীচে এবং তিন বছরের মধ্যে থাকা বাচ্চাদের ক্ষেত্রে এই পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়।
  • পিভোটাল রেসপন্স ট্রেনিং (পিআরটি)- এই পদ্ধতিতে বাচ্চাদের বিকাশের চারটি প্রধান অঞ্চলকে লক্ষ্য হিসেবে ধার্য করা হয়: মোটিভেশন বা উদ্দেশ্যগত দিক, আত্ম-পরিচালন ক্ষমতা, আত্ম-উদ্যোগ এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে সাড়া দেওয়ার ক্ষমতা। এই চিকিৎসায় শিশুদের প্রত্যক্ষভাবে অংশীদার হতে হয়। কারণ শিশুদের আগ্রহজনিত বিষয়গুলি শেখানোর ক্ষেত্রেই এই থেরাপি ব্যবহার করা হয়। আর এর সাহায্যেই বাচ্চারা নিজেদের লক্ষ্যে পৌঁছানোর চেষ্টা করতে পারে।

মিলিত প্রতিকার ব্যবস্থা (কম্বাইনড্‌ ইন্টারভেনশন)

ট্রিটমেন্ট অ্যান্ড এডুকেশন অফ অটিস্টিক অ্যান্ড রিলেটেড কমিউনিকেশন হ্যান্ডিক্যাপড্‌ চিলড্রেন মেথড (টিইএসিসিএইচ): গঠনগত শিক্ষাদানের উপর ভিত্তি করে এই ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। যে সব বাচ্চাদের ক্ষেত্রে অটিজমের সমস্যা প্রবল তাদের নানা দক্ষতা শেখানোর কৌশল হিসেবে এই পদ্ধতি গড়ে উঠেছে। এই প্রক্রিয়ার লক্ষ্য হল অটিজম আক্রান্ত বাচ্চাদের যতটা সম্ভব নিজের কাজ নিজে করার জন্য সাহায্য করা।

ডেভেলপমেন্টাল অ্যাপ্রোচ বা বিকাশের প্রক্রিয়া

ডেভেলপমেন্টাল, ইন্ডিভিজুয়াল ডিফারেনসেস্‌, রিলেশনশিপ-বেসড্‌ অ্যাপ্রোচ (ডিআইআর- একে ''ফ্লোরটাইম''-ও বলা হয়): এর লক্ষ্য হল আবেগজনিত এবং সম্পর্কের বিকাশ (অনুভূতি বা বোধ, পরিচর্যাকারীদের সঙ্গে সম্পর্ক)। এছাড়াও বাচ্চাদের দেখা, শোনা ও গন্ধ শোঁকার কৌশলের ক্ষেত্রেও এই পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়ে থাকে।

স্ট্যান্ডার্ড অ্যাপ্রোচ

  • অকুপেশনাল থেরাপি: এই থেরাপির সাহায্যে একজন অটিস্টিক বাচ্চাকে বিভিন্নরকম কৌশল শেখানো হয়, যার সাহায্যে সে ঠিকঠাকভাবে দৈনন্দিন জীবনযাপন করতে পারে। এই প্রক্রিয়া কতগুলি নির্দিষ্ট ক্ষেত্রকে শক্তিশালী করতে সাহায্য করে, যেমন- গ্রস মোটর দক্ষতা এবং ফাইন মোটর দক্ষতা।
  • স্পিচ থেরাপি: এই থেরাপি বাচ্চাদের যোগাযোগের ক্ষমতা উন্নত করতে সাহায্য করে। বাচ্চারা বিকল্প যোগাযোগ পদ্ধতি যেমন- আকার-ইঙ্গিত, ছবির বোর্ড প্রভৃতি ব্যবহার করতে শেখে। এই প্রক্রিয়ায় সাহায্যে নিজের চিন্তাভাবনা এবং ধ্যানধারণা অন্যের কাছে প্রকাশ করার কৌশল শেখে একটি বাচ্চা। ইন্টারডিসিপ্লিনারি ইন্টারভেনশন ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হল স্পিচ থেরাপি। কারণ অটিজমের সমস্যায় আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগের দুর্বলতা খুবই প্রকট হয়।
  • সেনসরি ইন্টিগ্রেশন থেরাপি: বাচ্চাদের দেখা, শোনা বা গন্ধ শোঁকার মতো অনুভূতির ক্ষেত্রে এই থেরাপি সাহায্য করে। বাচ্চারা যে বস্তুর শব্দ বা স্পর্শ এড়িয়ে চলতে চায় সেই বস্তুকে চেনার ক্ষেত্রে সাহায্য করে এই থেরাপি। যখন বাচ্চাদের নিজেদের বোধ বা অনুভূতির উপর নিয়ন্ত্রণ গড়ে ওঠে তখন তাদের নিজস্ব হাঁটাচলা, শব্দ শোনা বা আবেগ তাড়নার উপরও নিয়ন্ত্রণ শক্তিশালী হয়। এর ফলে বাচ্চাদের মধ্যে অস্বাভাবিকতা কমে ও সামাজিক দক্ষতা বেড়ে যায়।

