শিশুদের অবসাদ

শিশুদের অবসাদ কি?

শিশুকালে রাগ, দুঃখ, অভিমান এইসব আবেগ বেড়ে ওঠা স্বাভাবিক ধাপ যা বয়েস বাড়ার সঙ্গে নিয়ন্ত্রণে ছলে আসে। কিছু কিছু শিশুর মধ্যে এই আবেগগুলো দীর্ঘস্থায়ী বা এতটাই তীব্র হয় যে এর নেতিবাচক প্রভাব তাঁদের মানসিক ও চারিত্রিক স্বাস্থ্যের ওপর পরে যা পরবর্তী জীবনে সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। শিশুদের অবসাদ যথেষ্ট চিন্তার কারণ। অবসাদের প্রভাব শিশুটির ভাবনা, চিন্তা, ব্যবহার এবং তাঁর জীবনের গুণমানের ওপর পড়ে। 

শিশুদের অবসাদের লক্ষণগুলো কি?

অবসাদকে সাধারণত প্রাপ্তবয়স্কদের সমস্যা ধরে নেয়ার ফলে অনেক সময়েই শিশু এবং কিশোরদের মধ্যে ডিপ্রেশন সঠিকভাবে চিহ্নিত করা হয়না। এর প্রধান কারণ অবশ্য প্রাপ্তবয়স্কদের আর শিশুদের মধ্যে অবসাদের উপসর্গগুলো আলাদা। ডিপ্রেশনকে সঠিক ভাবে চিহ্নিত করাটাই নিরাময়ের প্রথম ধাপ।

অবসাদে ভোগা একটি শিশুর মধ্যে নিম্নলিখিত লক্ষণগুলো দেখা যায়

  • পড়াশুনায় উৎসাহ হারিয়ে ফেলা বা স্কুলের পরীক্ষায় ক্রমশ খারাপ ফল করা
  • স্কুলে যেতে না চাওয়া
  • পড়াশুনায় বা অন্য কাজে মনঃসংযোগ হারিয়ে ফেলা বা অন্যমনস্ক হয়ে পড়া
  • সহজে ক্লান্ত হয়ে পড়া আর অলস ভাব
  • খিদে আর ঘুম কমে যাওয়া
  • চিন্তাশক্তি আর নির্ণয়-ক্ষমতা কমে যাওয়া
  • ছোট বা সাধারণ কারণে বিরক্ত হওয়া
  • অকারণ কান্নাকাটি করা
  • মাথা ব্যথা বা পেট ব্যথা যা চিকিৎসায় সারছে না
  • বন্ধুদের সাথে খেলতে না চাওয়া
  • আমোদনের কাজগুলোর প্রতি অনীহা

শিশুদের অবসাদের কারণ কি?

এখনকার প্রতিযোগিতামূলক দুনিয়ায় শিশুদের ওপর পড়াশুনা ও তাঁর বাইরের ক্রিয়াকলাপে সাফল্যের জন্য অহেতুক চাপ সৃষ্টি করা হয়। বাবা-মা এবং শিক্ষকরা প্রত্যেকটা শিশুর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যকে উপেক্ষা করেন এবং সব শিশুকেই কঠোর নিয়মাবলী আর সমান মাপ দণ্ড দিয়ে বিচার করেন। অনেক শিশুই এই ধরনের চাপ নিতে পারে না। যেহেতু তাঁরা দিনের বেশিরভাগ সময়ই স্কুলে বা বাড়িতে পড়াশুনা করে কাটায়, শিশুদের মধ্যে অবসাদের প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়ে চলেছে।

এ ছাড়াও বিভিন্ন ধরনের মানসিক এবং সামাজিক চাপ কোমল শিশুমনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। মানসিক বা আবেগপূর্ণ উত্তেজনা যে সব শিশুকে অতিমাত্রায় বিচলিত করে দেয়, তাঁদের মধ্যে ডিপ্রেশন হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।

নিম্নলিখিত কারণগুলির জন্য শিশু ও কিশোরদের অবসাদ হতে দেখা গিয়েছে

  • মদিরা-আসক্ত বাবা বা মা বা তাঁদের মধ্যে খারাপ বৈবাহিক সম্পর্ক থেকে উৎপন্ন সাংসারিক অশান্তি যা শিশুর মনে চাপ সৃষ্টি করে
  • শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন, হিংস্র ব্যবহার বা অবহেলা
  • এংযাইটি ডিস্‌অর্ডার এর মত মানসিক সমস্যা জার চিকিৎসা করানো হয়নি
  • পড়াশুনা ক্ষেত্রে সমস্যা যা শিশুর আত্মবিশ্বাস আর দক্ষতা কে প্রভাবিত করেছে

