বিশেষজ্ঞের কলমে

ইতিবাচক জীবনযাপন

ডাঃ এডওয়ার্ড হফ্‌ম্যান
আশার আলো খোঁজার মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে ভালো থাকার মূল মন্ত্র
ডাঃ এডওয়ার্ড হফ্‌ম্যান

মার্কিনী গায়ক জেরোম কার্ণ আর জর্জ ডিসিল্ভা ১৯১৯ সালে ‘লুক ফোর দা সিলভার লাইনিং’ (মানে মেঘের রূপালী কিনারা খুঁজুন) গেয়েছিলেন। বিদেশী অভিবাসীদের সন্তান এবং নিউ ইয়র্কে জন্মগ্রহণ করা এই সফল সঙ্গীতকারেরা জীবনের প্রতি খুবই আশাবাদী ছিলেন যার স্পষ্ট প্রভাব তাদের গানের ওপর দেখা গিয়েছিল। ইতিহাসের পাতায় লেখা বিশ্বের সব থেকে ভয়ানক যুদ্ধ সবে শেষ হয়েছিল যাতে ৩০ কোটি মানুষ মারা গিয়েছিল। তা সত্ত্বেও গানটির আনন্দদায়ক সুর আর কথা জীবনে সূর্যের সন্ধানে যাওয়ার আর মেঘের পেছনে লুকিয়ে থাকা সোনালী রশ্মি খোঁজার কথা বলেছিল। যদিও ওই সময়ের সমালোচকেরা একে শিশুসুলভ দৃষ্টিকোণ আখ্যা দিয়ে এর তীব্র নিন্দা করেছিলেন, এখনকার ইতিবাচক মনোবিজ্ঞান এই ভাবনাকে সমর্থন করে। বৈজ্ঞানিক গবেষণার একটি বড় অংশ জানাচ্ছে যে আমাদের সাথে যা খারাপ ঘটে তা আমরা নিজেদের কাছে কীভাবে ব্যাখ্যা করি (ব্যাখ্যামূলক শৈলী) তার প্রবল প্রভাব পড়ে আমাদের মানসিক এবং শারীরিক স্বাস্থ্যের ওপর।

এই ধারণার একজন গুরুত্বপূর্ণ গবেষক হলেন পেনসিলভাইনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ডঃ মার্টিন সেলিগ্ম্যান। তিনি গবেষণা শুরু করেছিলেন ১৯৮০-র দশকের মাঝামাঝি সময়; বিষয় ছিল মার্কিনী পেশাদারী বেসবল খেলোয়াড় আর ম্যানেজারদের ব্যাখ্যামূলক শৈলী। আঞ্চলিক খবরের কাগজে প্রকাশিত তাদের উক্তির উপর নজর রেখে সেলিগ্ম্যান দেখলেন যে আশাবাদী দলগুলি (যারা ভবিষ্যতের খেলার পরিণাম প্রসঙ্গে আশাবাদী) আগের হার-জিতের রেকর্ডের তুলনায় বেশি ভালো ফল করেছে। অপরদিকে নিরাশাবাদী দলগুলির (যারা ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী মন্তব্য করেনি) পরিণাম আসলে খারাপই হয়েছে।

একই সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল বাস্কেটবল অ্যাসোসিয়েশনের করা এক সমীক্ষায় একই ধরণের পরিণামের কথা জানানো হয়ঃ একাকী এবং দলীয়, উভয় ক্ষেত্রেই এমন ব্যাখ্যামূলক শৈলী ছিল যা সনাক্ত করা এবং পরিমাপ করা সম্ভব ছিল। সেলিগ্ম্যানের মতে এই শৈলীর থেকে জয়ের গণনা সম্ভব যা নিছক ক্রীড়া ক্ষমতার উর্ধে। কেন? কারণ খেলার মাঠে আশা মানে জিত আর নিরাশা মানে হার। অন্য ভাবে বললে, আশাবাদীতার সরাসরি প্রভাব পড়ে ক্রীড়া প্রদর্শনের উপর।

