We use cookies to help you find the right information on mental health on our website. If you continue to use this site, you consent to our use of cookies.

ভারতে ক্রনিক পেন সাপোর্ট গ্রুপের প্রয়োজনীয়তা অত্যন্ত বেশি

যেকোনও ব্যথা বা যন্ত্রণা যখন তিনমাসের বেশি স্থায়ী হয় তখন তাকে ক্রনিক বা দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা বলা হয়। কোনও আঘাত, ভুল চিকিৎসা বা অন্যান্য অসুস্থতার কারণে এরকম ব্যথা দেখা দেয়। যেখানে এই ব্যথা কোনও একটি বিশেষ অসুস্থতা বা চোখে দেখা যায় এমন আঘাতের সঙ্গে যুক্ত থাকে না সেখানে ডাক্তাররা এই ব্যথার সমস্যাটিকে একপ্রকার উড়িয়ে দেন বা গুরুত্ব দিতে চান না এবং তাঁরা মনে করেন এই সমস্যা রুগিদের সম্পূর্ণ কল্পনাপ্রসূত। লাগাতার ব্যথা বা যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাওয়া অনেক রুগিকে ভুল রোগ নির্ধারণের এক দীর্ঘ ও নির্জন পথের বাধা পেরোতে হয়। এসব ক্ষেত্রে প্রায়শই সঠিক রোগ নির্ধারণ করতে অনেক সময় লেগে যায় এবং কীভাবে সমস্যার মোকাবিলা করা সম্ভব তা বুঝতেও দেরি হয়।

অদৃশ্য অসুস্থতা, যার সঙ্গে আবার শারীরিক দুর্ভোগ যুক্ত থাকে, সেক্ষেত্রে রুগির মধ্যে একপ্রকার বিচ্ছিন্নতা বা একাকিত্বের বোধ জেগে ওঠে; তার চারপাশে থাকা মানুষজন বুঝতেই পারে না যে সে আসলে কী অবস্থার মধ্য দিয়ে দিন কাটাচ্ছে। এর সঙ্গে যখন ব্যথা বা যন্ত্রণা সঙ্গী হয় তখন মানুষ দুঃখ, হতাশা এবং অবসাদে দিশাহারা হয়ে পড়ে। তখন নিজেকে এর থেকে দূরে রাখা খুব কঠিন হয়।

ভারতে অল্পবয়সি ছেলে-মেয়েদের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা বা যন্ত্রণার সমস্যা ক্রমশই  বেড়ে চলেছে। যখন পরিবারের সদস্য, বন্ধুবান্ধব বা ডাক্তারদের তাদেরকে সাহায্য  করার মতো আর কিছুই থাকে না তখন এই রোগ থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য রুগিরা অনলাইনের মাধ্যমে অন্যান্য মানুষের সমর্থন ও পারস্পরিক নির্ভরতার সন্ধান করে।

ক্রনিক পেন ইন্ডিয়া এমনই একটি সাপোর্ট গ্রুপ বা সমর্থনকারী দল যারা যেসব  মানুষ দীর্ঘস্থায়ী ব্যথার সমস্যা নিয়ে দিন কাটাচ্ছে তাদের ব্যক্তিগত জীবনের কথা এবং তাদের সমস্যাজনিত সুবিধা-অসুবিধা নিয়ে আলাপ-আলোচনা করে।

টুইটারের মাধ্যমে এই দল প্রথম তাদের কাজ শুরু করেছিল। ডঃ অনুভা মহাজনের নেতৃত্বে এই কাজ শুরু হয় ২০১৬ সালের মার্চ মাসে। ডঃ মহাজন দিল্লির ফরিদাবাদের একজন দন্ত চিকিৎসক। এক ডাক্তারের ভুল চিকিৎসার কারণে তিনি কমপ্লেক্স রিজিওনাল পেন সিনড্রোম এবং সেন্ট্রালাইজড্‌ পেন সিনড্রোমে ভুগছিলেন। ক্রনিক পেন ইন্ডিয়ার ওয়েবসাইটে তিনি তাঁর সমস্যার কথা জানানোর সময় দেখেন যে অন্য একজন মহিলা যিনি তাঁর দীর্ঘস্থায়ী ব্যথার কথা এই ওয়েবসাইটে জানিয়ে কীভাবে অন্যান্য মানুষের সঙ্গে নিজের সমস্যা নিয়ে আলোচনা করছেন এবং এর ফলে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গীরও গুরুতর বদল ঘটছে।