শিশুদের অবসাদ সামান্য, মধ্যম বা উচ্চ স্তরের হতে পারে

  • সামান্য অবসাদে শিশুর মন খারাপ হয় কিন্তু সে স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারে। শিশু দৈনন্দিন কাজ বা স্কুল নিয়ে বিশেষ উৎসাহ না দেখাতে পারে কিন্তু বাবা-মায়ের সাহায্যে আর জীবনধারায় সাধারণ কিছু পরিবর্তনে শিশু ডিপ্রেশন থেকে নিরাময় পেতে পারে।
  • মধ্যম মানের অবসাদ শিশুর জীবনে অনেকটা প্রভাব ফেলতে পারে। শিশুটি সবসময় মন খারাপ আর অবসাদে ভুগতে পারে। যদি আপনার সন্তানের মধ্যে এইধরনের উপসর্গ লক্ষ্য করেন, অবিলম্বে পারিবারিক চিকিৎসক আর  মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।
  • উচ্চ স্তরের অবসাদে শিশুর সারাক্ষণ নিজেকে অযোগ্য মনে হয়। তাঁর মনের মধ্যে নেতিবাচক ভাবনাচিন্তা দানা বেঁধে থাকে যার মোকাবিলা করার সামর্থ্য ওর শিশুমনের নেই। যদি আপনার সন্তানের মধ্যে এইধরনের গভীর অবসাদের উপসর্গ লক্ষ্য করেন, অবিলম্বে পারিবারিক চিকিৎসক আর  মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন আর আপনার সন্তানের চিকিৎসার ব্যবস্থা করুন।

অবসাদের চিকিৎসা

অবসাদ শিশুর শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলে, একই সঙ্গে তাঁর পড়াশুনা ও ভাল-থাকা কে প্রভাবিত করে। আপনি যদি আপনার সন্তানের মধ্যে দুটি বা তার বেশি উপসর্গ লক্ষ্য করেন, অবিলম্বে শিশুরোগ বিশেষজ্ঞের আর মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন। ডিপ্রেশনের চিকিৎসা ওষুধ এবং থেরাপি, দুটো পদ্ধতিতেই হয়। অবসাদ কোন পর্যায়ে রয়েছে সেটা নির্ধারণ করে ডাক্তার সঠিক পদ্ধতি বেঁছে নেবেন।

কগ্নিটিভ বিহেভিয়ার থেরাপি অবসাদের ক্ষেত্রে উপযোগী চিকিৎসা পদ্ধতি।

বিশেষ দ্রষ্টব্য – শিক্ষার্থীদের মানসিক সমস্যা ভালো ভাবে বুঝে তাঁদের সহযোগিতা করার জন্য শিক্ষকদের মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে অবগত করানো দরকার।

অবসাদে ভোগা শিশুর পরিচর্যা

প্রতিপালক হিসেবে আপনার শিশুর ডিপ্রেশনের সঙ্গে মোকাবিলা করতে আপনাকেই প্রধান সহায়কের ভূমিকা নিতে হবে। উল্লেখিত কিছু উপায়ে আপনি আপনার শিশুকে সাহায্য করতে পারেন –

  • অবসাদ সম্বন্ধে বিষদে জানুন। এই সমস্যা সম্পর্কে আপনি যতটা অবগত থাকবেন ততটাই সহজভাবে নিজের শিশুর পরিচর্যা করতে পারবেন আর ওকে উৎসাহ যোগাতে পারবেন।
  • সঠিক সময়ে নিয়ম করে ওষুধ খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলুন। লক্ষ্য রাখবেন ডাক্তারের পরামর্শ মত সে যেন সব ওষুধ নিয়মিত ভাবে খায়।
  • শিশুর সঙ্গে সব সময় সযত্নে কথা বলুন। ওকে নিজের মনের সমস্ত ভাবনা প্রকাশ করতে দিন। ওর সমস্যা বা ভাবনাগুলো কে কখনই উপেক্ষা করবেন না।
  • পরিস্থিতি বা সংকেতচিহ্নের প্রতি নজর রাখবেন। এমন পরিস্থিতি যথাসম্ভব এড়িয়ে চলুন যাতে আপনার শিশুর অবসাদ বাড়তে পারে।
  • আপনার শিশুর চিকিৎসক, শিক্ষক এবং অন্যান্য বিশেষজ্ঞের সঙ্গে পরামর্শ করে বুঝে নিন কি ভাবে আপনি আপনার শিশুকে সুস্থ থাকতে সাহায্য করতে পারেন।
  • শিশুর শারীরিক স্বাস্থ্যের প্রতি যত্ন নিন। ব্যায়াম এবং অন্যান্য শারীরিক ক্রিয়া শিশুর মন মেজাজ ভালো রাখতে সাহায্য করে।
  • শিশুর আহার এবং পুষ্টির দিকে নজর রাখুন। সুশম খাদ্য শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার জন্য একান্তভাবে জরুরি।

 


অনুসন্ধান করুন

সম্পর্কিত
আরও পড়ুন