ডিসগ্রাফিয়া

ডিসগ্রাফিয়া কি?

ডিসগ্রাফিয়া এক ধরনের শিক্ষাগ্রহণ সংক্রান্ত বিকার যা হাতের লেখনী ক্ষমতা, যেমন বানান ক্ষমতা, হাতের লেখা ইত্যাদি, এবং লিখিত শব্দ পড়ে তার মানে বোঝার বোধশক্তি (যেমন শব্দ সংগঠন, বাক্য, অনুচ্ছেদ) কে প্রভাবিত করে। হাতের লেখনী ক্ষমতার বিকাশের জন্য সূক্ষ্ম কার্যবিষয়ক অঙ্গ সঞ্চালন ক্ষমতা (ফাইন মোটর স্কিল্‌স) এবং ভাষা বোধন ক্ষমতার সামঞ্জস্য প্রয়োজন যা জটিল মানসিক প্রক্রিয়া দ্বারা সম্ভব। ডিসগ্রাফিয়ায় আক্রান্ত শিশুদের জন্য হাতের লেখনী ক্ষমতার বিকাশ সময় এবং পরিশ্রম সাপেক্ষ প্রক্রিয়া।

অন্যান্য শিক্ষাগ্রহণ সংক্রান্ত বিকার যেমন ডিসলেক্সিয়া বা ডিসক্যাল্কুলিয়ার তুলনায় ডিসগ্রাফিয়ার সম্পর্কে সচেতনতা কম এবং অনেক ক্ষেত্রে ডিসগ্রাফিয়া ধরাই পড়ে না। অন্যান্য বিকারের উপস্থিতিতে ডিসগ্রাফিয়ার উপসর্গ সঠিক ভাবে লক্ষ্য না করার ফলে এবং সমস্যা নির্ধারণের জন্য সঠিক পরীক্ষার অভাবে সমস্যাটি ঢাকা পড়ে যায়।

কোন সমস্যাগুলো ডিসগ্রাফিয়া নয়?

অপরিচ্ছন্ন বা ধীরগতিতে লেখনী অভ্যাস ডিসগ্রাফিয়ার উপসর্গ নয়। কিছু ক্ষেত্রে শিশুটি ভালো করে কানে শুনতে না পারার ফলে লেখার মাধ্যমে ভাব ব্যক্ত করতে অসুবিধে বোধ করতে পারে। এটা নির্ধারণ করার জন্য অডিওম্যেট্রি পরীক্ষার (শোনার ক্ষমতা যাচাই করার জন্য বিশেষ পরীক্ষা) মাধ্যমে শ্রবনক্ষমতা যাচাই করে নেওয়া উচিৎ।

ডিসগ্রাফিয়ার উপসর্গ কি?

ডিসগ্রাফিয়ার উপসর্গ এবং পর্যায় প্রত্যেক শিশুর ক্ষেত্রে আলাদা হয়।

স্কুল শুরু হওয়ার আগে

  • পেন্সিল ধরতে অসুবিধে হওয়া। শিশুটি খুব জোরে চেপে বা অদ্ভুত ভাবে পেন্সিল ধরে
  • অক্ষর এবং সংখ্যার আকার সঠিক ভাবে অনুকরণ করে লিখতে অসুবিধে হয়
  • হাতের লেখা অভ্যাস করার সময় বাক্য বা শব্দের মধ্যে সমান ব্যবধান রাখতে অসুবিধে হয়
  • ইংরেজি ভাষার ক্ষেত্রে বড় হাতের এবং ছোটো হাতের অক্ষর বুঝতে অসুবিধে হয়
  • পৃষ্টে সারি বা ধার মেনে লিখতে বা ছবি আঁকতে অসুবিধে হয়
  • দীর্ঘ সময় ধরে লেখা

স্কুলের প্রাথমিক এবং মধ্য স্তরে

  • অপরিচ্ছন্ন হাতের লেখা যা সহজে পড়া যায়না
  • টানা এবং গোটা হরফ মিলিয়ে লেখা
  • লেখার সময় শব্দগুলো মুখে বলে বলে লেখা
  • লেখার ওপর অতিরিক্ত মনোনিবেশ করার ফলে লেখার মানে বুঝতে না পারা
  • টীকা লিখে রাখা
  • লেখার সময় নতুন শব্দ বা প্রতিশব্দ মনে করতে না পারা
  • সম্পূর্ণ বাক্য না লেখা। কিছু শব্দ বাদ পড়ে যাওয়া বা অপূর্ণ থেকে যাওয়া

