স্কিৎজোফ্রেনিয়ার বিরুদ্ধে একজন মানুষের স্বাধীন ও আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠার লড়াই

এই লেখাটি স্কিৎজোফ্রেনিয়া থেকে সুস্থ হয়ে ওঠা পঞ্চাশ বছরের একজন ব্যক্তির স্বাধীন জীবন যাপনের ঘটনাকে আমাদের সামনে তুলে ধরেছেন। মানসিক অসুস্থতার বিরুদ্ধে লড়াই করার শিক্ষা আমাকে বদলাতে সাহায্য করেছে

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্কিৎজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত একজন মানুষ

আমার এবং আমার পরিবারের সদস্যদের অসুস্থতার বিষয়ে সচেতনতার অভাবই আমার দ্রুত সুস্থ হওয়ার পথে ছিল প্রধান বাধা।

সালটা ছিল ১৯৭০। তখন আমি স্কুলের ছাত্র। সেই সময়ে আমার অসুখটি ধরা পড়ে। আমি একজন মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে। আমার স্কুলের বেশিরভাগ বন্ধুরাই ছিল উচ্চ মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। তাই তাদের সঙ্গে মানিয়ে নিতে আমার বেশ কষ্ট হত। আমি লেখাপড়ায় মন বসাতে পারতাম না। আমার ক্লাসের বন্ধুদের সঙ্গে নিজেকে তুলনা করে আমি হীনম্মন্যতায় ভুগতাম। আমার থেকে অনেক দামি জামাকাপড় এবং জিনিসপত্র ছিল তাদের। যে সময়ে আমি হাই স্কুলে পড়ি, সেই সময়ে স্কুলের ইউনিফর্ম হাফ প্যান্ট থেকে ফুল প্যান্ট করে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু আমার পরিবার আমাকে তা কিনে দিতে পারেনি। এর ফলে আমার সব সময়ে মনে হত যে, বন্ধুরা আমাকে অবাক হয়ে দেখছে। এই ভাবনা থেকে আমার মনে একটা ভয়ও জন্মেছিল। এটাই হল আমার মনের প্রথম ভয়ের অনুভূতির স্মৃতি, যা ছিল একেবারেই আমার অপছন্দের বিষয়।

এইভাবে আমি একদিন স্কুলের গণ্ডি পার করলাম। কিন্তু এরপর যখন আমি আমার ছোট শহর থেকে একটি বড় শহরে এমবিবিএস পড়ার জন্য এলাম, তখন আমার সমস্যাটি ক্রমেই বাড়তে আরম্ভ করল। সেই সময় একটি বড় শহরের জীবনযাত্রার সঙ্গে মানিয়ে নিতে আমার খুবই অসুবিধা হয়েছিল। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল কলেজের র‍্যাগিং-এর দাপট। র‍্যাগিং-এর ফলে আমি এতটাই ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম যে, সেই ভয়ের অনুভূতি আমার মনে বারেবারেই ফিরে আসত এবং তার ফলে আমার মনের নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণভাবে নষ্ট হয়ে গিয়েছিল।

প্রথমদিকে ডাক্তার ভেবেছিলেন যে এটা আমার কোনও নতুন কিছুর সঙ্গে মানিয়ে না নিতে পারার সমস্যা। আমার মনে আশা ছিল যে, ডাক্তারের দেওয়া ওষুধ খেয়েই আমি সুস্থ হয়ে উঠব। কিন্তু আদৌ তা হল না। আমি সেই সময়ে কলেজে নিয়মিত না যাওয়া এবং পরীক্ষা না দেওয়া শুরু করলাম। আমি যখন এমবিবিএস-এর প্রথম বর্ষের ছাত্র, তখন আমার মানসিক অসুখ ধরা পড়ল। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, ওই অসুখ সম্পর্কে তখন আমার মনে কোনও ধারণাই ছিল না। অন্যরা আমার অসুখ নিয়ে হাসাহাসি করবে এই ভয় থেকে আমি এমবিবিএস-এর দ্বিতীয় বর্ষ থেকে কলেজে যাওয়া ছেড়ে দিয়েছিলাম।

