প্রসব-পরবর্তী অবসাদ নিয়ে আমি অবশ্যই কথা বলব, এ বিষয়ে আমি লজ্জিত নই

যদি আপনি আমার ও আমার বাচ্চার ছবি ফেসবুকে দেখেন তাহলে আপাতদৃষ্টিতে মনে হবে যে গর্ভাবস্থায় আমি খুবই হাসিখুশি ছিলাম এবং প্রসবও হয়েছে একেবারে নিখুঁতভাবে; তা যেন ছিল স্বপ্ন সত্যি হওয়ার মতো ঘটনা।

কিন্তু বাস্তবের ছবিটা মোটেই তেমন ছিল না। প্রসবের আগে গর্ভধারণের একেবারে শেষ পর্যায়ে আমি গুরুতর মানসিক অবসাদের ভুগতে শুরু করি। আবার ঠিক একইভাবে প্রসব-পরবর্তী সময়েও আমার মধ্যে গভীর অবসাদের জন্ম হয় (পিপিডি)।

স্বাভাবিক হতে আমার অনেক সময় লেগে গিয়েছিল। ঠিক একইভাবে ওই অবসাদ নিয়ে আমার লিখতে চাওয়ার সিদ্ধান্ত নিতেও বেশ অনেকটা সময় লেগে গিয়েছিল। আসলে আমি আমার জীবনের এই সত্য ঘটনার কথা আরও পাঁচজনকে জানাতে চেয়ে প্রসব-পরবর্তী অবসাদের বিষয়ে মানুষের সচেতনতা বাড়াতে চেয়েছিলাম। এনিয়ে আমি কোনওরকম লজ্জা বোধ করিনি। পৃথিবীতে যেকোনও মহিলার জীবনেই প্রসব-পরবর্তী অবসাদ দেখা দিতে পারে। কোনও আগাম সতর্কবার্তা না দিয়েই এই সমস্য দেখা দিতে পারে। সেই সঙ্গে সমস্যার মোকাবিলার ক্ষেত্রেও আমরা প্রস্তুত থাকি না।

গর্ভাবস্থার সময়ে আমি সাউথ আফ্রিকায় সফট্‌ওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কাজ করতাম। আমার সমস্যা হওয়ার মতো কোনও কারণই ছিল না। গর্ভধারণের শেষ পর্যায়ে আমি হায়দরাবাদে গিয়েছিলাম এবং ওখানেই আমার বাচ্চার জন্ম হয়। আমার স্বামীও ছুটিতে খুব অল্প সময়ের জন্য আমার সঙ্গে হায়দরাবাদ গিয়েছিলেন। ওখান থেকে খুব তাড়াতাড়ি উনি জোহানেসবার্গ ফিরে যান। আশা ছিল এই সময়টা আমি আনন্দ করে, আরাম করে কাটাব। কারণ আমি খুব উত্তেজিত ছিলাম। কিন্তু  জোহানেসবার্গ থেকে হায়দরাবাদে যেতে গিয়ে আমি খুব ক্লান্ত ও অবসন্ন হয়ে পড়ি। একমাসের কাছাকছি সময় আমি একদমই ভালো ছিলাম না।

বাবা-মায়ের কাছে থাকার সময়েই আমার মধ্যে অবসাদ দানা বাঁধে। ঘুম কম হওয়ার জন্য আমি হতাশায় ভুগতে শুরু করি। ঘুম না আসার জন্য আমি মাঝেমাঝে অবাক হয়ে যেতাম। বাড়িতে আমার খুব একঘেয়ে লাগত। গাড়ি চালানো না জানার জন্য আমি বাড়ির বাইরে বেরোতে পারতাম না; পরিবেশের বদল ও শহরের যান নিয়ন্ত্রণের নিয়মকানুন না জানার জন্য আমি প্রায় ঘরবন্দি হয়ে গিয়েছিলাম। আমার সক্ষমতা, খিদে ক্রমশ কমে যাচ্ছিল। কিন্তু আমি ভেবেছিলাম যে এই সমস্যাগুলো হরমোনের জন্য হচ্ছে এবং সেগুলো খুবই স্বাভাবিক। আমার গর্ভধারণের যখন আট মাস চলছিল তখন আমি উপলব্ধি করলাম যে সমস্যাগুলো হরমোনের জন্য হলেও, তা স্বাভাবিক নয়।

