ইটিং ডিস্‌অর্ডার বা খাদ্যাভ্যাস বিকার

খাদ্যাভ্যাস বিকার কী?

উড়ু উড়ু মনে অফিস থেকে বাড়ি ফিরছেন, আর থেকে থেকে নৈশভোজের কথা ভেবে যাচ্ছেন। কি খাব? কিছু বানিয়ে নেব না অর্ডার দেব? আমার কি চাইনিজ খাওয়াটা ঠিক হবে?

খাদ্য আমাদের জীবনের খুব গুরুত্বপুর্ণ অংশ। নানা লোকের নানা খাদ্যাভ্যাস ও স্বাদের রুচি। সময়ে অসময়ে আমরা আমাদের খাদ্যাভ্যাস পালটাই; ডায়েট করি বা হ্যাংলামিও করি! এই সমস্তই কিন্তু স্বাভাবিক।

কিন্তু কিছু লোকের ক্ষেত্রে এই খাদ্য সংক্রান্ত চিন্তা আরও এক ধাপ এগিয়ে যায়; তাঁরা খাবার, ওজন ইত্যাদি নিয়ে সর্বদা চিন্তায় ভোগেন। এর ফলে তাঁরা নিজেদের খাদ্যাভ্যাসে ব্যপক পরিবর্তন আনেন; দিনের পর দিন অত্যাধিক কম বা বেশী পরিমানে খাবার খেতে থাকেন। কোনও কোনও সময় এঁরা খাওয়া একেবারেই বন্ধ করে দেন (ধার্মিক বা সামাজিক আচার অনুষ্ঠান বাদে)। ইটিং ডিস্‌অর্ডার বা খাদ্যাভ্যাস বিকার একটি সাংঘাতিক মানসিক ব্যাধি যা আপনার সাস্থের সমূহ ক্ষতি ডেকে আনতে পারে। এই রোগের চিকিৎসা খুব সহজেই সম্ভব। যত শীঘ্র আপনি চিকিৎসকের শরণাপন্ন হবেন ততই আপনার সেরে উঠতে কম সময় লাগবে। 

খাদ্যাভ্যাস বিকারের উপসর্গগুলি কী?

খাদ্যাভ্যাস বিকারের সাধারণ উপসর্গগুলি হলঃ

  • আচরণগত লক্ষনঃ
    • অকারণে নিয়মিত উপোস এবং সবসময় ক্যালরির হিসাব রাখা।
    • তাঁরা ছুতো করে অন্যদের সাথে খাওয়া এড়িয়ে যান। খিদে পেলে লুকিয়ে লুকিয়ে খান।
    • ঘন ঘন শৌচাগারে গিয়ে মলত্যাগের চেষ্টা। সাধারণত খাবার সাথে সাথেই বা একটু পরেই তাঁরা সেটাকে বের করে দিতে চান।
    • রোজ একাধিক বার নিজের ওজন মাপা, আয়নায় নিজেকে দেখা।
    • অতিরিক্ত ব্যায়াম যেমন, অসুস্থ শরীর বা বৃষ্টি বাদলার দিনেও ওজন ঝরাতে বাইরে দৌড়ানো।
  • শারীরিক লক্ষনঃ
    • সাংঘাতিক কম ওজন বা ঘন ঘন ওজনে তারতম্য।
    • সবসময় ক্লান্তি এবং সঠিক ঘুম না হওয়া।
    • অতিরিক্ত শীতকাতুরে।
    • সবসময় মাথা ঘোরা বা অজ্ঞ্যান হয়ে যাওয়া।
    • অনিয়মিত ঋতুচক্র।
  • মানসিক লক্ষনঃ
    • সবসময় ওজন বেড়ে যাওয়ার ভয়।
    • খাবার নিয়ে দুশ্চিন্তা।
    • নিজের ওজন নিয়ে হীনমন্যতায় ভোগা।
    • ডিপ্রেশন এবং অ্যাংজাইটির শিকার হওয়া।

