আপনি কি মা হওয়ার জন্যে তৈরি?

img

আমি যখন বড় হচ্ছিলাম, তখন ভেবেছিলাম যে আমি ঠিক ২৭ বছর বয়সে বিয়ে করব। কারণ ততদিনে আমি নিশ্চয় একটা ভাল চাকরি করব এবং একজন সঠিক জীবনসঙ্গী খুঁজে পাব। বছর তিরিশ নাগাদ আমার একটি সন্তান হবে। পঁয়ত্রিশের মধ্যে আবার চাকরি।

দেখতে দেখতে তিরিশ পেরিয়ে গেলাম, কোনওটাই হল না। প্রত্যেক জন্মদিনে মায়ের কথায় আমার নিজেকে টাইম বোমা মনে হত। ধীরে ধীরে, আত্মীয়-স্বজনরাও চুপ করে গেলেন। আশে পাশে সমস্ত বন্ধুরা বিয়ে করে মা হয়ে গেল। আর আমি মিষ্টি মাসির মত তাঁদের বাচ্চাদেরকে গল্পের বই কিনে উপহার দিতে লাগলাম।

এক সময় পঁয়তিরিশও হল। শুনলাম যে এই জীবনে আর বিয়ে বা বাচ্চা, কোনওটারই আশা নেই।

আগামী পাঁচ বছরে, পছন্দের চাকরি, বর, সন্তান সবই হল। এ’রকমটা ভাবিনি। কিন্তু আমার মনে হয় যে এইগুলো নিয়ে ভাবা বন্ধ করার জন্যেই সব হল।

আমি কি তৈরি ছিলাম? মোটেই না। এত বছর চূড়ান্ত উড়নচণ্ডী আর বাউন্ডুলে জীবন কাটিয়েছি। ওইটুকু খুদে যে আমার জীবন এতটা পালটে দেবে, তা কে জানত? প্রত্যেক দিন এই ভেবে ঘুমাতে যেতাম যে এই সব কিছু স্বপ্ন, সকালে উঠে দেখব আবার আগের মত হয়ে গেছে। আর আশ্চর্য্যের ব্যপার হল, আমার সন্তানকে ছাড়া আমি একটা মুহুর্তও কল্পনা করতে পারি না। তাহলে কি আমি মা হওয়ার জন্যে তৈরি ছিলাম? না!

আমার বন্ধু ‘ক’ এবং আমার সন্তানের নাম একই। তাঁর সন্তানের বয়স ১৮, আর আমার ৬। আমার আর আমার বন্ধুর বয়স এক। আমি ভাবলাম, হুম, আগে আগে মা হবার একটা ভাল দিক আছে। তাড়াতাড়ি সেই ক্ষেত্রে ঝাড়া-হাত-পা হওয়া যায়। সে তাঁর কেরিয়ারের দ্বিতীয় পর্যায়। নতুন উদ্যমে সে নিজে একটি ব্যবসা শুরু করেছে। গত বছরই আমাদের দেখা হয়েছিল। তখন জানলাম যে নদীর ও’পাশের জগতটা খুব একটাও মজার নয়। যেই বয়সে আমি একের পর এক প্রেমিকদের সঙ্গে হিল্লি-দিল্লী ঘুরে বেড়িয়েছি সে বয়সে ও দু’টি সন্তানকে মানুষ করার পাশাপাশি নিজের পড়াশুনা চালিয়ে গেছে।

সন্তান ধারণের সঠিক সময় বলতে শরীরের সময় বোঝা উচিত। কিন্তু তা পরিবর্তনশীল। বয়স কম হলেই যে আপনার শরীর সন্তান ধারণের উপযুক্ত হবে, তাঁর কোনও মানে নেই। তেমনই বৃদ্ধ হলেই যে সে ক্ষমতা চলে যাবে তারও কোনও মানে নেই। কোনও দিন এই কথা বলব ভাবিনি, তবুও বলছি। সন্তান ধারণের ক্ষেত্রে তিনটি সূচক আছে: বায়োলজিক্যাল ক্লক, কেরিয়ার ক্লক আর ইমোশনাল ক্লক। আপনাদের বোঝার সুবিধার্থে আমি এটাকে তিনটি টাইম জোনে ভাগ করব, যে বয়সগুলিতে সাধারণত মহিলারা মা হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।: ২০, ৩০, এবং ৪০। মাঝের দলের কপালে থাকে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তি। অদ্ভুত ব্যাপার এই যে অধিকাংশ মহিলা আবার ৩০ ‘এর আশে পাশেই মা হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেন।

