মহিলাদের অবসাদ

মহিলাদের অবসাদ বলতে কি বোঝায়?

মহিলাদের, তাদের জীবদ্দশায়, অনেকগুলো জৈবিক দশার মধ্যে দিয়ে জেতে হয়। বয়ঃসন্ধি, গর্ভাবস্থা, মাতৃত্ব, রজঃ পরবর্তী অবস্থা এবং বৃদ্ধাবস্থা। প্রত্যেকটি দশা হল নিজ নিজ মহিমায় যথেষ্ট বিপর্যস্ত-কারি। কোন কোন ক্ষেত্রে, এই সকল দশা এমন কিছু শারীরিক উপসর্গের উদ্রেক ঘটায় যা দীর্ঘস্থায়ী হয়। এই উপসর্গের সাথে মানিয়ে নেবার প্রচেষ্টা নারীদের মানসিক স্বাস্থ্যকে প্রভাবিত করে জা মানসিক অবসাদ বা উদ্বিগ্নতা জড়িত ভারসাম্ম্যহীনতায় রূপান্তরিত হয়। এটা দেখা গেছে যে পাঁচ জনের মধ্যে একজন মহিলা তাদের জীবনের ভিন্ন ভিন্ন দশায় মানসিক অবসাদের শিকার হন।

কিছু কিছু কারণ জা মহিলাদের মানসিক অবসাদের দিকে ঠেলে দেয় তা হল –

  • ঋতুচক্র কালীন পরিবর্তন এবং তার আনুষঙ্গিক উপসর্গ, রজঃ পূর্ব লক্ষণ, রজঃ নিবৃত্তি
  • যৌনতা ও শারীরিক গঠনের পরিবর্তন
  • মতামত পোষণের স্বাধীনতা হীনতা (পিতা, মাতা, স্বামী, শ্বশুর ও শাশুড়ি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত)
  • কর্মসংস্থান, বিবাহ বা স্থানান্তরণের কারণে জীবনযাত্রার পরিবর্তন
  • বৈবাহিক সমস্যা যেমন বিবাহ বিচ্ছেদ, বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্ক, অথবা বনিবনা না হওয়া
  • পূর্ববর্তী কোন অবসাদের ঘটনা, প্রসব পরবর্তী (post partum) অবসাদ  
  • সামাজিক অসহযোগিতা
  • অপ্রত্যাশিত গর্ভ করণ, গর্ভ পাত বা গর্ভ ধারণের জটিলতা
  • অতিরিক্ত দায়িত্বভারে জর্জরিত থাকা বা একাকী সন্তান প্রতিপালনের দায়িত্ব
  • শারীরিক ও মানসিক অত্যাচার জনিত মানসিক আঘাত

প্রসব পরবর্তী অবসাদ বলতে কি বোঝায়?

মেঘা সদ্য একতা সুস্থ বাচ্চা প্রসব করেছে এবং তার পরিবার সেই কারণেই খুবই আনন্দিত। কিন্তু মেঘা কিছু দিনের মধ্যেই অস্থির হয়ে ওঠে। বাচ্চার অনিয়মিত দুধ খাওয়ানোর সময় এবং ঘুমানোর পদ্ধতি মেঘার ওপর প্রচুর ধকল সৃষ্টি করে। সে খুবই দুশ্চিন্তা করতে থাকে এবং রোজই প্রায় কান্নাকাটি করতে থাকে। ছোটো ছোটো ঘটনাতেই সে উত্ত্যক্ত হোয় ওঠে। শরীরের পরিবর্তন, ক্ষয়-ক্ষতির বিষয় দুশ্চিন্তা করে ও বাচ্চার দেখাশোনা করতে অরাজি হয়। ক্রমশ, তার খিদে কমে যায় এবং খাওয়া দাওয়া অনিয়মিত হতে থাকে। তার ব্যাবহারে বিভ্রান্ত হয়ে তার পরিবারের লকজন ডাক্তারের পরামর্শ নেবার সিদ্ধান্ত নেন। ডাক্তার রোগ নির্ণয় করে নিশ্চিন্ত করেন যে মেঘা পোস্ট পারটাম ডিপ্রেশন বা প্রসব পরবর্তী অবসাদে ভুগছে।

