কল্যাণ

নৈতিক উত্তরণ: আনন্দের একটি বিস্ময়কর পথ

ডাঃ এডওয়ার্ড হফ্‌ম্যান

আপনি কি জানতেন যে - আমেরিকার তৃতীয় রাষ্ট্রপতি আর ওই দেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের প্রধান লেখক - থমাস জেফারসন ইতিবাচক মনোবিজ্ঞানের একটি নতুন বৈশিষ্ট্য সৃষ্টি করতে সাহায্য করেছিলেন? এটি একটি জলন্ত উদাহরণ যে কীভাবে ইতিহাসের মহান ব্যক্তিত্বরা মানুষের মস্তিষ্কের বিষয়ে নতুন অর্ন্তদৃষ্টি খুঁজে পেতে সাহায্য করেছেন। ১৭৭১ সালে জেফারসনের বন্ধু রবার্ট স্কিপউইথ জানতে চেয়েছিলেন যে তাঁর ব্যক্তিগত পাঠাগারের জন্য কী বই কেনা উচিত – আর জেফারসন পরামর্শ দিয়েছিলেন উপন্যাস সংগ্রহ করার জন্য (সাথেই ইতিহাস এবং প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের খণ্ডের) কারণ “দান বা কৃতজ্ঞতার কোন কর্ম... যা আমাদের দৃষ্টি বা কল্পনার সামনে উপস্থাপন করা হয় (আমাদের) গভীরভাবে প্রভাবিত করে তার সৌন্দর্যের মাধ্যমে – এবং আমাদের মধ্যে একটি প্রবল ইচ্ছা জাগিয়ে তোলে দাতব্য এবং কৃতজ্ঞতা সম্পন্ন কাজ করার জন্য।” নিউ ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানের প্রোফেসর জনাথন হাইদ্‌থ নৈতিক বিরক্তির (যে নেতিবাচক অনুভূতি আমরা অনুভব করি বীভৎস কর্মের কথা শুনে)ওপর গবেষণা করছিলেন যখন উনি জেফারসনের এই উক্তি পড়েন। শুনতে তো বেশ আকর্ষক লাগছিল কিন্তু কথাটি কি বৈজ্ঞানিক ভাবে সত্য?

২১ শতকের শুরুর দিকে ডঃ হাইদ্‌থ এবং তাঁর আন্তর্জাতিক সহকর্মীদের দ্বারা করা গবেষণার ক্রমে জানা যায় যে উত্তরটি হল হ্যাঁ। অনুভূতি এবং উদ্দেশ্যের ফলাফল, উভয় বিষয়ের ক্ষেত্রে নৈতিক উত্তরণ বা নৈতিক বিকাশ (দুটো কথাই এখন ব্যবহার করা হয়) একটি বাস্তব এবং পরিমাপযোগ্য মানসিক অবস্থা রূপে প্রমাণিত হয়েছে – যা ক্ষণিক সুখের থেকে আলাদা। হয়তো আপনি ভাবছেন এই নিয়ে, এই মানসিক অবস্থা সরাসরি জড়িয়ে রয়েছে উদ্ভাসিত এবং উন্নত অনুভূতির সাথে, বুকের মধ্যে উষ্ণতা অনুভব করার সাথে, আরও ভালো মানুষ হওয়ার এবং অন্যদের সাহায্য করার ইচ্ছার সাথে।

আশ্চর্যের কথা এই যে গবেষণামূলক পরীক্ষা থেকে জানা গিয়েছে যে এমন সিনেমা যা অনুপ্রেরিত করে – ডকুমেন্টারি বা কাল্পনিক ছবি যাই হোক না কেন – নৈতিক উত্তরণকে জাগিয়ে তোলে। এই আবিষ্কার মানসিক স্বাস্থ্য পেশাদারদের চিকিৎসাবিদ্যাগত কাজের সাথে মিলে যায়। যেমন আমি কিছুদিন আগে এই প্রসঙ্গে সিনেমার প্রভাবে নিয়ে ইন্টারনেটে একটি জিজ্ঞাসা রেখেছিলাম যাতে সারা বিশ্বের মনোবিজ্ঞানী, কাউন্সেলর, এবং ব্যক্তিগত কোচেরা জানিয়েছেন যে কীভাবে কিছু বিশেষ ধরণের সিনেমার প্রভাবে তাঁদের ক্লায়েন্ট-রা মানসিক উত্তরণ অনুভব করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে যুগান্তকারী আত্মজীবনী যেমন ‘গান্ধী’ এবং ‘সিন্ডলার্স লিস্ট’, আর ছোট সিনেমা যেমন ‘দা বুক থিফ’ আর ‘গ্রাউন্ডহগ ডে’। কিছু সহকর্মী জানান যে তাঁরা নিয়মিত ভাবে কিছু বিশেষ ছবি দেখার পরামর্শ দেন তাঁদের ক্লায়েন্টদের যাতে তাঁরা মানবিকতার বিষয়ে বৃহত্তর আশা লাভ করতে পারেন এবং জানতে পারেন যে মানুষ উদারতা, সমবেদনা, এবং দয়াশীলতা দেখাতে পারেন – শুধু স্বার্থপরতা, নিন্দা এবং নিষ্ঠুরতা না।

