কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য: আমার মানসিক চাপের বিষয়ে সংস্থার ম্যানেজারের কাছে বলা কি যুক্তিযুক্ত?

প্রতিদিন কর্মক্ষেত্রে বহু কর্মীকে নানারকম ঘটনার মোকাবিলা করতে গিয়ে মানসিক চাপের মধ্যে দিন কাটাতে হয়। যেমন- নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করা, কাজ সংক্রান্ত বিষয়ে নানা জায়গায় ঘুরে বেড়ানো, বাড়তি কাজের বোঝা এবং অফিসের পরিবেশজনিত সমস্যা প্রভৃতি। মানুষের মানসিক সুস্থতার উপর এসব ঘটনার গভীর প্রভাব পড়ে।

কাজের জায়গায় অনেক মানুষ তাদের অনুভূতিগত সমস্যার কথা নিজেদের সহকর্মীদের সঙ্গে ভাগ করে নিতে চায় না। কারণ তাদের ভয় হয় এই ভেবে যে তারা অন্যদের কাছে হাসির খোরাক হয়ে উঠবে, অন্যের মতামতের উপর তাদের নির্ভর করতে হবে, অন্যদের চোখে তারা দুর্বল বলে চিহ্নিত হবে প্রভৃতি। এছাড়াও তাদের ব্যক্তিগত তথ্য অন্যদের কাছে পৌঁছে যাবে এটা ভেবেও তারা চিন্তিত থাকে। অন্যদিকে, নিজেদের মানসিক বিপর্যয় চিহ্নিত না হওয়ার জন্য তার প্রভাব তাদের কর্মজীবনে পড়ে। ফলে কাজের দক্ষতার নিরিখে কর্মীদের উৎপাদনশীলতা, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা এবং বোধগম্যতা হ্রাস পায়।

যদি কেউ এ কারণে দিশাহারা বোধ করে এবং কার্যক্ষেত্রে নিজের সেরা দক্ষতা দেখাতে না পারে তাহলে তার উচিত নিজের সমস্যা নিয়ে অন্যদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করা। এখানে এবিষয়ে কয়েকটি স্বাভাবিক প্রশ্ন ও উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।

কারোর সাহায্য নেওয়ার প্রয়োজন নেই আমার। আমি নিজেই আমার সমস্যার মোকাবিলা করতে পারব। কী মনে হয় আমি পারব না?

আমাদের প্রত্যেকের জীবনেই কিছু কিছু ক্ষেত্রে অন্যের সহায়তার প্রয়োজন পড়ে। যদি কারোর সামান্য জ্বর বা গায়ে ব্যথা হয় তাহলে একজন মানুষ বিশ্রাম ও যথাযথ খাবারদাবার খেয়ে সেই সমস্যার মোকাবিলা করতে পারে। যদি সমস্যা লাগাতার ও ক্রমশ গভীর হতে থাকে তখন চিকিৎসা এবং ওষুধ খাওয়ার দরকার হয়। মানসিক স্বাস্থ্যের সুরক্ষার ক্ষেত্রেও এই একই ঘটনা ঘটে। এক্ষেত্রে নিজের যত্ন নিয়ে জীবনযাত্রার ধরনে পরিবর্তন আনা যেতে পারে এবং পরিস্থতির উপরে কিছুটা  নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়। কিন্তু সমস্যা যদি লাগাতার চলতেই থাকে তাহলে বিরূপ পরিস্থিতির মোকাবিলার জন্য পারিপার্শ্বিক সাহায্যের প্রয়োজন পড়ে।

কাজের জায়গায় মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কীভাবে কথা বললে তা থেকে আমি উপকার বা সাহায্য পাতে পারি? এক্ষেত্রে আমি কর্মক্ষেত্রের বাইরের সাহায্য নিতে পারব কি?

আমরা দিনের একটা বড় সময় কাজের মধ্য দিয়ে কাটাই। তাই যে পরিবেশে আমরা কাজ করছি তার প্রভাব আমাদের মানসিক স্বাস্থ্যের উপরে পড়ে। তাই যদি কারোর অফিসের ম্যানেজার বেশ সহযোগী মনোভাবাপন্ন হয় তাহলে সেই কর্মীর পক্ষে কর্মক্ষেত্রে একপ্রকার বাস্তবসম্মত মানসিক সহায়তা পাওয়া সম্ভবপর হয়। যদি অফিসের কোনও কর্মচারীর নির্দিষ্ট কিছু সাহায্যের প্রয়োজন হয়, যেমন- কাজের সময়গত নমনীয়তা, সাপ্তাহিক ছুটির দিন বা কাজের পুর্নমূল্যায়ন করে কাজ ও জীবনযাপনের মধ্যে ভারসাম্য জোরদার করা প্রভৃতি তাহলে এসব অনুরোধ অফিসের ম্যানেজারের সামনে কর্মীদের পক্ষে তুলে ধরা সহজসাধ্য হবে। অন্যদিকে কর্মীদের অনুরোধের বিষয়গুলো ম্যানেজারকেও বুঝতে হবে। তাই কর্মক্ষেত্রে এহেন  পারস্পরিক কথপোকথনের সুযোগ রয়েছে কিনা তা একজন কর্মীর খতিয়ে
দেখা প্রয়োজন।

সাহায্য পাওয়ার ক্ষেত্রে কী কী রাস্তা খোলা রয়েছে আমার সামনে?

