মাতৃত্ব বনাম চাকুরিজীবন

img

আমি কি এবার বিরতি নেব? নাকি ছেড়ে দেব? নিজের শিশুকে কি একজন আয়ার হাতে ছেড়ে দেওয়া ঠিক? এই সমস্ত প্রশ্নের কোনও সদুত্তর দেওয়া সম্ভব নয়। সাকরা ওয়ার্ল্ড হসপিটালের মনোবিদ ডাঃ সাবরিনা রাও বললেন যে, এর উত্তর আপনাকেই খুঁজে নিতে হবে। সাবরিনা তিনটি সন্তানের মা। এবং প্রেগনেন্সির আগে ও পরে তিনি নিজের সুবিধা মত সময়ে কাজ করার অনুমতি পেয়েছিলেন। তাই হাসপাতালের মেডিক্যাল ডিরেক্টরের প্রতি তিনি খুবই কৃতজ্ঞ। এই সাক্ষাৎকারে আমরা ডাঃ রাও ‘এর সাথে মাতৃত্ব বনাম চাকুরিজীবনের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করব।

মাতৃত্ব একজন মহিলার জীবন পালটে দেয়। আজকালকার মায়েরা এ নিয়ে কী ভাবছেন? 

শহরাঞ্চলে, সাধারণত বিয়ের পরেই মা হওয়ার তাড়া থাকে না। এর কারণ হল ইদানীং অনেক দম্পতিই বিয়ের পরে পরিবারের থেকে আলাদা হয়ে থাকতে শুরু করেন। ফলে শ্বশুর বা শাশুড়ির তরফ থেকে বউমাকে সন্তান নিয়ে কোনও ঘ্যানঘ্যান শুনতে হয় না, বরং স্বাধীন ভাবে চিন্তা করার সুযোগ থাকে। মায়েরা আর্থিক সঙ্গতির কথাও ভেবে দেখছেন; উদাহরণস্বরূপ, অফিসে মাতৃত্বকালীন ছুটি দেবে কি না, তাঁদের পক্ষে আগামী দিনে সমস্ত খরচ সামলানো সম্ভব কি না। কেউ কেউ মানসিক ভাবে মা হওয়ার জন্য প্রস্তুত কিনা, তাও বোঝার চেষ্টা করেন। বেশ কিছু সংস্থাও এখন মহিলা কর্মীদের গুরুত্ব বুঝতে শুরু করেছে এবং তাঁরা এটিকে বোঝা নয়, বিনিয়োগ হিসেবে দেখছেন। কিন্তু বহু মহিলার জন্যেই আজও একটি সিদ্ধান্ত খুবই কঠিন। আমি যদি চাকরি জীবনে ফেরৎ যাই তাহলে আমার সন্তানকে কে দেখবে। সন্তানকে আনার সিদ্ধান্ত নেওয়া এতটাই কঠিন। এই সময় আপনার শরীর ও মনের পাশাপাশি আত্মপরিচয়েও এক বিশাল পরিবর্তন আসতে পারে।

তাহলে ধৈর্য সহকারে পরিকল্পনাই কি এই সমস্যার চাবিকাঠি?

সবাই হয়ত এই নিয়ে কোনওরকম পরিকল্পনা করেন না। একজন মহিলা শিক্ষিত হওয়া সত্ত্বেও হয়ত নিজের পরিবারের চাপ মেনে নিতে বাধ্য হন। অনেকের জন্যে এটি খুব স্বাভাবিক এক সিদ্ধান্ত। কারণ ছোটবেলা থেকেই তাঁদের শেখানো হয় যে বড় হয়ে বিয়ে করতে হবে এবং মা হতে হবে। এটা প্রায়ই বলা হয় যে মা হওয়ার জন্য কেউই তৈরি থাকেন না। এবং এটা এক অর্থে ঠিকও বটে। কারণ এই অবস্থায় সব কিছু আপনি নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন না। কিন্তু কিছু জিনিস আপনার আয়ত্তে থাকতেই পারে। খরচ কি রকম করবেন? আপনি কি চাকরি থেকে সাময়িক অবসর নেবেন? পরে চাকরি জীবনে যোগদান করলে আপনি কি ধরণের সহায়তা পেতে পারেন? এই সব আগে থেকে ঠিক করা থাকলে আপনার কাজ আরও সহজ হতে পারে। হ্যাঁ, তবে গর্ভাবস্থায় হওয়া বিভিন্ন শারীরিক সমস্যা আপনি নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন না।

একজন মহিলার পক্ষে চাকরি চলাকালীন মা হওয়া কতটা কঠিন?