কিশোর বয়েসে সমস্যা

  • ভাবনার প্রবাহকে লেখার মাধ্যমে অভিব্যক্ত না করতে পারা
  • লেখার মধ্যে ভাবনার ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে না পারা
  • ব্যাকরণের নিয়ম মেনে সঠিক বাক্য গঠন করতে না পারা

ডিসগ্রাফিয়া হওয়ার কারণ কি?

ডিসগ্রাফিয়া হওয়ার সঠিক কারণ গবেষকরা এখনো জানতে পারেননি। ধরে নেওয়া হয় যে মস্তিষ্কের তথ্য বিশ্লেষণ ক্ষমতার বিচ্যুতির জন্য ডিসগ্রাফিয়া হয়। 

ডিসগ্রাফিয়া কি করে নির্ধারণ করা হয়?

বাবা-মা এবং শিক্ষকরা নার্সারি স্কুলেই লক্ষণগুলো দেখতে পান কিন্তু বিশেষ গুরুত্ব না দেওয়ার ফলে সমস্যাটি অবহেলিত থেকে যায়। যত শীঘ্র সমস্যাটি নির্ধারণ করা হবে, তত তাড়াতাড়ি শিশুটি যথাযথ সাহায্য পাবে।

বিশেষজ্ঞরা কিছু বিশিষ্ট লেখনী এবং অন্যান্য পরীক্ষার সাহায্যে সূক্ষ্ম কার্যবিষয়ক অঙ্গ সঞ্চালন ক্ষমতা এবং লেখনী প্রক্রিয়ার মূল্যায়ন করে ডিসগ্রাফিয়া চিহ্নিত করার চেষ্টা করেন।

ডিসগ্রাফিয়ার চিকিৎসা

ডিসগ্রাফিয়ার কোন পরম্পরাগত চিকিৎসা নেই। বিভিন্ন ধরনের ক্রিয়ার সাহায্যে শিশুর লেখনী ক্ষমতা শোধরানো হয়। বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষা বিশেষজ্ঞের সাথে আলোচনা করে বুঝে নিতে হবে যে কোন শিক্ষা প্রক্রিয়া আপনার শিশুর জন্য কার্যকারী হতে পারে।

ডিসগ্রাফিয়ায় পরিচর্যা

বাবা-মা এবং বিশেষজ্ঞরা নিম্নলিখিত পদ্ধতির সাহায্য নিতে পারেন –

  • বিভিন্ন ধরনের পেন্সিল আর কলম কিনে শিশুকে ব্যাবহার করতে দিন যাতে জানা যায় ও কোনটা দিয়ে সব থেকে বেশি ভালভাবে লিখতে পারছে
  • এমন পৃষ্ট ব্যাবহার করুন যাতে দুটো সারির ব্যবধান বেশি রয়েছে, যাতে শিশু অনায়াসে সারি ধরে লিখতে পারে
  • ছবি, অলঙ্করণ এবং ধ্বনিতত্বের সাহায্যে অক্ষর এবং শব্দের সাথে শিশুর পরিচয় করানোর চেষ্টা করুন যাতে সে অক্ষর এবং শব্দ চিনে লিখতে শেখে
  • বিশেষ ধরনের প্রযুক্তি এবং শব্দের দ্বারা সক্রিয় হওয়া সফ্‌টওয়্যার (শব্দ আর অক্ষর বিশ্লেষণ প্রক্রিয়া) ব্যবহার করুন যা লেখনী ক্ষমতার বিকাশে সাহায্য করে
  • শিশুটিকে স্কুলে পরীক্ষার সময় সাধারণের চেয়ে বেশি সময় দেওয়া হোক
  • টেপ রেকর্ডারের সাহায্যে স্কুলের পড়া রেকর্ড করে রাখুন এবং বাড়িতে চালিয়ে শুনে শুনে লেখা অভ্যাস করতে বলুন

 


অনুসন্ধান করুন

সম্পর্কিত