একজন অবসাদগ্রস্ত মানুষের সঙ্গে কীভাবে কথা বলা উচিত

একজন অবসাদগ্রস্ত মানুষের সঙ্গে সবসময়ে থাকা দরকার। তাকে কী বলা উচিৎ বা উচিৎ নয় বিষয়টি তার কাছের মানুষদের জন্য অতি প্রয়োজনীয়।

কী বলা উচিত নয়:এমন ভাষা বা শব্দ ব্যবহার করা ঠিক নয়, যাতে একজন  অবসাদগ্রস্ত মানুষের মনে হয় যে তার অভিজ্ঞতাগুলো সাধারণ বা তুচ্ছ। অবসাদের শিকার হওয়া মানুষজন প্রায়শই এসব কথা শুনে থাকে, যেমন-

''প্রত্যেককেই লড়াইয়ের মুখোমুখি হতে হয়''

''কেন এই বিষয়টাকে আপনি এতটা ব্যক্তিগতভাবে নিচ্ছেন?''

''এগুলো সবই আমাদের জীবনের অঙ্গ, তাই এসব নিয়ে চিন্তা না করে আনন্দে  থাকুন, খুশি থাকুন!''

''যদি আপনি শরীরচর্চা করেন বা নতুন কোনো ভালো লাগার কাজ করেন তাহলে আপনি সুস্থ বোধ করবেন।''

কী বলা উচিত:একজন অবসাদগ্রস্ত মানুষের জীবনসংগ্রাম তার কাছে খুবই কঠিন লড়াই, এবং তাকে সম্মান বা কুর্নিশ জানানো প্রয়োজন।

কী বলা উচিত নয়:একজন মানুষকে তার অবসাদের লক্ষণগুলো লুকিয়ে রাখার জন্য জোর করা বা বাধ্য করা উচিত নয়। এমন কিছু কথা বলা ঠিক নয় যাতে সে ভাবে যে সে হয়তো ভুল কাজ করছে-

''কেন তুমি কান্নাকাটি করছ?''

''কান্নাকাটি করবেন না''

''দুঃখ বা মন খারাপ করবেন না! আনন্দ করুন, খুশিতে থাকুন!''

কী বলা উচিত নয়:যতক্ষণ না কেউ তার মেজাজ নিজে থেকে ঠিক করার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে ততক্ষণ তার উপর জোরজবস্তি করা যাবে না।

কী বলা উচিত: একজন অবসাদগ্রস্ত মানুষের সঙ্গে সবসময়ে থাকা দরকার। তাকে এ কথাই বোঝানো উচিত যে, প্রয়োজন মতো আপনি সবসময়ে তার পাশে রয়েছেন। আপনার হাত তার কাঁধে রাখা বা তাকে জড়িয়ে ধরা অথবা আলিঙ্গন করা এসময় একান্ত আবশ্যক।

কী বলা উচিত নয়:এমন কোনও মন্তব্য বা কথা বলা ঠিক নয় যা শুনে একজন অবসাদগ্রস্ত মানুষের মেজাজ বিগড়ে যেতে পারে। যেমন- ''ওহ্‌, দেখে মনে হচ্ছে এখন আপনি খুব ভালো মেজাজে রয়েছেন!''

কী বলা উচিত:একজন অবসাদগ্রস্ত মানুষের সঙ্গে সাধারণ কথাবার্তা বলা জরুরি। যদি আপনি কোনও বিষয় নিয়ে তার সঙ্গে কথা বলতে চান তাহলে তা শান্তভাবে বলতে হবে। যেমন- ''আপনি এখন ঠিক আছেন তো?''

''এমন কোনও কথা আছে কি যা আপনি আমাকে বলতে চান?''

''আমি কি কিছু সাহায্য করতে পারি?''

