এইচআইভি এবং মানসিক স্বাস্থ্যের মধ্যে পারস্পরিক সংযোগ রয়েছে

''যখন আমি দ্বিতীয়বারের জন্য মা হতে চলেছি তখন আমার রক্ত পরীক্ষা করে এইচআইভি সংক্রমণ ধরা পড়ে। স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ সেই কথা আমার স্বামী ও আমার বাবাকে জানান। আমার স্বামীও তখন নিজের রক্ত পরীক্ষা করান। সেই সময়ে আমার স্বামীকে বলা হয়েছিল যে আমরা আর তিনমাস বাঁচব। সেটা শুনে আমাদের মনে ভীষণ ধাক্কা লেগেছিল ও আমরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিলাম। সেই সময়ে আমি আমার সাত বছরের ছেলের জন্য চিন্তিত হয়ে পড়ি। আমার স্বামী এতটাই হতাশ হয়ে পড়েছিল যে কাজে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছিল এবং আমরা বাড়ি ছেড়ে অন্যত্র চলে গিয়েছিলাম। আমি আমার বাবার বাড়িতে ফিরে গিয়েছিলাম এবং আমার স্বামী কোনও কাজকর্ম না করে নানান শহরে ঘুরে বেড়াত। আমি আমার দ্বিতীয় সন্তানটিকে জন্ম দেওয়ার আগেই নষ্ট করে ফেলেছিলাম। কারণ তখন আমি জানতাম না যে এইচআইভি-র সংক্রমণ থেকে গর্ভস্থ শিশুকে বাঁচানোর জন্য ওষুধ রয়েছে। ফলে আমার জীবনে সেই সময়ে এক ভয়ংকর ক্ষতি হয়ে গিয়েছিল।''- এমনই অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন কর্ণাটকের হেলথ প্রমোশন ট্রাস্ট-এর আইনি পরামর্শদাতা সরোজা পুথ্রান।

ভারতে ২১.৭ লক্ষ মানুষ এইচআইভি-তে আক্রান্ত। পৃথিবীতে মহামারী হিসেবে এই সমস্যাটিতে ভারতের স্থান তৃতীয় বৃহত্তম (দক্ষিণ আফ্রিকা পৃথিবীর বৃহত্তম  এইচআইভি সংক্রমণের দেশ, যেখানে প্রায় ৭০ লক্ষ মানুষ এই সমস্যায় আক্রান্ত)।  এইচআইভি বা হিউম্যান ইমিউনোডেফিসিয়েন্সি ভাইরাস মানুষের শরীরে রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে তোলে যার ফলে তার শরীরে নানারকম সংক্রমণ এবং অব্যবস্থা দেখা দেয়।

দ্রুত রোগ নির্ধারণের গুরুত্ব

এইচআইভির লক্ষণ এক-একজনের ক্ষেত্রে এক-একরকম হয় এবং এইচআইভি সংক্রমণ হয়েছে কিনা তা জানার জন্য রক্ত পরীক্ষাই হল একমাত্র উপায়। এই সমস্যাটি যদি তাড়াতাড়ি নির্ণয় করা যায় তাহলে একজন মানুষ ওষুধের সাহায্যে আপেক্ষিকভাবে স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারে। যদি কোনও কারণে এইচআইভি সংক্রমণ সঠিক সময়ে নির্ধারণ করা না যায় এবং দীর্ঘ সময় ধরে যদি তার চিকিৎসা না হয় তাহলে এইডস্‌ বা অ্যাকোয়ার্ড ইমিউনোডেফিসিয়েন্সি সিনড্রোমের সমস্যা দেখা দেয়।

এইচআইভি এবং মানসিক অসুস্থতাঃ এদের মধ্যে কী সংযোগ রয়েছে?