এই প্রসঙ্গে ডঃ মহাজন বলেছেন, ''এই ঘটনার পর আমি এটা জেনে খুব অবাক হয়েছিলাম যে আমার মতো আরও অনেক মানুষ এই দেশে রয়েছে, আমারই মতো তারা মানসিক ও শারীরিক সমস্যা নিয়ে লড়াই করছে।'' তিনি আরও বলেছেন, ''একাকিত্বকে ঠিক বুঝিয়ে বলা যায় না, তবে তা জীবনের সঙ্গেই এগিয়ে চলে।''

সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গিয়েছে (এই গবেষণায় অডিয়েন্স স্যাম্পলের আয়তন ৮৩৬), ভারতে দীর্ঘস্থায়ী ব্যথার সমস্যা ১৯.৩ শতাংশ হারে বিস্তার লাভ করেছে; এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় ভারতে এই হারের মাত্রা বেশি।

বহু মানুষ ক্রনিক পেন ইন্ডিয়া গ্রুপের সদস্য হয়েছে (ফেসবুকে এই গ্রুপের সদস্য ১০৬ জন)। ডঃ মহাজন বলেছেন, ''প্রথম প্রথম যখন মানুষ আমাদের কাছে আসত তখন তাদের অধিকাংশের মধ্যে বেঁচে থাকার কোনও ইচ্ছে থাকত না বা তারা কাজ করা ছেড়ে দিত এবং ডাক্তারের উপরে কোনও ভরসাই থাকত না তাদের। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমরা তাদের জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে যাই এবং তাদের জীবনের অভিজ্ঞতা নিজেদের সঙ্গে ভাগ করে নিতে থাকি, বহু মানুষ এর ফলে উপকৃত হয়েছে এবং কম একাকিত্ব বোধ করেছে।''

২০১৪ সালে ৩৪ বছর বয়সি লেখক নম্রতা ব্যাংকিং বিনিয়োগের কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাঁর হাশিমোটর রোগ ধরা পড়ে। এটি এমন একটি অটোইমিউন অসুখ যেখানে অ্যান্টিবডি সঠিকভাবে গঠিত না হওয়ার ফলে থাইরয়েড গ্রন্থির কাজকর্ম বাধাপ্রাপ্ত হয় এবং তার ফলে মানুষের শরীরে দীর্ঘস্থায়ী জ্বালা অনুভূত হয়। নম্রতা নিজের অসুখটিকে 'রুড ওয়েক-আপ-কল' নামে অভিহিত করেছিল (কারণ এই অটোইমিউন অসুখটি সম্পর্কে মানুষের সচেতনতা অত্যন্ত কম)। নম্রতার কেরিয়ারের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়ে এই অসুখটি ধরা পড়েছিল।

ক্রনিক পেন ইন্ডিয়া অসুস্থতার কারণে নম্রতাকে তার জীবনের সীমাবদ্ধতাগুলোকে  গ্রহণ করতে কীভাবে সাহায্য করেছিল সেই অভিজ্ঞতার কথা সে আমাদের সঙ্গে ভাগ করে নিয়েছিল। সে জানিয়েছিল, ''এই দলের সদস্যদের সঙ্গে কথাবার্তা বলে আমার মনে হয়েছিল যে যা হয়েছে তা না হলেই ভালো হত। দৈনন্দিন জীবনে আমরা যে একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী নই সেকথাও তারা বলেছিল। এসব সত্ত্বেও জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে আমাদের লড়াই করেই এগিয়ে যেতে হয় এবং সত্যিই এই লড়াইটা অত্যন্ত বাস্তব''- এভাবেই ক্রনিক পেন ইন্ডিয়ার সঙ্গে নম্রতার কথাবার্তা হয়েছিল। এখন নম্রতা বাড়ির বাইরে বেরিয়ে ফ্রিল্যান্স এডিটর ও লেখক হিসেবে কাজ করে।

ফিজিশিয়ান, সাইকোথেরাপিস্ট, ক্লিনিক্যাল হিপনোথেরাপিস্ট ডঃ দিপালী এস. আজিঙ্কা বলেছেন যে দীর্ঘস্থায়ী ব্যথায় আক্রান্ত রুগিদের মধ্যে সাধারণত শারীরিক ও মানসিক- দু'ধরনের সমস্যাই দেখা দেয়।

ডাক্তার আজিঙ্কা জানিয়েছেন, ''অধিকাংশ রুগিদের মধ্যেই ব্যথা তীব্র হয়ে অবস্থার অবনতি করে এবং দীর্ঘ সময় ধরে এই ব্যথা চলতে থাকে ও এর থেকেই দীর্ঘস্থায়ী ব্যথার সমস্যা দেখা দেয়।'' তিনি আরও বলেছেন, ''তীব্র থেকে একটানা ব্যথা- ক্রমশ অবনতির এই প্রক্রিয়া রুগিদের আত্মবিশ্বাসকে একেবারে তলানিতে পৌঁছে দেয়। এর ফলে তাদের কাজকর্ম ক্ষতিগ্রস্ত হয়, এমনকী তারা তাদের প্রাত্যহিক কাজগুলোও ঠিকভাবে করতে পারে না। এর ফলে তাদের আত্মনির্ভরতা মারাত্মকভাবে কমে যায়। এই অবস্থায় যদি তারা তাদের পরিবার বা সমাজ থেকে কোনও সাহায্য না পায় তাহলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়ে যায় এবং মানুষের মধ্যে অবসাদ ও উদ্বেগের সমস্যা দেখা দেয়।''

