পার্সোনালিটি ডিস্‌অর্ডারের বিভিন্ন ধরন

পার্সোনালিটি ডিস্‌অর্ডারের বিভিন্ন ধরন

বিশেষ কিছু ব্যক্তিত্বের উপস্থিতি বা অনুপস্থিতিকে মাথায় রেখে এই রোগের বিভিন্ন বিভাজন করা হয়েছে। এই স্বভাব বা ব্যক্তিত্বগুলির উন্মেষ অত্যন্ত অল্প বয়সে হয় কিন্তু সাবালক হবার আগে অবধি তার পরিপূর্ণ বহিঃপ্রকাশ দেখা যায় না।

সাধারণত এই অসুখটিকে তিনটি প্রধান ভাগে ভাগ করা যেতে পারে। এদের উপসর্গগুলি মোটামুটি একরকম হলেও প্রত্যেক ক্ষেত্রেই কিছু নির্দিষ্ট আচার আচরণ লক্ষ করা যায়।

  • বিভাগ কঃ অস্বাভাবিক বা খামখেয়ালী ব্যবহার
  • বিভাগ খঃ নাটকীয় বা অতি-আবেগপ্রবণ ব্যবহার
  • বিভাগ গঃ আতঙ্কগ্রস্থ বা ভয়ার্ত ব্যবহার

সমাজের প্রতিটি স্তরে ও রোগীর ব্যক্তিগত জীবনে লক্ষণীয় কিছু চাল-চলন না থাকলে এই রোগের নির্ণয় করা অসম্ভব।  

বিঃ দ্রঃ – আমাদের সবার মধ্যেই এইসমস্ত অস্বাভাবিক চালচলন অল্প-বিস্তর থাকে। কিন্তু তাঁকে বিকার তখনই বলা যাবে যখন -

১) এইগুলো অতিমাত্রায় উপস্থিত এবং তাঁর ফলে রোগীর নিজের এবং আশে পাশের সবার জীবনযাপনে সমস্যা হচ্ছে। যে কোনও পরিস্থিতিতে তিনি সেগুলো বজায় রাখেন এবং বহুদিন ধরে সেটা লক্ষ করা যাচ্ছে।  

২) এই উপসর্গগুলি একটি সূচকমাত্র। এইগুলির ভিত্তিতে সম্পুর্ণরূপে রোগনির্ণয় সম্ভব না। তার জন্যে আপনাকে একজন অভিজ্ঞ মনোবিদের পরামর্শ নিতে হবে। 

বিভাগ ক

এইক্ষেত্রে রোগীর মধ্যে অস্বাভাবিক চিন্তা ও কার্য্যকলাপ লক্ষ করা যায়। বিশেষ করে রোগী তাঁর আশেপাশের লোকজনদের প্রতি অত্যন্ত সন্দেহবাতিক এবং উদাসীন মনোভাব প্রদর্শন করে থাকেন। এইসমস্ত তাঁদের ব্যক্তিগত সম্পর্ক এবং দৈনন্দিন জীবনে মারাত্মক প্রভাব ফেলে।

প্যারানয়েড পার্সোনালিটি ডিস্‌অর্ডার

এই ধরণের ব্যক্তিত্ব বিকারের রোগী কাউকে বিশ্বাস করে উঠতে পারেন না। অন্যদের মত সেটা তিনি লুকিয়ে রাখেন না। প্রকাশ্যে অন্যদের সামনে তা দেখিয়ে অপমান করেন। বন্ধু-বান্ধব বা আত্মীয়স্বজন কাউকে তিনি ভরসা করতে পারেন না। এঁরা সব সময় ভয় পান যে হয়তো কেউ ঠকিয়ে দেবে বা প্রতারণা করবে। এর ফলে তাঁরা অন্যদের থেকে দূরে সরে যেতে থাকেন। এঁরা মন খুলে নিজের স্ত্রী বা স্বামীকেও কিছু বলেন না। ছোট্ট কোনও ঘটনার জন্যে রাগ পুষে রাখা বা কাউকে সাহায্য না করাটাও অস্বাভাবিক না এই ক্ষেত্রে। নিজের জিনিষপত্র যেমন কম্পিউটারেও কাউকে হাত দিতে দেন না হ্যাক হবার ভয়ে।    

