আপনার শিশুকে প্রিয়জন হারানোর দুঃখ ভুলতে সাহায্য করুন

বড়দের মৃত্যু সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকলেও, বাচ্চারা মৃত্যুর মানে সহজাত ভাবে বোঝে না। যদি কোনও শিশু তার কাছের মানুষের মৃত্যু খুব কাছ থেকে দেখে তাহলে সে দিশাহারা বোধ করে এবং তার নিজের মনের মধ্যেই এই ঘটনা নিয়ে টানাপোড়েন শুরু হয়। বাচ্চার অভিভাবকরা মৃত্যুর কথা বাচ্চাকে জানাতে সংকোচ করে। এবং তাকে এই খবর দেওয়ার আগে অভিভাবকরা অনেক চিন্তাভাবনা করে, যেমন-

  • বাচ্চা কি মৃত্যুর খবর শুনতে পারবে?
  • মৃত্যু বা কাছের মানুষকে হারানোর জন্য বাচ্চারা কি ভয় পাবে?
  • মারা যাওয়া মানে কী তা বোঝার ও জানার জন্য তারা এখনও অনেক ছোট রয়েছে কি?
  • বড় হিসেবে আমি কীভাবে একজন শিশুর কাছে মৃত্যুর বিষয়ে ব্যাখ্যা করব?
  • প্রিয়জন মারা যাওয়ার খবরে বাচ্চাদের উপরে কীরকম প্রভাব পড়বে?
  • বাচ্চাদের নিষ্পাপ মন কি মৃত্যুর খবরে কলুষিত হয়ে যাবে?

মারা যাওয়া মানে কী অথবা প্রিয়জনের মৃত্যুর ঘটনা বাচ্চারা মনে রাখে না- এমন  বিশ্বাস মানুষের মধ্যে থাকলেও, তা সবসময়ে সত্যি হয় না। যখন তারা তাদের প্রিয় পোষ্য বা কাছের মানুষকে হারায় তখন একটা পাঁচ বছরের শিশুও বুঝতে পারে যে সেই ঘটনাটা কিছুটা আলাদা। এমনকী যদি বাবা-মা বা বাড়ির অন্য বড়রা তাদের কাছে খোলাখুলি সমস্যার কথা নাও বলে তখন তারা বড়দের কথা আড়াল থেকে শোনার চেষ্টা করে অথবা টেলিভিশন বা সিনেমায় দেখা কিছু দৃশ্যের সঙ্গে ওই পরিস্থিতিকে মিলিয়ে নিজেদের বোধ জাগাতে চেষ্টা করে।

প্রিয়জন হারানোর শোক মানুষের জীবনে একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ। শোকের মধ্য দিয়েই মানুষ তার ভালোবাসার জনকে হারানোর অর্থ এবং ভালোবাসার মর্ম বুঝতে শেখে। আর এভাবেই ব্যথা-বেদনাকে অতিক্রম করে মানুষকে একদিন সত্য বা বাস্তবের মুখোমুখি দাঁড়াতে হয়। একটা বাচ্চার যত বয়সই হোক না কেন, একটা  মৃত্যুর ঘটনার পর সে নিজের চোখে দেখতে পায় শ্মশাণের ক্রিয়াকলাপ, মৃতদেহ বা পারলৌকিক আচার-অনুষ্ঠান। অথবা এখান-সেখান থেকে টুকরো টুকরো কথাবার্তা শুনে তাদের মনে একটা আবছা বোধ জন্মায় যে যা ঘটেছে তা খুব সাধারণ বা স্বাভাবিক ঘটনা নয়।

আমরা জানি না যে ওই অস্বাভাবিক ঘটনা তাদের মনে কী প্রভাব ফেলবে। ওই ঘটনায় কি তারা দিশাহারা বোধ করবে নাকি ভয় পাবে, সে বিষয়ে আমরা আগে থেকে কিছু জানতে পারি না। পরিবারের কোনও সদস্যের মৃত্যুর ঘটনায় একটা বাচ্চার মনে বেশ কিছু ভুল ধারণা গড়ে উঠতে পারে, (যেমন- বাড়ির অন্যান্য বড়দের নিজের জীবন থেকে হারিয়ে ফেলার ভয়, তাদের মনে ভয় হতে পারে যে  বড়দের মধ্যে কেউ হঠাৎ করে মারা যেতে পারে বা রাতে ঘুমানোর সময়ে মৃত্যু হতে পারে)। এই পরিস্থিতিতে বাড়ির বড়দের উচিত সময় নিয়ে একটা বাচ্চাকে মৃত্যু সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা দেওয়া।

