We use cookies to help you find the right information on mental health on our website. If you continue to use this site, you consent to our use of cookies.

দীর্ঘমেয়াদী অসুস্থতার মানে মেনে নেওয়া যে আমি আর স্বাভাবিক নই

আমার নাম স্বাতী। আমার ফাইব্রোময়ালগিয়া নামক একটি লাগাতার অদৃশ্য অসুখ রয়েছে। আর এটাই আমার জীবনের গল্প।

সপ্তাহের প্রত্যেকদিনই ছিল আমার কাজে যাওয়ার কথা। কিন্তু আমার ব্যথা-যন্ত্রণার কারণে প্রতি সপ্তাহেই আমায় ছুটি নিতে হত। একটু বেশি সময় একনাগাড়ে বসে থাকলেই সেই যন্ত্রণা অসহ্য হয়ে উঠত। ফলে আমি মুম্বইয়ের একটি নামী হাসপাতালে গিয়ে একজন নিখাদ বিশ্বাসযোগ্য স্নায়ুবিদ বা নিউরোলজিস্টের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করি।

এরপরে কেটে গিয়েছে প্রায় বছরখানেকের বেশি সময়। এখন আমার জীবন অনেক বদলে গিয়েছে। শরীরের বিভিন্ন অংশে, যেমন- হাঁটু, গলা এবং দেহের পিছনের দিকের অংশে ব্যথা বোধ হলেও, তা অসহ্য বলে মনে হয় না। আগে সপ্তাহের  শেষের দিনগুলো সাধারণভাবে আমার ভীষণ ক্লান্ত লাগত আর বিছানা ছেড়ে ওঠার কথা ভাবতেই পারতাম না। প্রথম প্রথম আমি ভাবতাম যে এগুলো সবই কর্পোরেট  জীবনযাত্রার ফলাফল, যেখানে প্রচুর সময় কাজ করতে হয়, পর্যাপ্ত ঘুম হয় না, বসার ভঙ্গি ত্রুটিযুক্ত হয় এবং খাওয়াদাওয়াও অত্যন্ত অনিয়মিত হয়ে পড়ে। কিন্তু ক্রমশ দেখলাম যে ব্যথা এতটাই অসহ্য হয়ে উঠছে যে তা নিয়ন্ত্রণ করাই যাচ্ছে না। প্রত্যেকবার যখন আমি আঙুল দিয়ে কিবোর্ডের বোতাম টিপতাম তখন মনে হত যে আঙুলের মাথাটা যেন জ্বলে যাচ্ছে। আমি প্রচুর চিকিৎসা করিয়েছি এবং নানারকম রোগের বিশেষজ্ঞদের কাছে গিয়েছি। শেষমেশ আমি যাই একজন অস্থি বিশেষজ্ঞের কাছে, যিনি আমায় অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে বলেন যে আমার নাকি তেমন কিছুই হয়নি। প্রথমে তাঁর মতামত শুনে আমি চিন্তামুক্ত হয়েছিলাম। কিন্তু পরে তাঁর বক্তব্য আমায় বেশ নাড়া দিয়েছিল। তিনি বলেছিলেন, আমার এই  ব্যথার পিছনে তেমন কোনও জোড়ালো কারণ না থাকলেও যন্ত্রণার অবসান হচ্ছে না।

আমার মনের ভয়টাই সত্যি হয়েছিল। আমি সেইসময়ে অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে ফেলেছিলাম। আমার এমন কিছু একটা হয়নি যার জন্য আমার আচরণে অতিরঞ্জিত ভাব প্রকাশ পাওয়া জরুরি হয়ে দেখা দিয়েছিল। আমি আমার চাকরি ছেড়েছিলাম শুধুমাত্র এই ভেবে যে আমি একজন কর্পোরেট উকিল হিসেবে জীবনে প্রতিষ্ঠিত হতে চাইনি। আজ যখন পিছনে তাকাই তখন আমার আত্ম-সন্দিহান ও অপরাধ বোধ আমায় কুঁড়ে-কুঁড়ে খায় এবং সেগুলো কখনোই আমার পিছু ছাড়ে না।

