চাকরি সুত্রে স্থানান্তরঃ আমার বাড়ির মানে আমার কাছে কী সেটা সবাই বোঝে না

ভিও কী বলছে তা সে নিজে উপলব্ধি করার আগের মুহূর্তে আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়েছিল যখন আমি সোফায় বসে অঝোরে কাঁদছিলাম। তারপর সে আমার পাশে বসে নিজের হাতটা আমার হাতের উপর রেখে বলেছিল, ''অবশ্যই সে তোমাকে পেয়ে গর্বিত বোধ করছে। ওর জায়গায় অন্যকেউ হলে সেও তাই অনুভব করবে।'' এই কথা শুনে আমি দ্বিগুণ জোরে ফোঁপাতে শুরু করেছিলাম।

দশ মাসের একটা ফেলোশিপ প্রোগ্রামে যোগ দিতে আমি সিয়াটেল গিয়েছিলাম। ওখানে গিয়ে একজন খুব দারুণ পুরুষের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়। পরিচয়ের কয়েক সপ্তাহ পর আমরা একে অপরের সঙ্গে দেখা করতে শুরু করি। সে তার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে আমার পরিচয় করাতে চেয়েছিল। আসন্ন সন্ধেবেলায় কী ঘটবে তা নিয়ে আমার ভয়-ভয় লাগছিল। আমি এটা ভেবে গজগজ করছিলাম যে কেন সে তার বাড়ির লোকদের সঙ্গে আমার পরিচয় করাতে চাইছে। আমার সাথে যে একই বাড়িতে থাকত সে বলেছিল যে ওই লোকটা আমাকে পেয়ে গর্বিত। আমি তার সেই কথা শুনে কাঁদতে শুরু করে দিয়েছিলাম।

দেশে থাকাকালীন আমার পরিস্থিতি অন্যরকম ছিল। তখন আমি এমন একজন ছিলাম যাকে পেয়ে কারো গর্বিত বোধ করার কথা নয়। তিরিশ বছর বয়সে আমার গায়ে তকমা লেগেছিল এই বলে যে আমায় কেউ বিয়ে করবে না। আমিও সম্বন্ধ করে বিয়ে করাকে খুব ঘৃণা করতাম। আসলে আমি বইয়ের পোকা ছিলাম; মোটাসোটা, লাজুক, সামাজিক ব্যবস্থায় বেখাপ্পা, উদ্ভট, যাকে লুকিয়ে রাখা হত।

সিয়াটেলে আমার গায়ে লাগা সেই বিশেষ তকমার কথা কেউ জানত না। সেখানে আমার মনোভাব ছিল 'কেন নয়', অর্থাৎ একজনের প্রশ্নের জবাবে আমার উত্তর হত 'কেন নয়'। মানে অন্যদের চোখে তখন আমি ঝুঁকিপূর্ণ কাজ বেশ মজা ভেবেও করে ফেলতে পারতাম। তখন আমি ছিলাম লড়াকু, সামাজিক একজন মানুষ। এবং সবচেয়ে অবাক করার মতো বিষয় ছিল যে আমি এমন একজন মানুষ, যাকে নিয়ে লোকে গর্ব করতে পারত।

কয়েকজন অসুন্তুষ্ট আত্মীয়দের দ্বারা আমার গায়ে যেসব তকমা লাগিয়ে দেওয়া হয়েছিল তাতে নিজের সম্পর্কে আমার নিজস্ব ধ্যানধারণা বা মূল্যায়ন আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছিল। আমার তখন মনে হত যে ওইসব লোকগুলো যা বলছে সেগুলো ভুল নয়। আমার প্রোগ্রাম কো-অর্ডিনেটর সম্ভবত ঠিক কাজ করেছিল যখন সে আমায় বলেছিল যে সে বিশ্বাস করে যে আমি পারব আমার দলকে বিষণ্ণতা থেকে টেনে বের করতে। একইভাবে যেইদিন আমি মিটিং-এ সেজেগুজে যেতাম আমার অফিসের বাইরে বাস করা এক গৃহহীন ব্যক্তি আমার বেশভূষা লক্ষ করে আমাকে হেসে বলত যে আমায় নাকি খুব সুন্দর দেখাচ্ছে!

আনন্দ করা বা খুশিতে থাকার যোগ্য ছিলাম আমি, এটা আমি মেনে নিতে শুরু করেছিলাম। আমি উপলব্ধি করে পারছিলাম যে আনন্দের দিকে আমি নিজেই হাত বাড়াতে পারি।  

তাই যখন আমি ভারতে ফিরে এলাম তখন আমি আবার নতুন করে ব্যাগপত্র গুছিয়ে অন্যত্র রওনা হয়েছিলাম। নিজের পরিবারের সঙ্গে থাকার পরিবর্তে তখন  আমি চাকরি সূত্রে দেরাদুনে থাকতে শুরু করেছিলাম। আমার কাছে এই স্থানান্তরের অভিজ্ঞতা সিয়াটেলের চেয়েও করুণ ও কঠিন হয়েছিল। ফেলোশিপ প্রোগ্রামের সাহায্য ছাড়াই এখানে আমায় নিজের কাজ নিজে করতে হত। দেরাদুনে থাকার সময়ে নিজের অভিজ্ঞতা অন্যের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার জন্য কোনও সহযোদ্ধা আমার ছিল না। সূক্ষ্ম রসবোধসম্পন্ন কোনও খাঁটি প্রোগ্রাম কো-অর্ডিনেটরকেও আমি সেখানে পাশে পাইনি। সেখানে আমার সঙ্গে ছিল আমার ট্রাঙ্ক এবং বাড়ি খোঁজার জন্য সময়সীমা বাধা ছিল এক সপ্তাহ।