মানসিক রোগের হাত থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য আমি আমার জীবনে প্রচুর বাধার মুখোমুখি হয়েছিলাম। মানসিক রোগের শিকার হওয়াটা আমার কাজের জগতে এবং সামাজিক জীবনে ছিল একপ্রকার কলঙ্কজনক অধ্যায়। কাজের অভ্যাস বজায় রাখতে আমার পরিবারের সদস্যরা আমাকে অনেকাংশে সাহায্য করেছিল। একজন ডাক্তারের ছেলে হওয়ার সুবাদে আমি হাসপাতালে ক্যাশিয়ারের দায়িত্ব সামলে আমার বাবাকে তাঁর কাজে সাহায্য করতে শুরু করেছিলাম। হাসপাতালের কিছু রোগী, যাদের আমার শিক্ষাগত যোগ্যতা সম্বন্ধে ধারণা ছিল, তারা আমায় প্রশ্ন করত যে, হাসপাতালের ক্যাশিয়ার হিসেবে আমি কাজ করছি কেন? তারা আমায় প্রায়ই বলত যে, আমার আরও পড়াশোনা করা এবং অন্য হাসপাতালে ডাক্তার হিসেবে কাজ করা উচিত। একদিকে তখন আমি ক্রমশ আমার অসুস্থতা কাটিয়ে উঠছিলাম, আর অন্যদিকে লোকজনের এহেন মন্তব্যের ফলে আমি নিজেকে একজন অপদার্থ মানুষ বলে ভাবতে শুরু করেছিলাম এবং বাবার হাসপাতালে যাওয়াও বন্ধ করে দিয়েছিলাম।

এইসময় আমার জীবনে আরও একটি সমস্যা দেখা দিয়েছিল। আমার পরিবারের ভাই-বোনেদের এইসময় এক-এক করে বিয়ে হচ্ছিল। কিন্তু আমার ক্ষেত্রে তেমনটা হচ্ছিল না। তাই এই ধরনের ঘটনায় মনের অস্বস্তির কারণে নিজেকে অন্যদের থেকে দূরে সরাতে চেয়েছিলাম। তাই আমি আমার বন্ধুদের বিয়েতে কখনোই যেতাম না। সেই সময়ে আমার কয়েকজন কাকা আমাকে পরামর্শ দিয়েছিলেন যে, বিয়ে করাই হল আমার সমস্যার সমাধান। এখন যখন আমি পিছনের দিকে ফিরে তাকাই, তখন ভাবি যে, সেই সময়ে বিয়ে না করে আমি সঠিক সিদ্ধান্তই নিয়েছিলাম। বিবাহিত জীবনের দায়িত্বপালন সেই সময়ে শুধু আমার কাছেই অসম্ভব ছিল না, আমার অভিভাবকদের কাছেও তা যথেষ্ট কষ্টসাধ্য বিষয় হত।

আমার এবং আমার পরিবারের সদস্যদের মধ্যে অসুখ সংক্রান্ত বিষয়ে সচেতনতার অভাব আমার তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে ওঠার পথে ছিল প্রধান প্রতিবন্ধকতা। আসলে আমি আমার রোগটিকে নিছকই হীনম্মন্যতা বলে ভেবেছিলাম। প্রায় সাত-আট বছর ধরে ওষুধ খাওয়ার পরে জেনেছিলাম যে, আমি স্কিৎজোফ্রেনিয়া নামক একটি মানসিক রোগে আক্রান্ত হয়েছি। যেহেতু আমি একজন ডাক্তারির ছাত্র ছিলাম, তাই আমার মধ্যে এই অসুখ নিয়ে একপ্রকার কৌতূহল দেখা দিয়েছিল। যাইহোক, আমার অসুখের অন্য একটি দিক, যেমন—অবসেসিভ চিন্তাভাবনাজনিত সমস্যা সম্পর্কে আমি একেবারেই সচেতন ছিলাম না। প্রায় কুড়ি বছরের কাছাকাছি সময় ধরে আমি ওষুধ খেয়েছিলাম এবং অসুস্থতার সঙ্গে লড়াই করার মধ্য দিয়ে নিজেকে তার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শিক্ষিত করে তুলতে লেগেছিলাম। এই পরিস্থিতিকে মানিয়ে নেওয়া আমার এবং আমার পরিবারের কারও পক্ষেই খুব একটা সহজ বিষয় ছিল না। ১৯৭০ থেকে '৮০-র দশকে আমার শহরের এক মনোরোগ বিশেষজ্ঞ আমাকে যে সব ওষুধ খেতে দিয়েছিলেন, সেগুলির অনেক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ছিল। ওই ওষুধগুলি খেয়ে আমার দৃষ্টিশক্তির স্থিরতা ক্রমে নষ্ট হয়ে যেতে থাকল। এহেন পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কাটানোর জন্য ইঞ্জেকশন নিতে হত। কিন্তু সেই ইঞ্জেকশন নেওয়ার ফলেও আমি অনেক অসুবিধা বোধ করতাম। ১৯৯০ সালে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ আমাকে এমন একটি নতুন অ্যান্টি-সাইকোটিক ওষুধ দিয়েছিলেন, যেগুলি পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থেকে মুক্ত ছিল। এর কয়েক বছর পরে আমার ডাক্তার আমাকে ব্যাঙ্গালোরের নিমহানস্‌-এ আরও উন্নত চিকিৎসার জন্য যোগাযোগ করার সুপারিশ করেছিলেন।