এক অদৃশ্য অসুস্থতা

প্রতি মুহূর্তে, প্রত্যেক সময়ে আমায় অসুস্থ হয়ে দিন কাটাতে হয়। পরিকল্পনাগুলো বাতিল করতে হয় বা অন্যের কাছে সাহায্য চাইতে হয়। আমার নিজেকে খুব অপরাধী বলে মনে হয়। আমি বারবার নিজেকে প্রশ্ন করি যে আমি যদি অসুস্থতাকে অজুহাত হিসেবে খাড়া করি তাহলে কি বহু মানুষের কাছেই আমি ভয়ের কারণ হয়ে উঠব। সবাই ভাববে আমি খুব কুঁড়ে, অস্বাস্থ্যকর, দিশাহীন একজন মানুষ। এমনও মনে হতে পারে যে আমি আমার অভিভাবকদের উপর নির্ভর করেই বাঁচতে চাইছি তাই চাকরি ছেড়ে দিয়েছি। আমার মনে হয় আমি খুব ব্যর্থ মানুষ এবং নিজের উপর নির্ভর করে বেঁচে থাকার ক্ষমতাটাকুও আমার নেই। আমি জানি আমার উচিত ফাইব্রোময়ালগিয়া নামক অসুখের বিরুদ্ধে লড়াই করা এবং জীবনকে সৃষ্টিশীল করে তোলা। কিন্তু যেদিন থেকে আমায় এই অদৃশ্য অসুখ ঘিরে ধরেছে সেদিন থেকে আমার মধ্যে অপরাধ বোধ তীব্র হয়ে উঠেছে। আসলে নিজের চোখে কিছু না দেখে বিশ্বাস করাটা সত্যিই খুব কঠিন।

এজন্য আমি বেশ ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। কারণ রোগটিকে সঠিকভাবে নির্ধারণ করাই যাচ্ছিল না। আমার ভয় লাগত এই ভেবে যে আমার জীবনটা যন্ত্রণায় একেবারে ম্লান হয় যাবে এবং ক্লান্ত থাকার জন্য আমি একদম বিছানায় শয্যাশায়ী হয়ে যাব। যখন আমার অল্প বয়স তখন আমি আমার পরিবার-পরিজনের থেকে দূরে থাকতাম। নিজের জন্য নতুন শহরে গিয়ে এক ডাক্তারের কাছ থেকে অন্য ডাক্তারের কাছে ছোটাছুটি করতাম। সেটা আমার পক্ষে খুবই কঠিন কাজ ছিল। যাইহোক, আমি আমার দৃঢ়তা দিয়ে শেষমেশ একজন নিউরোলজিস্টের সঙ্গে যোগাযোগ করতে সক্ষম হয়েছিলাম (আমরা তাঁকে ডঃ এন বলে ডাকব)। এরপর আমার সঠিক রোগ নির্ধারণ হয় এবং বড় ক্ষতি হওয়া থেকে আমি বেঁচে যাই।

ডাক্তার এন আমার কথা শুনেই তাড়াতাড়ি আমায় কিছু পরীক্ষা করতে পাঠায়। তবে তিনি পরীক্ষার ধরন সম্পর্কে আমায় কিছু বলেননি। টেকনিশিয়ান আমায়  জিজ্ঞাসা করেছিলেন যে আমার দেখভাল করার জন্য কে আছে। কিন্তু যখন  জানলেন যে আমি একা থাকি তখন তিনি অবাক হয়ে গিয়েছিলেন। আমি বুঝেছিলাম কেন তিনি কিছুক্ষণ সময় নিয়েছিলেন। পরীক্ষা করার সময়ে একটা বৈদ্যুতিক তরঙ্গ আমার শরীরের মধ্য দিয়ে পাঠানো হয়েছিল। তখন আমার খুবই  ব্যথা লেগেছিল এবং পরীক্ষার পরে কিছুক্ষণ আমি বিছানায় শুয়েছিলাম। আমি শরীরটাকে বিছানা থেকে ঠেলে তুলতে চেষ্টা করছিলাম এবং ডাক্তারের মতামত জানার জন্য অপেক্ষা করছিলাম। অনেকক্ষণ অপেক্ষা করার পরে ডাক্তার এন আমায় ডেকে পাঠান ও বলেন যে আমার ফাইব্রোময়ালগিয়া আছে। ডাক্তারের কথা শুনে আমি ভয় পেয়েছিলাম ঠিকই কিন্তু মনে মনে আশ্বস্তও হয়েছিলাম এই ভেবে যে শেষমেশ আমার অসুখটা নির্ণয় করা সম্ভব হয়েছে। দুর্ভাগ্যবশত, খুব কম সময়ের জন্যই আমি স্বস্তি বোধ করেছিলাম। এরপর যখন আমি ডাক্তারকে কিছু প্রশ্ন করলাম তখন তিনি আমায় বলেছিলেন যে আমি যেন আমার অসুখটা গুগ্‌ল-এ গিয়ে একটু দেখে নিই। তবে তিনি জানিয়েছিলেন আমার রোগটা সেরে ওঠার নয়। তাই তা নিয়ে ডাক্তারের সঙ্গে আমার আলোচনা করার আর দরকার নেই।

