বয়স্কদের সুস্থতা বজায় রাখতে আপনি কী করতে পারেন?

মানুষের যত বয়স বাড়ে তত তার মধ্যে শারীরিক, বৌদ্ধিক, সামাজিক এবং পরিবার-ঘটিত নানারকম বোধশক্তিগুলো হারিয়ে যেতে থাকে। অপরদিকে তাদের জীবনে অক্ষমতাজনিত সমস্যা বাড়তে শুরু করে এবং সেই কারণে বয়স্ক মানুষদের দৈনন্দিন জীবনযাপনের ক্ষেত্রে অন্যদের সাহায্য নিতে হয়। বয়স্কদের শারীরিক সুস্থতার দিকে আমরা যতটা গুরুত্ব দিই, সেই সম পরিমাণ গুরুত্ব কিন্তু তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের সুস্থতার ক্ষেত্রে দেওয়া হয় না। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, বার্ধক্য নিয়ে আমাদের মনে যে ধরনের নেতিবাচক ধারণা গড়ে ওঠে তার ফলে বয়স্ক মানুষদের মধ্যে কাজ করার অক্ষমতা দেখা দেয় এবং তারা দ্রুত মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যেতে থাকে (Levy et al. 2002)। বার্ধক্যের সময়ে মানুষকে সচল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ হল তার শারীরিক এবং মানসিক সুস্থতা বজায় রাখা।

একজন বৃদ্ধ মানুষকে যে সব সমস্যার মুখোমুখি হতে হয় সেগুলো হল- দুঃখ, প্রিয়জনবিয়োগে শোক, বিচ্ছিন্নতা (সামাজিক এবং ভৌগোলিক), ভগ্ন স্বাস্থ্য, অপর্যাপ্ত সামাজিক কার্যকলাপজনিত সাহায্য (দুর্বল, অকেজো), তাদের বর্তমান জীবনযাপনের সঙ্গে সামাজিক পরিবেশের দ্বন্দ্ব প্রভৃতি।

এখানে এমন কয়েকটি উপায়ের কথা বল হয়েছে যা বয়স্কদের সুস্থতা বাড়াতে সাহায্য করে-

  • স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন পদ্ধতি বজায় রাখা জরুরি- শারীরিক কসরত, নিয়মিত  শরীরচর্চা অনুশীলন করা প্রয়োজন। কারণ বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শারীরিক ও মানসিক- দু'ধরনের স্বাস্থ্যেরই উন্নতি ঘটানো দরকার হয়। প্রাত্যহিক শরীরচর্চার প্রভাব মানুষের শরীর-স্বাস্থ্য, তার সচলতা এবং স্বাধীনতার উপর পড়ে। সেই সঙ্গে মানসিক অবসাদ ও উদ্বেগ দূর করতেও শরীরচর্চার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। মেজাজ-মর্জিগত সমস্যা কাটাতে এবং আত্মনির্ভরতা বাড়াতেও এটি সাহায্য করে। শারীরিক কসরতের মধ্যে রয়েছে হাঁটাহাঁটি করা, বাগান করা, নাচ করা, কুকুরকে নিয়ে রাস্তায় হাঁটা অথবা প্রতিযোগিতামূলক খেলাধুলোয় অংশগ্রহণ করা। বয়স্ক মানুষকে বেশি করে পুষ্টিকর খাবার খেতে হয়। কারণ তা শুধু একনাগাড়ে চলতে থাকা অসুখবিসুখ দূর করে তাই নয়, সেই সঙ্গে অসুস্থতা কাটিয়ে স্বাভাবিক জীবনযাপন করতেও সাহায্য করে।
  • অর্থবহ কাজকর্মের মাধ্যমে সক্রিয় থাকা জরুরি। এই কাজ পারিশ্রমিকের বিনিময়েও হতে পারে আবার স্বেচ্ছাধীনও হতে পারে। এটি বয়স্কদের সুস্থ থাকার ক্ষেত্রে খুবই দরকারি। কাজের মধ্য দিয়ে সমাজে নিজের কৃতিত্ব বজায় রাখতে পারলে তা তাদের মনের ইচ্ছাশক্তিকেও বাড়িয়ে তোলে। এছাড়া কাজকর্ম করতে পারলে বয়স্ক মানুষদের হাতে অর্থনৈতিক স্বাধীনতা আসে এবং এর উপর ভিত্তি করেই সামাজিক ক্ষেত্রে তাদের যোগদানের হারও বাড়ে (Marmot et al. 2003)।
  • সামাজিক কার্যক্রম শক্তিশালী করা দরকার। এর সাহায্যে বয়স্ক মানুষরা   সমাজে বিভিন্ন বয়সের মানুষের সঙ্গে মেলামেশার সুযোগ পায় এবং তাদের প্রতি সমাজের যত্নশীলতা বেড়ে ওঠে। অর্থাৎ, এমন অনেক সামাজিক আবাসিক সমিতি রয়েছে যারা কখনও কখনও কোনও একটা ক্লাব ভাড়া করে বয়স্কদের জন্য সাপ্তাহিক গল্প পড়ার অনুষ্ঠান আয়োজন করে। কমবয়সি স্বেচ্ছাসেবকরা এই দায়িত্ব নিজেদের কাঁধে তুলে নেয়।
  • সামাজিক আদানপ্রদান করা একান্ত জরুরি- যেহেতু সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এবং একাকিত্ব মানুষের শরীরে ও মনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে সেহেতু বিশেষ করে বয়স্ক মানুষদের সুস্থ থাকার জন্য তাদের মধ্যে সামাজিক মেলামেশার সুযোগ বাড়াতে হবে এবং সামাজিক সম্পর্ক গড়ে তোলার দিকে নজর রাখতে হবে। এর জন্য নিয়মিত বন্ধুবান্ধব ও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে হবে, নতুন নতুন বন্ধু পাতানোর চেষ্টা করতে হবে এবং সমব্যথী এমন মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলা দরকার। (বিশেষ করে যখন একজন বয়স্ক মানুষ শরীর-স্বাস্থ্যজনিত সমস্যা বা প্রিয়জন হারানোর জন্য শোকাতুর হয়ে পড়ে তখন সে তারই মতো আরও কয়েকজন মানুষের সঙ্গ পেতে চায়, যাতে তার মনের ব্যথা-বেদনা বা দুঃখের কিছুটা লাঘব হতে পারে)।

বৃদ্ধ বয়সে যদি মানুষের জীবনযাত্রার মধ্যে কোনও পরিবর্তন ঘটে তাহলে সেই পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া তাদের পক্ষে খুবই অসুবিধাজনক হয়। এর ফলে তাদের মধ্যে একাকিত্ব, বিচ্ছিন্নতা বা হতাশার বোধ জেগে উঠতে পারে। বয়স্কদের এই নেতিবাচক বোধগুলো দূর করতে সমাজের সক্রিয় মানুষজনকে এগিয়ে এসে  এই সমস্যার সমাধানে উদ্যোগী হতে হবে।

 

References: Levy, B.R,  Slade, M.D., Kunkel, S.R., & Karsi, S.V. (2002). Longevity increased by positive self-perceptions of aging. Journal of personality and Social Psychology, 83, 261-270.

  

  

    

Was this helpful for you?