বিশেষজ্ঞের কলমে

বিস্ময়কর বছরগুলি

ডাঃ শ্যামলা বৎসা
গুরুতর মানসিক উদ্বেগের ফলাফল কী হতে পারে
ডাঃ শ্যামলা বৎসা

বাইশ বছরের পায়েল রাজস্থানের এক যৌথ পরিবারের গৃহবধূ। সে তার স্বামীর সঙ্গে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ, অর্থাৎ আমার কাছে চিকিৎসার জন্য এসেছিল। একমাস ধরে  পায়েল খুব কান্নাকাটি করছিল ও টেনশনে ভুগছিল। এই ঘটনার দেড় বছর আগে পায়েলের বিয়ের ঠিক পরে পরেই সে খুব খিটখিটে হয়ে গিয়েছিল। মাঝে মাঝে সে চেঁচামেচি শুরু করত। সেই সময়ে পাঁচদিন ধরে পায়েল প্রায় অন্ধের মতো আচরণ করছিল। সেই দেখে এক চক্ষুরোগ বিশেষজ্ঞ পায়েলকে একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞের সঙ্গে পরামর্শ করার সুপারিশ করেন। মনোরোগের চিকিৎসায় তখন সে ভালো সাড়াও দেয়। দু'দিনের মধ্যে পায়েলের দৃষ্টি ফিরে আসে। পায়েলের মনে যে কারণে অসুন্তুষ্টি ছিল তা হল সে ভাবত যে সে আবার হয়তো তার চোখের দৃষ্টি হারিয়ে ফেলবে। তাই তার স্বামী এই সমস্যা প্রতিরোধ করার জন্য তাকে একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে নিয়ে আসে। 

পায়েলের বিষণ্ণতা ও মানসিক উদ্বেগের পিছনে ছিল রাজস্থানে সে যে যৌথ পরিবারে বড় হয়েছিল সেই পরিবারের ভাঙন এবং তার ফলে পায়েল ছোটবেলায় যে বাড়িতে থাকত সেই বাড়িটা বিক্রি হয়ে যাওয়ার ঘটনা। আমি পায়েলকে সংক্ষিপ্তভাবে কাউন্সেলিং করে এক সপ্তাহের জন্য দুটো ওষুধ দিয়েছিলাম। ওষুধ খাওয়া শেষ হলে আমি আবার তাকে পরীক্ষা করি।

এরপর পাঁচ সপ্তাহ পরে একটা হুইলচেয়ারে বসে পায়েল আমার কাছে চিকিৎসার জন্য এসেছিল। এর এক সপ্তাহ আগে পায়েলের পা ও ঊরুর বোধশক্তি হারিয়ে যায় এবং সে হাঁটাচলা করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। পায়েল আগেরবার যখন আমার কাছে এসেছিল তখন তার জীবনে দুটো ঘটনা ঘটেছিল। একটা ঘটনা হল- পায়েল রাজস্থানে তার পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিল। সেখানে গিয়ে পরিবারের পরিস্থিতি দেখে সে আবার খুব ভেঙে পড়ে। আগে তার মা ছিলেন একেবারে সুস্থসবল। কিন্তু এবার গিয়ে সে দেখে যে তার মা দুটো হাঁটুর ব্যথায় একেবার শয্যাশায়ী হয়ে পড়েছে। এমনকী, ডাক্তার হাঁটু দুটো বদলের জন্য অপারেশনের পরামর্শও দিয়েছেন। দ্বিতীয়টি হল, পায়েলের স্বামী রেগেমেগে তাকে তার বাবা-মায়ের কাছে থাকার কথা বলে এবং শ্বশুরবাড়িতে ফিরে না আসার জন্য রীতিমতো হুমকি দেয়। এভাবেই টেলিফোনে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে তিক্ত কথপোকথন হয়েছিল।

এই কথাবার্তার পরে পায়েল খুব টেনশন নিয়ে তাড়াতাড়ি রাজস্থান থেকে ফিরে এসেছিল। এর দু'দিন পরে পায়েল দেখে যে বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়াতেই পারছে না সে। কারণ কোমরের তলা থেকে তার পা দুটো সম্পূর্ণ অসাড় হয়ে গিয়েছিল। হাঁটাচলা করার কোনও ক্ষমতাই তার ছিল না।

