We use cookies to help you find the right information on mental health on our website. If you continue to use this site, you consent to our use of cookies.

থেরাপির প্রক্রিয়ায় পরিবারকে যুক্ত করলে ব্যক্তিগত সুস্থতায় সহায়তা পাওয়া যেতে পারে

একজন মানুষের পরিবার ও সমাজের দ্বারা তার মানসিক স্বাস্থ্য ও পারস্পরিক সম্পর্ক প্রভাবিত হয়। তাই পরিবারের সাহায্য না পেলে কীভাবে একজন মানুষ সুস্থ থাকবে? আমরা প্রত্যেকেই আমাদের পরিবারের সদস্য। সেই সঙ্গে আমরা  সমাজেরও ছোট ছোট অংশ। এভাবেই একটা পারিবারিক ব্যবস্থা গড়ে ওঠে। থেরাপির ক্ষেত্রে দম্পতি ও পরিবারের সদস্যদের যোগদানকে যদি স্বাস্থ্যকর বলে ভাবা হয় তাহলে এই ব্যবস্থার সঙ্গে পরিবারের সব সদস্যরাই ভালোভাবে মানিয়ে নিতে সক্ষম হবে।

আমরা প্রত্যেকেই নিজেদের ব্যক্তিত্ব গঠনের ক্ষেত্রে সাধারণভাবে পরিবারের ভূমিকার কথা স্বীকার করে থাকি। সেই স্বীকারোক্তির পথ ইতিবাচক বা নেতিবাচক- দু'রকমই হতে পারে। যদি কেউ একটা স্বাস্থ্যকর, সহযোগী মনোভাবাপন্ন পরিবারের সদস্য (ফ্যামিলি অফ ওরিজিন বা এফওও) হয় তাহলে তাকে খুবই সৌভাগ্যের অধিকারী বলে মনে করা হয়। তখন এটাও মনে করা হয় যে ওই মানুষটি  ব্যক্তিগতভাবে মানিয়ে-গুছিয়ে নিয়ে চলতে সক্ষম এবং তার ভবিষ্যৎ-সম্পর্কগুলোর মধ্যেও ভারসাম্য বজায় থাকবে ও সেগুলো সুস্থ-স্বাভাবিক হবে। অন্যদিকে যদি কেউ সমস্যাবহুল শৈশব কাটায় ও জটিল পারিবারিক প্রেক্ষাপটের অংশ হয় তাহলে তার কুপ্রভাব ওই ব্যক্তির ভবিষ্যৎ সম্পর্কগুলোর উপর পড়তে বাধ্য।

প্রাথমিকভাবে কী ধরনের বাধার সম্মুখীন হলে একজন মানুষের আচরণ ও বোধের ক্ষেত্রে জটিল পরিবর্তন ঘটতে পারে তা বোঝার জন্য এখানে একটা ঘটনার দৃষ্টান্ত তুলে ধরা হল-

রমেশ নামের এক ব্যক্তি কাউন্সেলিং-এর জন্য এসেছিল। কারণ সবসময়ে সে ভীষণ ক্লান্ত বোধ করত। তার সন্দেহ হত যে সে বোধহয় মানসিক অবসাদে ভুগছে এবং সেজন্য সে একজন থেরাপিস্টের সঙ্গে কথা বলতে চাইত। থেরাপি চলাকালীন বারবার তার সঙ্গে কথা বলে জানা যায় যে সে সম্প্রতি বিয়ে করেছে এবং সে তার নতুন বউকে নিয়ে বাবা-মা, ভাইয়ের সঙ্গে একটা যৌথ পরিবারে বসবাস করে। রমেশ ছিল ওই পরিবারের বড় ছেলে। তাই প্রয়োজনমতো অর্থনৈতিক দিক থেকে  সে ছিল পরিবারের একজন দায়িত্ববান সদস্য। রমেশকে তার মা একটু বেশি ভালোবাসত ও তার জন্য নানারকম পছন্দসই রান্নাবান্না নিজের হাতে করত। সেখানে রমেশের বাবা ও তার ভাইয়ের প্রতি মায়ের তেমন খেয়াল ছিল না।  রমেশের মা নানারকম সমস্যার কথা ছেলের কাছে বলতেন। সেই সমস্যাগুলো রমেশের মা-বাবার সমস্যা ছিল। বাবা-মায়ের সম্পর্কের নৈকট্য যে রমেশের খুব ভালো লাগত সেকথা সে তার মায়ের কাছে বলেছিল। সেই সঙ্গে রমেশ এটাও বুঝতে পেরেছিল যে বিয়ের মানে হল এমন একজন জীবনসঙ্গী পাওয়া যে স্বামীর সঙ্গে যৌথভাবে নিজেদের ও পরিবারের সব দায়দায়িত্ব পালন করবে। এমনকী, সেই জীবনসঙ্গী তার মাকেও নানাভাবে সাহায্য করবে।