স্কিজয়েড পার্সোনালিটি ডিস্‌অর্ডার

এরা সকলের থেকে আলাদা চলতে পছন্দ করেন। নিজেদেরকে দূরে সরিয়ে রাখেন। কোনও সামাজিক অনুষ্ঠানেও তাঁরা যোগদান করেন না। প্রশংসা বা নিন্দাতেও এঁদের যায় আসে না। জোর করে এইরকম কিছুতে তাঁদের রাখতে চাইলে তাঁরা একলা বোধ করতে শুরু করেন।

স্কিজোটাইপাল পার্সোনালিটি ডিস্‌অর্ডার

এটিকে প্যারানয়েড পার্সোনালিটি ডিস্‌অর্ডার এবং স্কিজয়েড পার্সোনালিটি ডিস্‌অর্ডারের একটি মিশ্রণ বলা যেতে পারে। অন্য কোনও মানুষকে এঁরা সহ্য করতে পারেন না এবং নিজেদেরকে দূরে সরিয়ে রাখতে পছন্দ করেন। খামখেয়ালী চালচলন যেমন খেতে বসে ভাত গোনা, জিনিষ পত্র বার বার গোছানো ইত্যাদিও এঁদের মধ্যে দেখা যায়।

অনেক সময় এই সমস্যাগুলিকে অবসেসিভ কম্পালসিভ ডিস্‌অর্ডার বলে মনে হয়। কিন্তু ওসিডি তে রোগী তাঁর চালচলন অস্বাভাবিক বুঝতে পারলেও তা সামালাতে পারেন না। কিন্তু এই ক্ষেত্রে রোগী সত্যিটা মানতেই চান না।

এঁরা অলৌকিক এবং জাদুকরী চিন্তা ভাবনায় বিশ্বাসী। কাকতালীয় দুটি ঘটনাকে জুড়ে দিয়ে এঁরা সহজেই সিদ্ধান্তে পৌঁছে যান। অনেক সময় এঁরা বাস্তব এবং কল্পনার মাঝের গণ্ডীটা গুলিয়ে ফেলেন।

বিভাগ খ

এই ক্ষেত্রে রোগীদের মধ্যে অতিনাটকীয়, অতি আবেগপ্রবণ এবং অত্যন্ত স্বার্থপর চালচলন লক্ষ করা যায়। আরেকটি চাঞ্চল্যকর ব্যাপার হল এই ক্ষেত্রে রোগীরা কার্য্যক্ষেত্রে নিজের ভুলটা বুঝতে পারেন না এবং পরবর্তীকালে তাই নিয়ে আপসোষ করেন।  

অ্যান্টিসোশাল পার্সোনালিটি ডিস্‌অর্ডার

রোগী অন্যদের প্রতি চূড়ান্ত উদাসীন মনোভাব পোষণ করেন এবং সেটা তাঁরা অগ্র-পশ্চাৎ বিবেচনা না করেই করেন। এঁরা সাধারণত নিজেকে যোগ্য ক্ষমতা সম্পন্ন ব্যক্তি বলে মনে করতে পছন্দ করেন।

এঁরা মানসিক ও শারীরিক দিক থেকে অত্যন্ত হিংস্র এবং ধ্বংসাত্মক মানসিকতার অধিকারী হন। ছোটবেলা থেকেই এইসমস্ত উপসর্গের উন্মেষ হওয়াতে অনেক সময়ই দেখা যায় বাচ্চারা তাঁদের চেয়ে বয়সে ছোট বা পোষা জন্তুদেরকে মেরে-ধরে, অত্যাচার করে আনন্দলাভ করে। এবং তাঁরা এই সমস্ত কিছুই স্বাভাবিক এবং প্রয়োজনীয় বলে মনে করে। মিথ্যে কথা বলা, ক্ষমা চাওয়ার অভিনয় করা, অস্থির মনোভাব এবং নিজের কাজের দায়িত্ব না স্বীকার করতে চাওয়াও এই ক্ষেত্রে খুব স্বাভাবিক।