অবশ্যই পেশাদারী ক্রীড়া মানুষের কীর্তি এবং ভালো থাকার একটি ক্ষুদ্র অংশ। পরবর্তীকালে সেলিগ্ম্যান এবং তার সহকর্মীরা জীবনের একটি মূল জায়গায় ব্যাখ্যামূলক শৈলীর প্রভাব নিয়ে গবেষণা করেন – শারীরিক সুস্থতা। জার্নাল অফ পারসোনালিটি অ্যান্ড সোশ্যাল সাইকোলজি তে প্রকাশিত একটি গবেষণামূলক পরীক্ষায় তারা জানিয়েছেন যে নিরাশাবাদী ব্যাখ্যামূলক শৈলী শারীরিক অসুস্থতার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের সময় তাঁর হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সহপাঠীদের থেকে সংগ্রহ করা ব্যক্তিত্ব এবং স্বাস্থ্য সংক্রান্ত তথ্য থেকে পরবর্তী সময়ে সেলিগ্ম্যানের দল নির্ধারণ করতে সক্ষম হন যে ব্যাখ্যামূলক শৈলীর প্রভাব ছাত্রদের স্বাস্থ্যের উপর পড়েছিল তাদের ৩০ থেকে ৬০ বছর বয়সকালে। মানে, যাদের কলেজে পড়াকালীন নিরাশাবাদী মনোভাব ছিল তাদের আশাবাদী মনোভাব সম্পন্ন ছাত্রদের তুলনায় পরবর্তী সময়ে স্বাস্থ্যের সমস্যা দেখা দেওয়ার প্রবণতা বেশী ছিল। আশ্চর্যের বিষয় এই যে প্রভাব সাথে সাথে দেখা যায়নি – পরিসংখ্যানে দেখা গিয়েছে যে এটি ৪০ বছর বয়সে উল্লেখযোগ্যভাবে নজরে আসে এবং ৪৫ এর কাছে গিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আকার ধারণ করে। খুব সম্ভবত, এই পরীক্ষার মিল বাস্তবের সঙ্গে রয়েছে কারণ সাধারণত স্বাস্থ্যের সমস্যা সাবালক হওয়ার পর গোঁড়ার দিকে দেখা না দিয়ে মাঝ বয়সে শুরু হয়।

কেন এমন হয় যে যারা নিজের জীবনের অভিজ্ঞতার বিষয়ে নিরাশাবাদী তারা আশাবাদী ব্যক্তিদের তুলনায় বেশী রোগে ভোগেন? এর অনেক কারণ রয়েছে। হতে পারে যে নিরাশাবাদীরা অদৃষ্টে বেশী বিশ্বাসী – মানে, তারা সুস্বাস্থ্যের যত্ন আহার, ব্যায়াম, যথেষ্ট পরিমানে ঘুমের দ্বারা না করে, ধূমপান করা, জাঙ্ক ফুড খাওয়ার মতো অস্বাস্থ্যকর ব্যবহার করেন। এর অতিরিক্ত, নিরাশাবাদীরা বিরক্তিকর ব্যথা বা উপশমের জন্য তৎপর হয়ে ডাক্তার দেখান না, কারণ তাদের দৃষ্টিভঙ্গি নিরাশাবাদীঃ দেরী করে বা ডাক্তারের সাহায্য না নিয়ে তারা সমস্যাটিকে বাড়িয়ে তোলেন।

বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা গিয়েছে যে আমাদের ব্যাখ্যামূলক শৈলী কাজে আমাদের সাফল্য, এমনকি স্কুলজীবনে প্রাথমিক দক্ষতাকেও প্রভাবিত করে। লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের ডঃ ফিলিপ কর আর ডঃ জেফেরি গ্রে আবিষ্কার করেন যে আশাবাদী ব্যাখ্যামূলক শৈলীর বিশ্লেষণ করে একটি ব্রিটিশ বিমা কোম্পানির সেলসকর্মীদের কাজে সাফল্যের হার আগে থেকে বলে দেওয়া সম্ভব হয়েছিল; এটাও যে তারা টাকার অঙ্কে কতটা ব্যবসা করতে পারবে এবং তাদের পারফর্মেন্স রেটিং কী হবে। পরবর্তী সময়ের এক পরীক্ষায়, যার পরিচালনা অ্যারিজোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডঃ ব্লেক এশফর্ড করেছিলেন, দেখা গিয়েছিল যে ঔষুধপ্রস্তুতকারক কোম্পানির ম্যানেজারদের ব্যাখ্যামূলক শৈলীর সাথে তাদের কার্জ পদ্ধতির সফলতার যোগাযোগ রয়েছে। পড়াশোনার জগতে অস্ট্রেলিয়ার ফ্লিন্ডার্স বিশ্ববিদ্যালয়ের ডঃ শার্লি ইয়েট্‌স দেখেন যে আশাবাদী ছাত্ররা প্রাথমিক এবং মাধ্যমিক স্তরে নিরাশাবাদী ছাত্রদের তুলনায় অঙ্কে বেশী ভালো ফল করছে। এতে বোঝা যাচ্ছে যে এর প্রভাব আমাদের জীবনে গোঁড়ার থেকেই পড়ে।

সমকালীন গবেষকেরা ব্যাখ্যামূলক শৈলীর মধ্যে তিনটি অনন্য বৈশিষ্ট্যের কথা জানিয়েছেন। এইগুলি হল

