বিশেষজ্ঞের কলমে

বিল্ডিং ব্লকস্

মৌল্লিকা শর্মা
পরীক্ষার আগে আপনি কি পরীক্ষার্থীর ওপর অহেতুক চাপ সৃষ্টি করছেন?
মৌল্লিকা শর্মা

পরীক্ষার সময়ে একজন পরীক্ষার্থীর অভিভাবক এবং শিক্ষক খুবই মানসিক চাপ এবং উদ্বেগের মধ্যে থাকেন, যেন তারাই পরীক্ষায় বসতে চলেছেন। তাদের মনের এই উদ্বেগের পিছনে থাকে পরীক্ষায় অনেক নম্বর পেয়ে ভালো ফল করার মতো আপাত মূল্যবান একটি বিষয়। তারা মনে করেন যে, তাদের সন্তানরা বা ছাত্র-ছাত্রীরা পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করতে পারলে পরোক্ষভাবে তা অভিভাবক এবং শিক্ষকদেরই সফলতা। আসলে ছেলে-মেয়েদের পরীক্ষার নম্বরের উপরে বাবা-মা বা শিক্ষকদের কর্তব্যপালনের সার্থকতা লুকিয়ে থাকে বলে একপ্রকার ধারণা আমাদের মধ্যে প্রচলিত রয়েছে। অর্থাৎ, ছেলে বা মেয়ে পরীক্ষায় ভালো ফল করলে বাবা –মায়েরা ভাবেন যে, তাঁদের অভিভাবকত্বের জন্যই এমন হয়েছে। অথবা একজন শিক্ষক ভাবেন যে, তিনি ভালো পড়িয়েছেন বলেই ছাত্র বা ছাত্রী পরীক্ষায় ভালো নম্বর পেয়েছে।

তবে এটা অবশ্য সত্যি কথা যে, পরীক্ষায় একজন ছাত্র বা ছাত্রীর ভালো ফল করার পিছনে তার অভিভাবক এবং শিক্ষকদের একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। আবার অন্যদিকে বাচ্চাদের প্রত্যাশা বা চাওয়া-পাওয়ার উপর বাবা-মা বা শিক্ষকদের প্রভাব অনস্বীকার্য। তাই ছেলে-মেয়েরা তাদের প্রত্যাশাগুলিকে পূরণ করার জন্য কী করছে বা এই কারণে তারা মানসিকভাবে চাপের শিকার হচ্ছে কিনা, তা দেখা একজন অভিভাবক বা শিক্ষকের কর্তব্য। এক্ষেত্রে একজন শিক্ষার্থী যখন পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন অভিভাবক বা শিক্ষকদের কিছু বিষয় মনে রাখা জরুরি—

প্রথমত, পরীক্ষার ফলাফল অভিভাবকত্বের উপর নির্ভরশীল নয়- ছেলে-মেয়েদের পরীক্ষার ফলাফলের মধ্য দিয়ে বাবা বা মায়ের অভিভাবকত্বের সাফল্যের বিচার করা ঠিক নয়। অথবা ছাত্র-ছাত্রীদের পরীক্ষার ফলাফলের জন্য শিক্ষকদের যোগ্যতা বা দক্ষতার বিচার করা যুক্তিযুক্ত নয়। শুধুমাত্র বাবা-মা বা শিক্ষক চেয়েছেন বলেই একজন পরীক্ষার্থী ভালোভাবে পরীক্ষায় পাশ করেছে— তা নয়। বরং একজন পরীক্ষার্থী চেয়েছে বলেই সে পরীক্ষায় ভালো নম্বর পেয়েছে— বিষয়টিকে এইভাবেই বিচার করা যুক্তিযুক্ত। বাবা-মা বা শিক্ষক তাদের সন্তান বা ছাত্র-ছাত্রীদের খুব  ভালোবাসে বলে তারা পরীক্ষায় ভালো ফল করবে— এমন ধারণার মধ্যে কোনও বাস্তবতা নেই। তাই ছেলে-মেয়ে বা ছাত্র-ছাত্রীদের পড়াশোনার ব্যাপারে অভিভাবক বা শিক্ষকদের উদ্বিগ্ন হওয়াটা পরোক্ষভাবে ছেলে-মেয়েদের উপরে প্রভাব বিস্তার করে। তাই বড়দের উচিত নিজেদের মনের উদ্বেগগুলি বাচ্চাদের সামনে প্রকাশ না করে, তৃতীয় কোনো ব্যক্তি, সে বন্ধু হতে পারে বা একজন কাউন্সেলর হতে পারেন, তার সঙ্গে আলোচনা করা। আসল কথা হল, বাচ্চারা তাদের নিজেদের করনীয় সম্পর্কে যথেষ্ট ওয়াকিবহাল থাকে। আর এই বিষয়টা বড়দের উপলব্ধি করা খুবই প্রয়োজন।