মনে রাখবেন নিজের খাওয়া দাওয়া নিয়ে খেয়াল রাখা এবং খাদ্যের পুষ্টিগুণ নিয়ে সচেতন থাকা সম্পুর্ন স্বাভাবিক। কড়া ডায়েটে থাকা মানেই খাদ্যাভ্যাস বিকার নয়। খাদ্যাভ্যাস বিকারে সাধারণত নিজের শরীরের ওজন এবং খাদ্যের এক অযৌক্তিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে।  উদাহরণস্বরূপ খাবার না খাওয়াটাই উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়ায়, না খাবার কারণটা না। অথবা ব্যাক্তি দৃশ্যত রোগা হওয়া সত্ত্বেও নিজেকে মোটা মনে করেন।

খাদ্যাভ্যাস বিকার কেন হয়?

খাদ্যাভ্যাস বিকার অনেক কারণে হতে পারে, যেমনঃ

  • মানসিক কারণঃ অনেক সময় অ্যাংজাইটি, ডিপ্রেশন ও স্ট্রেসের কারণে বেশী খাওয়া বা ব্যায়াম করার প্রবণতা তৈরি হয়। কারণ এই রকম মানসিকতায় মনে হয় যে অন্তত এই জিনিসটা আমার নিয়ন্ত্রণে থাকছে।
  • সামাজিক কারণঃ সিনেমা, টিভিতে এবং সমাজে চারপাশে তাকালে একটা জিনিসই উঠে আসে, রোগা মানেই সুন্দর। সারাক্ষণ তা শুনতে শুনতে একসময় সেটাকেই সত্যি বলে মেনে নিতে হয়। এর থেকে তৈরি হওয়া গ্লানিবোধের কারণে আমরা না খেয়ে বাড়াবাড়ি ব্যায়াম শুরু করে ফেলি।
  • আচরণগত কারণঃ নিজেকে নিয়ে অতিমাত্রায় সচেতন এবং খুঁতখুঁতে হলে এই রোগ হবার সম্ভাবনা থেকে যায়।
  • ব্যাক্তিগত ঘটনাঃ ওজন নিয়ে ঠাট্টা তামাশা, বা যৌন হেনস্থার মত ঘটনার কারণে অনেকের খাদ্যাভ্যাস বিকার দেখা দেয়। তাছাড়া নিকটজনের মৃত্যু বা পরীক্ষায় ফেল করলেও এই রোগ হানা দিতে পারে। 

খাদ্যাভ্যাস বিকার কতরকমের হয়?

  • অ্যানোরেক্সিয়া নার্ভোসাঃ ওজন বেড়ে যাবার ভয় এঁরা খাওয়া একেবারেই বন্ধ করে দেন। নিজের ওজন বেশী (রোগা হওয়া সত্ত্বেও) মনে হবার কারণে তাঁরা সবসময় গ্লানিবোধে ভোগেন।
  • বুলিমিয়া নার্ভোসাঃ এই রোগে ব্যাক্তি প্রথমে অতিরিক্ত খান তারপরে জোর করে বমি এবং মলত্যাগ করেন। এরপর তাঁরা অনেকক্ষণ উপোস করে থাকেন এবং অতিরিক্ত ব্যায়াম করেন। এঁদের মনে হয় যে তাঁরা খাওয়া এবং ওজন খুব সহজেই নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন।  
  • অতিরিক্ত খাদ্যগ্রহণের সমস্যাঃ লাগামছাড়া ভাবে বেশি খাওয়ার প্রবণতা লক্ষ করা যায়। এঁরা কখনই ওজন কমানোর চেষ্টা করেন না লজ্জায়। খিদে না পেলেও দরকার হলে এঁরা লুকিয়ে লুকিয়ে খান।

ইডিএনওএস বা ইটিং ডিস্‌অর্ডার নট আদারওয়াইজ স্পেসিফায়েডঃ ওপরের উপসর্গগুলি অল্পস্বল্প এখানে দেখা গেলেও নির্দিষ্ট করে এঁদের অ্যানোরেক্সিয়া বা বুলিমিয়ার শিকার বলা 