(১) স্থায়িত্ব – আপনি কি মনে করেন যে একটি কষ্টকর পরিস্থিতি অনন্তকাল ধরে চলবে, নাকি এটা ক্ষণিকের জন্য? যেমন ধরুন, একজন ব্যক্তি যে চাকরি হারিয়েছে বা যার বিবাহ-বিচ্ছেদ হয়েছে, তার মনে হতে পারে যে এই মানসিক চাপ কোনদিনও শেষ হবে না, কিন্তু তার বন্ধু হয়তো একই পরিস্থিতিতে ভাবতে পারে যে এই সমস্যার মেয়াদ কিছুদিন মাত্র।

(২) বিস্তৃতি – একটি অপ্রীতিকর পরিস্থিতির প্রভাব কি আপনার জীবনের সব কিছুর ওপর পড়ে, নাকি আপনি একে অন্য সব কিছুর থেকে আলাদা করে দেখতে পারেন?

আপনি কি নিজের ব্যাখ্যামূলক শৈলী বদলানো শিখতে পারবেন? যেমন আমরা দেখেছি, মনোবিদরা মনে করেন যে সব থেকে সংকটপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি হল একটি দুর্ভাগ্যজনক ঘটনাকে আজীবন চলা, বিস্তৃত রূপে দেখা এবং নিজের অক্ষমতাকে এর কারণ মনে করা। আপনি এই ধরণের ভাবনাকে যতটা নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারবেন, তত আপনার মানসিক, এমনকি শারীরিক স্বাস্থ্যও ভালো থাকবে। ঠিক কীভাবে আপনি এমনটা করতে পারেন?

একটি পরামর্শ যা আপনাকে সাহায্য করবেঃ নিজের জীবনে ঘটে যাওয়া এমন একটি খারাপ অভিজ্ঞতার কথা মনে করুন – কোথাও ঘুরতে যাওয়া, কলেজে পড়ার সময় বা চাকরির ক্ষেত্রে, বন্ধুত্ব বা প্রেমে – যার জন্য আপনি নিজেকে দায়ী মনে করেন। ঘটনাটিকে বর্ণনা করার পর এবার সচেতনভাবে নিজের সাথে কথা বলার ধরণ পাল্টানোর চেষ্টা করুন। প্রথমে স্বীকার করুন যে ঘটনাটি ঘটে গিয়েছে এবং বর্তমানে এর কোন অস্তিত্ব নেই। তারপর মেনে নিন যে এই ঘটনাটি আপনার জীবনের কেবলমাত্র ছোট একটি অংশ। অবশেষে, বোঝার চেষ্টা করুন যে পুরোটাই শুধু আপনার দোষ ছিল না; অন্য কারুর বা কিছুর কি এতে একেবারেই কোনো ভূমিকা ছিল না?

(৩) ব্যক্তিগতকরণ – মানে, খারাপ অভিজ্ঞতার সব দোষ কি আপনি নিজের নিয়ে নেন, নাকি অন্যদেরকেও দোষের ভাগীদার মনে করেন? যেমন আপনি হয়তো জানেন যে যা খারাপ অভিজ্ঞতার জন্য সবসময় নিজেকে দোষারোপ করা মানসিক সুস্থতার পক্ষে ক্ষতিকারক। মূর্তিকার অগাস্টে রডিন তার প্রতিভাসম্পন্ন ছাত্রী মালভিনা হফ্‌ম্যানকে (এই লেখকের সাথে তার কোন সম্পর্ক নেই) শেখানোর সময় বলেছিলেন “কোন কিছুই সময়ের অপচয় নয় যদি তুমি সেই অভিজ্ঞতাটিকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারো।”

ভাসিয়ে দিন, ভেতরে যা ভরা আছে সেইগুলোকে। দেখবেন আপনি অনেক বেশী ভালো থাকবেন।

 

এডওয়ার্ড হফ্‌ম্যান নিউ ইয়র্কের ইয়েশিভা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগে অতিরিক্ত সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কাজ করেন। তাছাড়া উনি একজন অনুমতিপ্রাপ্ত মনোচিকিৎসক। মনোবিজ্ঞান জগতে ওঁনার সম্পাদিত এবং লেখা ২৫টিরও বেশি বই আছে। উনি সম্প্রতি ডাঃ উইলিয়াম কম্পটনের সাথে পজিটিভ সাইকোলজি: দ্য সায়েন্স অফ্‌ হ্যাপিনেস অ্যান্ড ফ্লারিশিং বইটিতে সহ লেখকের ভূমিকা পালন করেছেন। এছাড়া উনি ইন্ডিয়ান জার্নাল অফ্‌ পজিটিভ সাইকোলজি এবং জার্নাল অফ্‌ হিউম্যানিস্টক সাইকোলজি’র সম্পাদক মণ্ডলীর অন্তর্গত। 

আপনি তাঁকে columns@whiteswanfoundation.org ঠিকানায় চিঠি লিখতে পারেন।