আমার মানসিক অবসাদ ও উদ্বেগ ছিল

যদি আমি আগেই ভয় পেতাম তাহলে আমি ক্রমশ আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়তাম। যখন ডাক্তারের মুখ থেকে শুনলাম যে আমার অসুখ সেরে ওঠান নয়, তার জন্য সব দরজাই বন্ধ তখন আমি প্রায় পাগলের মতো হয়ে গিয়েছিলাম, ভয়ে দিশাহারা ও  অসহায় মনে হত নিজেকে। কিন্তু সবকিছু জানার পর আমি আমার বাড়িতে ফিরে গিয়েছিলাম। কিন্তু আমার রোগ সম্পর্কে আমার পরিবারের সদস্যদের কোনও ধারণাই ছিল না। আমি অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলাম এবং আমার মানসিক উদ্বেগও বাড়তে শুরু করেছিল। শারীরিক যন্ত্রণা ও ক্লান্তির জন্য আমি নিজেকে বেশিরভাগ সময় ঘরেই বন্দি করে রাখতাম। নিজেকে খুব একা, বিচ্ছিন্ন মনে হত আমার। কারণ আমি ভাবতাম আমি যে অবস্থার মধ্যে দিন কাটাচ্ছি তা কেউ বুঝতেই পারছে না। অন্যের উপদেশ শুনতে শুনতে আমি ক্লান্ত হয়ে উঠেছিলাম, যেমন- বাড়ির বাইরে বেরোয়, শরীরচর্চা কর, শুধু যোগব্যায়াম কর এরকম আরও কত কী। যাইহোক, অদৃশ্য এই অসুখের বোঝা আমার উপর চেপে বসেছিল। এমনকী, যখন আমি জানতে পেরেছিলাম যে এর থেকে আমার মুক্তি নেই তখন আমি আর কিছু না পেয়ে নিজেকেই দোষারোপ করতে শুরু করি।

সাহায্যের জন্য মনস্তত্ত্ববিদের সঙ্গে যোগাযোগ

আমি ক্রমশ একজন আলাদা মানুষ হয়ে গিয়েছিলাম। আমি আমার পুরনো জীবনটা কোথায় যেন হারিয়ে ফেলেছিলাম। আগে আমি কদাচিত বাড়িতে থাকতাম। সবসময়ে কোনও না কোনও কাজ করার জন্য বাইরে বেরোতাম। কিন্তু অসুস্থ থাকার ফলে আমি ক্রমশ খিটখিটে হয়ে যাই এবং মানুষের সঙ্গে কথা বলা প্রায়  ছেড়েই দিই। আমি আর নিজের মধ্যেই ছিলাম না। এইসময়ে আমি আরও কয়েকজন ডাক্তারের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেছিলাম। ঘটনাক্রমে, আমার মাথাব্যথাটা সাংঘাতিক পরিমাণে হতে শুরু করেছিল এবং আমার এই মাইগ্রেনের সমস্যার জন্য আমি আরেকজন নিউরোলজিস্ট-এর সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলাম। তিনি আমাকে একজন সাইকোলজিস্ট দেখানোর কথা বলেন এবং তখন থেকেই আমার লাগাতার অসুস্থতার বিষয়টা প্রকট হওয়া শুরু করে।

এর ফলে আমার জীবনে যেমন বহু পরিবর্তন এসেছিল তেমনই একটানা অদৃশ্য অসুস্থতার প্রভাব আমার মানসিক স্বাস্থ্যের উপরেও পড়েছিল। এক্ষেত্রে বাস্তবে একটা নতুন অভিজ্ঞতা অর্জন করে যে কোনও মানুষ, যেখানে তার 'স্বাভাবিকত্ব' আর বজায় থাকে না। আমার ক্ষেত্রে সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল পরিস্থিতি স্বীকার করে নেওয়ার ক্ষমতা। অনেকদিন ধরে আমি আমার অসুখ নির্ণয়ের জন্য সচেষ্ট ছিলাম। আমি অনলাইনে এনিয়ে বিস্তর পড়াশোনা করেছি ও অনলাইনের মধ্য দিয়েই একদল সহযোগী মানুষের সঙ্গে কথাবার্তাও চালিয়েছি। আমি মন থেকে  মেনে নিয়েছিলাম যে আমার ফাইব্রোময়ালগিয়া রয়েছে এবং ভবিষ্যতে তা আমার জীবনের অঙ্গ হয়ে উঠতে চলেছে।