যখন আমি তার সঙ্গে একা কথা বলেছিলাম তখন পায়েল আমার কাছে খুব কান্নাকাটি করে তার অনুভূতির কথা আমায় জানায়। সেই সঙ্গে বাপের বাড়ি সংক্রান্ত চিন্তার কথাও আমায় বলে। সে ভয় পেয়েছিল এই ভেবে যে সে তার স্বামীর ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে ফেলেছে। এবং শ্বশুরবাড়ির কাছে থেকে অসাধু উপায়ে সুবিধা নেওয়ার জন্য পায়েলের মধ্যে একপ্রকার অপরাধবোধও কাজ করছিল।

পায়েল আমায় বলেছিল যে আমার সঙ্গে কথা বলার পর আগের থেকে সে সুস্থ বোধ করছে এবং আমায় অনুরোধ করে বলেছিল আমি যেন পরের সপ্তাহে আবার তাকে সময় দিই। যেহেতু পায়েল আমার আগেরবারের দেওয়া ওষুধগুলো ঠিকমতো খাচ্ছিল না তাই আমি তাকে এবার অ্যানজিওলাইটিক দিই। আমি তার স্বামীকে ভিতরে ডেকে বলে দিই যে এই ওষুধগুলো এক সপ্তাহের জন্য চলবে। সত্যি বলতে কি তখনও পায়েল তার পায়ের দিকে চেয়ে দেখছিল। স্বামী-স্ত্রীর মুখে হাসিও দেখা গিয়েছিল। পায়েলের স্বামী জানতে চেয়েছিল যে কীভাবে তার স্ত্রী দৃষ্টিশক্তি আবার ফিরে পাবে?

পরের সপ্তাহে পায়েল পায়ে হেঁটে আমার অফিসে আসে। সঙ্গে তার স্বামীও ছিল। পায়েলের ঠোঁটে লেগেছিল মৃদু হাসি। পায়েলের মধ্যে যে ভয়ংকর চেঁচামেচি করার প্রবণতা ছিল তা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। সেইসময় পায়েল অনেক শান্ত হয়ে গিয়েছিল। তার পরিবারের লোকজন যে বাড়িতে বাস করে সেখানে ফিরে যাওয়ার কথা পায়েল এমনভাবে বলেছিল যাতে বোঝা গিয়েছিল যে সে বদলে যাওয়া পরিস্থিতিকে গ্রহণ করতে বা মেনে নিতে শুরু করেছে।

এর পরের সপ্তাহে যখন পায়েল আবার আমার কাছে আসে তখন তার অন্য কারোর সাহায্যের আর প্রয়োজনই ছিল না। এমনকী, তার মধ্যে খুঁড়িয়ে চলার কোনও লক্ষণই চোখে পড়ছিল না। স্বামী-স্ত্রীর সঙ্গে যৌথ আলাপ-আলোচনার পর তার স্বামী খুব সহজভাবে বুঝতে পেরেছিল যে অস্বাভাবিক বাহ্যিক আচার-আচরণের পিছনে থাকে গুরুতর কোনও মানসিক আতঙ্ক।

ছ'বছর আগে দার্জিলিং-এর একটা অল্পবয়সি মেয়ে দেবশ্রীর সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল। মেয়েটি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল। একজন স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞ তাকে সম্পূর্ণ পরীক্ষা করার পর আমার কাছে পাঠিয়েছিলেন। ল্যাবরেটরির পরীক্ষার দ্বারা প্রমাণিত হয় যে মেয়েটির কোনও শারীরিক অস্বাভাবিকতা নেই। শরীরের ডানদিকের হাত ও পায়ে তার কোনও সাড় এবং চলাচল শক্তি ছিল না। পায়েলের সমবয়সি দেবশ্রীর পারিবারিক পরিস্থিতিও পায়েলের মতোই ছিল। সেই সঙ্গে তার প্রতি শ্বশুরবাড়ির প্রত্যাশা এত বেশি ছিল যে তার জন্য দেবশ্রীর জীবনে সাংঘাতিক চাপের সৃষ্টি হয়েছিল। পায়েলের মতো দেবশ্রীর চিকিৎসাতেও এক সপ্তাহের মধ্যে ওষুধ এবং সাইকোথেরাপি অনেক সুফল দিয়েছিল। তার ক্ষতিগ্রস্ত অঙ্গপ্রত্যঙ্গে সাড়া জেগেছিল ও হাঁটাহাঁটির ক্ষমতাও জন্মেছিল। যদিও এরপরে আরও একটা সপ্তাহ  মেয়েটির হুইলচেয়ারের প্রয়োজন হয়েছিল। তার পরিবারের সঙ্গে অনেকগুলো বৈঠকের পর পরিবারের লোকজন বুঝতে পেরেছিল যে দেবশ্রীর শারীরিক অসুস্থতা এবং গুরুতর মানসিক উদ্বেগের মধ্যে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে। আর এর ফলেই তার জীবনে এত বিপর্যয় ঘটেছে।

