বিশেষজ্ঞের কলমে

ইতিবাচক জীবনযাপন

ডাঃ এডওয়ার্ড হফ্‌ম্যান
অনুশোচনা কাটিয়ে উঠা
ডাঃ এডওয়ার্ড হফ্‌ম্যান

আপনি কি জীবনে কোন কিছু নিয়ে অনুশোচনায় ভোগেন? আপাতদৃষ্টিতে সবাই ভোগে – আর এমনই হয়ে আসছে লিখিত ইতিহাসের সূচনার যুগ থেকে। প্রাচীন ইস্রায়েলীয়রা ক্রীতদাস হিসেবে মিশর থেকে পালিয়ে আক্ষেপ করেছিল এবং মরুভূমিতে তাদের দুর্দশার জন্য মূসাকে দোষারোপ করেছিল। মার্কিনী বিপ্লবী গুপ্তচর নেথান হেল ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে যুদ্ধের সময় বিখ্যাতভাবে আক্ষেপ করেছিলেন যে তার নতুন দেশের জন্য পাত করার মতো তার কাছে মাত্র একটি প্রাণই আছে। আমাদের সময়ের সবথেকে প্রশংসিত ব্যবসায়িক নেতা স্টিভ জব্‌স জীবনের শেষ সাক্ষাৎকারে আক্ষেপ করেছিলেন যে তিনি তার চার সন্তানের আরো কাছে যেতে পারলেন না।

অথচ, খুবই আশ্চর্যের কথা যে এই বিষয়টি সম্প্রীতিকালেই বৈজ্ঞানিকদের দৃষ্টিআকর্ষণ করেছে। যদিও এক শতাব্দী আগেই সিগ্মান্ড ফ্রয়েড তার মধ্যবিত্ত ভিয়েনাবাসী রুগীদের মধ্যে বেশ ভালো পরিমাণে অপরাধবোধ আবিষ্কার করেছিলেন – এবং চেপে রাখা যৌন চিন্তাভাবনার সাথে একে জুড়েছিলেন – এখনকার মনোবিদরা অনুশোচনার পরিধি বিবিধ এবং বিস্তীর্ণ করেছেন। নিজেদের ভাবনা বা কর্ম নিয়ে অপরাধবোধে না ভুগেও আমাদের অনুশোচনা থাকতে পারে। মনোবৈজ্ঞানিক গবেষণা এখন একমত যে আমরা কি নিয়ে অনুশোচনা অনুভব করছি, কত ঘন-ঘন করছি, এবং কতটা করছি, সেটাই সব থেকে বড় ব্যাপার। এই গবেষণাগুলো সজ্ঞাতভাবে মনে নেওয়া যায় যদি সত্যিই অনুশোচনা ততটাই সর্বব্যাপী হয় যতটা আমাদের মনে হয় – সবাই পুরনো ভুল বা হাতছাড়া হয়ে যাওয়া সুযোগ নিয়ে ভাবে না, আবার কেউ কেউ পুরনো কথা ভুলতেই পারে না।

তাহলে ইতিবাচক মনোবিজ্ঞান কী আবিষ্কার করেছে? আসুন জেনে নিই।

প্রথমত, কোনো পরিস্থিতিতে কিছু করা আর কিছু না করার অনুশোচনা এক নয়। কিছু করে ফেলার পরের আক্ষেপের সাথে জড়িয়ে থাকে উত্তপ্ত আবেগ, যেমন রাগ (“আমি কী করে ওই গাড়িটা কেনার মত বোকামি করতে পারলাম!)। কিছু না করে থাকার আক্ষেপের মধ্যে থাকে মনখারাপ (“কী হত যদি আমি ওই বছর নিউ জার্সিতে না থেকে কেথির সাথে লন্ডনে চলে যেতাম?”) বা হতাশা (“যখন সুযোগ ছিল তখন কেন আমি আইন নিয়ে পড়াশুনা করলাম না? সারাটা জীবন নষ্ট করলাম জীবন বিমা বিক্রি করে”)। গবেষণায় বারবার দেখা গিয়েছে যে মানুষ কম বয়সে যা করেছে তাই নিয়ে অল্প সময়ের জন্য বেশী আক্ষেপ অনুভব করে, কিন্তু বয়স বাড়ার সাথে সাথে এই মনোভাব উলটে যায়।