অন্যান্য প্রক্রিয়া বা আদার অ্যাপ্রোচ

  • মিউজিক থেরাপি: যে সব শিশুরা অটিজমের শিকার হয়, তাদের ক্ষেত্রে মিউজিক থেরাপির মাধ্যমে সুরের কতগুলো বিশেষ কার্যকলাপ তাদের সামাজিক ও যোগাযোগের দক্ষতার উন্নতিতে সাহায্য করে।
  • পিকচার এক্সচেঞ্জ কমিউনিকেশন সিস্টেম (পিইসিএস): এই প্রক্রিয়া সেই সব অটিজম আক্রান্ত বাচ্চাদের উপর প্রয়োগ করা হয় যাদের যোগাযোগের ক্ষমতা খুবই কম বা একেবারেই নেই। এক্ষেত্রে ছবি বা প্রতিলিপি যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
  • বিশেষ দ্রষ্টব্য: গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে তাড়াতাড়ি রোগ নির্ণয় করে যথাযথ চিকিৎসার ব্যবস্থা করলে তা শিশুদের বিকাশে অত্যন্ত সহায়ক হয়। এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল যদি কোনও অভিভাবক দেখে যে তার বাচ্চার মধ্যে অটিজম বা যে কোনওরকম বিকাশজনিত সমস্যা দেখা দিচ্ছে তাহলে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব একজন শিশু চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করা জরুরি। এছাড়াও রয়েছে অনেক সাহায্যকারী প্রতিষ্ঠান, যেখানে বিপর্যস্ত অভিভাবক বা পরিচর্যাকারীদের সহায়তা ও কাউন্সেলিং-এর ব্যবস্থা থাকে। এই পরিস্থিতিতে অভিভাবকদের পক্ষ থেকে একজন থেরাপিস্টের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে বাচ্চার জন্য প্রয়োজনীয় যথাযোগ্য থেরাপির সাহায্য নেওয়া একান্ত জরুরি।

অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডারে আক্রান্তের প্রতি যত্নশীলতা

বাবা-মা বা অভিভাবকরা যখন জানতে পারেন যে তাঁদের বাচ্চা অটিজমের শিকার তখন তাঁরা ভীষণ মানসিক চাপগ্রস্ত এবং দিশাহারা হয়ে পড়েন। অনেক  অভিভাবক, বিশেষ করে মায়েরা বাচ্চাদের সবসময়ে পরিচর্যা করার জন্য চাকরি বা নিজস্ব কাজকর্ম ছেড় দেন। এই পরিস্থিতিতে একটা সংসারে বিভিন্ন সমঝোতা করে মানুষকে চলতে হয়। যেমন- ভাই বা বোনের যদি অটিজমের সমস্যা থাকে তাহলে ওই একই বাড়ির অন্যান্য ভাই-বোনদের তার সঙ্গে মানিয়ে চলার কৌশল রপ্ত করতে হয়। পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের মধ্যে সহযোগিতার মনোভাব গড়ে তুলতে হয়। অটিজমের সমস্যায় ভোগা একজন বাচ্চার মনের ইচ্ছা, আগ্রহ অনুসারে বাড়ির লোকদের নিজেদের কাজকর্ম বা পরিকল্পনা স্থির করতে হয়। অনেকসময়ে অটিজমের সমস্যা একটা পরিবারের কাছে অনন্য প্রতিবন্ধকতা ও তার বিরুদ্ধে লড়াই করার ক্ষেত্র হয়ে দাঁড়ায়। অভিভাবক বা পরিচর্যাকারীরা যদি অটিজম সংক্রান্ত বিষয়ে সঠিক জ্ঞান অর্জন করতে পারেন তাহলে তা একটি শিশুর রোগ-মোকাবিলার ক্ষেত্রে অপরিহার্য উপাদান হয়ে উঠতে পারে।

এই পরিস্থিতিতে অভিভাবক বা পরিচর্যাকারীদের করণীয় বিষয়গুলো হল-

  • অটিজমের বিষয়ে যতটা সম্ভব জ্ঞান অর্জন করা। এক্ষেত্রে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ব্যবস্থায় অংশ নেওয়া খুবই ফলদায়ক হয়। এবং এখান থেকেই নানারকম প্রতিকারের মাধ্যম সম্পর্কে জানা যায়।
  • দৈনন্দিন কাজকর্মের জন্য পরিকল্পনা এবং নিয়মিত রুটিন মেনে চলা একান্ত জরুরি।
  • একজন বিশেষজ্ঞের সাহায্যের দরকার। এছাড়াও কাউন্সেলিং-এর সাহায্য নেওয়া যেতে পারে।
  • অটিজমে আক্রান্ত বাচ্চাদের অভিভাবকদের পাশে অন্যান্য সুস্থ বাচ্চাদের অভিভাবকদের থাকা উচিত। তাদের সাহায্য করার জন্য যৌথ সহায়তা প্রদানকারী দল গড়ে তোলা এক্ষেত্রে খুবই উপযোগী।
  • অভিভাবকদের নিজেদের দৈহিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি যত্ন নেওয়া অবশ্যই প্রয়োজন ।

 

এই প্রবন্ধটি লিখতে সাহায্য করেছেন ব্যাঙ্গালোরের কম ডিঅল ট্রাস্টের এফিলিয়েশন্স কো-অর্ডিনেটর দীপা ভাট নায়ার


অনুসন্ধান করুন

সম্পর্কিত