মুম্বইয়ের পেন মেডিসিন-এর চিকিৎসক ডঃ মহেশ মেনন বলেছেন যে অনেকসময়ে নির্দিষ্ট কিছু ঘটনা যেমন- অসুস্থতা, আঘাত বা অপারেশনের ফলে মানুষের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা-যন্ত্রণা দেখা দেওয়ার ঝুঁকি লক্ষ করা যায়। কিন্তু তিনি এ-ও বলেছেন ''(...) এমন কিছু মানুষ আছে যারা ব্যথার জন্য দায়ী এই নির্দিষ্ট ঝুঁকিগুলো এড়াতে পারে না। আসলে দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা হল আমাদের স্নায়বিক হার্ডওয়্যার এবং সফটওয়্যারগত সমস্যার ফল। এই সমস্যা বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ কয়েকটি উপাদানের দ্বারা আরও জোড়ালো হয়ে তীব্র ব্যথার অনুভূতি জাগায়। এবং এই ব্যথা দূর করা বা তার চিকিৎসা করা মোটেই সহজ হয় না।''

ক্রনিক ইন্ডিয়া গ্রুপের একজন সদস্য হলেন অরুণ দাহিয়া। পেশায় প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষক এই সদস্যের ইন্টারস্টিটিয়াল সিস্টাইটিস, ফাইব্রোমায়ালজিয়া এবং মায়ালজিক এন্সেফায়োমায়ালাইটিস নামক অসুখ ধরা পড়েছিল। তিনি বলেছেন, ''আমার আশা ভবিষ্যতে এরকম আরও অনেক সাপোর্ট গ্রুপ হবে। তাহলে অদৃশ্য অসুস্থতাকে ঘিরে আমাদের মধ্যে যে কলঙ্কের বোধ জন্মায় তার বিরুদ্ধে আমরা লড়াই করতে পারব। এর ফলে এসব অসুস্থতার প্রতি মানুষের সচেতনতা এবং আলাপ-আলোচনা শুরু হবে। এখন বহু মানুষের ক্ষেত্রে এসব অসুখ ধরা না পড়া এবং তাদের দুর্ভোগের কারণ হল তারা জানেই না যে নিজের সমস্যাটা বোঝার জন্য তাদের কোথায় যেতে হবে এবং কীভাবে তারা যথাযথ সাহায্য পাবে।''

দীর্ঘস্থায়ী ব্যথায় আক্রান্ত একজন মানুষকে জীবনে অনেক প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হয়। এর জন্য তাদের মনে ভয় জাগে, যার ফলে তারা তাদের কাজ হারিয়ে ফেলে বা একঘরে হয়ে জীবনযাপন করে; এবং চিকিৎসার জন্য এক বিশাল অংকের টাকার সমস্যাও দেখা যায়...।  

ক্রনিক পেন ইন্ডিয়া এখন ক্রমশ নিজের লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে চলেছে। প্রতিটি দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতা, যা খালি চোখে দেখা যায় না সে সম্পর্কে মানুষের মধ্যে  সচেতনতা বাড়িয়ে চলেছে এই দল। তারা বিভিন্ন হাসপাতালে বক্তৃতা এবং সেমিনারের ব্যবস্থা করে সাধারণ ডাক্তারদের এবিষয়ে সচেতন করে তুলছে, যাতে এই ডাক্তাররা ব্যথা উপশমকারী একজন বিশেষজ্ঞের কাছে রুগিকে সঠিক চিকিৎসার জন্য পাঠানোর সুপারিশ করতে পারেন।

ভারতে সাপোর্ট গ্রুপ বা সমর্থনকারী দল একসময়ে একটি শহরে গড়ে ওঠে এবং সমীক্ষা চালিয়ে নিজেদের উপকারিতা প্রমাণের চেষ্টা করে। ডঃ মহাজনের রিপোর্ট থেকে জানা গিয়েছে একদম প্রথম ক্রনিক পেন ইন্ডিয়া নামের সাপোর্ট গ্রুপ গত বছরের শেষদিকে গড়ে উঠেছে, যার মাধ্যমে বহু মানুষ উপকৃত হয়েছে।