অন্যভাবে বললে, আপনি ২০ থেকে ৩০ বয়সী এমন অনেক মানুষ খুঁজে পাবেন যাদের প্রধান আক্ষেপ হল জীবনে করে থাকা ছোট ছোট বোকামি। অপরদিকে, মাঝবয়সে এবং বেশী বয়সে মানুষ সেই সব নিয়ে আক্ষেপ করে যা সে করেনি বা করতে পারেনি – এবং সেই অনুশোচনাটি বেশী কষ্টকর।

এটা একেবারেই স্পষ্ট যে জীবনে সবারই কিছু আক্ষেপ থাকে, কিন্তু স্বাস্থ্যের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল আমরা কীভাবে সেইগুলির সাথে আপোষ করে নিই। মন্ট্রিয়াল, কানাডার কনকর্ডিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ডঃ জেইমি ফারকুহার একটি দারুণ গবেষণার সঞ্চালনা করেছিলেন যাতে অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা জানিয়েছিলেন দুটি পন্থা যার সাহায্যে তারা অনুশোচনার মোকাবিলা করেন। প্রথম পন্থাটি হল অবসরগ্রহণের পরের বছরগুলি এমন আক্ষেপের মোকাবিলা করা যার সমাধান সম্ভব – যেমন নিজের সন্তানদের সাথে বেশী সময় কাটানো, ভ্রমণ করা, বা সামাজিক কাজকর্ম করা। দ্বিতীয় পন্থাটি হল সমাধান সম্ভব নয় এমন অক্ষেপগুলির সাথে আপোষ করে নেওয়া – যেমন উচ্চ শিক্ষা লাভ করা – আর সচেতনভাবে সেই আক্ষেপগুলির পিছুটান থেকে মুক্ত হওয়া। ওই দলের গবেষকরা উপসংহারে বলেন যে “অনুশোচনার (যুক্তিসঙ্গত) ব্যবস্থাপনা কর্মদক্ষতা এবং অবসরপ্রাপ্ত জীবনের সন্তুষ্টির একটি উল্লেখযোগ্য পরিমাপ।”

মোটেই আশ্চর্য হওয়ার কথা নয় এটা জেনে যে অনুশোচনা এখন বড় ব্যবসায়িক সংস্থাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে, এবং তারা এই ধরণের আক্ষেপের মোকাবিলার জন্য নানা ধরণের পণ্য এবং সেবা বাজারে ছাড়ছে। যেমন ব্রিটিশ এয়ারওয়েজ ২০০০ জন দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের পর জন্মানো মার্কিনী ব্যক্তিদের মধ্যে (বয়স ৫৫ বা তার বেশী) সার্ভে করেছে এবং ফল খুবই আশ্চর্যপ্রদ। যখন তাদের জিজ্ঞেস করা হয় যে জীবনে তাদের সব থেকে বড় আক্ষেপ কী, ২৫% ব্যক্তিরা বলেন বন্ধুদের সাথে যোগাযোগ ছিন্ন হওয়া এবং ২০% বলেন যতটা চেয়েছিলেন ততটা ঘুরতে যেতে না পারা। যেমন মনেই হয়, মহিলাদের তুলনায় পুরুষদের মধ্যে বেশী কাজ করা এবং সন্তানদের সঙ্গে যথেষ্ট সময় না কাটানোর অনুশোচনা বেশী (১৭% পুরুষ উভয় ক্ষেত্রেই এই উত্তর দিয়েছেন, এবং যথাক্রমে ৮% অ্যান্ড ১২% মহিলারা এমন মনে করেন)। উল্টোদিকে, ২২% মহিলাদের মনে ১৭% পুরুষদের তুলনায় ঘুরতে যেতে না পারা নিয়ে আক্ষেপ রয়েছে। মানছি ব্রিটিশ এয়ারওয়েজের নিজস্ব স্বার্থ রয়েছে এর মধ্যে, সব বয়সের মানুষদের আনন্দের জন্য ঘুরতে যাওয়ার প্রস্তাবের পেছনে। কিন্তু অন্য ধরণের পণ্য সামগ্রী?

