We use cookies to help you find the right information on mental health on our website. If you continue to use this site, you consent to our use of cookies.

স্থানান্তরের বিষয়েঃ বাবা-মায়ের থেকে দূরে কলেজের হোস্টেলে থাকাটা আমার কাছে মোটেই সহজ ছিল না

আমি মুম্বইয়ে জন্মেছি এবং জীবনের প্রথম কুড়িটি বছর সেখানেই কাটিয়েছি। যখন আমার তেইশ বছর বয়স তখন ব্যাঙ্গালোরের একটি নামী কলেজে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি কোর্স পড়ার জন্য ভর্তি হয়েছিলাম। কোর্সে ভর্তি হয়ে আমি পেইংগেস্ট থাকার জন্য কলেজের আশেপাশে ঘর খুঁজতে শুরু করেছিলাম; সেগুলোর মধ্যে অধিকাংশই ছিল ছোট এবং সেই ছোট ঘরগুলোতে একসঙ্গে অনেক লোকের থাকার ব্যবস্থা ছিল। ঘরগুলোকে দেখলে দম বন্ধ হয়ে আসত। সৌভাগ্যবশত আমি আমাদের কলেজের হোস্টেলে থাকার জন্য একটা ঘর পেয়ে যাই এবং সেখানে
চলে যাই।

আমি আমার পরিবারের লোকেদের খুব কাছের একজন ছিলাম এবং ব্যাঙ্গালোরে যাওয়ার আগে পর্যন্ত আমি কখনও আমার পরিবারের থেকে দূরে থাকিনি। তাই ব্যাঙ্গালোরে গিয়ে এক সপ্তাহের মধ্যেই পরিবারের জন্য আমার মন খারাপ করা শুরু করে। আসলে আমি খুব ঘরমুখো বা ঘরকুনো হয়ে পড়েছিলাম। হোস্টেলে থাকাকালীন আমি বেশ অসুস্থ হয়ে পড়ি। সেই সঙ্গে এক সপ্তাহ ধরে পেটের অসুখেও ভুগেছিলাম।

হোস্টেলের জীবনযাত্রা মানিয়ে নেওয়া আমার কাছে আদৌ সহজ কাজ ছিল না; সেখানে একে অপরের সঙ্গে মিলেমিশে থাকার কোনও বোধই কারোর মধ্যে ছিল না। আমি যেহেতু বরাবরই একটু অর্ন্তমুখী সেহেতু আমার পক্ষে নতুন বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে মেলামেশা করা কষ্টকর হয়ে দাঁড়িয়েছিল। আমার হোস্টেলের সহপাঠীরা যে যেখান থেকে এসেছিল সেখানকার সহপাঠীদের নিয়ে তারা নিজস্ব এক-একটা দল গড়ে তুলেছিল। হোস্টেলে উত্তর ভারতের একদল শিক্ষার্থী তাদের নিজেদের একটা দল তৈরি করেছিল, আবার আরেক দল ছিল দক্ষিণ ভারতের। মুম্বইয়ের বাসিন্দা হিসেবে কোনও একটা দলে যোগ দিতে আমার ভালো লাগেনি...তাই দুটো দলের কোনওটাতেই আমি যোগ দিইনি।

অন্যদিকে হোস্টেলের অন্য আবাসিকদের সঙ্গে সংস্কৃতির দিক থেকেও আমার মিল ছিল না। আমি জানতাম হোস্টেলে যেসব মানুষের সঙ্গে আমি ছিলাম তারা সবাই সমকামিতায় ভয় পেত। এজন্য হোস্টেলের অন্যান্যদের কাছ থেকে আমায় অনেক  বিদ্রূপাত্মক মন্তব্য শুনতে হয়েছিল। কিন্তু আমি আমার নিজের যৌন অভিমুখ নিয়ে তাদের সঙ্গে কোনও কথাই বলতে চায়নি। আসলে আমি একজন সমকামী এবং এজন্য আমি আশঙ্কায় থাকতাম যে যদি সেই সত্যি কথা আমি হোস্টেলের কাউকে বলি তাহলে পরিস্থিতিটা আমার জন্য একেবারেই সুখকর হবে না। আর একথা শোনার পর হোস্টেলের বাকি বাসিন্দারাও আমার সঙ্গে ঘর বা বাথরুম ব্যবহার করতে নাও চাইতে পারে। তাই নিজের যৌন বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে আমি একেবারে মুখ  বন্ধ করেছিলাম। আর এই বিষয়টা আমার কাছে নতুন ও অদ্ভুত ছিল; কারণ বাড়িতে আমি কখনোই এমনভাবে থাকিনি।

