পোস্ট-পার্টাম সাইকোসিস

img

পোস্ট-পার্টাম সাইকোসিস কী?

সন্তান প্রসবের আগে ও পরে যে মানসিক সমস্যাগুলি দেখা দেয় তাকে পোস্ট-পার্টাম সাইকোসিস বা পিওরপেরল সাইকোসিস বলে।

মনোরোগের ইতিহাস থাক বা না থাক, যে কোনও মহিলাই পোস্ট-পার্টাম সাইকোসিসের শিকার হতে পারেন। সেই মহিলা, তাঁর স্বামী এবং তাঁর পরিবারের জন্যে এটি একটি ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা হতে পারে। সাধারণত একবার পোস্ট-পার্টাম সাইকোসিসের পর মহিলারা সম্পূর্ণ সেরে ওঠেন।

বিশেষ দ্রষ্টব্য: পোস্ট-পার্টাম সাইকোসিস ‘এ আপৎকালীন চিকিৎসা প্রয়োজন। এই পরিস্থিতিতে আক্রান্ত মায়ের উপসর্গ নাটকীয় ভাবে বদলাতে পারে। অনেকেই ভূত-প্রেতের ভর ভেবে এই রকম পরিস্থিতিতে ওঝার কাছে নিয়ে যান। এতে চিকিৎসা শুরু করতে দেরি হয়, মা এবং সন্তান উভয়ের পক্ষেই বিপজ্জনক সাব্যস্ত হতে পারে।

পোস্ট-পার্টাম সাইকোসিসের উপসর্গগুলি কী?

  • মানসিকতার দ্রুত পরিবর্তন: উন্মাদনা বা অসংলগ্ন আচরণ, জোরে গান গাওয়া বা নাচ করা
  • অস্থির আচরণ, চুপচাপ না বসতে পারা
  • খিটখিটে মেজাজ, চেঁচামেচি করা
  • ক্রমাগত অস্বাভাবিক চিন্তার ফলে উদ্ভট বা জড়ানো কথা বলা
  • হঠাৎ করে সাহসী বা নতুন রকম কোনও আচরণ: যেমন সম্পূর্ণ অচেনা এক ব্যক্তির কাছে গিয়ে কথা বলতে শুরু করে দিলেন
  • বেশি কথা বলা
  • নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া
  • শান্তিতে ঘুমাতে না পারা
  • সন্দেহবাতিক এবং আতঙ্কিত হয়ে পড়া
  • মতিভ্রম বা ডিল্যুশন: মনে কাল্পনিক এবং অবাস্তব ধারনার জন্ম নেওয়া যেমন, নিজের সন্তানকে অন্য কারও মনে হওয়া বা প্রচুর টাকার মালিক হয়ে গেছি ভাবা
  • দৃষ্টিভ্রম/শ্রুতিভ্রম বা হ্যাল্যুসিনেশন: অবাস্তব দৃশ্যাবলী দেখতে পাওয়া বা কাল্পনিক শব্দ শুনতে পাওয়া

এই উপসর্গগুলি একজন মায়ের কাজ আরও কঠিন করে তোলে। তিনি যে অসুস্থ তা হয়ত তিনি বুঝতে পারেন না। কিন্ত আশেপাশের লোকেরা বোঝেন যে কোথাও কোনও গোলমাল হচ্ছে। এই রকম কঠিন সময়ে সেই মহিলার আপৎকালীন চিকিৎসা প্রয়োজন।

বিশেষ দ্রষ্টব্য: পোস্ট-পার্টাম সাইকোসিসের উপসর্গ খুব দ্রুত প্রতি ঘন্টায় বা প্রতি দিন বদলে যেতে পারে।

পোস্ট-পার্টাম সাইকোসিস কেন হয়?

পোস্ট-পার্টাম সাইকোসিসের শিকার হওয়া কোনও অপরাধ না। এবং সম্পর্কে টানাপোড়েন বা মানসিক উদ্বেগের সাথেও এর কোনও যোগাযোগ নেই। এই সমস্যা অনেক কারণে হতে পারে যার মধ্যে জিনগত কারণ অন্যতম। খুব ঘনিষ্ট কেউ যেমন নিজের মা বা বোনের পোস্ট-পার্টাম সাইকোসিস হয়ে থাকলেও তাতে ঝুঁকি বেড়ে যায়। শরীরে হরমোনের তারতম্য বা অনিদ্রা থেকেও এই সমস্যা দেখা দিতে পারে।

সেই ক্ষেত্রে কিভাবে পোস্ট-পার্টাম সাইকোসিস এড়ানো সম্ভব?

