বিশেষজ্ঞের কলমে

ইতিবাচক জীবনযাপন

ডাঃ এডওয়ার্ড হফ্‌ম্যান
আত্ম-উন্মোচন: নিজের মুখোশটা খুলে ফেলুন
ডাঃ এডওয়ার্ড হফ্‌ম্যান

আপনি কি সহজেই অন্যের সাথে নিজের আবেগ ও অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেন? না একটু দূরত্ব বজায় রাখতে পছন্দ করেন? নিজের মনের সবথেকে আনন্দের কথা, লক্ষ্য, দুঃখ ভাগ করে নেওয়া আপনার পক্ষে কতটা কঠিন? দীর্ঘ গবেষণার পর দেখা গেছে, এর উত্তরটি আপনার খুশির সাথে জড়িত। ক্যানাডার ডাঃ সিডনি জরার্ড এই ক্ষেত্রে পথিকৃৎ। আজ থেকে ৫০ বছর আগে উনি এই নিয়ে কাজ করে গেছেন। ১৯৭৪ –এ তাঁর অকস্মাৎ মৃত্যুর পর আন্তর্জাতিক মনোবিজ্ঞানে এবং আধুনিক সভ্যতায় তাঁর গবেষণার বিপুল প্রভাব দেখা গেছে। জরার্ড নিজেই বলে গেছেন, আমরা অন্যের কাছে নিজেকে যতটা মেলে ধরতে পারি ততটাই সমাজে সুন্দর সম্পর্ক গড়ে তুলতে, আনন্দে থাকতে এবং শারীরিকভাবেও সুস্থ থাকতে সক্ষম হই।

আশ্চর্য্যের ব্যাপার হল যে ব্যক্তিত্ব ও আচরণ নিয়ে গবেষণা করেছেন এরকম তাবড় বৈজ্ঞানিকরাও এই বিষয়ে কিচ্ছু বলেননি। সিগমন্ড ফ্রয়েডের মতে অবদমিত যৌন ইচ্ছাই হল মূল সমস্যা; আর অ্যালফ্রেড অ্যাডলারের কথা অনুযায়ী মূল সমস্যা হল আমাদের জন্মগত ক্ষমতার লোভ। মনোবিজ্ঞানের জগতে বিংশ শতাব্দীর তৃতীয় প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তি কার্ল জাং অবধি অন্যের সামনে নিজেকে মেলে ধরা নিয়ে কোনও আগ্রহ দেখাননি। যদিও আমেরিকান সাইকোলজির লেখক উইলিয়াম জেমস তাঁর এই অসামান্য বইটিতে খুব সুন্দর ভাবে ধর্মীয় অভিজ্ঞতা সম্পর্কে বলেছেন, কিন্তু মানুষের ঘনিষ্ট সম্পর্ক নিয়ে তাঁরও কোনও কৌতূহল ছিল না। এদিকে, আরেকজন মার্কিনি গবেষক জন বি ওয়াটসন, এবং বি এফ স্কিনারের অধিকাংশ পাওয়া তথ্যই, গবেষণাগারে ইঁদুর ও পায়ারাদের উপর পরীক্ষার ফলাফল। আবেগের ঘনিষ্টতা বোঝার সুযোগ আর সেখানে কোথায়!

১৯৫০ এর পরের দিকে নিশ্চিত ভাবেই মনোবিজ্ঞানের জগতে মানুষের মধ্যে ঘনিষ্টতা নিয়ে কেউ সেরকম ভাবে কাজ করেননি। ব্যাতিক্রম শুধু সিডনি জরার্ড। কেন উনি এই বিষয়ে গবেষণা আরম্ভ করেছিলেন তা জানা যায়নি। ইন্টারনেটে তাঁর সন্তানের দেওয়া তথ্যের উপরে ভিত্তি করে আমরা জানতে পেরেছি যে জরার্ড ক্যানাডায় একটি রুশ-ইহুদি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। সেই বিশাল পরিবারে ছিল তাঁর ৫ ভাইবোন, এক পিসি ও কতিপয় আত্মীয়স্বজন যারা তাঁর তুলনামূলক ধনী বাবা মার কাছে আশ্রয় নিয়েছিল। তাঁর শৈশব কাটে ১৯৩০ –এর ভয়াবহ আর্থিক মন্দার মাঝে। তাঁর বাবা মায়ের টরন্টোতে একটি বড় কাপড়ের দোকান ছিল। বন্ধুবান্ধব ও নিজের মাকে নিয়ে তিনি আনন্দে নিজের শৈশব কাটান। 