আমার হাই-স্কুলের অ্যালামনি ওয়েবসাইটে পোস্ট করা এমনই এক প্রশ্নের অনেক মন থেকে দেওয়া উত্তর পেয়েছিলাম। একজন উত্তরদাতা জানান, “সাত বছর মিডিয়া সেল্‌সে কাজ করার পরে আমি নতুন চ্যালেঞ্জ খুঁজছিলাম। তখন আমি ‘স্ট্যান্ড’ আর ‘ডেলিভার’ দেখি যা বলিভিয়ায় জন্মগ্রহণ করা লস এঞ্জেলেসের শিক্ষক জেইমি এস্কালান্টের উপর বানানো। এটা আমার জীবনের সব থেকে প্রভাবশালী অভিজ্ঞতা যা আমাকে সাহায্য করে এটা নিশ্চিত করতে যে আমি হাই-স্কুল এবং কলেজ দুটো স্তরেই পড়াব।” আরেকজন উত্তরদাতা লিখেছে, “আমার মনে আছে আমি ‘টুয়েল্ভ অ্যাংগ্রি মেন’ দেখেছিলাম, ১৯৫০-এর দশকের একটি ছবি খুনের মামলায় অচল অবস্থায় আটকে থাকা নির্ণায়কগনদের নিয়ে। দেখে আমার মনে হয়েছিল যে একজন ব্যক্তি – সমস্ত প্রতিকূলতা সত্ত্বেও – এই বিশ্বে পরিবর্তন আনতে পারে।”

এই আকর্ষণীয় ঘটনা নিয়ে পড়াশুনা করছেন জাভিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের ডঃ রায়েন নিইমিক যিনি হলেন এখনকার প্রথমসারির মনোবিজ্ঞানীদের মধ্যে একজন। তাঁর মতে, একটি অনুপ্রেরিত করার মতো সিনেমা বা চরিত্রকে দেখার পরে অনুভব করা উত্তরণ অনেক ভাবে দেখা দিতে পারে। যেমন, আমরা গল্পের মূল চরিত্রের শক্তি অনুকরণ করার কথা ভাবতে পারি, নিজেদের বা আমাদের প্রিয়জনদের সাহায্য করার জন্য। তাই ‘দা শোশেঙ্ক রিডেম্পশন’ কিছু মানুষকে অনুপ্রেরিত করে নিজেদের জীবনে আরও আশাবাদী এবং ধৈর্যের সাথে এগিয়ে যাওয়ার জন্য। অন্য ব্যক্তিরা ‘দা আর্টিস্ট’-এর মতো ছবি দেখে ঠিক করেন যে যা দেখানো হয়েছে তার বিপরীত একটি শক্তি বা গুণ বেছে নেবেন – যেমন জীবনের প্রতি উচ্ছ্বাসের বদলে কৃতজ্ঞতা। আবার এমন কিছু মানুষ আছেন যারা ‘গ্রাউন্ডহগ ডে’-র মতো সিনেমা দেখে “ভালো কাজ করার” জন্য অনুপ্রেরিত হন, বা দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ঘটিয়ে নিজেদের উন্নত করার কথা ভাবেন। আমার পেশাদারী অভিজ্ঞতা থেকে জেনেছি যে এই প্রসঙ্গে অন্য যে সব ছবির কথা বলা যায় তা হল “এজ গুড এজ ইট গেট্‌স”, “ফাইন্ডিং ফোরেস্টার” আর পরিচালক ফ্রাংক কাপ্রার সর্বোত্তম ছবি “ইট্‌স আ ওয়ান্ডারফুল লাইফ”। সূচিটি অনেক লম্বা এবং এটি খুবই উৎসাহের বিষয়।

নৈতিক উত্তরণের কি আসলে কোন শারীরিক ভিত্তি রয়েছে? সাম্প্রতিক বৈজ্ঞানিক গবেষণা তাই বলছে। ওরেগণ বিশ্ববিদ্যালয়ের ডঃ সারিনা সেটাম দ্বারা পরিচালিত এক পরীক্ষায় ১০৪ জন কলেজের ছাত্রছাত্রীদের কয়েকটি ভিডিও দেখানো হয় যাতে বীরত্বপূর্ণ, সহানুভূতিশীল বা কেবল হাস্যকর পরিস্থিতি ছিল। সেই সময় গবেষকরা পরিক্ষা করতে থাকেন অংশগ্রহণকারীদের হৃদস্পন্দন, মিডিয়াল প্রিফ্রন্টল কর্টেক্সের কার্যকলাপের পাশাপাশি তাদের শ্বাসযন্ত্রের সাইনাস অ্যারিথমিয়া – প্যারাসিম্প্যেথেটিক (পিএনএস) স্নায়ুতন্ত্রের কার্যকলাপ একটি নির্দেশক, নিজেদের শান্ত করার পদ্ধতি। ডঃ সেটামের দল খুবই অবাক হয়ে যায় এটা দেখে যে যারা উত্তরণমূলক অনুপ্রেরণার ভিডিও দেখেছিল তাদের হৃদস্পন্দন এবং পিএনএস দুটোই বৃদ্ধি পায়। অন্যদিকে যে ছাত্রছাত্রীরা শুধুমাত্র হাস্যকর ভিডিও দেখছিল তাদের হৃদস্পন্দন বা পিএনএস-এ কোন পরিবর্তন ঘটেনি।