এখানে এই কাল্পনিক চরিত্রটির আশ্রয় নেওয়া হয়েছে রোজকার জীবনের ঘটনার উদাহরণ দিয়ে এই অবসাদ বা বিষণ্ণতার ব্যাখ্যা করার জন্য।

একটি বাচ্চাকে প্রতিপালনের যন্ত্রণা - ধকল ও তার সঙ্গে জড়িত ভয়, দুশ্চিন্তা, উত্তেজনা, এবং জীবনযাত্রার পরিবর্তন – সব কিছুই একজন মা কে সংবেদনশীল করে তলে। এটা খুবই স্বাভাবিক যে, সব মিলিয়ে, সদ্য প্রসূতি মা কিছুদিনের জন্য বিপর্যস্ত হয়ে ওঠেন। যদি এই অনুভূতি অনেকদিন, এক মাসের ও বেশি দিন, ছলতে থাকে তাহলে সেই ঘটনাকে পোস্ট পারটাম ডিপ্রেশন বলে মেনে তার প্রয়োজনীয় চিকিৎসা করা দরকার।

এই অবসাদ বা বিষণ্ণতার প্রকৃত কারণ জানা না গেলেও ডাক্তাররা দেখছেন যে, হঠাৎ ঘটা হরমোনাল ও শারীরিক পরিবর্তন এবং সদ্য জাত বাচ্চাকে দেখাশোনা করার ধকল থেকেই এই অবসাদ ঘটে।

জানা জরুরিঃ মাঝে মাঝে মহিলাদের অবসাদের দেখা যায় গর্ভাবস্থাতেই। সেক্ষেত্রে ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলাটা দরকার এবং ডাক্তারের কাছ থেকে মানসিক অবসাদ লাঘব করার ঔষধ ব্যবহারে গর্ভাবস্থায় মা ও বাচ্চার ওপর কোন প্রতিক্রিয়া হয় কিনা জেনে তবেই রোগীকে ঔষধ খাওয়ানো উচিত। গর্ভাবস্থার কিছু কিছু সময় ঔষধ খাওয়ার ফলে গর্ভে বেড়ে ওঠা বাচ্চার ক্ষতি হতে পারে। আবার একই ভাবে ঔষধ না খাওয়াও মা ও বাচ্চার দুজনের জন্যেই ক্ষতিকারক হতে পারে। মায়ের অবস্থা ও রোগের প্রকোপতার ওপর ঔষধের প্রভাব নির্ভর করে। 

প্রসব পরবর্তী অবসাদের লক্ষণগুলো কি?

  • আত্মমর্যাদা বোধের অভাব এবং সন্তান প্রতিপালনের দায়িত্বভার গ্রহণে দ্বিধা
  • সামাজিক ও মানসিক সাহায্যের অভাবে অসহায় অনুভব করা ও অ-সহিষ্ণু হয়ে ওঠা
  • সর্বদা বাচ্চার জন্য দুশ্চিন্তা করা বা বাচ্চার দেখাশোনার জন্য উৎসাহের ঘাটতি
  • বাড়িতে ও কর্মস্থলে নিত্ত নৈমিত্তিক কাজের পরিবর্তন জনিত ধকল ও চাপ
  • শারীরিক পরিবর্তনের কারণে তিক্ত অনুভূতি
  • বাচ্চার অনিয়মিত দুগ্ধ-পান ও ঘুমানোর অভ্যাসের জন্য মায়ের ঘুমের ব্যাঘাত
  • পূর্ববর্তী অবসাদের ঘটনা বা বাইপোলার ডিস্‌অর্ডার

বাড়াবাড়ি পর্যায়ে, মা’র কখনো কখনো আত্মহত্যার প্রবণতা দেখা যায়। আবার কখনো বাচ্চার ক্ষতি করার প্রচেষ্টাও লক্ষ্য করা যায়। এইরকম ক্ষেত্রে, মাকে হাসপাতালে ভর্তি করা প্রয়োজন হয়। পরিবারের সকলের সাহায্য এবং উপযুক্ত চিকিৎসা পদ্ধতি রোগীকে সেরে উঠতে অনুপ্রেরণা জাগায়।