এইচআইভি ও মানসিক অসুস্থতাজনিত সম্পর্কের জটিলতা নিয়ে অনেক গবেষণা হয়েছে। নির্দিষ্ট কয়েকটি মনো-সামাজিক (সাইকো-সোশ্যাল) অক্ষমতাজনিত লক্ষণের জন্য একজন মানুষের মধ্যে এইচআইভি সংক্রমণ দেখা দেওয়ার ঝুঁকি অনেকটাই বেশি থাকে। যেমন- কোনও মানুষের মধ্যে যদি একটি নির্দিষ্ট মনোরোগ থাকে তাহলে তার মধ্যে অরক্ষিত যৌন জীবন যাপন করা এবং কোনও না কোনও নেশার প্রতি আসক্ত হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল হয়। এই দুটো কারণের জন্য মানুষের শরীর ভাইরাসজনিত সংক্রমণের আধার বা আশ্রয়স্থল হয়ে ওঠে। সংখ্যাতত্ত্বের বিচারে জনসংখ্যার প্রায় ১.৭ শতাংশ সাইকো-সোশ্যাল অক্ষমতাজনিত মানুষের মধ্যে এইচআইভি-র সংক্রমণ দেখা যায়।

অন্যভাবেও এই দুই সমস্যার মধ্যে যোগাযোগ রয়েছে। যেমন- এইচআইভি আক্রান্ত মানুষের মধ্যে নেতিবাচকতা বা অস্বীকার করার মনোভাব, রাগ বা ক্রোধ এবং দুঃখবোধ বা বিষণ্ণতা দেখা দেয়, যা মানুষের দৈনন্দিন কার্যকলাপের ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু এর মানে এই নয় যে এই ধরনের অনুভূতিগুলো দেখা দিলেই একজন মানুষের ক্ষেত্রে ক্লিনিক্যালি রোগ নির্ধারণ করতে হবে।

এই সমস্যাজনিত বহু গবেষণার পর্যালোচনা করে দেখা গিয়েছে যে, এইচআইভি সমস্যায় আক্রান্ত মানুষের ৯৮.৬ শতাংশের মধ্যে অন্যতম লক্ষণ হিসেবে অবসাদই প্রথম দেখা দেয়। আবার অন্যদিকে প্রায় ২৫ থেকে ৩৬ শতাংশ এইচআইভি আক্রান্ত মানুষ মানসিক উদ্বেগের সমস্যায় ভোগে। এর লক্ষণ হিসেবে সাইকোসিসেরসহাবস্থানও দেখা যায়। এর ফলে ভাইরাস বা অন্যান্য সংক্রমণের কারণে মানুষের রোগ প্রতিরোধ করার ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ে।

আমাদের সমাজে এইচআইভি পজিটিভ মানুষজনকে এক অকল্পনীয় কলঙ্কের যন্ত্রণা সহ্য করতে হয়। রোগ নির্ধারণের সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া হিসেবে এবং প্রতিকারক ওষুধ খাওয়ার ফলে মানুষের মধ্যে বাতিকগ্রস্ততা প্রবল হয়ে দেখা দেয়। অনেকসময়ে নিজেকে অসুস্থ ভাবাটাই মানুষের বাতিক হয়ে দাঁড়ায়।

এইচআইভি-র সহযোগী হিসেবে ডিমেনশিয়া এবং নিউরোকগনিটিভ (স্নায়বিক ব্যাধি) ডিসঅর্ডার-এর কারণে আমাদের স্নায়ুতন্ত্রের মধ্যে ভাইরাসের আক্রমণ ঘটে। এর ফলে সমাজচ্যুত ও প্রত্যাখ্যাত হওয়ার ভয়ে অনেক ক্ষেত্রে আত্মহত্যার চিন্তা জেগে ওঠতে দেখা গিয়েছে।

যদি আপনার মানসিক স্বাস্থ্যের সমস্যা দেখা দেয় তাহলে আপনি কী করবেন?