একজন অবসাদগ্রস্ত মানুষকে এটা বোঝাতে হবে যে তিনি যদি আপনাকে কিছু বলার জন্য প্রস্তুত থাকেন তাহলে সেই কথা শোনার জন্য আপনি সবসময়ে ইচ্ছুক বা আগ্রহী। এক্ষেত্রে মানুষকে সাহায্য করার জন্য মুখে কথা বলার চেয়ে অঙ্গ-সঞ্চালন বা নন-ভার্বাল কমিউনিকেশন বা ভাববিনিময় (পিঠে হাত রেখে আশ্বস্ত করা বা জড়িয়ে ধরা) বেশি কার্যকরী ও গুরুত্বপূর্ণ।

কী বলা উচিত নয়:যদি দেখা যায় যে উনি মুখে কথা বলার চেয়ে ইশারা বা অঙ্গভঙ্গির দ্বারা কিছু বোঝাতে চাইছেন তখন তাকে কথা বলতে জোর করা অথবা কোনও প্রশ্ন করা উচিত নয়।

কী বলা উচিত:অসুস্থ লোকটির পাশে সবসময়ে থাকতে হবে। তাকে এটা বোঝাতে হবে যে তার সমস্যার কথা আপনি খুব ভালভাবেই উপলব্ধি করতে পারছেন। যদি অসুস্থ মানুষটি তার অনুভূতি আপনার সঙ্গে ভাগ করে নিতে চায় তাহলে সেক্ষেত্রে আপনি তাকে বলতে পারেন, ''আপনার সমস্যাটা আমি উপলব্ধি করতে পাচ্ছি, তাই আপনি যদি সে বিষয়ে কিছু বলতেন চান, তাহলে আমি কিছুই মনে করব না বা আপনার সেই ইচ্ছাকে আমি সম্মান জানাচ্ছি।''

এটা খুবই স্বাভাবিক বিষয় যে আপনি আপনার কাছের মানুষের সমস্যার কথাটা জানতে চাইবেন এবং তার সমাধানের পথ যদি আপনার জানা না থাকে তাহলে নিজেকে আপনার খুবই অসহায় মনে হবে। সেক্ষেত্রে আপনাকে অত্যন্ত শান্তভাবে প্রশ্ন করতে হবে। কিন্তু আপনার মনের নিয়ন্ত্রণ জরুরি কারণ যাকে প্রশ্ন করছেন সে সেইসময়ে আপনার প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য ইচ্ছুক নাও থাকতে পারে।

কী বলা উচিত নয়:জটিল ও বিতর্কিত মন্তব্য এড়ানো প্রয়োজন, যেমন-

“আপনি কোনও দিনই সুস্থ হতে পারবেন না।”

“প্রতিদিন আমি আপনাকে একইরকম দেখছি।”

“আপনার আচরণে আমি ক্লান্ত বোধ করছি।”

“কবে আপনি বদলাবেন?”

“কবে আপনি একটু সুস্থ হবেন?”

“আপনি সুস্থ হওয়ার কোনও চেষ্টাই করছেন না।”

“যদি আপনার ইচ্ছাশক্তি থাকে তাহলে আপনি সুস্থ হয়ে উঠবেন।”

“আপনার এমন আচরণের জন্যই আমি আপনার সঙ্গে কথা বলতে চাই না।”

এই ধরনের কথাবার্তা বলার উদ্দেশ্য হতে পারে একজন মানুষকে তার আচরণের পরিবর্তন সম্পর্কে সচেতন করে দেওয়া। কিন্তু অধিকাংশ সময়ে এসব কথাবার্তা একজন মানুষের মধ্যে অসুস্থতার বোধ জাগিয়ে তোলে। কখনও কখনও কোনওরকম উদ্দেশ্য ছাড়াই এমন ধরনের কথাবার্তা মানুষকে বোঝায় যে সে ভুল করছে ও তাকে ক্রমশ অসুস্থতার দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়।

তবে এমনও হতে পারে যে আপনার কাছের মানুষটি এসব কথাবার্তাকে তেমন গুরুত্ব দেয় না বা পাত্তা দেয় না। কিন্তু তারা যদি নিজেদের দুর্বল বলে ভাবে তাহলে তাদের মধ্যে অসুস্থতার লক্ষণ ফুটে ওঠে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে এসব চিন্তাভাবনার ফলে তারা নিজেদের তুচ্ছ মনে করে বা নিজেদের প্রতি তাদের ভালবাসা, শ্রদ্ধা, ভক্তি সব হারিয়ে যায়। এগুলোর ফলে তাদের মধ্যে নিজের ক্ষতি বা অন্যের ক্ষতি করার মনোভাব জেগে ওঠে।

