বিশেষজ্ঞের কলমে

বিস্ময়কর বছরগুলি

ডাঃ শ্যামলা বৎসা
আপনার টিনেজারের আচরণগত পরিবর্তনের আড়ালে লুকিয়ে থাকতে পারে মানসিক সমস্যা
ডাঃ শ্যামলা বৎসা

দিল্লির মেয়ে, ২৩ বছরের আনিশা বিগত ৮ মাস ধরে ব্যাঙ্গালোরে বসবাস করছিল।  আমার কাছে আসার আগে দুই দফায় মেয়েটি কাউন্সেলিং-এর জন্য একজন মনোবিদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল। পরে এই কাউন্সেলরের সুপারিশ মতোই আমার কাছে এসেছিল। এই সময় আনিশা গুরুতর মানসিক অবসাদে ভুগছিল, তবে কাউন্সেলিং প্রক্রিয়া চলাকালীন চিকিৎসায় সে সাড়া দিচ্ছিল। কাউন্সেলরের ধারণা হয়েছিল যে, মেয়েটির হয়তো ঠিকঠাক ওষুধের প্রয়োজন রয়েছে।

প্রথম দফায় আনিশা খুব মনমরা হয়ে থাকত এবং নিজের ভিতরে কান্না চেপে রাখার চেষ্টা করত। এক মাসেরও বেশি সময় ধরে মেয়েটি অবসাদে ভুগছিল। তার অবসাদ এতটাই গুরুতর ছিল যে সে নিজের সমস্যা কাউকে বোঝাতে বা বলতে পারত না। এই অবস্থায় জনৈক এক ব্যক্তি আনিশার জীবন-কাহিনি একটি ওয়েবসাইটে প্রকাশ করে। এর থেকেই জানা যায় যে, আনিশা আদতে ছিল খুবই সাবলীল এবং চনমনে স্বভাবের মেয়ে। আনিশার প্রধান অসহায়তা হল, সে তার অবসাদের কথা কাউকে বলতে বা বোঝাতে পারছিল না। সে যখন হাই স্কুল এবং কলেজে পড়ত তখন দুই-তিন বার এই ধরনের সমস্যায় পড়েছিল। কিন্তু ওই সময়ে এই সমস্যার পাশাপাশি তার জীবনে অন্যান্য এমন কিছু ঘটনা ঘটে, যার ফলে তার মূল সমস্যা ততটা জটিল আকার ধারণ করতে পারেনি।

তার জীবনের টুকরো কিছু গল্প থেকে এই কথা জানা যায় যে, দুটি স্বতন্ত্র ঘটনা এমনভাবে তার মনে দাগ কেটেছিল যা শুধু অফুরন্ত আনন্দই বয়ে আনেনি, সম্পদ হিসেবে তার জীবনে পাকাপাকি জায়গা করে নিয়েছে। এই ঘটনা দুটি যখন ঘটে, তখন আনিশা আন্ডারগ্র্যাজুয়েটের ছাত্রী এবং হোস্টেলে থেকে পড়াশুনা করছে। তার রুমমেটের কথায় আনিশা তখন সব সময়ই বেশ উল্লসিত থাকত। তাছাড়া আনিশারও এই কথা মনে ছিল যে, দু'-একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা বাদ দিলে এমন কোনও কিছু ঘটেনি, যা তাকে সেই সময় কষ্ট দিয়েছে বা যাতে তার মন খারাপ হয়েছে। আর যদি কোনও ঘটনায় সে আঘাত বা কষ্ট পেত, তাহলে সেই ঘটনার প্রভাব তার জীবনে কয়েক ঘণ্টা বা দু'-এক দিনের বেশি স্থায়ী হত না।

কিন্তু ক্রমশ এই পরিস্থিতির বদল ঘটতে শুরু করল। আনিশার মেজাজ-মর্জির অস্বাভাবিক পরিবর্তন তথা মানসিক বিকার প্রকট হয়ে উঠতে থাকল। এই সময় কোনও নির্দিষ্ট কারণ ছাড়াই সে রেগে যেত এবং কথায়-কথায় বিরক্তি প্রকাশ করত। সেই সময়ে একটি ঘটনায় আনিশা এত আপ্লুত হয়েছিল যে, বহুতলের বারান্দায় দাঁড়িয়ে সে ভাবতে শুরু করেছিল যে সে তার দুই হাত ছড়িয়ে বা প্রসারিত করে উড়ে যেতে পারে কিংবা ঝাঁপও দিতে পারে। এই ঘটনা আমার কাছে আনিশার আসার দুই সপ্তাহ আগে ঘটেছিল। বস্তুতপক্ষে এই ঘটনায় ভয় পেয়েই আনিশার বন্ধু তাকে একজন মনোবিদের কাছে নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।