আমার মন যে আর আমার নিয়ন্ত্রণে থাকছে না তা ক্রমশ আমি বোধ করতে শুরু করলাম। আমার নিজেকে অন্যরকম মানুষ বলে মনে হতে লাগল; সেই সময়কার 'আমার' সঙ্গে প্রকৃত 'আমি'-র কোনও মিল ছিল না। আমি বুঝতে পারলাম আমার সঙ্গে অন্যরকম একটা কিছু ঘটছে, তবে তা আটকানোর ক্ষমতা আমার ছিল না। আমি ঘুমাতে পারতাম না, খেতে পারতাম না, সবসময়ে অস্থির, অধীর ও বিষণ্ণ হয়ে থাকতাম এবং কিছুতেই বুঝতে পারতাম না যে কেন এসব হচ্ছে। স্বামীর থেকে দূরে থাকার জন্য এই সময়ে আমার মধ্যে একপ্রকার নিরাপত্তাহীনতার বোধ হচ্ছিল। এভাবে যখন পরিস্থিতি একেবারে সহ্যের বাইরে বেরিয়ে গেল তখন আমি আমার দাই-এর কাছে সব ঘটনা খুলে বললাম। সেই সময় আমার মধ্যে শুধু যে মানসিক এবং অনুভূতিগত সমস্যাই ছিল, তা নয়। শারীরিক অসুবিধাও দেখা দিচ্ছিল। হাত, পায়ের স্নায়ুগুলো দুর্বল হয়ে যাওয়ার জন্য আমি ঠিকমতো দাঁড়াতে বা দৈনন্দিন কাজকর্ম করতে পারতাম না। বিছানা থেকে ওঠবার শক্তি ছিল না এবং নিজের পরিচর্যাও করতে পারতাম না।

আমরা অধিকাংশ মানুষজনই মনে করি যে গর্ভধারণ এবং সন্তানের জন্ম দেওয়া  একজন মহিলার জীবনে খুবই সুখের অনুভূতি। যদি এর বিপরীত কিছু ঘটে তাহলেই কেউ আর এই বিষয়ে মুখ খুলতে চায় না। আসলে আমরা ভাবি যে অসহায় মহিলা হিসেবে সমাজ আমাদের উপর অকারণ সহানুভূতিশীল হয়ে পড়বে। তাই আমরা নিজের অনুভূতিগুলোকে নিজের মধ্যেই লুকিয়ে রাখি।

কিন্তু আমি তা করতে চাইনি। আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম যে আমার দাইকে আমার সমস্যার কথা বলব। দাই খুবই দয়ালু প্রকৃতির ছিলেন এবং আমার কথা শুনে আমাকে আশ্বস্ত করেছিলেন। আমি যে সাহস করে আমার সমস্যার কথা তাঁকে বলতে পেরেছি তার জন্য উনি আমার অনেক প্রশংসা করেছিলেন। কারণ বেশিরভাগ মহিলাই নিজের সমস্যার কথা কাউকে খুলে বলতে পারে না। দাই জানিয়েছিলেন প্রসব-পরবর্তী অবসাদ বা পিপিডি এমন এক সমস্যা যা ৮০ শতাংশ সন্তানসম্ভবা মহিলারই হয়ে থাকে ভিন্ন ভিন্ন মাত্রায়। আমি এটাও বুঝতে পারিনি  আমার মধ্যে যে প্রসব-পূর্ববর্তী অবসাদ দেখা দিয়েছিল, তাও অধিকাংশ মহিলার মধ্যেই দেখা যায়।

