বিশেষজ্ঞের কলমে

বিল্ডিং ব্লকস্

মৌল্লিকা শর্মা
শাস্তি না দিয়ে বাচ্চাকে শিষ্টাচার শেখানো যায় কি?
মৌল্লিকা শর্মা

আমার যদ্দুর মনে পড়ছে, আমি আমার শেষ লেখায় শৃঙ্খলার কার্যকারিতা নিয়ে আলোচনা করেছিলাম। এবং এ বিষয়ে পাঠকের মনে নানা জিজ্ঞাসারও জন্ম হয়েছিল। তাঁদের প্রশ্ন ছিল, বাচ্চারা যদি খুব দুষ্টুমি করে, পড়াশোনায় মন দিতে না চায় বা উদাসীন গোছের হয়, তাহলে তাদের ভবিষ্যতের কথা মাথায় রেখে মা-বাবাদের তো সন্তানদের উপযুক্ত শাসন করা উচিত? সেক্ষেত্রে অল্পবিস্তর মারধর বা ভয় দেখানো - সবই তো দরকার? নাকি এর বদলে অন্য কোনও উপায় রয়েছে? আমার কাছে তাঁদের অনুরোধ ছিল, আমি যেন বাচ্চাকে শাসন করার পরিবর্তে বিকল্প কোনও ব্যবস্থার সন্ধান দিই।

আমি প্রথমে অভিভাবকদের ভুল ধারণাকে ভাঙার চেষ্টা করি। তারপর একটি বাচ্চাকে শিষ্টাচার শেখানো এবং শাস্তি দেওয়ার মধ্যে পার্থক্য বোঝাতে শুরু করি। অভিভাবকরা প্রায়শই এই দুটি বিষয়কে এক করে ফেলে। কিন্তু বিষয় দুটি মূলগত এবং উদ্দেশ্যগত ভাবে সম্পূর্ণ আলাদা। শাস্তিদানের লক্ষ্য হল, অতীতে করা একটি বাচ্চার ভুলের মাশুল। অন্যদিকে শিষ্টাচার শেখানোর উদ্দেশ্য হল, বাচ্চাটির ভবিষ্যৎকে মজবুত করা। দুটি বিষয়ের মধ্যেকার এই পার্থক্যটা আমরা অনেকসময়েই ভুলে যাই। এবং সন্তানের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে তাকে কঠিন শাস্তি দিয়ে ফেলি। যখন আমরা বিষয় দুটির পার্থক্য সঠিকভাবে বুঝতে পারব, তখন একটি বাচ্চাকে শাস্তি ভোগের যন্ত্রণা থেকে খুব তাড়াতাড়ি রেহাই দিতে সক্ষম হব।

শিষ্টাচার যা একটি বাচ্চার ভবিষ্যতের আচার-আচরণকে যথাযথ করে তুলতে সাহায্য করে, সেদিকে ভালোভাবে নজর দেওয়া দরকার। এক্ষেত্রে বাচ্চার ঠিক কোন আচরণ বাবা-মায়েরা যথাযথ করতে চাইছেন বা কী ধরনের আদর্শ আচরণবিধি গড়ে তোলার চেষ্টা করছেন, সে বিষয়টিকে পরিষ্কার করতে হবে। এছাড়া আরও একটি বিষয়ে আমাদের ওয়াকিবহাল থাকতে হবে যে, শিষ্টাচার শেখানোর ফলাফল একটি বাচ্চার ক্ষেত্রে কার্যকরী হচ্ছে কিনা। সব পরিস্থিতিতেই এর ফলাফল একরকম হয় না। একজন বাচ্চার উপর শিষ্টাচার শেখানোর প্রভাব যেমন হয়, অন্য আরেকটি বাচ্চার ক্ষেত্রে তার প্রভাব আলাদা হতেই পারে। যদি একজন বাচ্চা সারাদিন টিভি দেখতে ভালোবাসে, তাহলে তার টিভি দেখার সময়সীমাটা কমিয়ে দিলে বা বেঁধে দিলে ভালো ফল পাওয়া যায়। কিন্তু কোনও বাচ্চার যদি একেবারেই টিভি দেখার অভ্যাস না থাকে, তাহলে তার বেলায় এই বিষয়ে নিয়ম শেখানোর কোনও অর্থই নেই।