প্রথমে কর্মক্ষেত্রে সাহায্যের জন্য সহকর্মীদের কাছে যাওয়াই জরুরি। বিশেষ করে  কোনও সহকর্মীর সঙ্গে যদি সম্পর্ক খুব ভালো থাকে তাহলে তার সঙ্গেই আগে কথা বলার চেষ্টা করা উচিত। এর বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে কর্মীরা অফিসের ম্যানেজারের সঙ্গেও কথা বলতে পারে। যদি কারোর মনে হয় সহকর্মী বা ম্যানেজার সাহায্য করার ক্ষেত্রে অক্ষম তাহলে মানবসম্পদ বিভাগের অফিসারের সঙ্গে কথা বলা ভালো। এক্ষেত্রে কয়েকটি সংস্থা ইএপি বা এমপ্লয়ি অ্যাসিস্ট্যান্স প্রোগ্রামের ব্যবস্থা করে, যেখানে মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হয়। সেই সঙ্গে থাকতে পারেন প্রশিক্ষিত কাউন্সেলরও।

কিন্তু মানসিক বিপর্যয়ের কথা ম্যানেজারের কাছে বললে কি সত্যিই ভালো ফল পাওয়া যায়?

এটা নির্ভর করে ম্যানেজারের সঙ্গে কর্মীদের অন্তরঙ্গতা বা ম্যানেজারের সহানুভূতিশীল ভাবমূর্তির উপর। দেখতে হবে কর্মীদের মানসিক বিপর্যয়ের মোকাবিলা ম্যানেজার দক্ষতার সঙ্গে করতে পারছে কিনা, ম্যানেজার কর্মীদের সমস্যার কথা মন দিয়ে শুনছে কিনা বা তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল কিনা তা দেখাও জরুরি। কীভাবে ম্যানেজার বিরূপ পরিবেশের মোকাবিলা করছে বা কর্মীদের ব্যক্তিগত তথ্য যা তারা ম্যানেজারের সঙ্গে ভাগ করে নিচ্ছে তা কতটা সুরক্ষিত বা বিশ্বাসযোগ্য হচ্ছে সেটা বোঝাও প্রয়োজন। প্রায়শই প্রতিষ্ঠানের নিয়ম-নীতি মেনেই ম্যানেজাররা এধরনের সমস্যার সমাধান করতে চায়। তাই যদি কর্মীদের মানসিক স্বাস্থ্যের সমস্যার মোকাবিলা করা একটা সংস্থার কাছে গ্রহণযোগ্য নীতি হিসেবে  বিবেচিত হয় এবং ম্যানেজারও সেই নীতি মানতে বাধ্য থাকে তাহলে ম্যানেজারের কার্যকলাপে কর্মীদের সমস্যা সমাধানের জন্য সহানুভূতি এবং সহযোগিতা অবশ্যই প্রকাশ পাবে।

যদি আমার কর্মক্ষেত্রে আমাকে সাহায্য করার জন্য পর্যাপ্ত ব্যবস্থা বা উপায় না থাকে?

অনেকসময়েই কর্মক্ষেত্রে কর্মীদের নিজস্ব মানসিক বিপর্যয়ের কথা বলার মতো জায়গাই থাকে না; এবং কর্মীরাও মনে করে যে বিপর্যয়ের কথ বললে নিজেদের দুর্বলতা এবং অক্ষমতাই জনসমক্ষে প্রকাশ পাবে। একটা আদর্শ প্রতিষ্ঠানে কর্মীদের মানসিক বিপর্যয়ের কথা বলার জন্য অনেক রাস্তা খোলা থাকা উচিত এবং একটা সংস্থার দায়িত্ব হল কর্মীদের জন্য এধরনের কথপোকথনের সুযোগ তৈরি করে দেওয়া। যদি কোনও কর্মী বোঝে যে তার সমস্যার মোকাবিলা সংস্থা করতে পারছে না তাহলে কর্মক্ষেত্রের বাইরে একজন বিশেষজ্ঞের সঙ্গে আলোচনা করা জরুরি। নীচে একজন কর্মীর জন্য প্রতিষ্ঠানের করণীয় সহায়তার বিষয়গুলো তুলে
ধরা হল-

  • কাছের মানুষের সমস্যা সমাধানের মতো পদক্ষেপ করতে হবে। এছাড়া কর্মীদের সঙ্গে তাদের গুরুতর মানসিক স্বাস্থ্য সংক্রান্ত সমস্যার বিষয়ে অনবরত কথাবার্তা বলতে হবে
  • সংস্থার পক্ষ থেকে নেওয়া নানারকম ব্যবস্থার দ্বারা কর্মীদের গুরুত্বপূর্ণ মানসিক অসুখ এবং তার নিরাময়ের জন্য দীর্ঘ আলাপ-আলোচনা করা জরুরি
  • কর্মীদের সহায়তা করার জন্য নানাবিধ রাস্তা খুলে রাখা দরকার

এই প্রবন্ধটি লেখার জন্য ব্যাঙ্গালোরের ওয়ার্কপ্লেস অপশনের ক্লিনিক্যাল হেড মল্লিকা শর্মা এবং মুম্বইয়ের আইকল সাইকোসোশ্যাল হেল্পলাইন প্রোগ্রামের সহযোগী কর্মী তনুজা ভাবরের সাহায্য নেওয়া হয়েছে।