সাইকোলজিতে ডক্টরেট পাবার পাঁচ বছর পর, ১৯৫৮ তে জরার্ড ও তাঁর সহকর্মী ডাঃ পল লাসাকাওর সাথে আত্ম-উন্মোচনের উপর তাঁদের প্রথম গবেষণাপত্রটি প্রকাশ করেন।  এই গবেষণায় তাঁরা  প্রথমবার এই ক্ষেত্রটিকে জানার উপযোগী প্রশ্নাবলী তৈরি করেন যা আজও ব্যবহৃত হয়। তাঁর পরের বছর উনি এই বিষয়ে আরেকটি বিস্তারিত গবেষণা পত্র প্রকাশ করেন যা চতুর্দিকে সাড়া ফেলে দেয়। 

৩০-৩৫ বছর বয়সে জরার্ড জোর দিয়ে বলেন যে, “ভালবাসা, মনোচিকিৎসা, কাউন্সেলিং, শিক্ষকতা, সেবা এর কোনওটাই রোগীর পরিচয় গোপন রেখে করা সম্ভব না। একমাত্র নিজের কাছে সমাজে নিজের পরিচয় প্রকাশ করলেই তা করা সম্ভব। ঠিক যেমন থার্মোমিটার, স্ফিগমোম্যানোমিটার আপনার শরীরের আসল অবস্থা বাতলে দেয়, ঠিক তেমনই আত্ম-উন্মোচন আপনার নিজের আসল অবস্থা বাতলে দেয়। আপনি আপনার অতি ঘনিষ্ট ব্যক্তিকেও ভালবাসতে পারবেন না যদি না সে নিজেকে আপনার সামনে মেলে ধরে।”  

জরার্ড পরে এই বিষয়ে পরপর অনেকগুলি সফল বই রচনা করেন। তাঁর কয়েকটি বিখ্যাত বই হল ট্রান্সপারেন্ট সেলফ্‌, ডিসক্লোজিং ম্যান টু হিমসেলফ, সেলফ ডিসক্লোজার: অ্যান এক্সপেরিমেন্টাল অ্যানালিসিস অফ দ্য ট্রান্সপারেন্ট সেলফ এবং হেলদি পার্সোনালিটি। সেই থেকে, বিভিন্ন গবেষণায় তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি সমর্থন করা হয়েছে। বিয়ের মতন ঘনিষ্ট সম্পর্কের ক্ষেত্রে বিশেষ করে নারী পুরুষ উভয়ই নিজেকে একে অপরের কাছে মেলে ধরে মানসিক তৃপ্তি পান।

গবেষণায় এটাও দেখা গেছে যে বৈবাহিক সম্পর্কে স্বামী স্ত্রী ক্রমাগত দেখেন যে কে কতটা নিজেকে মেলে ধরেছেন। সামাজিক আচারের এর পেছনে একটি বড় ভূমিকা রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ,লাতিন আমেরিকার অধিবাসিরা উত্তর আমেরিকার লোকের তুলনায় নিজেকে বেশি মেলে ধরতে পছন্দ করেন। কিন্তু দুই ক্ষেত্রেই কেউ পরিবারের অভ্যন্তরীণ কলহ এবং যৌন সম্পর্ক নিয়ে কথা বলতে পছন্দ করেন না। লাতিন আমেরিকার লোকেরা অনেক বেশি পছন্দ করেন গানবাজনা, সিনেমা, ও ব্যক্তিগত শখ আহ্লাদ নিয়ে কথা বলতে। ভারতে এই নিয়ে গবেষণা কমই হয়েছে, তবে দেখা গেছে যে বিশ্বাসী কাউকে মনের কথা বলতে পারা এখানে খুব গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।