শরীরে যন্ত্রণা দিয়ে তার থেকে ফলের আশা করা মোটেই উচিত নয়। একটি বাচ্চার আচরণে পরিবর্তন আনতে তাকে শাসন করে আদৌ কোনও লাভ হয় না। শাসনের অর্থ যখন একটি বাচ্চার কাছে পরিষ্কার হয়, তখন শাসন করলে তার থেকে ভালো ফল পাওয়া যায়। বাচ্চাকে কিছু শেখাতে গেলে মারধর করা বা বকাঝকা করা একেবারেই উচিত নয়। কারণ জোর করে কারও উপর কিছু চাপিয়ে দেওয়ার নাম শেখানো নয়। এই সহজ- সরল বিষয়টা অধিকাংশ অভিভাবকই মেনে নিতে পারেন না। তাঁদের বিশ্বাস, বাবা-মায়েরা না শেখালেও একটি বাচ্চা ঠিক ও ভুলের মধ্যে পার্থক্য করতে পারবে। এই ভুল ধারণা নিয়েই অভিভাবকরা একটি বাচ্চাকে সুস্থ- সবলভাবে মানুষ করার জন্য সময়ও শক্তি খরচ করেন। আর এই পদ্ধতি অনুসরণের মধ্য দিয়েই তাঁরা ফলের আশা করেন।

শিশুদের নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষার ফল সবসময়ে ভালো নাও হতে পারে। বড়দের ক্ষেত্রেও একথা সত্যি। যেমন, রাস্তায় গাড়ি নিয়ে বেরোলে ক'বার আমরা লাল সিগন্যাল ভাঙার চেষ্টা করি। বড় জোর একবার। কারণ আমরা জানি সিগন্যাল ভাঙলে ফাইন দিতে হবে। এটাই নিয়ম। তাই কিছু সময় বাঁচানোর জন্য প্রতিদিন কে চাইবে ফাইন দিতে? বাচ্চাদের ক্ষেত্রেও বিষয়টা এরকমই। সন্তানকে নিয়ম না শিখিয়ে, কাজের ফলাফল সম্পর্কে তাকে আগে থেকে না জানিয়ে বাবা-মায়েরা যদি বাচ্চাদের কাছ থেকে সেরা ফল পাওয়ার আশা করেন, তাহলে তা একেবারেই সঠিক কাজ
হবে না।

যদি একজন বাচ্চা চায় যে, সে খেলাধূলা করে সন্ধে সাতটার সময় বাড়ি ফিরবে, তাহলে বাচ্চাটিকে জানিয়ে দিতে হবে যে, যদি সে সাতটার মধ্যে ফিরে না আসে, তাহলে তার সন্ধেবেলায় টিভি দেখা বন্ধ হয়ে যাবে। এভাবে বাচ্চাকে তার কাজের ফলাফল কী হতে পারে, সে বিষয়ে আগে থেকে জানিয়ে দেওয়া জরুরি। যদি একজন ছেলে বা মেয়ে তার কাজের ফলাফল কী হতে পারে তা জেনে যায়, তাহলে সেই মতো সে তার আচার-আচরণের পরিবর্তন বা কাজের ক্ষেত্রে রদবদল ঘটাতে চেষ্টা করবে। কিন্তু যদি একজন বাচ্চা বোঝে যে, সে যাই করুক না কেন, তাতে বাবা-মায়ের কিছুই যাবে-আসবে না বা তার কাজের ফলাফল নিয়ে কেউই ওয়াকিবহাল নয়, তাহলে বাচ্চাটি নিজের যা মনে হবে তাই করার চেষ্টা করবে।

আমি আগেই বলেছি যে, একজন বাচ্চার শেখার বিষয়টা যে কোনও কাজের ফলাফলের নিশ্চয়তা এবং তার ধারাবাহিকতার উপর নির্ভরশীল। উপরের উদাহরণ টেনে তাই বলা যায় যে, বাচ্চাটি যদি সন্ধে সাতটার মধ্যে বাড়ি না ফেরে তাহলে তার টিভি দেখা বন্ধ হয়ে যাবে। তাই এই ফলাফলের কথা মাথায় রেখে বাচ্চাটি বাবা বা মায়ের তৈরি করে দেওয়া নিয়ম মানতে বাধ্য থাকবে। আর এই পদ্ধতি প্রয়োগের মধ্য দিয়ে বাবা-মায়ের ক্ষেত্রে লাভ হল, বাচ্চাকে মারধর বা বকাঝকা না করে সঠিক নিয়ম শেখানোর সু্যোগ পাওয়া।