যদি আপনার বা আপনার প্রিয়জনের মধ্যে মানসিক সমস্যা দেখা দেওয়ার ঝুঁকি থাকে তাহলে আপনাকে প্রথমে আপনার ধারেকাছে থাকা ইন্টিগ্রেটেড কাউন্সেলিং অ্যান্ড টেস্টিং সেন্টারে (আইসিটিসি) যেতে হবে; সেখানে আপনি কাউন্সেলিং এবং এইচআইভি-র জন্য রক্ত পরীক্ষা করতে পারেন। এই কাউন্সেলিং সেন্টারগুলো রুগিদের সমস্ত পরীক্ষার রিপোর্ট খতিয়ে দেখে, সমস্যার লক্ষণগুলো ভালোভাবে বিচার-বিবেচনা করে আলোচনার মাধ্যমে এইচআইভি-র পূর্বাভাস ও তার সমাধানের উপায় ব্যাখ্যা করে, তাদের ওষুধ দেওয়া হয় এবং যথাযথ চিকিৎসার গুরুত্ব বোঝানো হয়। এই প্রক্রিয়াটি অনেকদিন ধরে চলে। এর ফলে মানুষ বুঝতে পারে যে এইচআইভি-র সমস্যাটি নিরাময় যোগ্য।

কিছু ক্ষেত্রে কাউন্সেলররা রুগিকে একজন মানসিক স্বাস্থ্যের বিশেষজ্ঞের সঙ্গে যোগাযোগ করার জন্য সুপারিশ করে। এমন সুপারিশ না করা হয়ে থাকলেও আপনার নিজের জন্য এমন পরিবেশ বেছে নেওয়া উচিত যেখানে কেউ আপনাকে বিচার করবে না, বরং সহিষ্ণুতার বাতাবরণ একজন রুগির মনে তার নির্ধারিত অসুখ সম্পর্কে ভুল ধারণা না জন্মাতে সাহায্য করে।

অনেকের মতো সরোজাও শুধুমাত্র স্বস্তি পেতে এবং নিজের মানসিক শক্তি গড়ে তোলার জন্য বিভিন্ন এনজিও-র দ্বারস্থ হয়েছিলেন। সেখানে তিনি নিজের সমস্যার বিষয়ে অনেক মূল্যবান তথ্য জানতে পেরেছিলেন এবং তাঁর মতো এই সমস্যায় আক্রান্ত অন্যান্যদের সঙ্গে যোগাযোগও করতে সক্ষম হয়েছিলেন।

এই ধরনের এনজিওগুলো সমর্থনকারী গোষ্ঠী হিসেবেও কাজ করে অথবা যাঁরা এই সংক্রমণে আক্রান্ত হয়েছেন তাঁদেরকে সেই সংক্রমণের সামাজিক, মানসিক এবং বাহ্যিক প্রভাব সম্পর্কে বোঝাতে সাহায্য করে থাকে। সর্বোপরি, এই এনজিওগুলো আপনাকে বা আপনাদের এইচআইভি সম্পর্কে সঠিক পথ দেখাতে ও দৈনন্দিন লড়াই-এর ক্ষেত্রে বাস্তবসম্মত জবাব বা উত্তর দেওয়ার জন্য সহায়তা করে থাকে।

এইচআইভি সম্পর্কে আরও তথ্য জানার জন্য এই ওয়েবসাইটটি দেখতে পারেন- http://naco.gov.in/faqs

কয়েকটি এমন সংস্থা রয়েছে যারা এইচআইভি আক্রান্ত মানুষকে সাহায্য করে। সেগুলো হল- কর্ণাটক হেলথ্‌ প্রমোশন ট্রাস্ট, কর্ণাটক স্টেট এইডস্‌ প্রিভেনশন সোসাইটি, এএসএইচএ ফাউন্ডেশন (ASHA Foundation), এসএএটিএইচআইআই (SAATHII), নাজ ফাউন্ডেশন (Naz Foundation), ইন্ডিয়া এইচআইভি/এইডস্‌ অ্যালায়েন্স।

এইচআইভি সংক্রমণে আক্রান্তদের কাউন্সেলিং করার জন্য যেসব হাসপাতাল রয়েছে সেগুলো হল- নিমহ্যান্স, সেন্ট জন্স হাসপাতাল, সরকারি হাসপাতালের ইন্টিগ্রেটেড কাউন্সেলিং অ্যান্ড টেস্টিং সেন্টার।