শ্বাস-প্রশ্বাসজনিত ব্যায়ামের কেন প্রয়োজন?

ডাঃ গরিমা শ্রীবাস্তব

আমরা তো সব সময়েই নিশ্বাস নিচ্ছি, ছাড়ছি। কিন্তু শ্বাস-প্রশ্বাস প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে আমরা কি খুব সচেতন থাকি? যদি থাকতাম তাহলে আমরা আরও অনেক বেশি সুস্থ থাকতে পারতাম। সাধারণত দুই ভাবে মানুষের শ্বাস-প্রশ্বাস ক্রিয়া চলে। কেউ কেউ বুক ভরে শ্বাস নেয়। এই সময় তাদের বুক উপরের দিকে ওঠে এবং শ্বাস ছাড়ার সময়ে বুক আবার নীচের দিকে নেমে যায়। এই প্রক্রিয়া খুব তাড়াতাড়ি এবং  অল্প সময়ের মধ্যেই সম্পন্ন হয়। যখন মানুষ কোনও কারণে টেনশনে থাকে, তখন এই বুক দিয়ে শ্বাস নেওয়া ও ছাড়ার গতি অনেক বেড়ে যায় এবং তার পরিমাণ  কমে যায়। যদি কেউ একটি ঘুমন্ত বাচ্চার নিশ্বাস নেওয়া ও ছাড়া লক্ষ্য করে, তাহলে দেখবে যে, প্রত্যেকবার শ্বাস গ্রহণ এবং বর্জনের সময় বাচ্চাটির পেট একবার বাইরের দিকে বেরোচ্ছে আবার তা ভিতরের দিকে ঢুকে যাচ্ছে। একে অ্যাবডোমিনাল বা ডায়াফ্র্যাগম্যাটিক বা বেল্লি ব্রিদিং বলা হয়। এই ধরনের শ্বাস-প্রশ্বাস প্রক্রিয়ায় ডায়াফ্র্যাগম্‌ নামক পেশি, যা বুক এবং পাকস্থলীর সংযোগস্থলে অবস্থিত, তা ব্যবহৃত হয়। অ্যাবডোমিনাল বা ডায়াফ্র্যাগমাল শ্বাস-প্রশ্বাস ক্রিয়া সাধারণত পরিপূর্ণ এবং গভীর একপ্রকার প্রক্রিয়া। এর প্রক্রিয়া আমাদের শুধু স্বস্তিই দেয় না, এর মাধ্যমে আমাদের ফুসফুসেও বিশুদ্ধ বাতাস ঢোকে।

অ্যাবডোমিনাল ব্রিদিং

শরীরচর্চার মধ্য দিয়ে একজন মানুষ তার শ্বাস নেওয়া ও ছাড়ার পদ্ধতিতে বদল ঘটাতে পারে। অত্যন্ত সচেতনভাবেই সে বুক দিয়ে শ্বাস-প্রশ্বাস ক্রিয়া চালানোর পরিবর্তে অ্যাবডোমিনাল ব্রিদিং-এ অভ্যস্ত হয়ে উঠতে পারে। এই ধরনের ব্যায়াম নিয়মিত অনুশীলনের মধ্য দিয়ে ক্রমশ কার্যকরী হয়ে ওঠে। কেউ যদি মোটামুটি ৩ মিনিট ধরে গভীরভাবে শ্বাস নেওয়া-ছাড়ার প্রক্রিয়া চালায়, তাহলে তার শ্বাস-প্রশ্বাসগত সমস্যা অনেকটাই কমে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। গবেষণায় দেখা গিয়েছে যে, প্রত্যেকদিন ৩ থেকে ৫ মিনিট অ্যাবডোমিনাল ব্রিদিং-এর অনুশীলন করলে তা আমাদের সামগ্রিক শ্বাস-প্রশ্বাস ক্রিয়ার উন্নতি ঘটাতে বিশেষভাবে সাহায্য করে।

অ্যাবডোমিনাল ব্রিদিং ডায়াফ্র্যাগম্‌-এর শক্তি বৃদ্ধিতে সাহায্য করে। মস্তিষ্কে অক্সিজেনের জোগান বাড়ায় এবং এর ফলে মানুষ স্বস্তি ও আরাম বোধ করে। যদি কেউ চেস্ট ব্রিদিং-এর পরিবর্তে অ্যাবডোমিনাল ব্রিদিং-এ অভ্যস্ত হতে চায়, তাহলে তাকে কিছুটা সময় ব্যয় করতে হবে। তবে নিয়মিত প্রচেষ্টার মধ্য দিয়ে যখন একজন অ্যাবডোমিনাল ব্রিদিং রপ্ত করতে পারবে, তখন তার শরীর এবং মনের জড়তা ও চাপ কেটে গিয়ে সে অনেকটাই সুস্থ বোধ করবে।

অনুশীলনের ধাপগুলি হল—

১। মনের টেনশনের দিকে নজর রেখে একটা শান্ত, নিরিবিলি জায়গায় বসে একটি  হাত পাঁজরের নীচে ডানদিকে পেটের উপর রাখতে হবে।

২। নাক দিয়ে আস্তে আস্তে নিশ্বাস নিয়ে আবার তা ছাড়তে হবে। হাত পেটের উপরেই থাকবে। এই সময় বুকের অংশটি ধীরভাবে নাড়াচাড়া করবে এবং শ্বাস নেওয়ার সময় পেটের অংশটির চলাচল বিস্তার লাভ করবে।