বিয়ের পর পরিস্থিতি অস্বস্তিকর হয়ে উঠল। যখন মধুচন্দ্রিমায় গিয়ে স্বামী-স্ত্রীর খুশি থাকা দরকার তখন বাড়িতে খুব ছোটখাটো বিষয় নিয়ে তাদের নিজেদের মধ্যে ঝগড়া-ঝাটি চলত। এই বিষয়ে রমেশকে প্রশ্ন করা হলে সে জানায় যে কীভাবে রমেশের প্রিয় খাবারদাবার বাড়িতে রান্না করা হয় এবং কাজের পর রমেশ কতটা সময় তার মায়ের সঙ্গে কথাবার্তা বলে কাটায় সে সম্পর্কে তার স্ত্রী নানারকম বাঁকা বা বিদ্রূপাত্মক মন্তব্য করে। এর ফলে রমেশের মনে অপরাধ বোধ জাগে যে হয়তো মায়ের সঙ্গে অনেকটা সময় তার কাটানো ঠিক হচ্ছে না। কিন্তু সেখানে তার মা কখনও তাকে সে বিষয়ে সরাসরি কিছু বলেনি। আসলে রমেশ বুঝতে পেরেছিল যে তার মায়ের তাকে অনেক বেশি করে কাছে রাখা প্রয়োজন। যদি রমেশ তার মায়ের কাছে না থাকত তাহলে তার পরিবর্তে কে থাকত?

এই কারণে রমেশের সদ্য বিবাহিত জীবনে ঝগড়া-ঝাটি লেগেই থাকত। বাড়িতে এতটুকু শান্তির বাতাবরণ ছিল না। তার স্ত্রী বাপের বাড়ি চলে যাবে বলে প্রায়শই হুমকি দিত। আর রমেশ ভাবত যদি সত্যিই এমন হয় তাহলে লোকে কী বলবে? অর্থাৎ, এর ফলে একদিকে বিয়ে টিকিয়ে রাখা এবং অন্যদিকে হনিমুনে যাওয়া-দুটোই রমেশের কাছে ভীষণ চাপের হয়ে দাঁড়িয়েছিল। সে সব দিক সামলাতে পারছে না এই ভেবে রমেশের মধ্যে একপ্রকার অপরাধ বোধ জেগে উঠেছিল।

রমেশের দিক দিয়ে দেখতে গেলে অবস্থাটা এমন হয়েছিল যেখানে সবার খুশির জন্য রমেশ সবকিছু করছে অথচ কেউ তাতে খুশি থাকতে পারছে না। সে ভাবত যা সমস্যা দেখা দিচ্ছে তা দেখা দেওয়া উচিত নয় এবং আর কী করলে তা ঠিক কাজ করা হবে সে বিষয়টাই খুঁজে বের করা দরকার। দুর্ভাগ্যবশত, যখন কোনও   বিবাহিত মানুষ এককভাবে কাউন্সেলিং-এর জন্য আসে তখন বাড়িতে তা নিয়ে প্রায়শই ঝগড়া-বিবাদ হয়। অন্যদিকে থেরাপিস্টও রমেশের সমস্যা নিয়ে কাজ করা শুরু করে এবং কোন কোন বিষয়ে তার সমস্যা হচ্ছে তা দূর করার জন্য তাকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসে। যেমন- যখন সে সব ঠিক কাজ করার চেষ্টা করছে তখন সে প্রায়শই অপরাধ বোধে কেন ভুগছে। সে তার বাড়িতে বাবা-মায়ের প্রতি যথেষ্ঠ দায়িত্বশীল, সে কারণে তার স্ত্রীর সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে ও কাজের জায়গায় তার ভূমিকা কী হচ্ছে। তার পরিবার নিয়ে লোকে কী ভাবছে সেই সামাজিক চাপও রমেশের মধ্যে দেখা দিয়েছিল।

ব্যক্তিগত থেরাপির সাহায্যে এরকম পারিবারিক সমস্যার সমাধান করা সহজসাধ্য নয়। যখন রমেশ তার স্ত্রীর চাইতে তার মায়ের সঙ্গে বেশি সময় কাটাচ্ছে তখন স্ত্রী একাকিত্বে ভুগছে এবং মনে মনে তার হিংসা হচ্ছে। এই ভাব যথাযথভাবে প্রকাশ করার পরিবর্তে রমেশের স্ত্রী বিদ্রূপাত্মক মন্তব্য করছে বা রেগে যাচ্ছে। আর যার ফলে রমেশের মধ্যে রাগ বা অপরাধ বোধ জন্মাচ্ছে। এমনকী,কাউন্সেলিং করানোর পরেও রমেশ তার পরিবারের কাছে থেকে যোগ্য ব্যবহার পায়নি। রমেশ যে নিজেকে বদলেছে বা তার চিন্তাভাবনায় যে পরিবর্তন এসেছে সে ব্যাপারেও পরিবারের বোধগম্যতার প্রমাণ মেলেনি।