কী বলা উচিত:পারস্পরিক কথাবার্তার মধ্যে এতটাই স্বচ্ছতা রাখতে হবে যাতে রোগী মনে না করে যে অসুস্থ হয়ে সে ভুল করেছেএসব ক্ষেত্রে কথাবার্তার ধরনটা হতে পারে এরকম- “প্রতিদিন আপনাকে মন খারাপ করে রয়েছেন দেখে আপনার জন্য আমার খুব চিন্তা হচ্ছে। যদি এরকম কিছু হয়ে থাকে তাহলে আমি কি আপনাকে কোনোভাবে সাহায্য করতে পারি?”

একজন মানসিক অবসাদগ্রস্ত মানুষের সঙ্গে কথাবার্তার সময়ে আরও কিছু করণীয়  মনে রাখা জরুরি-

  • একজনমানুষের অসুস্থতা ধরা পড়ার আগে তার সঙ্গে যেমনভাবে ব্যবহার করা হত ঠিক তেমনই ব্যবহার করা উচিত অসুখ ধরা পড়ার পরেও। আপনার কাছের মানুষের সঙ্গে নিজের থেকে তার অসুখের বিষয়ে আলোচনা করার প্রয়োজন নেই, যদি সে চায় তাহলেই আলোচনা করা যেতে পারে। তাদের কাজকর্ম, পরিকল্পনা বা পছন্দের বিষয় নিয়ে কথা বলা জরুরি।

  • অসুস্থ মানুষটির আচরণ এবং মেজাজের উপর অতিরিক্ত নজর না দিলেও এ বিষয়ে সচেতন থাকা জরুরি। যদি সে আপনার সঙ্গে কথা বলতে না চায় তাহলে আপনার উচিত তাকে জড়িয়ে ধরা বা তার পিঠে হাত রাখা। এবং তাকে জানানো দরকার যে আপনি সবসময়ে তার পাশে রয়েছেন।

  • যদি আপনি ভাবেন যে তার সাহায্যের দরকার তাহলে আপনি তাকে   জিজ্ঞাসা করতে পারেন:''আপনি কি আমাকে কিছু বলতে চাইছেন?'' বা ''আমি কি আপনাকে কোনওভাবে সাহায্য করতে পারি?''

যারা অবসাদে ভুগছে তারা কীভাবে অন্যান্যদের পরামর্শ অনুযায়ী আচরণ করবে

যখন আপনার জীবনে ভাল কিছু ঘটছে না তখন আশেপাশের মানুষের সুপরামর্শ আপনার ক্ষেত্রে খুবই ফলদায়ক হতে পারে। এক্ষেত্রে মনোবিদ বা কাউন্সেলরের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে নিজের সক্ষমতা সম্পর্কে একটা ধারণা করা যায়।

অন্যের পরামর্শের জবাব দেওয়া উচিত ভদ্রভাবে। কিন্তু নিজের সমস্যার কথাটা পরিষ্কার করে বলা উচিত। যেমন-

''আমাকে নিয়ে ভাবার জন্য ধন্যবাদ। আপনার সাহায্য পেয়ে আমি এখন ভাল বোধ করছি।''

যদি প্রশ্ন আপনার মনের মতো না হয় এবং উত্তর দিতে যদি আপনার ভাল না লাগে তাহলে আপনি বলতে পারেন, ''আমার এই মুহূর্তে কথা বলতে ভাল লাগছে না।''

যদি আপনি কারোর প্রশ্নে বা মন্তব্যে দিশাহারা বোধ করেন তাহলে আপনি একজন মনোবিদ বা কাউন্সেলরের সঙ্গে কথা বলে সেই মতো কর্মপরিকল্পনা স্থির করতে পারেন।