আমাদের দেশে, প্রচুর সংস্থাই তাঁদের মহিলা কর্মীদের কোনও রকম মাতৃত্বকালীন সুবিধা দেন না। এমন কি, শিশুদের যত্ন নেওয়ার পর্যাপ্ত সুযোগ সুবিধাও নেই। কাজেই যেই সমস্ত মহিলারা শহরের মাঝে একটি অণু পরিবারে বাস করেন, তাঁদের নিজেদেরকেই যাবতীয় দায়িত্ব সামালাতে হয়। কেউ কেউ হয়তো তাঁর পরিবারের থেকে কিছুটা সাহায্য পান, কিন্তু এক সময় পরিবারের সদ্যস্যদেরও বয়স বাড়তে থাকে। কাজ করার সিদ্ধান্ত নিলে একজন মহিলা কি করবেন? ফলে পুরো দায়ত্বটাই কর্মক্ষেত্রের উপরে এসে পড়ে। লম্বা ছুটি বা ক্রেশের মত সুবিধা দিয়ে হয়তো মায়েদেরকে সাহায্য করা যেতে পারে। আর পুরুষদের চেয়ে মহিলারা যে কোনও অংশে কম নন, এই কথা কে না জানে? কাজেই একটি সংস্থা যদি তাঁর মহিলা কর্মীদের এই ন্যূনতম সুযোগগুলো দেন, তাহলে মায়েরা অনেকটা উৎসাহ সহকারে সফল এবং সক্ষম ভাবে কাজ করতে পারবেন।

এমনিতেই যেই সমস্ত মহিলারা তাঁদের সন্তানকে পরিবার বা আয়ার হাতে ছেড়ে অফিসে যান, তাঁদেরকে সমাজে ভাল চোখে দেখা হয় না। এই সমস্ত চিন্তা ভাবনাই মহিলাদের পক্ষে মাতৃত্বকে কঠিন করে তোলে।

সুতরাং গ্লানি এক বৃহৎ সমস্যা?

গোটা বিশ্বেই গ্লানি এক বৃহৎ সমস্যা। উদাহরণস্বরূপ তথ্য ও প্রযুক্তি নিয়ে যেই সমস্ত মহিলারা কাজ করেন, তাঁরা ছুটি নিতে পারেন না। প্রতিনিয়ত তথ্য ও প্রযুক্তি জগতে পরিবর্তন হওয়ার কারণে, তাঁরা লম্বা ছুটি নিলে পিছিয়ে পড়েন। অথচ এই ইঁদুর দৌড়ে সামিল থাকতে গিয়ে তাঁরা নিজেদের সন্তানকে একলা ফেলে রাখার গ্লানিতে ভোগেন। আক্ষরিক অর্থেই উভয় সংকট! বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে যে কর্মরত মায়েদের সন্তানেরা অনেক বেশি স্বাবলম্বী হয়। যদি সেই মা নিজেও হাসি খুশী থাকেন তবেই তিনি একজন সফল মা হয়ে উঠতে পারবেন। একজন মায়েরও সুস্থ মনের অধিকারী হওয়া খুবই প্রয়োজন। তাই বলি, এই গ্লানিবোধকে কাটিয়ে উঠুন।

একজন মহিলাকে বুঝতে হবে, যে তাঁর সুবিধা অনুসারে উনি যে রাস্তা বেছে নেবেন সেটাই ঠিক। কেউ যদি কর্মজগতে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে চান, তবে তাঁর তাই করা উচিত। কেউ আবার সন্তানকে মানুষ করার মধ্যেই পূর্ণতা খুঁজে পান। এর বিপরীত মুখী অসুবিধাও আছে। কষ্টার্জিত ডিগ্রি কেন জলে দেবেন? মহিলারা অনেক সময়ই সব কিছুতে সাফল্য পেতে চান – সবই করুন, তবে সামলে। আমার মতে, সেটাই ঠিক। নিজের মনের কথা শুনুন। মাতৃত্ব এক কঠিন সময়, ফলে আপনার বিচলিত হওয়া খুবই স্বাভাবিক।

এই মানসিক চাপ কি একজন মায়ের মানসিক সাস্থেও প্রভাব ফেলে?