শিশুদের সামনে মৃত্যুর অর্থ ব্যাখ্যা করা

মৃত্যুর ধারণা দিতে গিয়ে একজন শিশুর সামনে যে সমস্ত কিছু পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বলতে হবে তা কখনোই জরুরি নয়। কিন্তু যদি কোনও বাচ্চা তার দেখা বা শোনার উপর ভিত্তি করে বা তার পরিচিত কারোর মারা যাওয়ার বিষয়ে জানতে চায় তাহলে সেক্ষেত্রে বড়দের সচেতন থাকতে হবে। মারা যাওয়ার খবর শোনা এবং সে বিষয়ে বোঝার চেষ্টা করা একটা বাচ্চার কাছে যথেষ্ঠ কঠিন। তাই একজন বাচ্চার কাছে কারও মারা যাওয়ার ঘটনা ব্যাখ্যা করার কতগুলি পন্থা হল-

১. নিজের বোধবুদ্ধি দ্বারা এমনভাবে তথ্য দিতে হবে যা একজন বাচ্চার পক্ষে বোঝা সম্ভবপর হয়।

২. বাচ্চাদের প্রশ্ন যদি খুব অবাক করার মতো হয় তাহলে সততার সঙ্গে বাচ্চাকে উত্তর দিতে হবে এবং এক্ষেত্রে পর্যাপ্ত সময় হাতে রাখতে হবে।

৩. বড়দের উচিত খুব স্বচ্ছন্দে বাচ্চার কাছে মৃত্যুর ঘটনা ব্যাখ্যা করা। বাচ্চার বয়স যদি খুবই অল্প হয় তাহলে তাকে বলা ভালো যিনি মারা গিয়েছেন তিনি আকাশের তারা হয়ে গেছেন বা তিনি স্বর্গে ঠাকুরের কাছে রয়েছেন অথবা আকাশ থেকে দেবদূতের মতো তিনি সব দেখতে পাচ্ছেন। যিনি এভাবে বাচ্চাদের বোঝান তা যে তাঁর ব্যক্তিগত বিশ্বাস বা মতামত সে কথা বাচ্চাকে বলে দেওয়া জরুরি। এক্ষেত্রে অন্যান্যদের মত ভিন্ন হতেই পারে।

৪. যদি কাছের মানুষের মৃত্যু হয় তাহলে মারা যাওয়ার ঘটনা ঘটলেই বাচ্চাকে জানানো দরকার যে যিনি মারা গিয়েছেন তাকে আর পরিবারে দেখা যাবে না। এছাড়া এই বিষয়ে অন্যান্য পুঙ্খানুপুঙ্খ ঘটনা বলার প্রয়োজন নেই। যেমন- মৃত ব্যক্তির স্বাস্থ্য কেমন ছিল, তার শরীরে কী রোগ হয়েছিল বা তার মারা যাওয়ার ঘটনা যে অপ্রত্যাশিত অথবা তিনি কীভাবে মারা গেছেন তার বর্ণনা দেওয়া নিষ্প্রয়োজন। কারণ এসব বর্ণনা শুনে বাচ্চার মনে মৃত্যু সম্পর্কে ভয় জন্মাতে পারে।

৫. শুধুমাত্র বাচ্চাদের তথ্য দিলেই হবে না; বাচ্চাকেও তার মনের ভয়ের কথা বলার সুযোগ দিতে হবে। তাদের মনে ঠিক কী প্রতিক্রিয়া হচ্ছে তা তাদের জিজ্ঞাসা করা প্রয়োজন। তারা কী ভাবছে বা মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে তারা কতটা চিন্তিত সে বিষয় নিয়ে তাদের সঙ্গে কথা বলা দরকার।

৬. প্রিয়জনের মৃত্যু নিয়ে কোনও অস্পষ্ট কথাবার্তা বা প্রতীকধর্মী আচরণ (যেমন- 'তিনি চলে গেলেন' অথবা 'তিনি ঘুমিয়ে আছেন') করা যাবে না। বরং তাদের বোঝাতে হবে এই বলে যে কোনও মৃত্যুর ঘটনাকে বদলানো যায় না, যেমন- বলতে হবে ''না, আমরা হয়তো আর তাঁকে চোখে দেখতে পাব না, কিন্তু তিনি চিরকালই আমাদের স্মৃতিতে বা ছবিতে আমাদের সঙ্গেই থাকবেন।''