পারিবারিক ও দাম্পত্য থেরাপিস্টরা এইধরনের সমস্যাগুলোকে ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করেন। এই প্রবন্ধে যে উদাহরণ দেওয়া হয়েছে তাতে দেখা যাচ্ছে যে রমেশের সাহায্যের ফলেই তার পরিবার, বাবা-মায়ের সঙ্গে তাদের সুসম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। এই পরিস্থিতি ততক্ষণ ভালো যতক্ষণ সন্তান ছোট থাকে। কিন্তু সন্তান যখন বড় হয়ে যায় তখন কি তারা তাদের প্রত্যাশা মতো বাবা-মায়ের সব প্রয়োজন আগের মতো মেটাতে সক্ষম হয়? আসলে পরিবর্তনের সঙ্গে পরিবারগুলো নিজেদের অবস্থানের বদল ঘটাতে পারে না। রমেশ ও তার ভাই দু'জনকেই এই সমস্যা দূর করে পারিবারিক গতিশীলতা রক্ষার জন্য কী করা উচিত তা জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। যেহেতু তার ভাই দাদার মতো একই দ্বন্দ্বের মধ্যে পড়েনি তাই সে এই প্রশ্নের উত্তর যথাযথভাবে প্রকাশ করতে পারেনি। তার মানে এই নয় যে সমস্যার দ্বারা সে প্রভাবিত হয়নি। পারিবারিক থেরাপির সাহায্যে মানুষের অপরাধ বোধে ভোগার পরিমাণ কমানো যায়। এই ঘটনায় পুরো পরিবারের পক্ষ থেকে রমেশের মধ্যেই অপরাধ বোধ ও বিপর্যয় দেখা গিয়েছিল। কিন্তু পারিবারিক থেরাপির সাহায্যে রমেশ ও তার স্ত্রীর মধ্যে সুসম্পর্ক গড়ে তুলে তাদের নৈকট্য বা কাছাকাছি আসার সম্ভাবনা প্রবলভাবে দেখা দিত।

এভাবে পারিবারিক থেরাপির সাহায্যে রমেশের অপরাধ বোধ ও অবসাদের মূল কারণ অনুসন্ধান করা সম্ভব হত। কারণ বিয়ের আগে রমেশের জীবনে সব সম্পর্ক  এবং সব ঘটনাপ্রবাহ স্বাভাবিক ছিল। সমস্যা শুরু হয় বিয়ের পর। অধিকাংশ সময়েই পরিবারগুলো প্রয়োজনমতো পরিস্থিতির বদল সঠিকভাবে গ্রহণ করতে পারে না। তাই পরিবারগুলোর সম্পর্কের মধ্যে টানাপোড়েন শুরু হয়। এই সমস্যার মোকাবিলায় পারিবারিক থেরাপি অনেক বেশি কার্যকরী ফল দেয়।

পশ্চিমি দেশগুলোতে পারিবারিক থেরাপি নিয়ে অনেক কাজকর্ম হয়েছে। পারিবারিক পরিবেশে শিশু ও বয়ঃসন্ধিদের মধ্যে যে ধরনের সমস্যা দেখা দেয় তা পারিবারিক থেরাপির মাধ্যমে সমাধান করা যায়। বিদেশে এমপ্লয়ি অ্যাসিসট্যান্স প্রোগামের (ইএপি) সাহায্যে দম্পতিদের ব্যক্তিগত সমস্যার সমাধান কার্যকরী হয়। আমাদের  দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে প্রায় প্রত্যেকটি সমস্যাকেই সিস্টেমেটিক বা পদ্ধতিপূর্ণ হিসেবে দেখা উচিত এবং তার সবচাইতে ভালো সমাধান সেই পদ্ধতি মেনেই হওয়া জরুরি। বিদেশের থেকে ভারতে বসবাসকারী মানুষ তার পরিবার ও গোষ্ঠীর সঙ্গে অনেক বেশি ওতোপ্রোতোভাবে জড়িয়ে থাকে। যেখানে পারস্পরিক সহায়তা মানুষের উপকার করে, সেখানে পারিবারিক থেরাপি গ্রহণ না করা এবং পরিবর্তনকে স্বীকার না করতে পারলে তা আরও বেশি বিপর্যয়ের কারণ হয়ে উঠতে পারে। তাই বৃহত্তর পরিপ্রেক্ষিত থেকে দাম্পত্য ও পারিবারিক থেরাপির সাহায্যে সমস্যার সমাধান করা একান্ত জরুরি।

এই প্রবন্ধে যে ঘটনা বা ব্যক্তিকে দৃষ্টান্ত হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে তা বাস্তব নয়, নিতান্তই কল্পিত।

প্রবন্ধটি লিখেছেন পরিবর্তন কাউন্সেলিং ট্রেনিং অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টারের প্রশিক্ষক ও কাউন্সেলর শবরী ভট্টাচার্য।

                       

 



প্রস্তাবিত