এর পরে আনিশার বর্তমান অবসাদগ্রস্ত মানসিক অবস্থা এবং তার অতীতের কিছু সমস্যা সংক্রান্ত তথ্যের উপর নির্ভর করে আমরা মেয়েটির মূল রোগটি চিহ্নিত করি এবং এটি যে মানসিক বিকারজনিত একটি সমস্যা সে সম্বন্ধেও নিশ্চিত হই। চিকিৎসা শুরু হয় ও আনিশা সপ্তাহ দুয়েকের মধ্যে সেই চিকিৎসায় সাড়াও দিতে থাকে। অর্থাৎ ওষুধের কার্যকারিতা ক্রমান্বয়ে প্রকাশ পায়। এইভাবে নিয়মিত তাকে পর্যবেক্ষণ করা হতে থাকে। এক্ষণে লক্ষ করা যায় যে, তার মনের বিকারগুলি কেটে গিয়ে স্বাভাবিকতা ফিরে আসছে এবং তার সঙ্গে এখন আর অন্যদের আচরণের পার্থক্য করা যাচ্ছে না।

মানুষের মনের কাজকর্ম বা তার মতি-গতির বদল সহজে বোধগম্য হয় না এবং তা চোখেও দেখা যায় না। তাই এর নিরাময়ের জন্য চাই সঠিক চিকিৎসা। আনিশা যখন বহুতলের উপর থেকে ঝাঁপ দিতে যাচ্ছিল, তখন তার মনের বিপন্নতা ছিল চরমে। আবার আনিশা যদি অত্যন্ত গভীর অবসাদে ডুবে যেত তাহলে বেঁচে থাকার ইচ্ছেটুকুও সে হারিয়ে ফেলত। এই ধরনের চরম মনোভাব প্রকাশ পাওয়া ছাড়াও এই অবস্থায় মানুষের আরও অনেক বহিঃপ্রকাশ দেখা যায়। যেমন— অশান্ত জীবন যাপন করা, কাছের মানুষদের সঙ্গে লড়াই-ঝগড়া বা সম্পর্ক নষ্ট করে দেওয়ার  প্রবণতা, যৌন সম্পর্ক স্থাপনে অনীহা, অন্যকে অপমান বা নিগ্রহ করার ইচ্ছে প্রভৃতি। অনেক ক্ষেত্রে আবার কেউ কেউ তার জমানো টাকা খরচ করে প্লেনে চেপে এক এয়ারপোর্ট থেকে আরেক এয়ারপোর্টে ঘুরে বেড়ায়। এইভাবেই সে ওড়ার সুখ  অনুভব করে। গভীর অবসাদ একজন মানুষের উচিত-অনুচিত বোধ এবং চাওয়া-পাওয়ার অনুভূতিগুলিকে নষ্ট করে দেয়। এইভাবে জীবন ক্রমশ অন্তঃসারশূন্যতায় ভরে যায়।

অল্পবয়সি ছেলেমেয়েদের মধ্যে প্রায়ই দেখা যায় যে, কোনও বিষয়ে বিভ্রান্ত হয়ে অতিরিক্ত উচ্চাকাঙ্খী হয়ে ওঠা, মেজাজি ভাব, হরমোনগত সমস্যায় ভোগা, পিএমএস, ইন্টারপার্সোনাল সমস্যা, আত্মনির্ভরতার অভাব ইত্যাদি।

কমবয়সিদের এহেন মানসিক বিকারকে সব সময়ে মেজাজের তারতম্য বা ওঠা-নামা বলে মনে করা যথোপযুক্ত নয়। এই বিকারজনিত সমস্যা মানুষের মানসিক স্থিতির চরম পরিবর্তন সাধন করে। হয় সে অতিরিক্ত খুশি থাকে আর না হয় সাংঘাতিক বিমর্ষ হয়ে যায়। এই সময় রোগীর পরিবার এবং বন্ধুদের উচিত একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞের সাহায্য নিয়ে যত দ্রুত সম্ভব চিকিৎসার ব্যবস্থা করা ও রোগীকে সুস্থ করে তোলা।

এই লেখায় ড. শ্যামলা বত্‌স তুলে ধরতে চেয়েছেন যে, কিশোর-কিশোরীদের ব্যবহারের বদল একপ্রকার মানসিক স্বাস্থ্য সংক্রান্ত সমস্যারই নামান্তর। এই প্রবন্ধে এটাই দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে যে, কীভাবে অল্পবয়সিদের আচরণগত অস্বাভাবিকতা তাদের মানসিক স্থিতিকে নষ্ট করে ক্রমশ বিকারগ্রস্ত করে তোলে। এই রচনায় ২৩ বছর বয়সি আনিশার জীবনকাহিনি শুধু করুণই নয়, এটি আমাদের এই শিক্ষাই দেয় যে, এহেন সমস্যা গুরুতর হয়ে ওঠা বা হাতের বাইরে চলে যাওয়ার আগেই এর যথাযথ চিকিৎসা হওয়া জরুরি।

ডাঃ শ্যামলা বৎসা ব্যাঙ্গালুরুতে অবস্থিত একজন মনোবৈজ্ঞানিক (সাইকিয়াত্রিস্ট) যিনি কুড়ি বছরেরও বেশী সময় ধরে এই পেশার সাথে যুক্ত। এই সংক্রান্ত আরও লেখা এখানে পাক্ষিক ভাবে প্রকাশিত হবে। আপনাদের কোন বক্তব্য বা জিজ্ঞাস্য থাকলে তাঁকে columns@whiteswanfoundation.org তে লিখে জানাতে পারেন।