বাইপোলার বা স্কিৎজোফ্রেনিয়ার মতন কোনও রোগ আগে থেকে থাকলে, প্রসবের পরে আবার সেই অসুখ দেখা দিতে পারে। সেই ক্ষেত্রে আগে থেকেই একজন সাইকায়াট্রিস্ট ও গাইনোকলোজিস্ট ‘এর পরামর্শ নিন। তাঁদের পরামর্শ অনুসারে চললে সন্তান সম্ভবা হওয়ার আগেই সুস্থ হয়ে ওঠা সম্ভব। কয়েক জায়গায় প্রিনেটাল সাইকায়াট্রিস্টরা বসেন, যারা শুধুমাত্র মাতৃত্বকালীন মনোরোগের চিকিৎসা করেন। তাঁদের সাহায্য নিন।

আপনি যদি গর্ভবতী হন এবং আপনার পোস্ট-পার্টাম সাইকোসিস হওয়ার ঝুঁকি থাকে, তাহলে অবিলম্বে আপনার সাধারণ চিকিৎসক বা গাইনির পরামর্শ নিন। প্রয়োজন হলে তিনি হয়ত আপনাকে কোনও মনোবিদের কাছে পাঠাতে পারেন। সে ক্ষেত্রে তাঁরাও আগে থেকে আপনাকে সুস্থ করে তোলার পরিকল্পনা বানাতে পারবেন।

বিশেষ দ্রষ্টব্য: বাইপোলার বা স্কিৎজোফ্রেনিয়ার ওষুধ খেলে গর্ভবতী হওয়ার আগে মনোবিদের পরামর্শ নিন।

পোস্ট-পার্টাম সাইকোসিসের চিকিৎসা

পোস্ট-পার্টাম সাইকোসিসে আক্রান্ত মহিলার অবিলম্বে চিকিৎসা প্রয়োজন। আজকাল অনেক জায়গায় মনোরোগে আক্রান্ত মায়েদের চিকিৎসার উদ্দেশ্যে আলাদা স্বাস্থকেন্দ্র চালু করা হয়েছে। সেখানে মায়ের সাথে একজন মহিলা যত্নপ্রদানকারী থাকতে পারেন যিনি বাচ্চার দেখভাল করার দায়িত্ব নেবেন।

পোস্ট-পার্টাম সাইকোসিস থেকে সেরে উঠতে বেশ কয়েক সপ্তাহ বা মাস লাগতে পারে। সব থেকে খারাপ উপসর্গের স্থায়িত্ব ২-১২ সপ্তাহ লাগতে পারে। অধিকাংশ মহিলারাই সম্পূর্ণ সেরে ওঠেন। কিন্তু কারও কারও অনেক পরের দিকে বা আবার মা হওয়ার সময় কিছু উপসর্গ দেখা দিতে পারে।

চিকিৎসা চলাকালীন স্তন্যপান করানো

স্তন্যপান করানোর আগে একজন মনোবিদের সাথে আলোচনা করে নিন। কিছু ওষুধ, মাতৃদুগ্ধের সাথে মিশে আপনার সন্তানের ক্ষতি করতে পারে। চিকিৎসক সেই ক্ষেত্রে আপনাকে অন্য কোনও নিরাপদ ওষুধ দেবেন।

স্তন্যপান করান কোনও অবস্থাতেই বন্ধ করা যাবে না। এতে শিশুর কোনও রকম ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা নেই। মা অস্বাভাবিক আচরণ করলে সেই সময় বাচ্চাকে তাঁর থেকে দূরে রাখুন। সবসময় মা এবং শিশুকে চোখে চোখে রাখুন।

সেরে ওঠার পর

পোস্ট-পার্টাম সাইকোসিসের পরে সাধারণত হতাশা, দুশ্চিন্তা এবং হীনমন্যতা দেখা দেয়। এই ধাক্কা সামলে উঠতে একটু সময় লাগতে পারে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মহিলারা ধীরে ধীরে আগের মতন স্বাভাবিক হয়ে ওঠেন।