খাদ্যাভ্যাস বিকারের চিকিৎসা

খাদ্যাভ্যাস বিকার একটি জটিল সমস্যা যা আমাদের শরীর ও সাস্থ দুইয়েরই ক্ষতি করে। যদিও সঠিক চিকিৎসার সাহায্যে সম্পুর্ন আরোগ্যলাভ সম্ভব। যত জলদি আপনি চিকিৎসকের সাহায্য নেবেন তত তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে উঠবেন।

চিকিৎসা চলাকালীন সাধারণত বিশেষজ্ঞের একটি দল মিলে রোগীর মানসিক এবং শারীরিক সাস্থ, উভয়েরই চিকিৎসা করেন। রোগীর সাস্থের ওপর নির্ভর করে যে তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হবে কি না। সবার আগে রোগীর সাস্থকে একটি স্থিতিশীল পর্যায় আনা হয় যাতে আরও খারাপ পরিণতিকে আটকানো যায়।

এরপরের কাজ হল রোগীকে স্বাভাবিক ওজনে নিয়ে আসা। পুষ্টিকর খাদ্যগ্রহণ ও সাস্থকর খাদ্যাভ্যাসের মাধ্যমেই তা করা হয়ে থাকে। সেই জন্য কাউন্সেলিং ও থেরাপির সাহায্যও নেওয়া হয়ে থাকে। 

খাদ্যাভ্যাস বিকারে আক্রান্ত ব্যাক্তির যত্ন নেওয়া

খাদ্যাভ্যাস বিকারে আক্রান্ত নিজের প্রিয়জনের যত্ন নেওয়া খুবই কঠিন কাজ; কিন্তু মনে রাখবেন আপনার যত্ন ও ভালবাসাই তাঁকে আরোগ্যের দিকে দ্রুত ঠেলে দিতে পারে। সাধারণত এই রোগে আক্রান্ত ব্যাক্তিরা সর্বদা লজ্জা ও গ্লানিতে ভোগেন। কেউ হয়ত মানতে চাইবেন না যে তিনি অসুস্থ। কিন্তু তাঁর চিকিৎসা হওয়াটা খুবই জরুরি। জোর করবেন না, তাঁর কথা মন দিয়ে শুনুন এবং বোঝান। সবসময় মনে রাখবেন যে খাদ্যাভ্যাস বিকার বা ইটিং ডিস্‌অর্ডার শুধু খাওয়া বা ওজন নিয়ে নয়, এর মূল কারণ তাঁদের অন্তরে লুকিয়ে থাকা চাপা কষ্ট। চিকিৎসা চলাকালীন তাঁর আশে পাশে সবার উচিৎ সাস্থসম্মত খাওয়া দাওয়া করা এবং খাবার বা ওজন নিয়ে কোন আলোচনা না করা। মনে রাখবেন ধৈর্য্যই শেষ কথা, রাতারাতি কোনও রোগের চিকিৎসা হয় না।  

খাদ্যাভ্যাস বিকারের সাথে মোকাবিলা

খাদ্যাভ্যাস বিকারের চিকিৎসা সময়সাপেক্ষ এবং ক্লান্তিকর, কাজেই সঠিক চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়াটা খুব জরুরি। আপনি হয়ত খাওয়া দাওয়া বাড়িয়ে বা কমিয়ে জীবনের সমস্যাগুলি কমিয়ে ফেলবেন ভাবছেন, কিন্ত যত জলদি সেই সমস্যাগুলির সরাসরি মুখোমুখি হবেন ততই ভাল। চেষ্টা করুন একা না থেকে কারও সাথে কথা বলে হাল্কা হবার। দেখবেন তাতে আপনার কাজ অনেকটা সহজ হয়ে যাবে। 


অনুসন্ধান করুন

সম্পর্কিত