মানসিক অবসাদগ্রস্ত একজন মানুষের জীবনযাপন

মনের অবসাদ মোকাবিলার ক্ষেত্রে এই প্রবন্ধের লেখক একপ্রকার উপায় বের করেছেন, যার সাহায্যে তাঁর চারপাশে বাস করা মানুষজন তাঁকে সঠিকভাবে বুঝতে পারবে।

অরুণা রামান, সমাজ-সংস্কারক

মানসিক অবসাদ খুবই আশ্চর্যের বিষয়। যার কাছে মানসিক চাপ এবং উদ্বেগ নিত্যসঙ্গী, তার লড়াই, আমার মতে নিজের শরীরে বাসা বাঁধা শত-শত সাপের ফণা তোলার মতো ভয়ংকর একটি ঘটনা। 

অনেক মানুষই জানে না যে, তাদের চারপাশে থাকা অবসাদগ্রস্ত ব্যক্তিদের আচার-আচরণ কেমন হয়-- এই বিষয়ে আলোকপাত করেছেন অরুণা রামান

মানসিক অবসাদ সত্যিই বেশ আবাক করা একটি বিষয়। যে মানুষটি প্রতিদিন মানসিক চাপ এবং উদ্বেগের মধ্য দিয়ে জীবন কাটায়, আমার মতে তার লড়াই শরীরে বাসা বাঁধা শত-শত বিষধর সাপের ফণার মতোই বিপজ্জনক এবং ভয়ংকর। আমাদের স্নায়ুগুলি যখন বহু ব্যবহারের ফলে ঝিমিয়ে পড়ে, তখন মনে হয় যেন একটা গভীর শ্বাস নিলে সেই স্নায়ুগুলি আবার শান্ত, সতেজ হয়ে উঠবে। আবার জলে ডুব দেওয়ার সময় আমাদের পেটের ভিতর সূর্যের তেজ ঢুকছে বলে বোধ হয়। আমার মতে, এগুলির মতো একইরকমভাবে মানুষ হতভম্ব হয়ে পড়ে, যখন সে মানসিক অবসাদের শিকার হয়। আমি সব সময় কয়েকটি বিষয় খুব অপছন্দ করি এবং সেগুলি প্রতিরোধ করার চেষ্টা করি। বিষয়গুলি হল—দেমাক দেখিয়ে যখন কেউ কিছু প্রত্যাখ্যান করে, মানুষকে ভড়কে দেওয়া বা তাকে ধন্দে ফেলে দেওয়া এবং একজনকে অন্যজনের সঙ্গে তুলনা করে তাকে হেয় করা। কারও-কারও ক্ষেত্রে এগুলি কুপ্রভাব ফেলে, আবার কারও ক্ষেত্রে এগুলি ভালো ফল দেয়। আমার আগের কৌশল ছিল, নয় লড়াই করতে হবে আর নাহলে নিজেকে সেই জায়গা থেকে সরিয়ে নিতে হবে। এই যুক্তি, তা যতই মন্দ বলে মনে হোক না কেন, হয় তাকে হাসি মুখে মেনে নিতে হবে, না হয় মুখ গোমড়া করে থাকতে হবে।

যাইহোক, নিজেকে চেনার এবং বোঝার জন্য এমন পদক্ষেপ করা যেতেই পারে। আমার চারপাশে থাকা মানুষজনের থেকে এই কথা শুনতে এবং উপলব্ধি করতে শুরু করেছিলাম যে, তারা লড়াই করছে অথচ তাদের অন্যের সাহায্যও চাই। যদিও এই ধরনের সমস্যার ক্ষেত্রে এহেন অনেক আলোচনাই আমাদের জন্য আশীর্বাদস্বরূপ। যারা আমাদের সাহায্য করতে চাইছে, তাদের মনেও এই ধরনের কথা সন্দেহ জাগিয়ে তোলে। সম্প্রতি একজন বন্ধুর মন্তব্য শুনলাম। সে বলেছে যে, তারা আমাকে ভালোবাসে, কিন্তু তারা জানে না যে, ভালোবাসতে গেলে কী করা প্রয়োজন। এহেন আবেগপ্রবণতা আমার নিজের চিন্তাভাবনাগুলিকে একত্র করে তাকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে সাহায্য করে বা করে চলেছে। এর জন্য কোনও বৃহৎ গবেষণা করার দরকার নেই। ছোট-ছোট ধাপে এগোনোই ভালো। ধাপ ১। ধাপ ২—রুটিন, এবং এরকমই আরও কিছু বিষয়।