বর্ডারলাইন পার্সোনালিটি ডিস্‌অর্ডার

মূলত রোগী এই ক্ষেত্রে আবেগ জড়িত সমস্যায় ভুগতে থাকেন। এঁদের নিশ্চিত রকম ব্যক্তিত্ব না থাকার কারণে এঁরা সর্বত্র নিজেকে মানিয়ে নেবার চেষ্টা করতে থাকেন। পরিস্থিতি বুঝে তাঁদের ব্যাক্তিত্ব পালটে নেবার লড়াই প্রতি মুহূর্তে চলতে থাকে।

নার্সিসিস্টিক পার্সোনালিটি ডিস্‌অর্ডার

এঁরা প্রকৃত অর্থেই মেগালোম্যানিয়াক হন। রোগীর নিজেকে নিয়ে অদ্ভুত আত্মমুগ্ধতা দেখা যায়। নিজেকে সাজানো, নিজের গুণগান গাওয়া এবং সর্বোপরি অত্যন্ত গর্বিত হাবভাব থাকাটা খুবই স্বাভাবিক এই রোগে। নিজ সৌন্দর্য্য, গুরুত্ব এবং মহানতা ছাড়া এঁদের মাথায় অন্য কোনও চিন্তা আসে না। ফলে তাঁরা বিশেষ ব্যবহার, ক্ষমতা, অর্থ এবং সাফল্য নিয়ে কল্পনা করেন। নিজের কাজে সেই জন্য ফাঁকি দেওয়া এবং অন্যের সামনে ক্ষমতা জাহির করাটাও এই ক্ষেত্রে স্বাভাবিক।   

অন্যরা তাঁদেরকে অত্যন্ত নাক উঁচু মানসিকতার মনে করলেও আদতে এঁরা নিজেকে নিয়ে হীনমন্নতায় ভোগেন। সবসময় অন্যের আগ্রহ পাবার চেষ্টা করেন। সাফল্য পাবার উদ্দেশ্যে অন্যের বিশ্বাস বা ভালবাসার সুযোগ ওঠাতেও পিছপা হন না। ফলে কোনও সম্পর্কে বেশী দিন টেঁকা এঁদের পক্ষে কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।  

হিস্ট্রায়োনিক পার্সোনালিটি ডিস্‌অর্ডার

রোগী এই ক্ষেত্রে অন্যের দৃষ্টি আকর্ষনের জন্য অনিয়ন্ত্রিত আবেগ প্রদর্শন করে থাকেন। সব সময় অন্যের মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু হবার উদ্দেশ্যে এঁরা যা খুশী করতে পারেন, এমন কি আত্মহত্যারও হুমকিও দিতে পারেন। এই সমস্ত আবেগ জনিত চালচলন তাঁদের পোষাক-আসাক এবং হাব ভাবেও ফুটে ওঠে। 

ব্যক্তিগত সম্পর্কেও এঁরা বাস্তব পরিস্থিতি বিচার না করে তাই নিয়ে অতি আবেগে ডুবে থাকতে চান। সামান্য আলাপেই এঁরা ভীষণ আন্তরিক ভালবাসা দেখান ফলে লোকে সেটাকে নকল বলে মনে করেন। এঁদের একটানা কোনও কিছুতেই মন বসতে দেখা যায় না।  

বিভাগ গ

অবসেসিভ ও কম্পালসিভ কিছু চালচলন, নিজেকে নিয়ে দুশ্চিন্তা, নিজের ওপর অনাস্থা এবং একলা থাকার ইচ্ছা এই ক্ষেত্রে রোগীর মধ্যে লক্ষ করা যেতে পারে।