৩। একবার লম্বা শ্বাস টানার পরে কয়েক মুহূর্ত থামতে হবে। এরপর নাক অথবা মুখ দিয়ে শ্বাস বাইরে ছাড়তে হবে। ভালোভাবে নিশ্বাস ছাড়ার বিষয়টি এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এইভাবে লক্ষ্য করা যাবে যে, পেট অনেক নরম এবং ভিতরের দিকে ঢুকে যাচ্ছে।

৪। এইভাবে কয়েকবার অ্যাবডোমিনাল ব্রিদিং চালাতে হবে। ধীরে ধীরে একবার শ্বাস নিয়ে তা আবার ছাড়ার মাধ্যমে শ্বাস-প্রশ্বাস ক্রিয়ায় একপ্রকার নমনীয়তা আসবে। প্রত্যেকবার শ্বাস নেওয়া এবং ছাড়ার আগে ৪ গুনতে হবে। মনে রাখা জরুরি যে, একবার শ্বাস নেওয়া-ছাড়ার পর কয়েক মুহূর্ত বিশ্রাম নিয়ে আবার তা করতে হবে। এইভাবে দশবার শ্বাস-প্রশ্বাস ক্রিয়া চালাতে হবে।

৫। এইভাবে নিয়মিত এই ব্যায়াম অনুশীলনে অভ্যস্ত হয়ে ওঠা প্রয়োজন। এটা খুবই সহজ ব্যায়াম এবং একবার এটি রপ্ত করতে পারলে মানুষ খুব সচেতনভাবে হাঁটার সময়, পরীক্ষার হলে ঢুকে বা অন্যান্য সময়েও এই ব্যায়াম করতে সক্ষম হয়। দিনে পাঁচ মিনিট এই ব্যায়াম করলে মানসিক চাপ কমে এবং শরীর-স্বাস্থ্য
সুস্থ থাকে।

স্থিরভাবে শ্বাস-প্রশ্বাসজনিত ব্যায়ামের চর্চা—

প্রাচীনকালে যোগসাধনার ক্ষেত্রে এহেন শ্বাস-প্রশ্বাসজনিত ব্যায়ামের অনুশীলন নিয়মিত করা হত। অ্যাবডোমিনাল ব্রিদিং-এর কৌশলও সেই সময়ে প্রচলিত ছিল। এর সাহায্যে মানুষ তার শরীর এবং মনের নানা সমস্যা কাটিয়ে সুস্থ সবল হয়ে বাঁচতে পারে। এই ব্যায়াম অনুশীলনের পর্যায়গুলি হল—

১। এমন শান্ত জায়গা বাছতে হবে যেখানে হই-হট্টগোল নেই। হাত পেটের উপরে রেখে কাঁধ এবং বুকের অংশ শিথিল করে রাখতে হবে। নাক দিয়ে আস্তে আস্তে শ্বাস নিতে হবে এবং পেট উপরের দিকে ওঠা পর্যন্ত শ্বাস টেনে রাখতে হবে। এই অবস্থায় ৫ গুনতে হবে।

২। এরপর কিছুক্ষণ থেমে আবার ৫ গুনে শ্বাস-প্রশ্বাস ক্রিয়া চালাতে হবে।

৩। নাক বা মুখ দিয়ে শ্বাস বাইরে ছাড়তে হবে। এইক্ষেত্রে নিশ্বাস পুরোপুরি বাইরে বের করা জরুরি।

৪। হাওয়া পুরো বাইরে বের করে দেওয়ার পর পেট অনেক নরম এবং ভিতরের দিকে ঢুকে যায়। দুবার এইভাবে স্বাভাবিক ছন্দে শ্বাস গ্রহণ এবং বর্জন করতে হবে। তারপর কিছুক্ষণ থেমে আবার একই প্রক্রিয়া প্রথম থেকে শুরু করতে হবে।

৫। এইভাবে ৩ থেকে ৫ মিনিট ক্রমাগত দশ বার এই ব্যায়াম অনুশীলন করা  জরুরি। অনুশীলনের মাধ্যমে আস্তে আস্তে মানুষের নিশ্বাস ছাড়ার গতি শ্বাস নেওয়ার গতির থেকে সামান্য বেড়ে যায়। এহেন অভ্যাস নিয়মিত বজায় রাখার মধ্য দিয়ে মানুষের ইতিবাচক মানসিকতা গড়ে ওঠে, চিন্তাভাবনায় স্বচ্ছতা আসে এবং সামগ্রিকভাবে শরীর সুস্থ থাকে।

প্রত্যেকবার শ্বাস ছাড়ার সময়ে একজন মানুষের উচিত ইতিবাচক মনোভাব, সুচিন্তাভাবনায় সমৃদ্ধ হওয়া। প্রতিনিয়ত এই অভ্যাস অনুশীলনের মধ্য দিয়ে  একজন মানুষ শরীরে এবং মনের দিক থেকে সুস্থ-সবল ও সতেজ হয়ে উঠবে—
এটাই কাম্য।

সূত্রঃ

Cooper S, Oborne J, Newton FS. Effect of two breathing exercises (Buteyko and pranayama) in asthma: a randomised controlled trial. Thorax 2003; 58: 674-679.

http://vsac.ca/wp-content/uploads/2014/03/Deep-Breathing-CD.pdf.