রোগ নির্ণয়ের ব্যাপারে আমার মা সম্পূর্ণ অপ্রস্তুত ছিল। আমার আচরণের পরিবর্তন বোঝার জন্য মাকে অনেক লড়াই করতে হয়েছিল। আসলে মা তার জীবনে এ ঘটনা আগে কখনও ঘটতে দেখেনি বা শোনেনি। মায়ের এই বোঝার অভাব আমাকে ক্রমশ হতাশ করে তুলছিল।

আমি হাসিখুশি থাকতে চেয়েছিলাম এবং সাদরে সন্তানের জন্ম দিতে চেয়েছিলাম। সেই সময়ে আমার যা অবস্থা ছিল তাতে কীভাবে আমি আমার সদ্যোজাত সন্তানের দেখভাল করব তা ভেবে সাংঘাতিক ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। তবে সেই ভয়ের কোনও কারণই ছিল না। কারণ আমার স্বামী রবি সব কাজ আগেভাগে শেষ করে তাড়াতাড়ি আমার কাছে ফিরে এসেছিল। কিন্তু আমার পাশে সেই সময়ে কে থাকল বা কে কী বলল তা নিয়ে আমার কোনও মাথাব্যথাই ছিল না। কারণ আমার খুবই দুরবস্থা ছিল। ছোটখাটো বিষয় নিয়ে আমার অহেতুক ভয় হত; এমন অনেক ঘটনা ঘটেছিল যেখানে কয়েক মিনিট আমার কোনও বোধবুদ্ধিই কাজ করেনি।

আমি একটা নিখাদ প্রসব-অভিজ্ঞতা লাভ করতে চেয়েছিলাম। এজন্য আমি কোনও ওষুধ খাইনি। কিন্তু মানসিকভাবে আমি অন্যরকম আচরণ করেছিলাম। তখন আমার দাই আমাকে পরামর্শ দিয়েছিল একজন ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্টের সঙ্গে যোগাযোগ করতে। দুর্ভাগ্যবশত, তিনি যাঁর কথা বলেছিলেন তিনি সেই সময়ে শহরে ছিলেন না। তাই আমি অন্য আরেকজন বয়স্ক মনোরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে গিয়েছিলাম।

সেই সময়ে আমি বাচ্চাকে বুকের দুধ খাওয়াচ্ছিলাম এবং আমার শরীরও ক্রমশ সুস্থ হচ্ছিল। কিন্তু আমি তবুও মনোবিদের সঙ্গে পরামর্শ করেছিলাম। তিনি আমার কথা শুনে কতগুলো মনস্তাত্ত্বিক পরীক্ষানিরীক্ষা করেছিলেন। আমি পরীক্ষা করার সময়ে গাড়িতে মায়ের কাছে আমার বাচ্চাকে রেখে গিয়েছিলাম। মাঝে মাঝে এসে তাকে বুকের দুধ খাওয়াচ্ছিলাম।

চিকিৎসার বিষয়ে আমার কোনও ধারণাই ছিল না। কিন্তু ডাক্তারের কাছে গেলেই যেন মনটা বিষণ্ণ হয়ে যায়। সেই সময়ে আমার প্রসব-পরবর্তী মানসিক অবসাদ নামক একটা অসুখ ধরা পড়ে। দুটো পর্যায়ে ডাক্তার আমাকে পেশি শিথিল রাখতে সুপারিশ করেন। সেটা অনেকটা যোগ ব্যায়ামের মতো কৌশল ছিল। আমি তাঁর কাছে প্রায় ভিক্ষে করেছিলাম আমাকে ওষুধ দিয়ে সুস্থ করতে। কিন্তু যেহেতু আমি  বাচ্চাকে বুকের দুধ খাওয়াচ্ছিলাম সেই সময়ে তাই তিনি আমার অনুরোধ রাখেননি। তিনি আমাকে বলেছিলেন ঈশ্বরের কাছ থেকে পাওয়া শাস্তি হিসেবে যেন  আমি এটাকে মেনে নিই এবং এই পরিস্থিতি ৬ মাসের জন্য সহ্য করি। তিনি আমায় বলেছিলেন নিজের ব্যথা-বেদনা দূর করার চেয়ে মায়ের কর্তব্য পালন করা আমার পক্ষে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সেই সঙ্গে বলেছিলেন যে, যদি তাঁর চিকিৎসায় আমি কোনও সুফল না পাই তাহলে ৬ মাস পরে যেন আবার তাঁর কাছে যাই।