দ্বিতীয়ত, একটা পরীক্ষাই একজন বাচ্চার জীবনের প্রধান বিচার্য বিষয় নয়—একজন মানুষের জীবনে অনেক কঠিন বাধা পেরনোর মধ্যে পরীক্ষায় ভালোভাবে পাশ করা অন্যতম একটি বিষয়। পরীক্ষাকে ম্যারাথন দৌড়ের সঙ্গে তুলনা করে চলে। শুধু তাই নয়, পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে একজন পড়ুয়ার তার জীবনের স্থির  লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যাওয়া প্রয়োজন। এই সময় আশে-পাশে না তাকিয়ে সোজা পরীক্ষার দিকেই ছুটে যাওয়া দরকার। আসলে শৈশবকে মানুষের জীবন গঠনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে মনে করা হয়। তাই এই সময়ে লেখাপড়া শিখে নিজের জীবনের উন্নতির বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি। ঘুরে-বেড়িয়ে বা মজা করে অযথা সময় নষ্ট করা উচিত নয়। কিন্তু জীবনের চলার পথটা সবসময়ে এই নিয়ম মেনে চলে না। যদি জীবনকে ম্যারাথন দৌড়ের সঙ্গে তুলনা করা হয় তাহলে সেই দৌড়কে সফলভাবে শেষ করাই উদ্দেশ্য হওয়া জরুরি, জেতাটাই বড় কথা নয়। লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য মানুষকে যেমন অনেক বাধা-বিঘ্ন অতিক্রম করতে হয়, সেক্ষেত্রে ভেঙে পড়লে চলে না, জীবন-দৌড়ের ক্ষেত্রেও এই একই নিয়ম প্রযোজ্য। অভিভাবক বা শিক্ষক হিসেবে একজন ব্যক্তির দায়িত্ব হল তার সন্তানকে জীবন- সংগ্রামে টিকে থাকার শিক্ষা দেওয়া। তাকে লক্ষ্য পূরণের জন্য উৎসাহ জোগানো। যদি জীবনে লড়াই করতে গিয়ে ছোটরা কখনও দিশাহীন হয়ে পড়ে, তাহলে বড়দের উচিত তাদেরকে সঠিক পথ দেখিয়ে লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। ভুল পথে গিয়েছে বলে ছোটদের অবহেলা করা বা তাদের আত্মবিশ্বাসে আঘাত দেওয়া উচিত নয়।