এর উলটো দিকটা হল, যে ২০ ‘র  আশে পাশে যারা মা হন, তাঁরা ৪০ ‘র কোঠায় পৌঁছে আবার ফুরফুরে জীবন কাটান। আবার পরের দিকে মা হলে, তাঁরা ইতিমধ্যেই এক রঙচঙ্গে জীবন কাটিয়ে ফেলেন, প্রচুর শখ আহ্লাদ মিটিয়ে ফেলেন।

যতই পরিকল্পনা করুন না কেন, মা হওয়ার পর আপনার মনে একটাই প্রশ্ন আসবে: এর জন্যেই কি এত পরিশ্রম করলাম? আর তাঁর চেয়েও খারাপ হল, আপনার আনন্দ হবে। কারণ এতদিন ধরে যত উপদেশ শুনেছেন, আজ তার জবাব দেওয়ার সময় উপস্থিত।

মাতৃত্ব এক কঠিন সময়। অথচ তা নিয়ে কেউ মাথা ঘামান না। কেউ কেউ হয় এত জলদি মা হন যে কিছু বুঝে ওঠার সময় পান না, আর কেউ কেউ এত দেরিতে মা হন যে চাইলেও কিছু বুঝে ওঠার সময় থাকে না।

এই ‘সঠিক সময়ের অপেক্ষা’ ব্যাপারটা খুবই হাস্যকর। এর মানেই হল যে আপনি মা হওয়ার জন্যে ‘তৈরি’ হতে পারেন। একজন শিশুর আগমন ততটাই অনির্দিষ্ট যতটা আপনার নিজের জীবন। এই ক্ষেত্রে আমি দু’টি জিনিসই বলব: আপনি তখনই মা হতে পারেন যখন আপনি নিজেকে চিনতে শিখবেন। কারণ এক মাত্র মা হলে পরেই নিজের যোগ্যতা অনুভব করা যায়। একে পুরোপুরি মজা ব্যাপার বলা যায় না, কারণ আপনি ভবিষ্যৎ সম্পর্কে অবগত নন। কিন্তু আপনি যদি সত্যিই মা হতে চান, তবে আপনাকে আটকায় কার সাধ্যি!

আপনি কখন মা হওয়ার জন্যে তৈরি না বলতে পারলেও, কখন নন, তা বলতে পারি:

১. আপনি তৈরি নন কারণ আপনি নিজের পেশাকে ভালবাসেন। এবং মা হওয়ার পরে সে কাজে যোগদান দেওয়াই সবথেকে কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। আপনার অবর্তমানে আপনার চেয়েও যোগ্য কেউ আপনার আসন কেড়ে নেবে, এটাই নিয়ম।

২. আপনি তৈরি নন কারণ আপনার সঙ্গী তৈরি না। একবার নিজের শুক্রাণু দান করার পর দেখবেন, আপনার সঙ্গী বাড়ির বাইরে থাকার জন্য যত রাজ্যের কাজ খুঁজে বের করবেন। সেই ক্ষেত্রে, অরক্ষিত মিলনের পূর্বে আপনার সঙ্গীর সাথে আলোচনা করুন।

৩. সন্তান ধারণ আর পদক জেতা এক: এই রকমটা ভেবে থাকলে আপনি তৈরি নন। তার চেয়ে খেলায় মেডেল জেতা বা অফিসে সেলস টার্গেট অ্যাচিভ করা অনেক বেশী যুক্তি সঙ্গত। অনভিজ্ঞ কাজে আপনি আনন্দ নাও পেতে পারেন।

৪. আপনি তৈরি নন কারণ আপনার মনে হয় সন্তান এলে পরে আপনাদের বৈবাহিক সম্পর্ক এক অন্য মাত্রা পাবে। বরং এটা সবচেয়ে কঠিন এক সময়, কারণ আপনার মা হওয়া মানেই বেশ কিছু বিপণি সংস্থার আজীবন লক্ষী-লাভ। সেই অতিরিক্ত খরচের ধাক্কা সামলাতে পারবেন তো?

৫. আপনি তৈরি নন কারণ আপনার এবং আপনার স্বামীর, দু’জনেরই মা-বাবা জীবিত। শুরুতে ভাল লাগলেও পরে ঠাকুর্দা-ঠাকুমা আর দাদু-দিদাকে সামলে ওঠা মুস্কিল হয়ে পড়বে।

৬. আপনি তৈরি নন কারণ আপনার সমস্ত বন্ধু বান্ধবদের ধেড়ে বাচ্চা আছে। তাঁরা আপনার সন্তানের সঙ্গে খেলবে তো?