সন্তানকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করে তোলার জন্য মা-বাবাকে কতগুলি বিষয়ের দিকে নজর দিতে হবে। সেগুলি হল—

প্রথমত, বাবা-মাকে সন্তানের আচার-আচরণ পরিবর্তনের জন্য বাচ্চার ভুলভ্রান্তিগুলিকে বেছে নিতে হবে। এক্ষেত্রে সব ত্রুটি-বিচ্যুতি সংশোধন করতে গেলে বাবা-মায়ের জীবনটা একটা লড়াইক্ষেত্রে পরিণত হবে। তাই আমার মনে হয় কোনও অভিভাবকই নিজের বাড়িকে লড়াইয়ের ময়দান বানাতে চাইবে না। তাই বাবা-মায়ের চোখে বাচ্চার পাঁচটি আচরণ, যা সংশোধন না করলেই নয়, সেগুলির দিকেই প্রথমে নজর দিতে হবে। কারণ এগুলি সমানে চলতে থাকলে বাচ্চার প্রতি মা-বাবার বিরক্তি ক্রমশ বেড়ে যায়। তাই এই ফলাফল মাথায় রেখেই বাবা-মাকে সন্তানের আচরণে বদল ঘটানোর জন্য উদ্যোগী হতে হবে।

দ্বিতীয়ত, বাচ্চার আচরণের মধ্যে কোনটি গ্রহণযোগ্য আর কোনটি গ্রহণযোগ্য ন্য, সে বিষয়ে পরিষ্কার পার্থক্য করা জরুরি। কাজের ফলাফল সীমা অতিক্রম করে যাচ্ছে কিনা, তাও ভালোভাবে বোঝা প্রয়োজন। বাবা-মা হিসেবে সেই ফলাফলকে নিয়ন্ত্রণ করার আত্মবিশ্বাসও একজন অভিভাবকের থাকা উচিত। এই বিষয়ে তাঁর নিশ্চিত হওয়াটা একান্ত কাম্য। আর এই বিষয়টাই বাবা-মায়েদের কাছে সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং।

তৃতীয়ত, শাসনের ধরনটা এমন হওয়া উচিত, যা বরাবরের জন্যই সন্তানের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা যায়। সবশেষে মনে রাখা জরুরি যে, বাচ্চার বয়সের সঙ্গে বাবা-মায়ের শাসনের সীমারেখা নির্ধারণ হওয়া উচিত। সন্তানের বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শাসনের ধরনের সংশোধন করা প্রয়োজন। এই পরিস্থিতিতে সন্তানকে আদেশ বা নির্দেশ করার পরিবর্তে তার সঙ্গে পারস্পরিক আলোচনা এবং বোঝপড়ার ক্ষেত্র গড়ে তোলা দরকার।

বাবা-মায়েদের উদ্দেশ্যে আমার প্রধান বক্তব্য হল, কোনও বাচ্চাই সমস্যাবহুল নয়। তাদের আচরণে মাঝ- মাঝে কিছু সমস্যা দেখা দেয়। আর এই সমস্যা দূর করতে চাই সঠিক শৃঙ্খলা। যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি নয়।

মৌল্লিকা শর্মা ব্যাঙ্গালুরুতে অবস্থিত একজন কাউসেলার যিনি নিজের কর্পোরেট চাকরি ছেড়ে মনোরোগ নিয়ে কাজ করছেন। তিনি নিয়মিত ব্যাঙ্গালুরুর রীচ ক্লিনিকে বসেন। আপনাদের কোন বক্তব্য বা জিজ্ঞাস্য থাকলে তাঁকে columns@whiteswanfoundation.org তে লিখে জানাতে পারেন। সমস্ত প্রশ্নের উত্তর এখানে পাক্ষিক ভাবে ছাপানো হবে।