আমাদের শরীরে সম্পূর্ণ পৃথক একটা নার্ভাস সিস্টেম বা স্নায়ুতান্ত্রিক ব্যবস্থা রয়েছে,  যাকে অটোনমিক নার্ভাস সিস্টেম (এএনএস) বলা হয়। এর সঙ্গে অ্যাড্রেনাল গ্রন্থি,  এন্ডোক্রিন অঙ্গ ও অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। মস্তিষ্কের আবেগজনিত অনুভূতি নিয়ন্ত্রণ করে এই ব্যবস্থা। সেন্ট্রাল নার্ভাস সিস্টেমের অংশ হিসেবে (সিএনএস) এই ব্যবস্থা স্বাধীনভাবে কাজ করে। মানুষের যুক্তি-বুদ্ধির বোধ  নির্ধারণ করে। তাই মানুষের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে যখন কোনও সাড়া থাকে না বা অন্ধত্বের জন্ম হয় তখন সেই পরিস্থিতির পিছনে কোনও সচেতন উদ্দেশ্য থাকে না। এগুলো  মোটেই কোনও অসুখের ভান বা ছল নয়। এর ফলে একজন মানুষের মধ্যে যে অক্ষমতার জন্ম হয় তা একেবারে বাস্তব। যখন মানুষের মনে মাত্রাছাড়া চাপ জন্মায় তখন এএনএস গুরুতর মানসিক উদ্বেগের মোকাবিলা করার জন্য প্রস্তুত হয়। এএনএস ব্যবস্থা সাধারণত সফল হয় বা অনেকের ক্ষেত্রে আবার পায়েল বা দেবশ্রীর মতো অবস্থাও হয়। কখনও কখনও অটোনমিক নার্ভাস সিস্টেম ঠিকঠাক কাজ না করার জন্য মানুষ দিশাহারা বোধ করে, শারীরিকভাবে অসাড় হয়ে পড়ে, চলাচল করার ক্ষমতা হারায়, যেমন পায়েল ও দেবশ্রীর ক্ষেত্রে ঘটেছিল। এক্ষেত্রে নিষ্প্রাণ বা জড় পদার্থ শব্দটি খুবই যথোপযুক্ত উদাহরণ।

এই রোগের চিকিৎসা সাধারণত পর্যায়ভিত্তিক হয়ে থাকে। একবার যদি রোগের লক্ষণগুলো দূর হয়ে যায় তাহলে আর চিকিৎসার প্রয়োজন পড়ে না। পায়েল বা দেবশ্রীর মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে থেরাপি তাদের জীবনের ওঠাপড়ার সঙ্গে মোকাবিলা করতে প্রভূত সাহায্য করেছিল। কিন্তু তাদের জীবনে এমন ভাগ্যবিপর্যয় আর ফিরে না আসার সম্ভাবনাই বেশি। এছাড়া আরও একটা আশার কথা হল পায়েলের স্বামী বা দেবশ্রীর পরিবারের লোকজনের সঙ্গে খোলাখুলি আলোচনার মধ্য দিয়ে তাদের অর্ন্তদৃষ্টি জাগানো সম্ভব হয়েছিল। আর সেই সঙ্গে ভবিষ্যতে তাদের কাছের মানুষকে এরকম বিপদ থেকে রক্ষা করার পথ দেখানো গিয়েছিল।

 

প্রবন্ধটিতে ব্যাঙ্গালুরু-নিবাসী মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডাঃ শ্যামলা বৎসার অভিজ্ঞতা বর্ণিত হয়েছে যিনি কুড়ি বছরেরও বেশী সময় ধরে এই পেশার সাথে যুক্ত। । এই বিষয়ে যদি কারোর কোনও মন্তব্য বা কিছু প্রশ্ন থাকে তাহলে এই ওয়েবসাইটে নিজেদের মতামত লিখতে পারেন। ওয়েবসাইটের ঠিকানা হল - columns@whiteswanfoundation.org