এই অনুভূতি আমায় গভীর অবসাদ ও উদ্বেগের দিকে ঠেলে দিয়েছিল, যার ফলে সারা জীবন ধরে একটানা ব্যথা ও ক্লান্তির (সঙ্গে আরও অনেক লক্ষণ) চিন্তা আমার মাথায় চেপে বসেছিল। নিজের অর্ন্তনিহিত শক্তির দ্বারা আমি এখনও জীবন চালাচ্ছি  এবং আমার শরীর ও মনের অবস্থা বোঝার চেষ্টা করছি। আমার সমস্যা অতিক্রমের জন্য থেরাপির ভূমিকা ছিল অন্যতম। আমার ক্ষেত্রে একটা অত্যন্ত গুরুতর উপলব্ধি ছিল যে আমি আমার পুরনো জীবনটাকে পিছনে ফেলে দিতে চেয়েছিলাম। তার বদলে চেয়েছিলাম এমন একটা নতুন জীবন, যা গড়ে তোলার জন্য জীবনের খারাপ অভিজ্ঞতাগুলোর (পুরনো জীবন) আর দরকার ছিল না। পুরনো জীবনের তিক্ততা ঝেড়ে ফেলে আমি জীবনটা উপভোগ করতে চাইতাম। এবং আমি মনে করতাম যে নানাভাবে আমি আমার জীবন কাটাতে পারি, তার মানে এটা নয় যে আমি আমার জীবনকে কোনও ছোট গণ্ডির মধ্যে আবদ্ধ করে রাখব। এখন আমি একটা বড় জায়গায় নিজের মতো করে কাজ করি, নিজের মতো করে জীবনযাপন করি ও দুটো বিড়ালের দেখভাল করি। এখনও প্রতিনিয়ত আমায় লড়াই করতে হয়, কিন্তু এখন আমি আমার জীবনের অর্থ খুঁজে পেয়েছি। সেইসঙ্গে ফাইব্রোময়ালগিয়া নিয়ে বাঁচতেও শিখেছি। আমার দেহ ও আত্মার স্বরূপকে আমি এখন বুঝতে শিখেছি। নিজেকে নিয়ে আমি এখন অনেক বেশি শান্তি পাই। আমি জানি যে আমার প্রতি অনেক মানুষের সহানুভূতি রয়েছে এবং যখন তার বাস্তব প্রয়োগ দেখি তখন তা আরও ভালোভাবে বুঝতে পারি।

আমার মতে ফাইব্রোময়ালগিয়ার কারণে মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতির পিছনে রয়েছে আমাদের সচেতনতার অভাব। আগে যখন আমি এই বিষয়টা বুঝতাম না তখন আমার খুব ভয় করত, আমি বিভ্রান্ত হয়ে পড়তাম। কয়েকটি আপাত সহযোগী দল ছাড়া সাহায্য করার মতো কেউ ছিল না। চিকিৎসকেরাও লাগাতার অসুস্থতার শিকার হওয়া রুগি ও সাধারণ রুগিদের মধ্যে অনেক বৈষম্য করেন। সমাজের অধিকাংশ মানুষেরই ফাইব্রোময়ালগিয়া সম্পর্কে সঠিক ধারণা নেই। এবিষয়ে তারা তেমন কিছু জানে না। অবিশ্বাস থেকে অতিরঞ্জন- এভাবেই আমরা বিষয়টাকে দেখার চেষ্টা করি। এসবেরই মুখোমুখি হয়েছি আমি। এবং বাস্তব জীবনে বারবার এর প্রমাণ পেয়ে আমি ক্লান্তও হয়ে গিয়েছি। পরিস্থিতিটা ছিল সত্যিই খুব বিচ্ছিন্ন।

আমি একজন ভাবালু, ফাইব্রো-সৈনিক এবং আমার আশা ফাইব্রোময়ালগিয়া নামক অসুখ সম্পর্কে একদিন মানুষের সচেতনতা বাড়বে। সেইসঙ্গে সমাজের সহযোগিতাও প্রসার লাভ করবে।  

প্রবন্ধটি লিখেছেন স্বাতী আগরওয়াল। ইনি একজন উকিল। এমন প্রতিষ্ঠানে তিনি কাজ করেন যেখানে বহু বৈচিত্র রয়েছে। লেখকের ফাইব্রোময়ালগিয়া নামক রোগটি ধরা পড়েছিল। অদৃশ্য এই অসুখের বিরুদ্ধে মানুষের সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি তিনি সামাজিক কলঙ্কের বিরুদ্ধেও লড়াই করেছেন।