We use cookies to help you find the right information on mental health on our website. If you continue to use this site, you consent to our use of cookies.

আমি একজন থেরাপিস্ট এবং আমারও থেরাপিস্ট রয়েছেন

অর্চনা রামানাথন

বাণী যখন প্রথম তার কাউন্সেলিং সেশন শুরু করে, তখন সে একটু ভয়ে ভয়েই ছিল। তার মাথায় খালি ঘুরছিল যে তার কাউন্সেলর কি এমন অভিজ্ঞতার কথা আগে শুনেছেন? তার দুশ্চিন্তা হচ্ছিল যে তার থেরাপিস্ট কি তার কথা শুনে বুঝতে পারবেন: “আমি মাঝে মাঝে ভাবি যে সারাদিন লোকের কষ্টের কথা শোনা কীভাবে একজন কাউন্সিলরকে প্রভাবিত করে? আমি আশা করছি যে আমার কাউন্সেলর শক্ত মনের অধিকারী এবং তিনি আমায় সাহায্য করতে পারবেন।”

কখনও কখনও আমার ক্লায়েন্টরাও আমার কাছে কৌতূহলবশত জানতে চেয়েছেন, “আপনার নিজের মাথার উপরে এই বোঝা রোজ কি করে নিয়ে নেন?”

থেরাপি করাচ্ছেন বা করাবেন ভাবছেন এমন ব্যক্তির পক্ষে এই চিন্তাগুলো যথেষ্ট উদ্বেগজনক।

থেরাপিস্ট এবং তাঁর ক্লায়েন্টের সম্পর্ক খুবই জটিল, যার প্রভাব তাঁদের ব্যক্তিগত এবং পেশাগত জীবনেও পড়ে। কাজেই থেরাপিস্টের নিজের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যও সমান গুরুত্বপূর্ণ। যেহেতু থেরাপিস্টদের জীবনটাই অন্যকে সেবা করে কেটে যায়, তাই তাঁদের নিজেদের ভালো থাকার দিকে মন দেওয়া উচিৎ।

অনেক থেরাপিস্টেরই এই পেশায় আসার পেছনে ব্যক্তিগত এক কাহিনী থাকে। একজন থেরাপিস্টকে এই পেশায় আসার আগে কঠোর তাত্বিক প্রশিক্ষণ এবং ও ব্যবহারিক প্রয়োগ আয়ত্ব করতে হয়। এছাড়াও তাঁদের নিজেও থেরাপির মধ্যে দিয়ে যেতে হয়, যাতে তাঁরা নিজেদের অতীত ও বর্তমান সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল থাকেন। এর ফলে তাঁরা নিজেদের মানসিক দ্বন্দ্বকে অতিক্রম করে, নিজেকে স্বাভাবিক ভাবে মেনে নিয়ে স্থিতিশীল মানসিকতা গড়ে তুলতে পারেন। বহু পেশাদারী কাউন্সেলিং প্রশিক্ষণে নির্দিষ্ট একটা সময় বাঁধা থাকে, যেটা শিক্ষানবিশদের আবশ্যিক ভাবে পূর্ণ করতে হয়, যাতে তাঁরা যোগ্যতার মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হতে পারেন।

একজন কাউন্সেলরের থেরাপি কেন প্রয়োজন?

থেরাপির মাধ্যমে একজন শিক্ষানবিশ কাউন্সেলর বুঝতে পারেন যে ক্লায়েন্টের জায়গায় থাকার এবং নিজেকে মেলে ধরার অভিজ্ঞতাটা কী রকম। এছাড়াও এই সময়টাতে তাঁরা নিজেরাও মানসিক সুস্থ্যতার পাঠটাও শিখে ফেলেন, যা আগামী দিনে তাঁরা ক্লায়েন্টকে শেখাবেন। এছাড়াও থেরাপি তাঁদেরকে নিজের বিশ্বাস, মূল্যবোধ, বিচারধারা এবং নিজের অন্তরের অনাবিষ্কৃত ক্ষেত্রকে উপলব্ধি করতে সাহায্য করে।

একজন থেরাপিস্টকে ক্রমাগত নিজের অভিজ্ঞতার উপরে ভর দিয়ে নিজেকে গড়ে তুলতে হয়। এর ফলে তাঁদের আবেগ, চিন্তাধারা এবং শারীরিক সচেতনতা সম্পর্কে গভীর উপলব্ধি হয়। থেরাপিস্টদের নিজের সম্পর্কে সচেতন থাকাটা খুবই জরুরি যাতে তাঁরা সৎ এবং খাঁটি ভাবে অন্যের মনে প্রবেশ করতে পারেন।

উদাহণস্বরূপ, একজন থেরাপিস্ট তার থেরাপি চলাকালীন নিজের রাগ ও দুর্বলতার ও অভিজ্ঞতাগুলো বিশ্লেষণ করার ফলে তার সচেতন মানসিকতাই তার ক্লায়েন্টদের কাউন্সেলিং করার মূল শক্তি খুঁজে পান। বিক্রম যখন প্রথম কাউন্সেলিং করাতে আসেন, তখন তার রুক্ষ মেজাজ তার জীবন এবং সম্পর্কগুলোকে বিষিয়ে তুলেছে। সেই থেরাপিস্ট কিন্তু সহজেই বিক্রমের পরিস্থিতি বুঝে সহমর্মিতার সাথে তার দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। এরপরে তিনি সহজেই বিক্রমকে তার মেজাজ নিয়ন্ত্রণে রাখার পথ দেখতে পেরেছিলেন।

