ক্লেপটোম্যানিয়া

১৭ বছরের মারিয়া যখন থেরাপিস্টের সাথে দেখা করতে এলো তখন তাকে ভীষণ চিন্তিত দেখাচ্ছিল। খানিকক্ষণ কথা বলার পর সে স্বীকার করল যে সে ১৪ বছর বয়স থেকে পাড়ার দোকান থেকে জিনিস চুরি করছে। তার আগে সে স্কুল থেকে চক বা ক্লাসে সহপাঠীদের ব্যাগ থেকে খাতা কলম ইত্যাদি চুরি করেছে। প্রথমদিকে সে কী করছে বা কেন করছে না বুঝলেও, তার মনের মধ্যে অদ্ভুত উত্তেজনার ঢেউ খেলে যেত। চুরি করা জিনিসগুলো সে খুব একটা ব্যবহার করত না। কিন্তু ইদানিং মারিয়া নিজের এই প্রবৃত্তিকে দমন করতে পারছে না। আর প্রত্যেকবার চুরি করার পরে সে চূড়ান্ত অপরাধবোধে ভুগছে।

ক্লেপটোম্যানিয়া, বা চুরি করার বাতিক বলতে কোনও বস্তু চুরি করার আকাঙ্খাকে দমন না করতে পারাকে বোঝায়। এটি প্রধানত পশ্চিমের দেশগুলিতে দেখা গেলেও ভারতে প্রতি বছর প্রায় ১০ লক্ষ ক্লেপটোম্যানিয়ার কেস রিপোর্ট করা হয়। ক্লেপটোম্যানিয়াভোগী ব্যক্তি কিছুতেই চুরি করা থেকে নিজেকে বিরত রাখতে পারেন না। কিন্তু দৈনন্দিন জীবনে সেই চুরি করা বস্তুর প্রয়োজনীয়তা কিংবা অর্থনৈতিক মূল্য কোনও গুরুত্ব বহন করে না। এবং এই চুরি করা বস্তু সামান্য একটা সেফটিপিন থেকে শুরু করে দামী যন্ত্রপাতি বা আসবাব যা খুশি হতে পারে।

ক্লেপটোম্যানিয়া সাধারণত কিশোর বয়সে বা আরেকটু পরের দিকে দেখা দেয় এবং আজীবন ভোগায়। কোনও কোনও ক্ষেত্রে ক্লেপটোম্যানিয়া জীবনের বিভিন্ন পর্যায়, যেমন শৈশব বা প্রাপ্তবয়সে, সুস্পষ্ট হতে উঠলেও, বেশি বয়সে এটি দেখা দিয়েছে এ’রকম কমই শোনা যায়। ক্লেপটোম্যানিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তির সংখ্যা বলা খুবই কঠিন, কারণ ধরা পড়ার বা জরিমানা হওয়ার ভয়ে অনেকেই এই বিষয়ে মুখ খুলতে চান না। এই ক্ষেত্রে মাথায় রাখতে হবে যে ক্লেপটোম্যানিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তি কোনও জিনিসের আর্থিক মূল্য দেখে সেটা চুরি করেন না, বরং সেটিকে হাত পাওয়ার তৃপ্তির উদ্দেশ্যে করেন।

ক্লেপটোম্যানিয়া বনাম চুরি: দেখতে শুনতে এক রকম লাগলেও দু’টোর পার্থক্য বোঝা খুবই জরুরি। (১) ক্লেপটোম্যানিয়া হল অন্যের জিনিস না বলে নেওয়ার এক অদম্য আকাঙ্খা যা সেই ব্যক্তির স্বতঃস্ফূর্ত আচরণ। কিন্তু চুরি হল সেই জিনিসটি ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্যে হাত করা, যার জন্যে প্রাথমিক পরিকল্পনা প্রয়োজন। (২) ক্লেপটোম্যানিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তি অন্যের জিনিস চুরি করার ইচ্ছাকে দমন করতে পারেন না। অন্যদিকে দোকানপাট থেকে লোভে পড়ে জিনিস চুরি করার পেছনে সেটাকে আত্মসাৎ করার চিন্তা কাজ করে। কাজেই দেখতে শুনতে এক রকম লাগলেও, একে অপরের থেকে যথেষ্ট আলাদা।

ক্লেপটোম্যানিয়ার লক্ষণগুলি হল:

  • অপ্রয়োজনীয় জিনিস চুরি করার অদম্য আকাঙ্খা
  • চুরি করার আগে অত্যাধিক চাপ এবং উদ্বেগ
  • চুরি করে আনন্দ পাওয়া
  • চুরি করার পরে অপরাধবোধ এবং লজ্জায় ভোগা
  • চুরিগুলো কোনও বিভ্রম, বিভ্রান্তি বা রাগের বশে অথবা প্রতিশোধ স্পৃহায় না করা
  • কোনও কোনও ক্ষেত্রে অপরাধবোধ থেকে মুক্তি পেতে চুরি করা জিনিস ফেরৎ দেওয়া
     

কারণ: ক্লেপটোম্যানিয়ার প্রকৃত কারণ সকলেরই অজানা।তবে মনোবিদরা অনুমানের ভিত্তিতে এই সংক্রান্ত কিছু যুক্তি খাড়া করেছেন।

  • ফ্রন্টাল লোব ডিসফাংশন: আমাদের মস্তিষ্কের সামনের অংশ বা ফ্রন্টাল লোব আমাদের ইছাগুলিকে নিয়ন্ত্রণ করতে সাহায্য করে। সেখানে কোনও রকমের রাসায়নিক বা নিউরোট্রান্সমিটারের ভারসাম্যহীনতার জন্য ক্লেপটোম্যানিয়া দেখা দিতে পারে।
  • অন্যান্য মানসিক উপসর্গের উপস্থিতি: অনেক সময় মানসিক চাপ, অত্যধিক-অমোঘ ব্যাধি (অবসেসিভ কম্পালসিভ ডিসঅর্ডার), মাদকাসক্তি বা মুড ডিসঅর্ডারের সাথে ক্লেপটোম্যানিয়া দেখা দিতে পারে।
  • জিনগত: বিভিন্ন গবেষণা থেকে জানা গিয়েছে যে বংশানুক্রমেও ক্লেপটোম্যানিয়া দেখা দিতে পারে।

চিকিৎসা: ক্লেপটোম্যানিয়া একজন ব্যক্তির আজীবন থাকতে পারে। এর চিকিৎসার উদ্দেশ্য হল রোগের উপসর্গগুলিকে নিয়ন্ত্রণ করা, কারণ এটি সম্পূর্ণ নির্মূল করার কোনও নিশ্চয়তা দেওয়া সম্ভব নয়। পরিণতির ভয়ে লোকে ক্লেপটোম্যানিয়া নিয়ে আলোচনা করতে দ্বিধা বোধ করেন, যা তাদেরকে ক্রমাগত হতাশা এবং মানসিক চাপের দিকে ঠেলে দেয়। ক্লেপটোম্যানিয়ার চিকিৎসা পদ্ধতিগুলি নিম্নরূপ:

  • ওষুধ: অ্যন্টিডিপ্রেসেন্টস (অবসাদ নিয়ন্ত্রণকারী), মুড স্টেবিলাইজার (মেজাজ নিয়ন্ত্রণকারী), অ্যান্টি-সিজার (খিঁচুনি প্রতিরোধক) এবং নেশা কাটানোর ওষুধের মাধ্যমে সুফল পাওয়া সম্ভব।
  • থেরাপি: সাইকোথেরাপি ক্লেপটোম্যানিয়ার চিকিৎসায় ভালো কাজ করে। এমন কিছু পদ্ধতি হল –  


প্রচ্ছন্ন সংবেদনশীলতা: এখানে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে ধরা পড়ার পরিণতিগুলি নিয়ে কল্পনা করতে বলা হয়। অপরাধের নেতিবাচক দিকগুলি নিয়ে অবগত থাকলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি চুরি করা থেকে নিজেকে আটকাতে সক্ষম হন।

বিতৃষ্ণা পদ্ধতি: সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে চুরি করার আগে অস্বাচ্ছন্দ্যকর কিছু করতে বলা হয়। উদাহরণস্বরূপ, সেই ব্যক্তিকে চুরি করার প্রলোভনে সাড়া দেওয়ার আগে নিঃশ্বাস ততক্ষণ বন্ধ করে রাখতে বলা হতে পারে যতক্ষণ না সেটা অসম্ভব মনে হয়।

ক্লেপটোম্যানিয়া এমন এক মানসিক ব্যাধি যা নিয়ে আমাদের সমাজে যথেষ্ট কুণ্ঠা এবং লজ্জা বিদ্যমান রয়েছে। ফলে এতে আক্রান্ত ব্যক্তিরা এই নিয়ে খোলাখুলি আলোচনা করতে ভয় পান। পাশাপাশি এটাও মনে রাখা দরকার যে  সম্পূর্ণ নির্মূল করার কোনও নিশ্চয়তা না দেওয়া গেলেও চিকিৎসার মাধ্যমে ক্লেপটোম্যানিয়ার উপসর্গগুলিকে আরও দক্ষভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

Was this helpful for you?