তৃতীয়ত, আন্তরিকভাবে চেষ্টা করতে হবে, ফলের আশা করা জরুরি নয়-- পরীক্ষায় ভালো ফল করার জন্য পরীক্ষার্থীকে মনে-প্রাণে চেষ্টা করতে হবে। পরীক্ষার ফলাফল নিয়ে অযথা ভাবনাচিন্তা করার দরকার নেই। কারণ কাজ করাটা আমাদের নিজেদের নিয়ন্ত্রণের উপরে থাকে, সেই কাজের ফলাফল সবসময়ে আমাদের ইচ্ছা-অনিচ্ছার উপর নির্ভর করে না। পরীক্ষায় কেমন প্রশ্ন আসবে, বা শিক্ষক কীভাবে একজন ছাত্র বা ছাত্রীর উত্তরপত্রের মূল্যায়ন করবেন, তার উপর পরীক্ষার্থীর কোনও নিয়ন্ত্রণ নেই। এছাড়া পরীক্ষায় অন্যান্য ছাত্র-ছাত্রীরা কেমন ফল করবে তা-ও কোনও একজন বিশেষ ছাত্র বা ছাত্রীর পছন্দের উপর ভিত্তি করে হবে না। অথবা পরীক্ষা শুরুর আগেই প্রশ্নপত্র বাইরে বেরিয়ে যাবে কিনা, সে বিষয়েও পরীক্ষার্থীর কোনও ভূমিকা থাকে না। তাই এইসব বিষয় নিয়ে ছাত্র-ছাত্রীদের অযথা উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনও কারণ নেই। তাদের প্রধান এবং একমাত্র কর্তব্য হল মন দিয়ে পড়াশোনা করে পরীক্ষায় নিজেদের দক্ষতার পরিচয় দেওয়া। এইক্ষেত্রে কোনও খামতি রাখা কাম্য নয়— এটাই ছোটদের বোঝানো উচিত বড়দের।

অভিভাবক বা শিক্ষকরা কি জানেন একজন পরীক্ষার্থীকে কী বলা উচিত বা কোন কথা বলা ঠিক নয়?  

১। ''আমি জানি তুমি খুব ভালো পরীক্ষা দেবে''— এই কথা একজন পরীক্ষার্থীকে বললে তার মনে হতে পারে যে, যদি সে ভালো পরীক্ষা দিতে না পারে তাহলে অভিভাবক বা শিক্ষকরা তার উপর মনঃক্ষুণ্ণ হবে। এই কথা বলে ভালোভাবে পরীক্ষা দেওয়ার শর্ত একজন পরীক্ষার্থীর উপর চাপিয়ে দেওয়া হয়। তাই এর পরিবর্তে বলা উচিত যে, পরীক্ষার্থী যেন অত্যন্ত মনোযোগ সহকারে আন্তরিকভাবে প্রশ্নের উত্তর লেখার চেষ্টা করে। তাকে বোঝাতে হবে যে, এই চেষ্টাটাই খুব প্রয়োজনীয় বিষয়।

২। ''আমি চাই তুমি প্রতিটি বিষয়ে ১০০ শতাংশ নম্বর নিয়ে বাড়ি এসো। আমি জানি তুমি নিশ্চয়ই পারবে।''— এই কথা বলে অনেক সময় শিক্ষকরা ভালো ছাত্র-ছাত্রীদের উৎসাহ দেন। কিন্তু এর ফলে ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে চাপ বেড়ে যেতে পারে।  তাই বলা উচিত যে, ''তুমি শুধু চেষ্টা করবে তোমার সেরাটুকু দিতে। আর তাতেই তোমার পরীক্ষার ফল ভালো হবে।''— শিক্ষকদের এমন উপদেশ ছাত্র-ছাত্রীদের অপেক্ষাকৃত কম চাপে ফেলে।