অ্যাভয়েডেন্ট পার্সোনালিটি ডিস্‌অর্ডার

অন্যেরা তাঁকে নিয়ে কী ভাবছে তা রোগীর দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। অন্যেরা তাঁর ভুল ত্রুটি দেখতে পাবে, তাঁকে খারাপ কথা বলবে এই নিয়ে তাঁরা প্রবল ভয়ে বাস করেন। ফলে লোকের মাঝে এঁরা স্বাভাবিক ভাবে চলতে পারেন না। এঁরা লোকের সাথে মিশতে চান। কিন্তু অর্থহীনতা ও বুদ্ধিহীনতার জন্যে তিরস্কৃত হবার ভয়ে তা করে উঠতে পারেন না। ফলে তাঁরা এইরকম পরিস্থিতি এড়িয়ে চলেন। অনেক সময়ই এদের কে দেখে লাজুক মনে হয়।

ডিপেন্ডেন্ট পার্সোনালিটি ডিস্‌অর্ডার

এঁরা আশে পাশের লোকের ওপর অতি মাত্রায় নির্ভরশীল হন। এঁরা স্বাধীনভাবে চিন্তা ভাবনা বা সিদ্ধান্ত নিতে ভয় পান। তাঁরা মনে করেন তাঁদের সেই ক্ষমতা নেই। একলা কোন কাজে এঁরা অসহায় বোধ করেন। এর জন্য অনিচ্ছা সত্ত্বেও এঁরা নিজেকে কারও কাছে সম্পূর্ণ সঁপে দেন। কোনও ব্যাক্তিগত সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যাওয়ার চেয়ে বড় আতঙ্ক এঁদের কাছে কিছু হতে পারে না। তাঁর জন্যে এঁরা দুর্ব্যবহার অবধি সইতে রাজি থাকেন। এই ক্ষেত্রে অ্যাঙজাইটি এবং ডিপ্রেশনের সম্ভাবনাও বেশী।

অবসেসিভ কম্পালসিভ পার্সোনালিটি ডিস্‌অর্ডার/অ্যানানকাস্টিক পার্সোনালিটি ডিস্‌অর্ডার

এঁরা নিজের কাজ করার ধরন নিয়ে অত্যন্ত একগুঁয়ে হন। সবকিছু নিপুণ ভাবে করার জন্য এঁরা যে কোনও পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারেন। কাজটি বিশেষ ভাবে না করা হলে করবই না গোছের মানসিকতায় এঁরা বিশ্বাস করেন। তাঁর জন্য প্রয়োজনে সুখ, শান্তি, আরাম এবং নিজের যত্ন নেওয়া ছাড়তেও এঁরা রাজি থাকেন। অনেক ক্ষেত্রেই এঁরা অফিসের কাজ নিপুণ ভাবে করতে গিয়ে নিজের পরিবারের প্রতি চূড়ান্ত অবহেলা দেখান।

এঁরা নিজেদেরকে একটা কড়া অনুশাসনে বেঁধে ফেলার চেষ্টা করতে থাকেন। অনেক সময়ই এঁদেরকে লোকজন কিপটে মনে করে। এঁরা নিজেরাও বোঝেন যে যা করছেন তা অযৌক্তিক, কিন্তু শত চেষ্টাতেও পাল্টাতে পারেন না।  

অবসেসিভ কম্পালসিভ ডিস্‌অর্ডারের সাথে এই রোগের তফাত

অনেকেই এই অসুখটিকে ওসিডি র সাথে গুলিয়ে ফেলেন। একজন ওসিডি রুগী পরিস্থিতি এড়াবার জন্যে কাজটা বার বার করতে থাকেন। কিন্তু ব্যাক্তিত্ব বিকারে তিনি বাধ্য হয়ে এইরকম কিছু করেন না। নিপুণতা থেকে ছিটকে যাবার ভয়ে করতে থাকেন। ওসিডি তে কাজ করবার ভয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েন রোগী। কিন্তু এই ক্ষেত্রে কাজ গুছিয়ে না করতে পারার ভয়ে রোগী অসুস্থ বোধ করতে থাকেন। সবচেয়ে বড় কথা, ওসিডি র ক্ষেত্রে রোগী স্বীকার করেন যে তিনি অসুস্থ। কিন্তু ব্যক্তিত্ব বিকারে রোগী সেটা মেনে নিতে চান না।

 


অনুসন্ধান করুন

সম্পর্কিত