রেস্টলেস লেগস্‌ সিন্ড্রোম

রেস্টলেস লেগস্‌ সিন্ড্রোম কী?

রেস্টলেস লেগস্‌ সিন্ড্রোম একধরনের স্নায়বিক ব্যাধি যার ফলে আক্রান্ত ব্যক্তি নিজের পায়ে অস্বস্তিকর শিহরন অনুভব করেন এবং হেঁটে বা বারবার নিজের পা নাড়াচাড়া করে সাময়িক আরাম বোধ করেন। রেস্টলেস লেগস্‌ সিন্ড্রোমে আক্রান্ত ব্যক্তির একটানা ঘুমোতে অসুবিধে হয় কারণ রাতে অনেক বার তিনি এইধরনের অস্বস্তি অনুভব করেন। এর ফলে তাঁর ঘুমের গুনগত মান কমে যায় এবং দিনের বেলায় তিনি ঝিমুনি অনুভব করেন। আর এল এস–র জন্য গাড়ি বা বিমানে বেশিক্ষণ যাত্রা করাটাও অসুবিধাজনক। আর এল এস সমস্যাটি খুবই যন্ত্রণাদায়ক কিন্তু ওষুধ এবং জীবন শৈলীতে কিছু পরিবর্তনের মাধ্যমে এই রোগের নিরাময় সম্ভব।

রেস্টলেস লেগস্‌ সিন্ড্রোমের উপসর্গ

রেস্টলেস লেগস্‌ সিন্ড্রোমের প্রধান উপসর্গগুলো হল –

  • পায়ে অস্বস্তিকর শিহরন বা অনুভূতি – পায়ে চুলকানি ভাব, জ্বালা করা, বা কোন পোকা মাকড় পা বেয়ে ওঠা নামা করার অনুভূতি হতে পারে যার ফলে আপনি পা নাড়াচাড়া করতে বাধ্য হবেন যাতে অস্বস্তি-ভাব কমে যায়। কিছু বিরল ক্ষেত্রে একই অনুভূতি আপনার শরীরের অন্য অংশে, যেমন বাহু বা হাতেও হতে পারে, কিন্তু সাধারণত পায়েই বেশিরভাগ রোগী অস্বস্তি অনুভব করেন।
  • অচল অবস্থায় অনুভূতি শুরু হয় –উপসর্গ বসে থাকা বা শুয়ে থাকা অবস্থায় আরম্ভ হয়।
  • দিনের বেলায় ঝিমুনি ভাব –ঘুমের মধ্যে বারবার পা নাড়ানোর জন্য ঘুম বিঘ্নিত হওয়ার ফলে সকালে ক্লান্ত লাগে, সারাদিন ঝিমুনি ভাব থাকে এবং ঘুমের অভাবে মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায়।

অনেকেই ভাবেন যে আর এল এস-এর উপসর্গগুলো এমন কিছু গুরুত্বপূর্ণ না। তাঁরা এটাও বোঝেন না যে এই সমস্যার প্রভাব তাঁদের জীবনের গুণগত মানের ওপর কিভাবে পড়ছে। আপনি যদি কোন পরিচিত জনকে মাঝে মধ্যেই বিনা কারণে নড়াচড়া বা হাঁটাচলা করতে দেখেন বা আর এল এস-এর অন্য কোন উপসর্গ লক্ষ্য করেন তাহলে তাঁর সাথে এই বিষয়ে কথা বলুন এবং ওনাকে মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে বলুন।

রেস্টলেস লেগস্‌ সিন্ড্রোম হওয়ার কারণ কী?

আর এল এস বিভিন্ন কারণে হতে পারে এবং প্রত্যেক রোগীর ক্ষেত্রে আলাদা যার মধ্যে কিছু কারণ এখনও জানা যায়নি। গবেষণা থেকে জানা গিয়েছে যে মাংসপেশি সঞ্চালনার জন্য দায়ী শারীরিক রসায়ন ডোপামিনের তারতম্যের জন্য আর এল এস হতে পারে। অন্যান্য কিছু কারণগুলি হল:

  • শরীরে আয়রনের (লৌহ কণিকা) অভাব – মস্তিষ্কের কোষগুলোর মধ্যে যোগাযোগে সমস্যা সৃষ্টি করে যার ফলে আর এল এস-এর উপসর্গ দেখা দেয়।
  • বংশগত কারণে - কখনো আর এল এস-কে বংশগত ভাবে হতে দেখা গিয়েছে। আগের প্রজন্মের যদি অল্প বয়েসে আর এল এস হয়ে থাকে তাহলে সম্ভাবনা বেড়ে যায়।
  • অন্যান্য শারীরিক সমস্যা – কিডনির রোগ, ডায়াবেটিস, স্নায়ু রোগ, আর্থেরাইটিস (বাত), এনিমিয়ার (রক্তস্বল্পতা) মতো অন্যান্য শারীরিক রোগের জন্যও আর এল এস হতে পারে। এইসব রোগের চিকিৎসা আরম্ভ হলে আর এল এস-এর উপসর্গ কমে যেতে দেখা গিয়েছে।
  • গর্ভাবস্থা – গর্ভাবস্থায় মহিলাদের মধ্যে আর এল এস হতে দেখা গিয়েছে, কিন্তু সন্তান প্রসবের এক মাসের মধ্যে উপসর্গ কমে যায়।

