বিশেষজ্ঞের কলমে

বিস্ময়কর বছরগুলি

ডাঃ শ্যামলা বৎসা
কিশোর বয়সের সমস্যা
ডাঃ শ্যামলা বৎসা

“পৃথিবীটা যেন হঠাৎ বড় হয়ে গেছে। না, বিজ্ঞানের ভাষা নয়, বরং অনেক দিনের চেনা এক অদ্ভুত জিনিস এটা। যে বুদ্বুদের মধ্যে এতদিন সুরক্ষিত ছিলাম, তা ভেঙ্গে যাওয়াতে একটা কড়া, বিষাক্ত হাওয়া আমায় ধিরে ধিরে গ্রাস করছে।”

এটি আমার একজন অত্যন্ত চেনা কিশোরের লেখা। এই সহজ সুন্দর ভাষায় সে বড় হওয়াটা কে বুঝিয়ে দিয়েছে। অনাবিল আবেগ ও কল্পনায় ঠাসা, এবং মানুষ ও প্রযুক্তিতে মোড়া এই বিশাল পৃথিবী যাকে কোন গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ করা সম্ভব নয়।

জীবনে এই প্রথম সব ঠিক বা ভুলের গণ্ডিতে আটকে থাকে না, বরং এই দুইয়ের মিশ্রণে গড়ে ওঠে আমাদের সমস্ত সিদ্ধান্ত। সংস্কার, বন্ধুবান্ধব, এমন কি কীধরনের জামা পরবো, কোন কিছুই আর সাধারণভাবে দেখা হয় না। সামাজিক রীতি নিয়ে মনে প্রশ্ন ওঠে কারণ, নিজের পরিচয়টাই তখন আমাদের কাছে সবথেকে গুরুত্বপুর্ণ হয়ে ওঠে।

সবথেকে আত্মবিশ্বাসী কিশোর বা কিশোরীও নিজেকে সম্পুর্ন রূপে গ্রহন করতে পারে না। আপাত দৃষ্টিতে এই বয়সে তৈরি হওয়া পারস্পরিক রেষারেষি ছেলেমানুষি মনে হলেও তা অনিবার্য। কারণ এই মানসিকতাই আমাদের নিজেকে গড়ে তোলার মাপকাঠি তৈরি করে দেয়। নিজে নিজের গুরুত্ব বোঝার জন্য তাই জীবনে জেতাটা খুব জরুরি। এটাই হল মানসিক সুস্থতা। কারণ এর অন্যথা আমাদের মনে নেতিবাচক চিন্তার জন্ম দেয়, যার থেকে অ্যাংজাইটি ও ডিপ্রেশনের মত সমস্যা দেখা দিতে পারে।

আমাদের সব সময় মনে রাখা উচিৎ যে শরীরের মতন মনও ভালো রাখা উচিৎ। যখনই কোন সমস্যায় পড়বে সবার আগে তোমার বাবা মায়ের কাছে যাওয়া উচিৎ। এক কথায় বলতে গেলে, বাবা মায়ের সাথে এক সুস্থ সম্পর্ক বজায় রাখাটা খুবই গুরুত্বপুর্ণ, কারন তাঁরা নিজের সন্তানকে সবচেয়ে ভালো চেনেন। হয়ত তাঁরা তোমার সব কথা মেনে নেন না, কিন্তু দিনের শেষে তাঁরা তোমার মঙ্গলই চান। যদি কোনও কারনে তুমি মা-বাবাকে মনের কথা খুলে বলতে না পারো, তবে অন্য কোনো ভরসাযোগ্য প্রাপ্তবয়স্ক ব্যাক্তিকে বা একজন মনোবিদকে সব খুলে বলতে পারো।

এখানে আরেকজন কিশোরের অভিজ্ঞতা বলতে চাইব:

“কৈশোর একটা কঠিন সময়। বড়দের লাগামহীন প্রত্যাশা আর অন্যান্য সমবয়সীদের উদাহরণ টানা একটা সময় বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। মা-বাবা আমাদের গুণাবলি এইসব তুচ্ছ মাপকাঠিতে মাপতে গিয়ে আমাদের মনোবল ভেঙ্গে দেন।

অন্যদের কথা যদি বাদও দেই, একবার নিজের মনের কথাটাই ভেবে দেখি তো! আমি কি সবসময় নিজেকে অন্যের সাথে তুলনা করি না? প্রতি মুহুর্তে অপরাজেয় প্রতিদ্বন্দ্বীদের কাছে হারতে হারতে নিজেকে অপদার্থ মনে হয় না? ভীষণ ক্লান্তিকর হলেও আমি মাঝে মাঝে এইসব ভাবি। সত্যি কথা বলতে কোনও কিছুই আমাকে এটা করা থেকে আটকাতে পারবে না।

জীবনে কি করতে চাই? সাফল্য বা ব্যার্থতার ব্যাখ্যা কী? এই সব উত্তর বুঝে উঠতে পারা এমনিতেই কঠিন আর তার ওপর মা বাবার চাপে আমি আরও দিশেহারা হয়ে যাই।

এছাড়াও আছে নৈতিক দ্বিধা। বিশেষত যখন স্কুলে পড়াশোনার চাপ বেড়ে যায়, তখন নিজেকে অনেক একলা মনে হয়। কিন্তু বন্ধুদের চাপে পড়ে মরিয়া হয়ে অন্যায় কিছু করতেও ইচ্ছা করে না।

পরিস্থিতি বা মানুষকে কখনও শুধুমাত্র ঠিক বা ভুলের গণ্ডিতে বেঁধে রাখা যায় না। আমি এক অদ্ভুত বিভ্রান্তিকর অবস্থায় আছি যেখানে বড়রা সত্যিই পুরোটা ভুল না কিছু অংশে ঠিক, তা বুঝতে পারি না।

আমার এই জটিল সমস্যার কোন সমাধান আছে কি না জানি না। হয়ত আমি একাই এই রকম ভাবি। কিন্তু তাও মাঝে মাঝে মনে প্রশ্ন জাগে, সত্যিই কি কৈশোরের জীবন এতটাই কঠিন?”

এটি শুধু একটি মেয়ের গল্প। আমি নিশ্চিত যে প্রত্যেক কিশোরীই যখন প্রথমবার সব কিছু নিজের চোখে দেখতে শেখে, তখন এই রকমই জিজ্ঞাসু হয়ে ওঠে। আগামী কয়েক সপ্তাহ এই বিভাগে কিশোর বয়সের মানসিক সুস্থতার ব্যাপারে আলোচনা করা হবে।
 

ডাঃ শ্যামলা বৎসা ব্যাঙ্গালুরুতে অবস্থিত একজন মনবৈজ্ঞানিক (সাইকিয়াত্রিস্ট) যিনি কুড়ি বছরেরও বেশী সময় ধরে এই পেশার সাথে যুক্ত। এই সংক্রান্ত আরও লেখা এখানে পাক্ষিক ভাবে প্রকাশিত হবে। আপনাদের কোন বক্তব্য বা জিজ্ঞাস্য থাকলে তাঁকে columns@whiteswanfoundation.org তে লিখে জানাতে পারেন।