৩। ''এই পরীক্ষাটা তোমার জীবনে খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তোমার জীবনের ভালো-মন্দ এর উপর নির্ভর করছে। তাই এই সুযোগ নষ্ট করা উচিত নয়। যদি পরীক্ষা ভালো না হয় তাহলে তোমার জীবন একেবারে রসাতলে যাবে।''— এই ধরনের পরামর্শ একেবারেই যুক্তিগ্রাহ্য নয়। কারণ জীবনে একবার সুযোগ নষ্ট হলে আর যে কোনও সুযোগ পাওয়া যাবে না-- তা কখনোই জোর দিয়ে বলা যায় না। বরং বলা  হয় যে, বারবার ব্যর্থ হওয়ার মধ্য দিয়েই মানুষ নতুন কিছু শেখে এবং এর মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে সফল হওয়ার মূল মন্ত্র। তাই একজন শিক্ষার্থীর উদ্দেশ্যেই এই কথাই বলা উচিত যে, মন-প্রাণ দিয়ে চেষ্টা করাটাই বড় কথা। মানুষের চেষ্টার মধ্য দিয়েই নতুন পথের সন্ধান মেলে। আসলে জীবনে চলার পথে কোনও একটি বিষয়কেই সঠিক বলে মনে করা জরুরি নয়। যদি কেউ কোনো একটি নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে সফল না-ও হয়, তাহলে অন্য আরেকটি ক্ষেত্রে যে সে সফল হবে না—সে কথা কি কখনও জোর দিয়ে বলা যায়? তাই বিষয় নির্বাচনের ক্ষেত্রে ব্যক্তির নিজস্ব পছন্দ, ভালো লাগা প্রভৃতিকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। এভাবেই একজন পরীক্ষার্থীকে অনুপ্রেরণা দেওয়া বাঞ্ছনীয়।

৪। ''যদি তুমি পরীক্ষায় ভালো ফল না করতে পার, তাহলে তোমার দাদু-দিদা কী  মনে করবে'' বা ''যদি তুমি ভালো পরীক্ষা না দাও তাহলে স্কুল বা কলেজের অধ্যক্ষ খুবই হতাশ হবেন।''— এমন কথা সমাজের একটা বড় অংশের মানুষের মুখে প্রায়ই শোনা যায়। কিন্তু একজন বাচ্চার উপর এভাবে কোনও শর্ত চাপানো উচিত নয়। তার চাওয়া-পাওয়াকে মূল্য দেওয়া উচিত। তার উপর এমনভাবে চাপ সৃষ্টি করা উচিত নয় যার জন্য পরবর্তীকালে অভিভাবকদের আপশোস করতে হয়। এটা মাথায় রাখা প্রয়োজন যে, প্রত্যেকটি মানুষের কাজ করার একটি নির্দিষ্ট ক্ষমতা বা সাধ্য রয়েছে। এবং সে তার সাধ্য অনুযায়ী কাজ করবে— সেই আশা
করাই যুক্তিযুক্ত।

এই ধরনের উদাহরণের মধ্য দিয়ে একজন পরীক্ষার্থীর সামনে অভিভাবক বা শিক্ষকদের কেমন আচরণ করা উচিত বা তাদের কোন পরামর্শ দেওয়া সঠিক—সে বিষয়ে একটা ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করা হল। সবশেষে এই কথাই বলা যায় যে, অভিভাবক বা শিক্ষকদের ছাত্র-ছাত্রীদের চেষ্টাকেই বড় করে দেখা প্রয়োজন, তারা  পরীক্ষায় কত বেশি নম্বর পেল, তার চুলচেরা বিচার করা উচিত নয়। আমাদের মানসিক উদ্বেগ যেন আমাদের চিন্তাভাবনাকে প্রভাবিত করতে না পারে, সে দিকে খেয়াল রাখা জরুরি। এর সঙ্গে এই কথাও মনে রাখতে হবে যে, জীবনে চলার পথে মানুষ অনেক সুযোগ পায়, তাই সাফল্যেরও অনেক সংজ্ঞা রয়েছে। একমাত্র পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়াই একজন মানুষের জীবনে সাফল্যের মাপকাঠি হতে পারে না।  

মৌল্লিকা শর্মা ব্যাঙ্গালুরুতে অবস্থিত একজন কাউসেলার যিনি নিজের কর্পোরেট চাকরি ছেড়ে মনোরোগ নিয়ে কাজ করছেন। তিনি নিয়মিত ব্যাঙ্গালুরুর রীচ ক্লিনিকে বসেন। আপনাদের কোন বক্তব্য বা জিজ্ঞাস্য থাকলে তাঁকে columns@whiteswanfoundation.org তে লিখে জানাতে পারেন। সমস্ত প্রশ্নের উত্তর এখানে পাক্ষিক ভাবে ছাপানো হবে।