৭. কিছু বাচ্চা খুব গভীরভাবে বিশ্বাস করতে থাকে যে সে বা তার অভিভাবকও মারা যেতে পারে। সেক্ষেত্রে একজন অভিভাবক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ হল বাচ্চা এবং তার নিজের শরীরের প্রতি যত্ন নেওয়া।

৮. যখন বাচ্চা বাড়ির একজন বড় কাউকে এসে প্রিয়জনের মারা যাওয়ার ঘটনার কথা জিজ্ঞাসা করবে তখন 'এমন কথা বলতে নেই', 'তুমি চিন্তা কোর না' বা 'এ ঘটনা বোঝার জন্য তুমি এখনও খুবই ছোট আছ' –এই সব বলে বাচ্চাদের অভিব্যক্তিকে আটকানো উচিত নয়। মৃত কাছের মানুষ আমাদের চারপাশে রয়েছে এবং কিছুদিনের মধ্যেই তারা আবার ফিরে আসবে বলে বাচ্চাদের মিথ্যে কথা বা মিথ্যে আশা দেওয়া একেবারেই সঠিক কাজ নয়।

শিশুদের দুঃখ কমাতে সাহায্য করা

কে কীভাবে দুঃখ প্রকাশ করবে তা তাদের একান্তই নিজস্ব ব্যাপার। আমরা আমাদের প্রিয় মানুষ হারানোর ব্যথা এক একজন এক একরকমভাবে প্রকাশ করি।  অভিভাবক হিসেবে একজনের উচিত খুব সহজভাবে বাচ্চাদের প্রিয়জন হারানোর দুঃখ ভোলানো। যেমন-

  • বাচ্চাদের অনুভূতি এবং ভয় নিজেদের (অভিভাবকদের) সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া।
  • পারলৌকিক আচার-অনুষ্ঠান বা পরিবারের রীতিনীতির সঙ্গে বাচ্চাকে যুক্ত করা।
  • দুঃখকে মানিয়ে নেওয়ার জন্য বাচ্চাদের সময় ও সুযোগ করে দেওয়া জরুরি। পরিবারে কেউ মারা গেলে কিছু বাচ্চা একদিন বা দু'দিন স্কুলে যেতে না চাইতে পারে, বা কিছু নির্দিষ্ট কাজ সে কিছুদিনের জন্য (বিশেষ করে সেই সব কাজ যেগুলো সে যিনি মারা গিয়েছেন তার সঙ্গেই করতে ভালোবাসত) করতে নাও চাইতে পারে। অন্য একদল বাচ্চা আবার নিজেদের বেশি করে কাজের মধ্যে ব্যস্ত রাখতে চায় বা কিছু সময়ের জন্য নিজেদেরকে অন্যমনস্ক রাখতে চায়। এই দুই আচরণই সঠিক।
  • রুটিন মেনে কাজ করার জন্য বাচ্চাদের সাহায্য করতে হবে- এটা তখনই গুরুত্বপূর্ণ যখন কোনও মৃত্যুর ঘটনা একটা বাচ্চার দৈনন্দিন জীবনে গুরুতর প্রভাব ফেলে। জীবনযাপনের জন্য কী ধরনের পরিবর্তন তারা আশা করছে সে বিষয়ে তাদের সঙ্গে কথা বলতে হবে। যেমন- যদি কোনও বাচ্চা আগে তার দাদু বা দিদার সঙ্গে একই ঘরে থাকত তখন তাকে বোঝাতে হবে যে এরপর থেকে দাদু-দিদার সঙ্গে আর এক ঘরে থাকা সম্ভব নয়, বদলে তারা কিছু সময়ের জন্য বাড়ির অন্য কোনও সদস্যের সঙ্গে থাকতে পারে। অথবা যদি দাদু বা দিদা নাতি-নাতনিকে প্রতিদিন দুপুরে স্কুল ছুটির পরে বাড়িতে আনার জন্য যেতেন, তাহলে তাঁদের অবর্তমানে অন্য কেউ যে বাচ্চাদের স্কুল থেকে বাড়িতে আনার দায়িত্ব পালন করবেন সেকথা ছোটদের ভালো করে জানিয়ে দেওয়া একান্ত জরুরি।  
  • নিজের মনকে ভালো রাখার জন্য একান্ত নিজস্ব কিছু নিয়ম-নীতি গড়ে তোলা: এর মধ্যে থাকতে পারে এমন মানুষের সঙ্গে কথাবার্তা বলা যিনি ইতিমধ্যেই তাঁর কোনও প্রিয়জনকে হারিয়ে ফেলেছেন অথবা যিনি মারা গিয়েছেন তাঁর ছবি দেখা। এক্ষেত্রে নতুন করে ছবির অ্যালবাম তৈরি করা যেতে পারে, আঁকার কাজে মন দেওয়া যেতে পারে বা ভালোবাসার মানুষ বা কারোর স্মৃতির উদ্দেশ্যে কোন কাজ অথবা ছোট গল্প লেখাও অত্যন্ত ফলপ্রসু হতে পারে।

