পোস্ট-পার্টাম ডিপ্রেশন নিয়ে ওরা আমাকে যা বলেনি

img

মা হবার সময় তাঁরা আপনাকে অনেক জ্ঞ্যান দেবে। ‘তাঁরা’ বলতে আমি এখানে, আত্মীয়, বন্ধুবান্ধব, বই, ইন্টারনেট, ইত্যাদির কথা বলছি। তাঁদের হয়ত এই বিষয়ে যথেষ্ট অভিজ্ঞতাও আছে জ্ঞ্যান দেবার মত। আপনি কি খাবেন, কি খাবেন না, কোন কোন ব্যায়াম করবেন আর কতটা করবেন, কি পরবেন, কি এড়িয়ে চলবেন, কি ওষুধ খাবেন কি খাবেন না, কি কি না করলেও চলবে, ইত্যাদি। এই রকম অনেক কিছু নিয়েই তাঁরা কথা বলবেন। কিন্তু যেটা নিয়ে তাঁরা কেউই কিছু বলবেন না, তা হল পোস্ট-পার্টাম ডিপ্রেশন।

আমার বাচ্চার জন্মের কিছুদিন পর (তথাকথিত ‘স্বাভাবিক’ প্রসব, এপিসিওটমি, উফ্‌), আমি লক্ষ্য করলাম যে আমার মেয়ের জন্যে আমি যথেষ্ট মাতৃদুগ্ধের যোগান দিতে পারছি না। তার উপরে সে ছিঁচকাঁদুনে। এই দু’টির মধ্যে কোনও যোগাযোগ থাকার সম্ভাবনা ভেবেও উড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। আমার মেয়ে ও আমার চিকিৎসার ব্যর্থ  চেষ্টাও করা হয়েছে। আমায় বাধ্য হয়ে মেনে নিতে হল যে তিন বছর বয়স অবধি আমার মেয়ে প্রত্যেকদিন রাত্রে সাত ঘন্টা কাঁদবে। আমায় এও বলা হল যে আমার স্তনে পর্যাপ্ত মাতৃদুগ্ধ তৈরি না হবার কারণ আমার অনীহা। আমায় এও বলা হল যে শিক্ষিত মহিলাদের মধ্যে নাকি এটা আকছার দেখা যায়, কারণ তাঁরা এই ব্যাপারে বড্ড বেশি ভাবেন। শেষের বাণীটি বলাই বাহুল্য, এক নামজাদা (এবং পুরুষ) শিশু চিকিৎসকের বলা।

আমাকে আরও অনেক কিছু বলা হয়েছিল। কিন্তু আমাকে কেউ বলেনি যে এক্ষেত্রে মানসিক ভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়াটা স্বাভাবিক। কেউ বলেনি যে যোনিদ্বারে অপারেশনের যন্ত্রণায়, শারীরিক ক্লান্তিতে, ছিঁচকাঁদুনে বাচ্চাকে সামলে ক্রমাগত নিজেকে অপদার্থ মনে করে, এই দুনিয়ার সবচেয়ে ভয়ঙ্কর সুন্দর সময়ে মানসিক ভাবে ভেঙ্গে পড়াটাই স্বাভাবিক।

যাই হোক, তো আমিও গ্লানিতে ভুগতে শুরু করলাম। তুলনামূলক ঝঞ্ঝাটমুক্ত ডেলিভারি হওয়া সত্ত্বেও আমি খুশি নই কেন? আমার মেয়েকে কোলে নিলে আমার মন অনাবিল আনন্দে ভরে ওঠে না কেন? আমাকে তো আমার মা-বাবা সাহায্য করছেন যথাসাধ্য, তাও কি আমার মনে এক ফোঁটাও কৃতজ্ঞতা নেই? কোনও উত্তর ছিল না এ’সবের। হতাশা, একাকীত্ব এবং ক্লান্তিতে আমার প্রত্যেকটা দিন কাটত। কারণ তাঁরা আমাকে এটাই শিখিয়েছিল যে মা হওয়া মানেই অনাবিল আনন্দ। কিন্ত, হা ঈশ্বর! ঘৃণামিশ্রিত কষ্ট? নিঃসন্দেহে আমার মধ্যে কোনও গোলমাল আছে!