৭. আপনি তৈরি নন। কারণ আপনার বেড়াল ভাল লাগে। ভাল কথা। আরও বেশি করে ম্যাও পুষুন। কারণ সে কথা বলে না, কাঁদেও না বা একই গল্প হাজার বার বলতেও বলে না।

৮. বন্ধুদের বাচ্চাদের হাসিমুখে সামলে নেন? তাহলে আপনি এখনো মা হওয়ার জন্যে তৈরি নন। কারণ বন্ধুদের বাচ্চা সাময়িক, আপনারটা পাকাপাকি।

৯. আপনি তৈরি নন কারণ আপনার শিশুদের খুব ভাল লাগে। বাচ্চাদের সাথে খেলা আর ৩৬৫ দিন, ২৪ ঘন্টা তাঁদেরকে মানুষ করা এক কথা না।

১০. আপনি তৈরি নন কারণ আপনার অগাধ টাকা আছে। টাকা কোনও দিনও অগাধ হয় না। ব্ল্যাক-হোল জানেন তো?

১১. আপনার কোনও দিনই নিজেকে প্রাপ্তবয়স্ক মনে হবে না। নিজেকে ততটা যোগ্য মনে হবে না যেখানে আপনার নিষ্পাপ শিশু আপনাকে দেখে ভাল কিছু শিখবে।

১২. বৈবাহিক জীবনে কোনও স্থিতিশীল দিন আসে না। কোনও দিনও না।

মাতৃত্ব আপনার জীবনকে আমূল বদলে দেয়। কতকটা এই রকম: স্তন্যপান করানো, বাচ্চাকে ঢেঁকুর তোলানো, দোল খাওয়ানো, তাঁর মল পরিষ্কার করা, ন্যাপি ধোয়া, নিজে স্নান করা, বাচ্চাকে স্নান করানো, স্তন্যপান করানো, আবার মল পরিষ্কার করা, ন্যাপি পাল্টানো, স্তন্যপান, দুপুরের খাবার খাওয়া, স্তন্যপান, ঢেঁকুর, ন্যাপি পাল্টানো, নিজে প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেওয়া, আবার স্তন্যপান করানো, ঢেঁকুর তোলানো, গান গাওয়া, মজাদার মুখ বানিয়ে দেখানো, মল পরিষ্কার ইত্যাদি।

এর মানসিক চাপ প্রবল। প্রসব করার সাথে সাথেই কেউ মা হয়ে যান না। ক্ষোভ, মানসিক দন্ধ, ধোঁয়াশা, এবং এই সবের ফলে হতাশা দেখা দেওয়া, যার পোশাকি নাম পোস্টন্যাটাল ডিপ্রেশন বা পোস্ট-পার্টাম ডিপ্রেশন। আশ্চর্যের ব্যাপার হল, যে সন্তান মানুষ করার মিষ্টি মিষ্টি উপদেশে ঠাসা বইগুলিতে এর কোনও উল্লেখ থাকে না।

অনেকে অন্য মায়েদের সাথে কথা বলে দেখেন, শোনেন তাঁরা কী বলছেন। আবার অনেকে চারপাশ থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে নিজেকে হতাশার খোলসে মুড়ে ফেলেন। অনেকেই এই ক্ষোভ জমিয়ে রাখেন; লজ্জায়, ভয়ে কোথাও মুখ খোলেন না।

এটা করবেন না। কথা বলুন। যাকে ভালবাসেন তাঁর সাথে। আপনার বর। আপনার মা। আপনার বন্ধু-বান্ধব। অথবা মনোবিদ। প্রসবের পরে কাউন্সেলিং কে কেউ গুরুত্ব দেই না, অথচ এই সময় এটাই সবথেকে বেশি প্রয়োজন। কারণ সময় মতো তা না করালে পরে আপনার সন্তানের উপরেই কু-প্রভাব পড়বে। অনেক মহিলাই প্রসবের পরে হতাশায় ডুবে গিয়ে বুঝতে পারেন না যে কি করবেন। এটা আমার কাছে সবচেয়ে বেশি আতঙ্কের।

ললিতা আইয়ার একজন লেখিকা। তিনি “আই অ্যাম প্রেগন্যান্ট, নট টার্মিনালি ইল, ইউ ইডিয়ট!” নামে একটি বইও লিখেছেন।  একটি ছ’ বছরের ছেলে ও ক’টি বেড়ালের সাথে তাঁর ছোটবেলা কেটেছে।