দেরাদুনে থাকার জন্য একটা বাড়ি আমি পেয়েছিলাম। একটা গ্রন্থাগার ও কফিশপের খোঁজও মিলেছিল। এমন একটা খাবার জায়গা আবিষ্কার করেছিলাম যেখানে প্রয়োজনে তো যেতামই আবার কাউকে খাওয়ানোর জন্যও যেতাম। সপ্তাহের শেষে দিনগুলো আমি খুব মজা করে কাটাতাম। দেরাদুনটাকে আমি পাকাপাকিভাবে আমার নিজের বাড়ি-ঘর করে তুলেছিলাম। এমনকী, সেখানে আমার কিছু বন্ধুবান্ধবও হয়ে গিয়েছিল।

আমার বাড়ির মানে আমার কাছে কী সেটা সবাই বোঝে না। আমার সহকর্মী এবং পরিবারের সদস্যদের মনে হয়েছিল যে আমি যেখানে থাকি সেটা শুধুই একটা ঘর ছাড়া আর অন্য কিছু নয়। কারণ জীবনে বেঁচে থাকতে গেলে একজন একা মহিলার চাই একটা নিরাপদ বাসস্থান। সহকর্মীরা বলেছিল যে এই ফ্ল্যাটের পরিবর্তে আমার কোথাও পেইংগেস্ট হিসেবে থাকাই ভালো। তারা আমায় জিজ্ঞাসা করেছিল যে কেন আমি একটা বাড়ি চাইছি? আমি তাদের উত্তর দিয়েছিলাম যে এখন দেরাদুনই আমার নিজের বাসস্থান বা ঘর-বাড়ি হয়ে উঠেছে। আমি আরও বলেছিলাম যে সেই  কারণেই আমি চাই ওখানে আরাম করে থাকতে। আমি চেয়েছিলাম হাত পুড়িয়ে  রান্না করে খেতে। সেই সঙ্গে চেয়েছিলাম একটু বিনোদনের ব্যবস্থাও করতে। আসলে অন্যরা যা করে আমিও ঠিক তাই করতে চেয়েছিলাম। আসলে দুঃখের কথা হল আমি আমার জীবনটাকে একটা সঙ্গত রূপ দিতে চেয়েছিলাম। আমি আমার পরিবারের সদস্যদের যখন বলতাম যে আমি কিছু আসবাবপত্র কিনেছি তখন তারা অবাক হয়ে যেত আর সেটা দেখে আমি খুব হতাশ হয়ে পড়তাম। যদিও সেই সময় আমার বয়স ছিল মাত্র বত্রিশ বছর। তখনও আমি একজন শিক্ষার্থীর মতো করেই জীবনযাপন করতাম। কারণ তখন আমি অবিবাহিত ছিলাম।

এখন আট বছর হল আমি উত্তরাখণ্ডে চলে এসেছি। সিয়েটেলে থাকার সময় যে লোকটার সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছিল তাকে আমি বিয়েও করেছি। আমাদের সংসারে এখন রয়েছে একটা কুকুর, ঝগড়ারত মুরগির ঝাঁক। সেই সঙ্গে রয়েছে  একটা বাগান এবং টুকিটাকি, আজেবাজে জিনিসের স্তূপ বা গাদা।

ছ'মাস আগে আমার পরিবারের সদস্যরা আমায় পরামর্শ দিয়েছে যে আমি যেন আমার মায়ের বাড়ির ঠিকানায় নিজের আধার কার্ড করিয়ে নিই। কারণ যে বাড়িতে আমি গত দশকে এক সপ্তাহের বেশি কখনও থাকিনি, অথচ আপাতভাবে সেই বাড়িটাই হচ্ছে আমার আসল ঠিকানা।

শেষ দশকে আমি আমার জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে একটা জিনিসই শিখেছি যে আমার গায়ে অন্যদের দ্বারা সৃষ্ট যে তকমা লাগানো হয়েছিল তার প্রভাব আমার উপর আদৌ জোড়ালোভাবে পড়েনি।

 

প্রবন্ধটি লিখেছেন চিকু, যিনি জলবিবাদ চুক্তি সংক্রান্ত একটি সংস্থায় কনসালট্যান্ট। তিনি ও তাঁর স্বামী হিমালয় পর্বতবেষ্টিত এক স্থানে একটা ফার্মে থাকেন।

 

এই প্রবন্ধটি দেশান্তর বা স্থানান্তরের প্রভাব কীভাবে আমাদের মানসিক স্বাস্থ্যের উপরে পড়ে সেই বিষয়ের অর্ন্তগত। এই বিষয়ে আরও জানতে পড়ুন-

এই প্রবন্ধটি দেশান্তর বা স্থানান্তরের প্রভাব কীভাবে আমাদের মানসিক স্বাস্থ্যের উপরে পড়ে সেই বিষয়ের অর্ন্তগত। এই বিষয়ে আরও জানতে পড়ুন-

১. কাজের সূত্রে স্থানান্তরিত হওয়ার মানসিক প্রভাবকে আমাদের স্বীকার করা প্রয়োজন - ডঃ সাবিনা রাও 

২. চাকরি সূত্রে স্থানান্তর: কর্মীদের অবস্থান পরিবর্তনের ক্ষেত্রে প্রয়োজন প্রতিষ্ঠানের সাহায্য

৩. Moving was all of these: a challenge, and adventure and an opportunity to learn about myself: Revathi Krishna.         

 

    

  

Was this helpful for you?

প্রস্তাবিত