যদি কোনও শিশুর বাবা-মা, ভাই-বোন বা কাছের বন্ধু মারা যায় তাহলে সেই হারানোর দুঃখ কাটিয়ে ওঠার জন্য অতিরিক্ত কিছু সাহায্যের প্রয়োজন হয়। এই  পরিস্থিতিতে বাচ্চারা যখন নতুন রুটিন এবং মনে খানিকটা অনিশ্চয়তা নিয়ে জীবনযাপন শুরু করে তখন তার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার জন্য ওই বাচ্চার প্রতি বড়দের আরও বেশি করে মনোযোগ দেওয়া দরকার।

কখন একজন শিশুর সাহায্যের প্রয়োজন পড়ে

কিছু বাচ্চা তার প্রিয়জনের মৃত্যুর ঠিক পরে পরেই খুব খিটখিটে, মারমুখী, বিষণ্ণ বা ভীষণভাবে দুঃখ পেতে পারে। এই ধরনের আচরণগুলি আপাতভাবে শিশুসুলভ মনে হলেও এহেন অনুভূতির গভীরতা বা জটিলতাকে অবহেলা করা ঠিক নয় এবং এই বিষয়ে বাচ্চাদের পুরনো কোনও অভিজ্ঞতাও থাকে না। তাই প্রথম প্রথম কয়েকদিন তাদের আচরনের উপর নজর রাখা জরুরি। কিন্তু যদি দেখা যায় যে কাছের মানুষের মৃত্যুর পর প্রথম তিন সপ্তাহ বা তার বেশি সময় ধরে শিশুর অস্বাভাবিক আচরণের উন্নতির কোনও লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না এবং এর ফলে বাচ্চাদের দৈনন্দিন জীবনযাপন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তাহলে অবিলম্বে এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। বাচ্চার অস্বাভাবিক আচরণের মধ্যে রয়েছে-

১. স্কুল কামাই করা

২. ঠিকঠাক খাওয়াদাওয়া না করা, ভীষণভাবে দৈহিক ওজন কমে যাওয়া

৩. লোকসমাজ থেকে নিজেকে সরিয়ে নেওয়ার মনোভাব; সামাজিক মেলামেশার থেকে এড়িয়ে যাওয়া

৪. ঘুমের সমস্যা

৫. বিছানা ভিজিয়ে ফেলা (বিশেষ করে যদি তার বিছানা ভিজিয়ে ফেলার অভ্যাস বন্ধ হয়ে গিয়ে থাকে)

৬. খুব বেশি কান্নাকাটি করা, খুব কম পরিমাণ কথাবার্তা বলা

৭. জড়সড় হয়ে থাকা

৮. যিনি মারা গেছেন তাঁর কথা মনে করিয়ে দিতে পারে এমন মানুষ বা কাজের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত না করা

এছাড়াও সাহায্যের জন্য হেল্পলাইন বা শিশু মনস্তত্ত্ববিদের সঙ্গে যোগাযোগ করা যেতে পারে।

 

এই প্রবন্ধটি লেখার সময়ে নিমহ্যান্সের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট ডাক্তার নিত্য পূর্ণিমা এবং আরেক ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট সোনালী গুপ্তার সাহায্য নেওয়া হয়েছে।