মানসিক অবসাদ এবং উদ্বেগের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ক্ষেত্রে দৈনন্দিন নির্দিষ্ট রুটিন তৈরির কৌশল খুবই কার্যকরী হয়। আমার ভাবতে অবাক লাগে যে, একটি গোছানো রুটিন মনের স্থিতিশীলতা খুঁজে পেতে সাহায্য করে। যেহেতু আমাদের মাথায় অনেক এলোমেলো চিন্তা ঘুরপাক খায়, কোনও কিছু সম্ভাব্য ঘটনার কথা কল্পনা করে আমরা আশঙ্কিত হই এবং আমাদের মাথায় অযথা চাপের সৃষ্টি হয়, সকালটা কেমনভাবে কাটে সেই জন্য অধীর অপেক্ষা করা এবং তার বিচারেই সারা দিনটা কেমন যাবে সেই বিষয়ে আন্দাজ করা— প্রভৃতি কাজ আমরা প্রায়শই করে থাকি। কিন্তু রুটিন অনুযায়ী কাজ করলে এই সমস্যাগুলিকে রোধ করা যায়। আমার পরিবারের সদস্যরা প্রায়ই আমাকে প্রশ্ন করে যে, কেন আমি নির্দিষ্ট রুটিন অনুযায়ী  জীবনযাপন করি। তারা আমাকে হামেশাই বলে যে, যদি আমি প্রতিদিন শরীরচর্চা না করি, সেটা রুটিন থেকে বাদ দিয়ে দিই, তাহলে তা আমার এবং তাদের পক্ষে বেশ সুবিধাজনক হবে। যাইহোক, রুটিন আমার নিত্য কাজের প্রস্তুতির ক্ষেত্রে পথপ্রদর্শকের ভূমিকা গ্রহণ করে। তাই পরিবার এবং বন্ধুদের কাছে আমার একান্ত অনুরোধ হল, সব সময়ে একটা রুটিন অনুযায়ী জীবনযাপন করা। রুটিন মেনে চলার সময়ে কোনও বাধা আসবে না তা মনে করা ঠিক নয়। তবে তার মানে এই নয় যে, সেই বাধা দূর করা সম্ভব নয়। বরং সেই বাধা অতিক্রম করে এগিয়ে চলার নামই যে জীবন— সে কথা ভুলে যাওয়া উচিত নয়। একজন ব্লাডপ্রেশারের রোগীর হাত থেকে কেউ কি ওষুধ কেড়ে নিতে পারবে? কারণ নিয়মিত ওষুধ খাওয়াটা একজন ব্লাডপ্রেশারের রোগীর পক্ষে একান্ত বাধ্যতামূলক একটি বিষয়। রুটিন মেনে জীবনযাপন করাও অনেকটা এমনই বিষয়।

ভুলে যাওয়া এবং স্মৃতি হাতড়ানো

স্মৃতি বিষয়টি স্বল্পস্থায়ী এবং অনির্দিষ্ট— এই সত্য একদিন সবাই অনুভব করবে এবং কোনও একদিন এমনটাই ঘটবে। যে সব মানুষ অবসাদের বিরুদ্ধে লড়াই করে বাঁচেন, তাদের লক্ষ্য করলে দেখা যাবে যে, বাজার থেকে এক জিনিস আনার জন্য এরা তিনদিন ধরে বাজারে যাতায়াত করে। যখন তারা প্রথম দিন মুদি দোকান থেকে ফিরে আসে, তখন তারা তাদের যা যা কিছু জিনিস আনার কথা ছিল তার সবগুলোই এনেছে বলে মনে করে। এটাই অবশ্য তাদের কাছে যুক্তিসংগত আচরণ। কারণ অবসাদগ্রস্ত মানুষরা এই যুক্তি-বুদ্ধিতেই চলে।