আমি খুবই হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়ছিলাম। আমার ব্যথা-বেদনা সেই সময়ে এতটাই গভীর ছিল যে আমি সবকিছু ছেড়ে দিয়ে চলে যেতে চাইতাম। কিন্তু ওষুধ খেতেও  ভয় লাগত। ভাবতাম যে যদি একবার ওষুধ খেতে শুরু করি তাহলে আমার জীবনে আরও দুর্যোগ ঘনিয়ে আসবে। আমি চিন্তা করতাম যে ওষুধ খেয়ে যদি আমি অলস হয়ে যাই তাহলে আমার মেয়ের যত্ন করতে পারব না। তাই আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম যে কঠিন উপায়ে হলেও আমি স্বাভাবিকভাবেই সুস্থ হব। যে সব মায়েরা বাচ্চাকে বুকের দুধ খাওয়ায় তাদের পক্ষে নিরাপদ ওষুধের অস্তিত্ব যে কতখানি প্রয়োজন তা আমি সাউথ আফ্রিকা ফিরে যাওয়ার পরে বুঝেছিলাম। যখন এসব নিয়ে আমি এখন চিন্তা করি তখন মনে হয় যদি আমি ওষুধ খেতাম তাহলে আমার সমস্যা দূর হওয়াটা কত সহজ হয়ে যেত।

আমাদের সমাজে মেয়েদের গর্ভধারণের সময়কে খুবই আনন্দের বলে মনে করা হয়। কিন্তু গর্ভধারণ যে একজন মহিলাকে তার দায়িত্ব সম্পর্কে কতটা উদ্বিগ্ন করে তোলে, সে বিষয়টাকে আমরা তেমনভাবে স্বীকার করি না। অনেকসময়ে এর ফলে মানসিক চাপ অত্যন্ত বেশি থাকে। অনেক মহিলার মধ্যেই প্রসব-পূর্ববর্তী ও প্রসব-পরবর্তী অবসাদ জন্মাতে দেখা যায়; কিন্তু কলঙ্কের ভয়ে সবাই ডাক্তারের কাছে যেতে চায় না। কিন্তু আমি ডাক্তার দেখিয়েছিলাম। তবু আমার সেই সময়ের অভিজ্ঞতা খুবই ভয়াবহ ছিল। আমি সম্পূর্ণ অসহায় ছিলাম এবং প্রয়োজন থাকলেও কারোর সাহায্য নিতে চাইতাম না।

বাচ্চা জন্ম দেওয়ার দেড় বছরের মধ্যে আমি সুস্থ হয়ে উঠেছিলাম। আমার কাছে ওই লড়াইটা ছিল এক দীর্ঘ, কঠিন এবং চ্যালেঞ্জিং কাজ। একবার আমি ভেবেছিলাম আমার সেই অভিজ্ঞতার কথা কারোর সঙ্গে ভাগ করে নেব না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমি নিজের জীবনের লড়াইয়ের কাহিনি প্রকাশ্যে বলার সাহস পেলাম। কারণ আমি চেয়েছিলাম আমার অভিজ্ঞতা যাতে অন্যদের সাহায্য করে। তারা এই অসুখ সম্পর্কে সচেতন হয়ে ওঠে।

এই প্রবন্ধের লেখক পূর্ণা কৌমুদি ভোগেটি একজন সফট্‌ওয়্যার বিশেষজ্ঞ। ইনি সাউথ আফ্রিকার জোহানেসবার্গে থাকেন। শিল্পকলা, ব্লগ লেখা এবং সঙ্গীতের প্রতি তাঁর আগ্রহ রয়েছে।       

   

প্রস্তাবিত