২০১০ সালে আমি ব্যাঙ্গালোরে গিয়েছিলাম। সেখানকার একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ আমাকে বলেছিলেন যে, ওষুধ প্রয়োগ আমাকে ৫০ শতাংশ সুস্থ হতে সাহায্য করেছে। বাকি ৫০ শতাংশের জন্য প্রয়োজন আমার সদিচ্ছা এবং চেষ্টা। ওই ডাক্তার আমাকে মানসিক পুনর্বাসন কেন্দ্রগুলির সঙ্গে যোগাযোগ করার জন্য উৎসাহিত করেন।

এহেন পুনর্বাসন কেন্দ্রে গিয়ে আমি রুটিনমাফিক কাজ করা শিখেছিলাম। ঘুম থেকে নির্দিষ্ট সময় উঠতাম, রেডি হতাম, বৃত্তিগত প্রশিক্ষণের ক্লাসে যথাসময়ে উপস্থিত হতাম। এগুলি আমার সামাজিক দক্ষতাকে বাড়াতে সাহায্য করেছিল। দলবদ্ধভাবে কাজ করতে শিখেছিলাম। চিকিৎসার জন্য ব্যাঙ্গালোরে আসলেও, পরে আমি এখানেই বসবাস করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। এখানে এসে আমি টাকা-পয়সার হিসেব করাও শিখেছিলাম, যা আমাকে একজন দায়িত্বশীল মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে সাহায্য করে। এখন আমি স্বাধীনভাবে পেইংগেস্ট হিসেবে একটি বাড়িতে থাকি, নিজের দেখভাল এবং নিজের টাকা-পয়সার হিসেব রাখতেও পারি। যথাযথ ওষুধ খাওয়া, কাউন্সেলিং করানো এবং কগনিটিভ বিহেভায়রল থেরাপির সাহায্য নেওয়া, নিয়মিত হাঁটাহাটি করা এবং প্রাণায়মের সাহায্যে আমি এখন আমার শরীর ও মনকে শান্ত রাখতে পারি। এই ধরনের মানসিক রোগে আক্রান্ত হওয়ার অভিজ্ঞতা আমাকে খানিকটা আধ্যাত্মিক হতেও সাহায্য করেছে। সেই সঙ্গে আমার শরীরে এবং মনের মধ্যে ঠিক কী চলছে, সে সম্পর্কে আমার মধ্যে একটা স্পষ্ট ধারণা গড়ে উঠেছে, যা আমাকে দ্রুত সুস্থ করে তুলতে সাহায্য করেছে।

এখন, যদিও আমি স্বাধীনভাবে নিজের দেখাশোনা নিজেই করতে সক্ষম, তবু নতুন কোনও মানুষকে, যার আদৌ মানসিক সমস্যা নেই, তাকে বন্ধু হিসেবে ভাবতে ভয় পাই। আসলে এহেন ভয়ের পিছনে রয়েছে নিজের গ্রহণযোগ্যতা সম্বন্ধে সন্দেহ এবং নিজেকে অন্যের চোখে হাসির খোরাক বলে ভাবা। এছাড়াও আমি আরও একটি বিষয়ে ভীত। কারণ আমার মনে হয় যে, যখন আমার বাবা-মা থাকবে না, তখন আমার কী হবে? কিন্তু এহেন পরিস্থিতি এলে আমি যে আমার ভাই, নিমহানস্‌ এবং পুনর্বাসন কেন্দ্রের সাহায্য ও সমর্থন পাব, সে বিষয়ে আমি নিশ্চিত।

যাইহোক, মানসিক অসুস্থতা এবং তার বিরুদ্ধে লড়াই করে সুস্থ হয়ে ওঠার অভিজ্ঞতার মাধ্যমে আমি একজন নতুন মানুষ হয়ে উঠতে পেরেছি।

হোয়াইট সোয়ান ফাউন্ডেশনের কাছে একজন মানুষ তাঁর জীবনের এহেন সংগ্রামের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছিল। সেই মানুষটি নিজের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক থাকায় তাঁর নাম প্রকাশ করা সম্ভব হল না।