মনোবিজ্ঞানীরা লক্ষ্য করেছেন যে আত্ম উন্মোচনের এক পারস্পরিক প্রভাব রয়েছে। তাই উনবিংশ শতাব্দীর লেখক জেন অস্টেন বলেছেন, “সুখী দাম্পত্য জীবন একটি সৌভাগ্যের বিষয়।” দেখা গেছে যে অপর ব্যক্তি যখন নিজেকে আমাদের সামনে মেলে ধরেন তখন আমরাও তাঁদেরকে আপন করে নেই। ফলে অপর ব্যক্তিও আমাদের বিশ্বাস ও ভরসা করতে শুরু করেন। বর্তমানে সোশ্যাল মিডিয়ার বন্ধুত্বও ঠিক এভাবেই কাজ করে।  

খালি প্রেমই না, বাবা-মার সঙ্গে সন্তানের সম্পর্কও নির্ভর করে নিজেকে মেলে ধরার উপর। আমি ও আমার সহকর্মীরা কলেজের ছাত্রদের উপরে একটি সাম্প্রতিক গবেষনায় দেখেছি যাদের পাশে বড় হয়ে ওঠার পথে বাবা-মা ছিলেন, তাঁরা সকলেই বাবা মার খুব ঘনিষ্ট। এটাও দেখা গেছে যে সব বাবা মায়েরা নিজেদেরকে সন্তানের কাছে মেলে ধরেন – তাঁদের সন্তানও বিপদে পড়লে তাঁদের কাছেই আগে পরামর্শ চায়। এর থেকে একটা জিনিস কিন্তু পরিষ্কার: আপনি যদি চান যে আপনার সন্তান আপনার কথা মেনে চলুক, তবে তাঁদের সাথে নিজের জীবনের সমস্ত অভিজ্ঞতা আলোচনা করুন।

তাহলে কি সব বলে দেবেন? অবশ্যই না। জরার্ডও স্বীকার করেছেন যে কোন কথাটি বলবেন আর কোনটি নয়, তা বিচার করা প্রয়োজন বৈকি। অধিকাংশ মনোবিদই বলেন যে কর্মক্ষেত্রে এই বিষয়ে সাবধানতা অবলম্বন করা খুবই প্রয়োজন। কিন্তু তাছাড়া নিজের ভেতরে কোনও কথা চেপে না রাখাই মঙ্গলের। কীভাবে তা করবেন আপনি? ছোট ছোট জিনিস দিয়ে শুরু করুন যেমন, সাম্প্রতিক দেখা কোনও টিভির অনুষ্ঠান, সিনেমা, বা পড়া কোনও বই নিয়ে আলোচনা করুন। কিন্তু মনে রাখবেন, সমালোচক না হয়ে সেগুলির ব্যপারে নিজের অনুভূতি ব্যক্ত করুন।

এডওয়ার্ড হফ্‌ম্যান নিউ ইয়র্কের ইয়েশিভা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগে অতিরিক্ত সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কাজ করেন। তাছাড়া উনি একজন অনুমতিপ্রাপ্ত মনোচিকিৎসক। মনোবিজ্ঞান জগতে ওঁনার সম্পাদিত এবং লেখা ২৫টিরও বেশি বই আছে। সম্প্রতি ডাঃ উইলিয়াম কম্পটন রচিত পজিটিভ সাইকোলজি: দ্য সায়েন্স অফ্‌ হ্যাপিনেস অ্যান্ড ফ্লারিশিং বইটিতে সহ লেখকের ভূমিকা পালন করেছেন। এছাড়া উনি ইন্ডিয়ান জার্নাল অফ্‌ পজিটিভ সাইকোলজি এবং জার্নাল অফ্‌ হিউম্যানিস্টক সাইকোলজি’র সম্পাদক মণ্ডলীর অন্তর্গত। আপনি তাঁকে columns@whiteswanfoundation.org ঠিকানায় চিঠি লিখতে পারেন।