নিজের পরিবার ও বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে কথা বলুন। যদিও তাঁদের হয়ত আপনার সাথে আগের মত মিশতে সময় লাগবে। প্রয়োজন অনুযায়ী একজন সাইকোলজিস্ট, একজন সাইকো থেরাপিস্ট ও একজন কাউন্সেলরের সাহায্য নিন।

পোস্ট-পার্টাম সাইকোসিসের সাথে লড়াই

মায়েরা কি করবেন:

পোস্ট-পার্টাম সাইকোসিসের পরে সন্তানকে মানুষ করা নিয়ে ভয় লাগা খুবই স্বাভাবিক। সুস্থ মায়েদেরও একই রকম ভয় করে।

অনেক মায়েদের সুস্থ হওয়ার পর শিশুর সাথে ভাব জমাতে সমস্যা হতে পারে। ভেঙ্গে পড়বেন না, কারণ এটি খুবই সাময়িক। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পোস্ট-পার্টাম সাইকোসিস থেকে সেরে ওঠার পর মায়েরা সন্তানদের সাথে ভাল রকম ভাব জমিয়ে ফেলেন। আপনি একজন অবস্টেট্রিশিয়ান, গাইনি বা মনোবিদের সাথে এই বিষয়ে আলোচনা করুন। এই সময়ে একজন মায়ের স্বাভাবিক জীবন সুনিশ্চিত করা তাঁর পরিবারের দায়িত্ব।

স্বামীরা কি করবেন:

অনেকেই নিজের স্ত্রীর পোস্ট-পার্টাম সাইকোসিস আছে শুনে ভয় পেয়ে যান বা মানসিক ভাবে ভেঙে পড়েন।  আপনার স্ত্রী হয়ত নিজের অসুস্থতার কথা মানতে চাইবেন না, তাই তাঁকে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাওয়াটা আপনার দায়িত্ব। তাঁকে যদি হাসপাতালে তাঁর শিশুর সাথে ভর্তি করতে হয় তাহলে হতাশ হবেন না, কারণ এই মুহুর্তে আপনার ঘাড়েই সবথেকে বেশি দায়িত্ব। এমন কি মনোবিজ্ঞানীর সাথে আপনারও কথা বলা জরুরি। তাঁরা আপনাকে সঠিক পথ দেখাতে পারবেন।

আপনার স্ত্রী সুস্থ হয়ে ফিরে এলে চেষ্টা করুন:

  • যতটা সম্ভব শান্ত থাকুন এবং তাঁর পাশে দাঁড়ানোর।
  • মন দিয়ে তাঁর কথা শোনার।
  • তাঁকে বাড়ির কাজকর্মে সাহায্য করার।
  • বাচ্চার যত্ন নিতে সাহায্য করার। দরকার হলে একটি আয়া ঠিক করে দিন।
  • তাঁকে নিয়মিত ওষুধ খেতে সাহায্য করুন এবং লক্ষ্য রাখুন যে তিনি চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া যাতে কোনও ওষুধ খাওয়া বন্ধ না রাখেন।
  • রাত্রে তাঁকে পর্যাপ্ত বিশ্রামের সুযোগ দিন।
  • বাড়ির কাজকর্ম করতে অন্য লোকজনদের সাহায্য নিন। এতে আপনি মা ও শিশুর সাথে সময় কাটাতে পারবেন।
  • বাড়িতে যাতে সবসময় অতিথি অভ্যাগতদের ভিড় না লেগে থাকে সেদিকে খেয়াল রাখুন।
  • বাড়ির পরিবেশ শান্ত রাখুন।
  • ধৈর্য ধরুন। পোস্ট-পার্টাম সাইকোসিস থেকে সেরে উঠতে সময় লাগে।
  • নিজের স্বাস্থের যত্ন নিন এবং নানা রকম কু-অভ্যাস এড়িয়ে চলুন।
  • পরবর্তী সময় আপনার অভিজ্ঞতা নিয়ে আলোচনা আপনার স্ত্রীর আরোগ্যের কারণ হতে পারে।
  • আপনারা দু’জনেই কাউন্সেলিঙ্গের সাহায্য নিন।