এমন ধরণের গবেষণার অর্থ হল নৈতিক গুণসম্পন্ন ঘটনার সাক্ষী হওয়ার ফল একযোগে শক্তি সঞ্চার করে এবং শারীরিকভাবে ভালো বোধ করায় – যা একটি দারুণ জুটি! যেমন ডঃ সেটাম একজন সংবাদদাতা কে জানান “আমরা জানতে পেরেছি যে মানুষের সদয় হওয়ার ঘটনার একটি অনুপ্রেরণাকারি ভিডিও কেবলমাত্র দেখিয়ে শরীরে নাটকীয় ঘটনা ঘটানো সম্ভব এবং আপনার মধ্যে এমনটাই করার ইচ্ছেকে জাগিয়ে তুলবে এবং সামাজিক কুশলতার ভাগীদার হতে সাহায্য করবে।”

নির্দেশিত ক্রিয়া

যেহেতু নৈতিক উত্তরণ ভালো কর্ম এবং ব্যক্তিগত আনন্দের উৎস, আপনি সাক্ষী ছিলেন এমন উল্লেখযোগ্য করুণা, সাহস, বা পরাক্রমশক্তিসম্পন্ন ঘটনার কথা মনে করার চেষ্টা করুন। দৈনন্দিন জীবনে শেষবার কবে আপনি একজনের প্রতি অন্য জনের দয়াশীল ব্যবহারের সাক্ষী ছিলেন? লেখার মাধ্যমে ঘটনার বর্ণনা করুন এবং অবশ্যই জানাবেন যে এতে আপনি কেমন অনুভব করেছিলেন। আপনি কি এই দুই ব্যক্তিকে চেনেন না কি এরা আপনার কাছে অপরিচিত? আপনি কি অনুপ্রেরিত অনুভব করেছিলেন এমন ব্যবহার অন্যদের সাথে করার জন্য? যদি এর উত্তর হ্যাঁ হয়, তাহলে আপনি এর জন্য কী পদক্ষেপ নিয়েছিলেন?

এর পর এমন একটি সিনেমার বর্ণনা করুন যা দেখে আপনি খুবই ভাবুক হয়ে পড়েছিলেন, সেই সিনেমায় হয়তো কোন শারীরিক বা নৈতিক সাহস দেখানো হয়েছিল, বা পরার্থবাদ, বা অটল ভালবাসা যেমন একজন অভিভাবকের তার সন্তানের প্রতি। সিনেমাটি দেখে আপনি শারীরিক এবং মানসিকভাবে কেমন অনুভব করেছিলেন? আপনি কি উদ্যোক্তার সাথে বেশী মিল খুঁজে পেয়েছেন না প্রাপকের সাথে? অবশেষে, উৎসাহের প্রয়োজন এমন একজন টিন এজারকে মানবিকতার সুন্দর দিকের প্রভাব সম্বন্ধে জানানোর জন্য আপনি কোন সিনেমা দেখতে বলবেন, এবং কেন?

ডাঃ এডওয়ার্ড হফ‌ম্যান নিউ ইয়র্কে ইয়েশিভা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের উপাধ্যক্ষ। তাছাড়া উনি একজন অনুমোদিত মনোচিকিৎসক। মনোবিজ্ঞান জগতে ওঁর সম্পাদিত এবং লেখা ২৫টিরও বেশী বই আছে। সম্প্রতি ডাঃ উইলিয়াম কম্পটন রচিত পজিটিভ সাইকোলজি: দ্য সায়েন্স অফ হ্যাপিনেস অ্যান্ড ফ্লারিশিং বইটিতে সহ লেখকের ভূমিকা পালন করেছেন। এছাড়া উনি ইন্ডিয়ান জার্নাল অফ পজিটিভ সাইকোলজি এবং জার্নাল অফ হিউম্যানিস্টিক সাইকোলজি’র সম্পাদকমণ্ডলীর অন্তর্গত। আপনাদের কোন বক্তব্য বা জিজ্ঞাস্য থাকলে তাঁকে columns@whiteswanfoundation.org তে লিখে জানাতে পারেন।