একদম, এবং সাধারণত তাই হয়। বিভিন্ন মানসিক এবং সামাজিক চাপের ফলে এই অবস্থায় দুশ্চিন্তা ও হতাশাগ্রস্থ হয়ে পড়া খুবই স্বাভাবিক। একে বলা হয় পোস্ট-পার্টাম ব্লুজ। একজন মা, সন্তানের যত্ন নিতে গিয়ে প্রায়শই পোস্ট-পার্টাম ব্লুজের শিকার হন, এবং দ্রুত কর্মক্ষেত্রে ফিরতে চান। অনেকেই তাঁদের বলেন যে, “যদি ঘরেই বসে থাকবে তাহলে এত পড়াশুনা করে কি লাভ হল”।

এটা খুবই কঠিন একটি সময়। মহিলাদের প্রসবের পরে অন্তত ছয় সপ্তাহ ছুটি নেওয়া উচিত। যদি আপনার সংস্থায় মাতৃত্বকালীন ছুটির মেয়াদ কম হয়, তাহলে কতৃপক্ষের সাথে কথা বলে দেখুন, যদি অতিরিক্ত সময় পাওয়া যায়। প্রশ্ন করতে তো কোনও অসুবিধা নেই।

এর মধ্যে একজন স্বামীর ভূমিকা কী?

মা হওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় আপনার স্বামীর ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্ত আমাদের দেশে অধিকাংশ পুরুষই গর্ভাবস্থা বা প্রসব নিয়ে কোনও রকম মাথা ঘামান না। পুরো বিষয়টাকেই একজন মহিলার মাথাব্যথা বলে ছেড়ে দেওয়া হয়। এই সময় একজন স্ত্রীর আর্থিকের চেয়েও বেশী মানসিক সহায়তার প্রয়োজন। সন্তানকে আনার পূর্বে দুজনে একত্রে বসে সমস্ত কিছু পরিকল্পনা করে নিন। বাচ্চার ন্যাপি পাল্টানো থেকে শুরু করে খাবার খাওয়ানো, সবেতেই তার বাবারও যেন সমান যোগদান থাকে। আর পুরুষদের উদ্দেশ্যে একটাই কথা বলব, সন্তান মানুষ করাটা কিছু কম পুরুষালি ব্যাপার না!

বিচলিত হলে পরে একজন মা কার সাথে কথা বলবেন?

আপনার যদি মনে হয় যে আপনার মা বা শাশুড়ি আপনার সমস্যা বুঝতে পারবেন না তাহলে এমন কোনও মহিলার সাহায্য নিন যার অনুরূপ অভিজ্ঞতা আছে। নিজের আশেপাশে মহিলাদের সাথে কথা বলুন, জানার চেষ্টা করুন যে তাঁরা কিভাবে ঘরে-বাইরে উভয় দিকে সামলেছেন। মনে রাখবেন সবার সমস্যা কিন্তু আলাদা আলাদা হয়। কোনও কোনও সংস্থায় অভিজ্ঞ মহিলা বা কাউন্সেলররা থাকেন যারা এই সময় আপনাকে মানসিক সহায়তা দিতে পারেন। তাঁদের সাহায্য নেওয়ার পাশাপাশি আপনি একজন মনোবিদেরও সাহায্য নিতে পারেন।

নিজেকে কিভাবে সাহায্য করা সম্ভব?

অধিকাংশ মহিলাই প্রসবের পরে ক্লান্তি ও অনিদ্রায় ভোগেন। এই সময় গোটা পরিবারের তাঁর পাশে দাঁড়ানো উচিত। ঘরের দৈনন্দিন কাজ করাটাও তখন কঠিন মনে হতে পারে। অনেকেই হয়ত হাসি মুখে বাচ্চা সামলিয়ে মাত্র কয়েক হপ্তার মধ্যে সমস্ত ওজন ঝরিয়ে অফিসে যোগদান করেন। এসব শুনে ঘাবড়াবেন না। মনে রাখবেন, সবার অভিজ্ঞতা এক রকম হয় না।

একটা রুটিন বানান। যতটা সম্ভব তত বিশ্রাম নিন। রুটিন অনুযায়ী সমস্ত কাজ না করতে পারলে নিজেকে দোষারোপ করবেন না। নিজের যত্ন নেওয়াই যেন আপনার মূল লক্ষ্য হয়। মন খুলে কথা বলার কোনও সঙ্গী না পেলে ডাইরি লিখুন। দরকার মনে হলে একজন মনোবিদের সাহায্য নিন।

যেই সমস্ত মায়েরা কর্মজগতে যোগদান করতে চান, তাঁদের একজন ল্যাকটেশন কনসালটেন্টের পরামর্শ নিয়ে নিজের বুকের দুধ সংগ্রহ করে রাখার ব্যবস্থা করুন। আপনার অনুপস্থিতিতে একমাত্র সেটাই আপনার শিশুর খাদ্য হতে পারে।

প্রসবের পরে একটা কথা মনে রাখবেন, আপনি এখন আর আগের মত নেই। আপনি এখন আরও উন্নত। তাই নিজের উপরে গর্ব অনুভব করুন।