এই বছরের এমআইটী নিউজে জানানো হয়েছে যে গবেষণায় দেখা গিয়েছে যে ধনী ব্যক্তিরা বাজার করতে গিয়ে কিছু কেনার অবসর থাকা সত্ত্বেও তা না কেনা নিয়ে বেশী আক্ষেপ করেন; সেলে বেশী দাম দিয়ে কিছু কেনা নিয়ে ততটা আক্ষেপ অনুভব করেন না। এমআইটী-র প্রোফেসর কেরেন ঝেং জানালেন “ব্র্যান্ডেড ফ্যাশনের ক্ষেত্রে স্টকে না থাকার অনুশোচনার প্রকাশ শক্তিশালী, উচ্চমূল্যে কেনার আক্ষেপের তুলনায়।“ অন্য ভাবে বললে, যদি আপনি একটা দামী জ্যাকেট কেনেন, সময়ের সাথে আপনার মন থেকে দাম নিয়ে অনুশোচনা মুছে যাবে, এবং আপনি ভালো বোধ করবেন জ্যাকেটটি কেনার জন্য। কিন্তু কেনার অবসর থাকা সত্ত্বেও যদি আপনি না কেনেন তাহলে পরবর্তী সময়ে আপনি প্রবল আক্ষেপ অনুভব করবেন। মজার ব্যাপার হল এই ধরণের আক্ষেপ সাধারণ পোশাক নিয়ে হয় না। টি-শার্টের মতো পোশাককে আমরা চলতি ফ্যাশন মনে করি।

এর থেকে যে সত্যটা উঠে আসে তা হল যে গুরুতর অনুশোচনা আমাদের মানসিক এবং শারীরিক স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকারক। টরন্টোর সানিব্রুক হেলথ সেন্টারের ডঃ ইসাবেলা বাউর-এর করা গবেষণায় দেখা গিয়েছে যে যে ব্যক্তিরা নিজেদের তুলনা করেন তাদের থেকে বেশী সফল বন্ধুবান্ধব এবং প্রতিবেশীদের সাথে তাদের সর্দি হওয়ার প্রবণতা বেশী; তুলনামূলক ভাবে যারা নিজেদের তুলনা এমন লোকেদের সাথে করেন যারা তাদের তুলনায় কম সফল, তাদের মধ্যে এই সমস্যা কম দেখা যায়। মন্ট্রিয়াল-এর কনকর্ডিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ডঃ কার্স্টেন রোশ গবেষণা করে দেখেছেন যে বৃদ্ধদের মধ্যে গভীর অনুশোচনা থেকে অনিদ্রা, কর্টিসল-এর স্তর বিগড়ে যাওয়া এবং কম আনন্দ অনুভব করার মত সমস্যা দেখা দেয়।

আমরা কি নিজেদের আক্ষেপ কম করা শিখতে পারি, এবং নিজেদের মনকে ভালো রাখতে পারি? হ্যাঁ, নিশ্চয়ই পারি। পরীক্ষামূলক গবেষণায় বলা হয়েছে যে ডায়রি লেখা – বিশেষত বেদনাদায়ক ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার বিষয়ে – আমাদের সাহায্য করে সেই ঘটনাগুলিকে সঠিকভাবে বিচার করে তা কাটিয়ে উঠতে। বিংশ শতাব্দীর গোঁড়ার দিকে ব্রিটিশ লেখিকা ক্যাথরিন ম্যান্সফিল্ড খুব সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা করেছিলেন, “অনুশোচনা শক্তির ভয়াবহ ক্ষয়। আপনি এর ভিত্তিতে কিছুই সৃষ্টি করতে পারবেন না। এটা শুধু বিলাপ করার জন্যই ভালো।”

নির্দেশিত ক্রিয়া
এমন একটি ঘটনার কথা ভাবুন যা করেছেন বলে আপনার এখনো আক্ষেপ হয়, এবং সেই ঘটনাটির বিষয়ে অনেকটা সময় ধরে গুছিয়ে লিখুন। তার পরে এর সঙ্গে জড়ানো মনের টানকে ছেড়ে ফেলুন। কিছু না করে থাকার আক্ষেপ যা অনেকটা সময় ধরে মনে পোষণ করে রেখেছেন, সেটার সাথে বাস্তব পরিস্থিতির তুলনা করুন। মানে, ওই কাজটা করলে আপনার জীবন কি সত্যি অন্যরকম হত, নাকি আপনি নিজের মনকে ভোলানোর জন্য বাস্তব-মুখর পৃথিবীতে একটি সুন্দর স্বপ্নর রেষ ধরে রেখেছেন, যার আসলে কোনো মানে নেই?