কিন্তু এই যে ‘কোনও গোলমাল’ আসলে পোস্ট-পার্টাম সিন্ড্রোম তা আমার একবারও মাথায় আসেনি। অথচ আমি কিন্তু এই ব্যাপারে পড়েছি। কিন্তু আমার এই সমস্যা কেন হবে খামকা? মানে আমি তো আর কোনও ভুলচুক করিনি তাই না? ঠিকমত খেয়েছি, যোগব্যায়াম করেছি, প্রসবের আগের দিন অবধি কাজ করেছি, সমস্ত বাজে জিনিস এড়িয়ে চলেছি। একদম লক্ষ্মী মেয়ের মত। তাছাড়া আমি কি বাস্তবিকই হতাশ? না এমনি মনটা ভাল নেই? কারণ মন খারাপ তো মানুষের হতেই পারে।

মাতৃত্ব সংক্রান্ত বিভিন্ন বই এবং ইন্টারনেটে লেখা থাকে যে বাচ্চা জন্মানোর পরে একটু মন কেমন করা স্বাভাবিক, কারণ মন ভাল করার জন্যে দায়ী হরমোন গুলি এই সময়ে কমে যায়। মানে, এটা একটা কথা হল? মন কেমন করা! যেন, “ইস্‌, আজ আর বাজারে করতে গিয়ে কাজ নেই, তাঁর চেয়ে চল কোথাও বসে একটু নলেন গুড়ের সন্দেশ খাই। আজ না খুব মন কেমন করছে।” সত্যি কথা বলতে সেই ভয়ঙ্কর দিনগুলিতে আমার চিৎকার করে বলতে ইচ্ছা করত, “হে ভগবান, আর পারছি না! আমি এক অপদার্থ মা বলেই এখন দিনরাত আমায় পেঁপে গিলতে হচ্ছে!” (পেঁপের চেয়ে বেশি এই দুনিয়ায় অখাদ্য কিচ্ছু নেই! আর আমায় কি না বুকে দুধ আনার জন্যে বেশি করে পেঁপে খেতে বলা হয়েছিল? এখন আমি পেঁপে আরই দু’চক্ষে দেখতে পারি না!)

আমার স্বামী প্রায়ই বলেন যে আমার সাথে ওই ক’মাস থাকা বেশ চাপের ছিল। নিশ্চয়ই তাই। এটা আমার চেয়ে কেই বা ভাল জানবেন, বলুন? আমার এক সময় পোস্ট-পার্টাম ডিপ্রেশন ছিল, এবং বলতে গেলে সহজেই আমি তা থেকে বেরিয়ে এসেছি। আমি খনই নিজেকে আমার মেয়ের থেকে দূরে সরিয়ে নেইনি। আমি কখনও তাঁর ক্ষতি চাইনি। পোস্টপার্তাম ডিপ্রেশনের ফলে অনেক মহিলাই কিন্তু তা করে বসেন। একজন মেয়ের জন্যে এমনিতেই এটা এক সাংঘাতিক অভিজ্ঞতা। তাঁর উপরে আগের মতন ছিপছিপে দেহ ফিরে পাওয়ার চেষ্টা, অফিসে মাইনে কাটা যাওয়া, নির্লজ্জের মতন অন্যদের ‘আবার কবে মা হব’ জানতে চাওয়া, যোগ হয়।

আরও বলব?

যদি কেউ পোস্ট-পার্টাম ডিপ্রেশনের গনগনে আঁচ সামান্যও টের পান, তাহলে অবিলম্বে কাইন্সেলিং’এর সাহায্য নিন। শুধু মায়েদেরই নয়, বাবাদের উদ্দেশ্যেও একই কথা বলছি। এতে হতাশার ঢেউয়ে টালমাটাল খেলেও, তিনি পুরোদমে হাবুডুবু খাবেন না।  

বেদশ্রী খাম্বাটে শর্মা ‘দেয়ার মে বি অ্যান অ্যাস্টেরিক্স ইনভলভড’ নামে একটি বই লিখেছেন। মুম্বাই’এ একটি বিজ্ঞাপন সংস্থার ক্রিয়েটিভ ডিরেক্টর হবার পাশাপাশি তিনি দু’টি সন্তানের মা। তিনি এর জন্যে রীতিমত পুরস্কার আশা করেন, কিন্তু কেউ শুনলে তো!