সেই সময়ে আমার পরিবারের সঙ্গে কোনওভাবে যোগাযোগ না রাখতে পারাটা আমার কাছে অত্যন্ত কষ্টদায়ক ছিল। কারণ আমাদের হোস্টেলে মোবাইল ফোন ব্যবহারের সুযোগ ছিল না। আমি হোস্টেল থেকে বাইরে বেরিয়ে যেতাম। আমার পরনে থাকত কলেজ-নির্ধারিত সাধারণ পোশাক। এমনকী কলেজে ক্লাস শেষ হয়ে যাওয়ার পরেও আমি তা পরে থাকতাম। হোস্টেলের আবাসিকদের সঙ্গে আমি প্রায় কথা বলাই বন্ধ করে দিয়েছিলাম। কিন্তু কলেজে যেতে আমার খুব ভালো লাগত। কারণ সেখানে আমি এমন সব বন্ধু পেয়েছিলাম যারা ছিল অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র। সপ্তাহের শেষের দিনগুলো আসলেই আমার খুব খারাপ লাগত; কারণ ওইসময়ে  কলেজের বন্ধুদের সঙ্গে আমার দেখা হত না এবং নিজেকে ভীষণ একা মনে হত।

সপ্তাহের শেষে হোস্টেলের অধিকাংশ আবাসিকই তাদের বাড়িতে চলে যেত এবং হোস্টেল তখন প্রায় খালি হয়ে যেত। আমি আমার বাড়ি বেশি যেতে পারতাম না। কারণ বাড়ি যেতে একদিকে যেমন প্রচুর সময় লাগত, তেমন আবার প্লেনে মুম্বই যেতে গেলে অনেক টাকা-পয়সা খরচেরও ব্যাপার ছিল। তাই সপ্তাহের শেষের ছুটির দিনগুলো আমি হোস্টেলের কাছে থাকা একটি মন্দিরে চলে যেতাম। সেখানেই বসে থাকতাম বা অনেকসময়ে একঘণ্টা বা দু'ঘণ্টা ধ্যান করতাম। এভাবেই দিনগুলো কেটে যেত। কিন্তু কতক্ষণই বা একা মন্দিরে বসে থাকা যায়? ওইসময়ে আমি হোস্টেলের ঘরে একা রাত কাটাতাম। একা থাকতে ভয় পেতাম বলে ঘরের বাইরে উঠোনের আলোগুলো সারা রাত ধরে জ্বলত।

সেখানে থাকাকালীন আরেকটা বড় সমস্যা ছিল খাওয়াদাওয়া। মুম্বইয়ে থাকার সময়ে আমি কদাচিৎ বাইরে খেতে যেতাম। এখানে আমি ক্যান্টিনে খেতে শুরু করেছিলাম। কারণ এখানকার খাবার খেতে আমার একদম ভালো লাগত না। ক্যান্টিনের দূরত্ব আমার ঘর থেকে মেরে-কেটে পনেরো মিনিটের হাঁটা পথ ছিল। কিছুদিন পর এই হেঁটে খেতে যাওয়াটা আমার কাছে চাপের হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ফলে আমি খেতে যাওয়া ছেড়ে দিয়েছিলাম। তখন সারাদিন আমি বিছানাতেই থাকতাম। হোস্টেল চত্বরে ইন্টারনেটের ব্যবস্থা থাকলেও সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করার সুযোগ ছিল না। আমি রাত আটটা বাজলে হোস্টেলে ফিরতাম। এমনকী, সপ্তাহের শেষেও রাত আটটার সময়েই ফিরতাম। আমাদের চালচলন, পোশাক-পরিচ্ছদ সংক্রান্ত খুব কড়া নিয়ম ছিল হোস্টেলে। আমার মনে আছে একবার আমি গোল গলা একটা টি-শার্ট পরার জন্য হোস্টেল মাস্টারের কাছে খুব বকুনি খেয়েছিলাম। ঘটনাটা খুব সামান্য বলে মনে হলেও, প্রতিদিন সেসব ঘটনার মুখোমুখি হতে হত বলে আমার নিজেকে বাইরের জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন বলে বোধ হত।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল কলেজের চাপ। আমাদের সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত ক্লাস হত। এইসময়ের মধ্যে অন্য কোনও দিকে মন দেওয়ার সুযোগ আমাদের ছিল না। এর ফলে আস্তে আস্তে আমার মধ্যে কলেজ ছেড়ে দিয়ে বাড়ি ফিরে যাওয়ার চিন্তাভাবনা প্রবলভাবে দেখা দেয়।