আমি নিজের ক্ষেত্রেও লক্ষ্য করেছি যে, যখন আমি বাজারের তালিকা মেলাতে শুরু করি, আমি দেখি যে, তার থেকে আমি অনেক জিনিসই আনতে ভুলে গিয়েছি। ফলে পরের দিন আমাকে আবার দোকানে যেতে হয়। আসলে এটাই আমাদের কাছে অভ্যাস হয়ে দাঁড়িয়েছে। অধিকাংশ মানুষই ভাবে যে বাজার করার ক্ষেত্রে এটাই বোধ হয় রীতি। তবে যারা তালিকা মিলিয়ে নির্দিষ্ট পদ্ধতি মেনে বাজার-দোকান করে, তারা এহেন ঝামেলার মুখোমুখি হয় না। লাভবানই হয়। আমি দেখেছি যে, যখন আমি চোখ-কান খুলে রেখে মুক্ত চিন্তাভাবনা নিয়ে বাজারে যাই, তখন ভুলে যাওয়ার মতো কোনও অঘটন আমার ক্ষেত্রে ঘটে না।

ঘরের জিনিসের স্থান পরিবর্তন হলেও আমার খুব অসুবিধা হয়। যেমন, খবরের কাগজটা টেবিলের নীচে থাকাটাই আমার কাছে স্বাভাবিক বিষয়। কিন্তু সেটা যদি টেবিলের উপরে থাকে তাহলে তা আমার পক্ষে মোটেই সুখকর নয়। বা, রান্নাঘরের ড্রয়ারের মধ্যে চামচ থাকাটাই বাঞ্ছনীয় আর এর ফলে তা মনে রাখাও সম্ভব হয়।

আমার একজন ঘনিষ্ঠ বন্ধুর স্মৃতিশক্তি খুব দুর্বল ছিল এবং সে সব সময়ে স্মৃতি হাতড়িয়ে বেড়াতো। এই রকম মানুষ যদি ঘোড়ায় চড়া পছন্দ করে, তাহলে দুর্বল স্মৃতির কারণে সে একটি শান্ত ঘোড়া বেছে নেবে, আর স্মৃতি হাতড়িয়ে বেড়াবার কারণে সে দুরন্ত ঘোড়ার পিঠে চড়তে পছন্দ করবে। আসলে যাদের মস্তিষ্কের সচলতা সব সময়ে থাকে না, তাদের মাথায় একসঙ্গে বহু চিন্তা ঘুরপাক খায় এবং সেগুলির মধ্যে কোনও মিল খুঁজে পাওয়া যায় না। আমার জীবনে, যারা সব সময়ে আমার চারপাশে থাকে, যেমন, প্যাথলজিক্যাল বিশেষজ্ঞরা, তারা আমাকে এখনই নানা আবোল-তাবোল কথা জিজ্ঞাসা করছে, আবার পরক্ষণেই প্লামবারকে ফোন করছে, বা আমার ভাই-বোনকে হোয়াটস্‌ অ্যাপে মেসেজ পাঠাচ্ছে, আবার জানতে চাইছে কীভাবে ভালো কফি তৈরি করা যায় প্রভৃতি। উফ! সাংঘাতিক কাণ্ড। এহেন আচরণ সত্যিই বোধবুদ্ধিহীনতার পরিচয়। আসলে আমি জানি যে, একসঙ্গে অনেক কাজ করাটা কারো-কারো কাছে গর্বের বিষয়। কিন্তু আমার মনে হয় এক সময়ে অনেক কাজ করার চেয়ে কয়েকটি কাজ করলে ভালো ফল হয়। আমি তখনই একসঙ্গে অনেক কাজ করতে পারব, যখন আমি নিজেকে সংগঠিত করে, সঠিক বোধ-বুদ্ধি প্রয়োগ করব। এর উপায় হল কাজের পদ্ধতিগুলিকে পরপর লিখে রাখা এবং নিজের মনে সেগুলিকে গেঁথে ফেলা।

নিজের জন্য খোলা জায়গার ব্যবস্থা করা—

প্রতি মাসে কয়েকটি দিন দৈনন্দিন কাজকর্ম থেকে ছুটি নেওয়া কার্যকরী একটি উপায়। এই সময় বাড়িতে বসে কাজ করা উচিত। এর ফলে নিজেকে নতুন করে গুছিয়ে নেওয়ার সুযোগ থাকে। কাজের ক্ষেত্রে গতি আসে এবং নিজেকে লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়। আর বাড়িতে বসে কাজ করার ফলে ঘরের কাজকর্মগুলিরও তদারকি করা যায়। একলা সময় কাটানোর জন্য চিন্তাশক্তির  ক্ষেত্রে স্থিরতা আসে এবং শক্তি কম ক্ষয় হওয়ায় কর্মক্ষমতা অনেক বেড়ে যায়। বাইরের কোনও প্ররোচনা না থাকার ফলে চিন্তাভাবনার মধ্যে অসংগতি চোখে পড়ে না। এই কৌশল আমাদের পক্ষে খুবই উপকারী।