রেস্টলেস লেগস্‌ সিন্ড্রোম-এর চিকিৎসা

আর এল এস–এর চিকিৎসা পদ্ধতি অনেক ধরনের হয়, যেমন জীবন শৈলীতে সাধারণ কিছু পরিবর্তন, অন্যান্য শারীরিক ব্যাধির চিকিৎসা করানো, আবার আর এল এস-এর জন্য প্রকৃত ভাবে তৈরি ওষুধের সেবনে ভালো ফল পাওয়া যায়।

প্রথমদিকে আপনাকে সাধারণ কিছু পরিবর্তনের কথা বলা হবে যেমন নিয়মিত ব্যায়াম করা, বাড়তি ওজন কমানো, ধূমপান এবং ক্যাফিনের সেবন না করা। যদি শরীরে আয়রন-এর ঘাটতি থাকে তাহলে আপনাকে আয়রন বাড়ানোর জন্য ওষুধ দেওয়া হবে। এইধরনের ওষুধ শুধুমাত্র ডাক্তারদের পরামর্শ মেনেই সেবন করা উচিৎ। এইসব করেও যদি কোন সুফল না পাওয়া যায় তাহলে ডাক্তার আপনাকে নিম্নলিখিত ধরনের ওষুধ সেবনের পরামর্শ দিতে পারেন:

  • পার্কিনসন্‌স রোগের ওষুধ – এই জাতীয় ওষুধ আপনার মস্তিষ্কে ডোপামিনের মাত্রা বাড়িয়ে তোলে যা আর এল এস-এর উপসর্গ নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য উপকারী। তবে এর মানে এই নয় যে আর এল এস হলেই আপনার পার্কিনসন্‌স রোগ হবে।
  • নারকোটিক জাতীয় ওষুধ – ব্যথা উপশমকারী উদ্দীপক জাতীয় ওষুধ, যাদের অপিওড্‌স বলা হয়, আপনাকে ভালো করে ঘুমোতে সাহায্য করবে, কিন্তু এইগুলোতে আসক্ত হয়ে পড়ার সম্ভাবনা থাকে।
  • ঘুমের ওষুধ এবং মাংসপেশি শিথিল করার ওষুধ – এই জাতীয় ওষুধের সেবনে আপনার ঘুম ভালো হলেও আর এল এস-এর সমস্ত উপসর্গ এতে নিয়ন্ত্রিত থাকে না যার ফলে দিনের বেলায় ঝিমুনি ভাব থেকে যেতেই পারে।

ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ খাওয়া এবং চিকিৎসা পদ্ধতি মেনে চলা খুবই জরুরী। সব ওষুধ সবার জন্যও উপকারী না। একটা ওষুধে একজন রোগী ভালো ফল পেতে পারেন আবার ঐ একই ওষুধে অন্য রোগীর পরিস্থিতির অবনতি ঘটতে পারে। এর জন্যও সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে সব সময় নিজের ডাক্তারের সাথে যোগাযোগ বজায় রাখা এবং সব ধরনের প্রতিক্রিয়া তাঁর সাথে আলোচনা করা।

রেস্টলেস লেগস্‌ সিন্ড্রোম-এর রোগীর পরিচর্যা

আপনার পরিচিত কোন ব্যক্তি যদি আর এল এস-এ আক্রান্ত হয়ে থাকেন তাহলে আপনাকে সর্বপ্রথম এটা বুঝতে হবে যে উনি যথেষ্ট কষ্টের মধ্যে রয়েছেন। অনেকেই জানেন না যে এটা একধরনের ব্যাধি যার চিকিৎসা সম্ভব। আপনার উচিৎ এই রোগ সম্বন্ধে বিষদে জেনে নেওয়া। আপনার স্বামী বা স্ত্রী যদি আর এল এস-এ ভুগে থাকেন তাহলে আপনারও হয়ত রাতে ভালো করে ঘুমোতে অসুবিধে হচ্ছে। মনে রাখবেন যে এইধরনের অনুভূতির ওপর রোগীর কোন নিয়ন্ত্রণ থাকে না এবং আপনার সহযোগিতা তাঁকে তাড়াতাড়ি সুস্থ হতে সাহায্য করবে। রোগীর সাথে এই বিষয়ে কথা বলুন এবং তাঁকে মনোরোগ বিশেষজ্ঞয়ের পরামর্শ নেওয়ার জন্যও উৎসাহিত করুন। দরকার মনে করলে তাঁকে বলুন যে আপনি তাঁর সাথে ডাক্তারের কাছে যেতে রাজি। লক্ষ্য রাখবেন যেন তিনি চিকিৎসা পদ্ধতি অনুসরণ করে চলেন এবং চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোন অন্য ওষুধ সেবন না করেন। 

রেস্টলেস লেগস্‌ সিন্ড্রোম-এর সঙ্গে মোকাবিলা

আর এল এস তীব্র মানসিক চাপ সৃষ্টি করতে পারে রোগীর মধ্যে, কিন্তু কিছু সাধারণ উপায় মেনে চললে যন্ত্রণা নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। নিয়মিত ব্যায়াম করুন এবং রাতে ভালো করে ঘুমান। গরম জলে স্নান আর পায়ে গরম বা ঠাণ্ডা সেঁক পায়ের মাংসপেশি শিথিল করতে সাহায্য করে। ক্যাফিন আর তামাকের সেবন না করলে ঘুম ভালো হয়। সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ হল চিকিৎসা পদ্ধতির নিয়ম মেনে চলা এবং কোন পরিবর্তন লক্ষ্য করলে ডাক্তারকে সঙ্গে সঙ্গে তা জানানো।

 


অনুসন্ধান করুন

সম্পর্কিত