স্থানান্তরিত হওয়া এবং আমার মানসিক অসুস্থতার মোকাবিলা করা

যখন আমি মুম্বইয়ে থাকতাম তখন আমার মানসিক অবসাদ এবং সাধারণ উদ্বেগের সমস্যা ধরা পড়ে। এজন্য আমায় তখন ওষুধ খেতে হত। যখন আমি ব্যাঙ্গালোরে পড়ার জন্য প্রস্তুত হতে শুরু করেছিলাম তখন নতুন জায়গায় যাব, নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচয় হবে- এই ভেবে মনে মনে খুব উত্তেজিত হয়ে পড়েছিলাম এবং ওষুধ খাওয়াও ছেড়ে দিয়েছিলাম। এখন আমি ভাবি যে ওই  সিদ্ধান্তটা কত ভুল ছিল। হঠাৎ ওষুধ খাওয়া ছেড়ে দেওয়া, সেই সঙ্গে নতুন শহরে এসে মানিয়ে নেওয়ার চাপ, একাকিত্ব এবং সামাজিক উদ্বেগ- এসব কিছু আমার মানসিক স্বাস্থ্যের উপর প্রভাব ফেলেছিল। সেই সময়ে আমার মধ্যে আত্মহত্যার চিন্তাও দেখা দিয়েছিল।

পিছনের দিকে তাকালে এখনও আমার মনে হয় যে হোস্টেলের আবাসিকদের সঙ্গে থাকতে গিয়ে আমার যে সমস্যা হয়েছিল, তা আমার মানসিক উদ্বেগ ও চাপকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল। ছোটবেলা থেকেই আমি মেয়েদের থেকে দূরে থাকতেই পছন্দ করতাম। কিন্তু হোস্টেলে এমন ছেলেদের সঙ্গে থাকতাম যারা সিগারেট, মদ্যপানের থেকে দূরে থাকতে চাইত। তখন আমার নিজেকে তাদের থেকে আলাদা এবং একা বলে মনে হত।

কলেজে ভর্তির চারমাস পরে আমার আর ওই কলেজে পড়তে ভালো লাগছিল না। তাই ওই কলেজ ছেড়ে অন্য কলেজে চলে যাওয়ার জন্য আমি আবেদন জানাই। কলেজ কর্তৃপক্ষ আমার সেই সিদ্ধান্তের কারণ জানার জন্য উদগ্রীব হয়ে ওঠে। কারণ ওই সিদ্ধান্তটা ছিল খুবই হতাশাজনক। আমার বিশ্বাস মানসিক স্বাস্থ্যের সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংবেদনশীল থাকা উচিত এবং যেসব ছাত্ররা পড়াশোনার জন্য অন্য শহর থেকে এসে নতুন শহরে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে তাদের সেই পরিস্থিতিজনিত উদ্বেগের সমস্যাকে গুরুত্ব দিয়ে বুঝতে পারাটাও বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম দায়িত্ব হওয়া জরুরি। এক্ষেত্রে যদি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব একজন মনোবিদ থাকেন তাহলে তিনি মানসিক স্বাস্থ্যের সমস্যায় আক্রান্ত ছাত্রদের সাহায্য করতে পারেন। এর ফলে অনেক শিক্ষার্থীই উপকৃত হতে পারে।  

এই প্রবন্ধটির লেখকের নাম হোয়াইট সোয়ান ফাউন্ডেশনের কাছে করা অনুরোধ মতো গোপন রাখা হয়েছে। এই প্রবন্ধটি দেশান্তর বা স্থানান্তর সংক্রান্ত এবং তার প্রভাব কীভাবে আমাদের মানসিক স্বাস্থ্য ও অনুভূতির উপরে পড়ে সেই বিষয়ের অর্ন্তগত। 

এই বিষয়ে আরও জানতে পড়ুন-

১. কাজের সূত্রে স্থানান্তরিত হওয়ার মানসিক প্রভাবকে আমাদের স্বীকার করা প্রয়োজন

২. চাকরি সূত্রে স্থানান্তর: কর্মীদের অবস্থান পরিবর্তনের ক্ষেত্রে প্রয়োজন প্রতিষ্ঠানের সাহায্য

 

         



প্রস্তাবিত