এমন অনেক সময় হয়, যখন আমরা কোনোরকম সামাজিক অনুষ্ঠানে যেতে চাই না। বন্ধুদের সঙ্গে এক হয়ে খেতে চাই না। যারা শুভবুদ্ধিসম্পন্ন, তারা তাদের সদিচ্ছার দ্বারা এই সব বাধা কাটিয়ে উঠতে পারে। কারও সঙ্গে মেশার ক্ষেত্রে কোনও হীনম্মন্যতা বজায় রাখা ঠিক নয়। কেউ যদি কারও সঙ্গে সৌজন্যবশত হাত মেলাতে চায়, তাহলে তাকে স্বাগত জানানো জরুরি।

অবসাদ যদি কারও উপর আধিপত্য বিস্তার করে, তাহলে তা খুবই বিপজ্জনক। আমার সঙ্গে যারা খুব ঘনিষ্ঠভাবে মেশে তারা বলে যে, আমি যদি না থাকি তাহলে তারা জানে না যে, তাদের কী হবে! এটা আমায় খুবই যন্ত্রণা দেয়। আসলে মানুষের মধ্যে থাকা অপরাধ বোধের জন্য তারা এহেন আচরণ করে। এক্ষেত্রে অহং বোধকে নতুন করে জাগিয়ে তোলা দরকার। এবং নিজের মধ্যে অন্যের মতামতকে সম্মান জানিয়েও, নিজের সিদ্ধান্তে অটল থাকার শপথ নেওয়া বাঞ্ছনীয়।

অন্যের দ্বারা প্রভাবিত হওয়া

আমাদের সমাজে জোর করে তুলনা করার প্রবণতা দেখা যায়। কারো ক্ষেত্রে সবকিছুই খারাপ, আবার কেউ-কেউ যা করে, তাই সেরা বলে বিবেচিত হয়। আসলে মানুষ যখন তার শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে দূরে সরিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যায়, তখন তা আমাদের কাছে দৃষ্টান্ত হয়ে ওঠে। কিন্তু, যখন কেউ মানসিক সমস্যাগুলির বিরুদ্ধে লড়াই করে জয়ী হয়, তখন তা আমাদের কাছে আগের উদাহরণের তুলনায় কম প্রশংসা পায়। সবার কাছে আমার একটাই অনুরোধ যে, মতের অনৈক্য থাকতেই পারে, কিন্তু সব মতকেই গ্রহণ করার মানসিকতা থাকা প্রয়োজন। যে বিষয়গুলি শুধু আমার কাছে গুরুত্ব পাচ্ছে, সেগুলিই সঠিক, আর যেগুলি কম গুরুত্ব পাচ্ছে, সেগুলি ভুল— এমন চিন্তা করা উচিত নয়। এক্ষত্রে মানসিক স্বাস্থ্যের বিপর্যয়কে অবহেলা করা একদম সঠিক কাজ নয়। আসলে, আমার মতে এমন কাজ করা দরকার, যার পিছনে সময় ব্যয় করাটা সফল এবং মূল্যবান হয়।

আমার উদ্দেশ্য হল, কোনোভাবেই কোনও কাজকে ছোট করে দেখা নয়। এবং সমাজবিচ্ছিন্ন হয়ে বাঁচা নয়। বরং দোষ-ত্রুটি নিয়েই সব কিছুকে বিচার করা জরুরি।

অরুণা রামান সমাজে নতুন কিছু সৃষ্টির পথ দেখান। ইনি একটি  আমেরিকান বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত। আরুণা চান মানুষ যাতে তার মানসিক অবসাদ এবং উদ্বেগ কাটিয়ে সুস্থ জীবন যাপন করতে পারে এবং এই জন্য তিনি তাদের সঠিক দিশা দেখাতে সদাসচেষ্ট। এই লেখার মধ্য দিয়ে তিনি নিজেকে একজন পরিচর্যাকারী হিসেবে তুলে ধরতে চেয়েছেন।

Was this helpful for you?