এইরকম অগুনতি সাইকোথেরাপিস্ট রয়েছেন যারা থেরাপিস্ট হয়েও নিজের থেরাপির প্রয়োজনীয়তাকে প্রাধান্য দেন। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও এইরকম বহু নিয়ন্ত্রক সংস্থা রয়েছে যাঁরা মানসিক রোগের চিকিৎসা করার অনুমতি দেওয়ার পূর্বে থেরাপি করানোকে বাধ্যতামূলক করে দিয়েছে। ব্রিটিশ অ্যাসোসিয়েশন অফ কাউন্সেলিং অ্যান্ড সাইকোথেরাপি'র (বি.এ.সি.পি) ফ্রেমওয়ার্ক অফ গুড প্র্যাকটিস (সুষ্ঠ প্রণালির নিয়মাবলী) অনুযায়ী একজন থেরাপিস্টের নিজের যত্ন নেওয়া এক নীতিবদ্ধ দায়িত্ব।

আশা অভিভাবকত্বজনিত সমস্যার শিকার হয়ে থেরাপির শরণাপন্ন হন। নিজের মানসিক আবেগ বিশ্লেষণ করাকালীন আশা শৈশবে নিজের মাকে হারানোর যন্ত্রণা টের পেতে শুরু করেন। থেরাপিস্ট আশার কষ্টটা উপলব্ধি করেন এবং তার যন্ত্রণাটা বুঝতে পারেন। কিন্তু তা সত্বেও তিনি আশাকে সাহায্য করতে বিফল হননি। এই কারণেই একজন থেরাপিস্টের নিজের যত্ন নেওয়া প্রয়োজনীয়।

থেরাপিস্টরাও মানুষ, এবং বাকি সবার মতন তাঁদেরও জীবনযুদ্ধ রয়েছে। একজন কাউন্সেলরের জীবনেও ব্যক্তিগত সঙ্কট, গুরুতর কোনও ঘটনা, প্রিয়জনের মৃত্যু, শারীরিক অসুস্থতা, ব্যর্থতা ইত্যাদি আসতে পারে। কিন্তু জীবন প্রতিপদে তাঁদের পরীক্ষা নিলেও, তাঁদের দায়িত্ব হল নির্বিঘ্নে নিজেদের কাজ চালিয়ে যাওয়া।

থেরাপিস্টরা যখন থেরাপির আশ্রয় নেন, তখন তাঁরা পর্যাপ্ত শুশ্রূষা পান যা তাঁদের অভিজ্ঞতার ভাঁড়ার ভরিয়ে তোলে, প্রাণোচ্ছলতা ফিরিয়ে দেয় আর মানসিক ক্লান্তি দূর করে। সর্বোপরি এর দরুণ একজন থেরাপিস্টের সার্বিক সুস্থতা ও জীবনীশক্তি ফিরে পান, যার প্রভাব তাঁদের কাজের উপরেও পড়ে।

একজন থেরাপিস্ট কষ্ট বা যন্ত্রণার উর্দ্ধে নন। আদতে, এই কষ্ট বা যন্ত্রণায় প্রভাবিত হওয়ার ক্ষমতাই তাঁদের নিজেকে এবং ক্লায়েন্টকে বুঝতে সাহায্য করে। একজন থেরাপিস্টের নিজের থেরাপি তাঁকে সেই ক্ষমতাটুকু দিতেই অনেকটা সময় নেয়। একজন ক্লায়েন্ট এইটুকু অন্তত ভরসা করতে পারেন যে, যেই থেরাপিস্ট নিজেও থেরাপি করিয়েছেন, তিনি তার ক্লায়েন্টের মানসিক আবেগ বুঝতে ও সামলাতে অনেক বেশি সক্ষম।
 

**উপরোক্ত উদাহরণগুলিতে ব্যবহৃত নামগুলি সম্পূর্ণ কাল্পনিক এবং বাস্তবে তাঁদের কোনও অস্তিত্ব নেই

**কাউন্সেলর থেরাপিস্ট শব্দ দুটি এবং কাউন্সেলিং সাইকোথেরাপি শব্দ দুটি অদলবদল করে ব্যবহার করা হয়েছে

অর্চনা রামানাথন কাউন্সেলর ট্রেনার হিসেবে পরিবর্তন কাউন্সেলিং ট্রেনিং অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার-এর সাথে যুক্ত

তথ্যসূত্র: দ্য ব্রিটিশ অ্যাসোসিয়েশন অফ কাউন্সেলিং অ্যান্ড সাইকোথেরাপি'র (বি.এ.সি.পি) - গাইডলাইনস ফর এথিক্যাল ফ্রেমওয়ার্ক - https://www.bacp.co.uk/ethical_framework/