প্রসব পরবর্তী অবসাদের ঝুঁকি

নিচের যে কোন একটি পোস্ট পারটাম ডিপ্রেশনের জন্য যথেষ্টঃ

  • আগে ঘটা প্রসব পরবর্তী অবসাদ
  • গর্ভাবস্থার সঙ্গে সম্পর্ক নেই এরকম পূর্ব বিরাজমান আংশিক অবসাদ
  • জোর করে চাপানো কঠিন বৈবাহিক সম্পর্ক
  • গর্ভধারনকালীন বা প্রসবোত্তর কালে, কঠিন, বাস্তব ঘটনাবহুল জীবন (যেমন কঠিন রোগে আক্রান্ত হওয়া বা কষ্টসাধ্য অকাল প্রসব)
  • বন্ধু-বান্ধব ও পরিবারের নিকট হতে সহায়তার অভাব
  • বাইপোলার ডিস্‌অর্ডারে আক্রান্ত হওয়া

কি ভাবে প্রসব পরবর্তী অবসাদকে রোধ করা যায়?

মা হওয়ার সাথে সাথেই স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের দিকে খেয়াল রাখা অনেকাংশে প্রসব পরবর্তী অবসাদ রোধে সাহায্য করে।

  • বাচ্চার যত্ন নেবার জন্য যত বেশি সম্ভব অন্যের সাহায্য নেওয়া, জাতে মা তার আবশ্যিক পরিমাণ ঘুম ঘুমিয়ে নিতে পারেন
  • একটি নির্দিষ্ট নিয়মমাফিক জীবন যাপন করা যেখানে অবসর বিনোদন ও গাইনোকলজিস্টের দেখানো শরীরচর্চার জন্য সময় থাকে
  • যদি পোস্ট পারটাম ডিপ্রেশন নিয়ে চিন্তা থাকে, তাহলে প্রসবোত্তর সময়ে গাইনোকলজিস্টের সাথে পরামর্শ করা উচিত
  • অ্যালকোহল ও অন্যান্য ড্রাগ এড়িয়ে যাওয়া 

প্রসব পরবর্তী অবসাদের সাথে মানিয়ে নেওয়া

চিকিৎসা পদ্ধতি চালু হওয়ার সাথে সাথেই রোগিণীর উন্নতি লক্ষ করা যায়। এখানে কিছু নির্দেশাবলী রইল যা এই অবস্থায় মানিয়ে নিতে সাহায্য করে।

  • রোগিণীর সেই সব কাজই বেশি করা উচিত জা তিনি গর্ভধারণের আগে খুব উপভোগ করতেন
  • কখনো নিজেকে অতিরিক্ত কর্মভারে ভারাক্রান্ত করাও যেমন ঠিক নয়, তেমনি একেবারে অলস কর্মহীন জীবন যাপন করাও উচিত নয়
  • একসাথে একটাই কাজ সম্পন্ন করা দরকার। বড় বড় কাজগুলোকে যত বেশি সম্ভব ছোটো ছোটো ভাগে বিভক্ত করে সম্পন্ন করা ভালো
  • অন্য লোকেদের সাথে সময় কাটানো, বন্ধু-বান্ধব ও আত্মীয়স্বজনের সাথে কথা বলা ও তাদের সাথে নিজের অনুভূতি ভাগ করা
  • বাচ্চাদের দেখাশোনার জন্য পরিবারের লোকজন বা নার্সের সাহায্য নেওয়া 
  • যতক্ষণ না সম্পূর্ণরূপে সুস্থ অনুভব করছেন, ততক্ষণ জীবনের কোন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়। গুরুত্বপূর্ণ বিশয় যেমন অর্থনীতি, কর্মসংস্থান ইত্যাদি বিশয়ে পরিবারের সদস্যদের সাথে আলোচনা করা উচিত।          

  


অনুসন্ধান করুন

সম্পর্কিত
আরও পড়ুন